আল জাজিরার বিশ্লেষণ

সৌদি-ইরান দ্বন্দ্বে কতক্ষণ নিরপেক্ষ থাকতে পারবে পাকিস্তান?

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
সৌদি-ইরান দ্বন্দ্বে কতক্ষণ নিরপেক্ষ থাকতে পারবে পাকিস্তান?
গত বছর ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ও প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ। ছবি: রয়টার্স

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ এক হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। জবাবে ইসরায়েলের ওপর ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইরান। সরাসরি যুদ্ধে না জড়ালেও এই দ্বন্দ্বের প্রভাব পড়ছে পাকিস্তানেও।

ইসরায়েলের পাশাপাশি উপসাগরীয় ছয়টি দেশে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইরান। এতে পাকিস্তান একটি কঠিন অবস্থায় পড়েছে। কারণ দেশটির দক্ষিণ-পশ্চিমে ইরানের সঙ্গে প্রায় ৯০০ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে এবং পাকিস্তানের লাখো শ্রমিক সৌদি আরবসহ বিভিন্ন উপসাগরীয় দেশে কাজ করেন।

গত বছরের সেপ্টেম্বর থেকে ইসলামাবাদ রিয়াদের সঙ্গে কয়েক দশকের সম্পর্ক আরও জোরদার করেছে। দুই দেশ একটি আনুষ্ঠানিক পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তিতে সই করেছে, যেখানে বলা হয়েছে-এক দেশের ওপর আক্রমণ হলে সেটিকে উভয়ের ওপর আক্রমণ হিসেবে গণ্য করা হবে।

এখন ইরানের ড্রোন ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র যখন উপসাগরীয় দেশগুলোকে লক্ষ্য করে হামলা চালাচ্ছে, তখন পাকিস্তানে জোরালোভাবে প্রশ্ন উঠছে-যদি এই যুদ্ধের মধ্যে ইসলামাবাদও জড়িয়ে পড়ে, তবে তারা কোন পক্ষ নেবে?

এ পর্যন্ত পাকিস্তানের অবস্থান হচ্ছে কূটনৈতিক যোগাযোগ জোরদার করা। দেশটি ইরান ও সৌদি আরবসহ আঞ্চলিক নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছে।

খামেনির মৃত্যুর পর ওই হামলাকে ‘অযৌক্তিক’ বলে নিন্দা জানিয়েছিল পাকিস্তান। এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর ইরানের পাল্টা হামলাকেও ‘সার্বভৌমত্বের স্পষ্ট লঙ্ঘন’ হিসেবে আখ্যা দেয় ইসলামাবাদ।

সংঘাত শুরুর সময় পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার সৌদি আরবের রিয়াদে ইসলামিক সহযোগিতা সংস্থার (ওআইসি) একটি বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন। পরে তিনি জানান, তখন তিনি তেহরান ও রিয়াদের মধ্যে মধ্যস্ততাকারী হিসেবে যোগাযোগ শুরু করেছিলেন।

৩ মার্চ এক সংবাদ সম্মেলনে পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, তিনি ব্যক্তিগতভাবে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচিকে সৌদি আরবের সঙ্গে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা চুক্তির বিষয়টি স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন।

সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ। ফাইল ছবি: রয়টার্স
সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ। ফাইল ছবি: রয়টার্স

ইসহাক দার বলেন, “সৌদি আরবের সঙ্গে আমাদের একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি রয়েছে এবং পুরো বিশ্বই এটি জানে। আমি ইরানি নেতৃত্বকে সৌদি আরবের সঙ্গে আমাদের এই চুক্তির বিষয়টি বিবেচনায় রাখতে বলেছি।”

পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরও জানান, ইরানের বিরুদ্ধে হামলা চালাতে সৌদি ভূখণ্ড ব্যবহার করা হবে না- এমন নিশ্চয়তার ব্যাপারে জানতে চেয়েছিলেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী।

ইসহাক দার জানান, তিনি রিয়াদ থেকে সেই নিশ্চয়তা সংগ্রহ করেছেন। এই পর্দার আড়ালের যোগাযোগের ফলেই সৌদি আরবের ওপর ইরানের হামলার মাত্রা সীমিত রাখা সম্ভব হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।

গত ৫ মার্চ সৌদি আরবে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত আলিরেজা এনায়াতি বলেন, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের মধ্যকার চলমান সংঘাতে সৌদি আরব তার আকাশপথ বা ভূখণ্ড যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে ব্যবহার করতে না দেওয়ার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এমন প্রতিশ্রুতিকে স্বাগত জানায় তেহরান।

এক সাক্ষাৎকারে ইরানের রাষ্ট্রদূত বলেন, “আমরা সৌদি আরবের কাছ থেকে বারবার যা শুনেছি যে, তারা তাদের আকাশপথ, জলসীমা বা ভূখণ্ড ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে দেবে না। আমরা তার প্রশংসা করি।”

তবে এর মাত্র একদিন পরই সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, তারা প্রিন্স সুলতান বিমান ঘাঁটি লক্ষ্য করে ছোড়া তিনটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করেছে।

এর কয়েক ঘণ্টা পর পাকিস্তানের ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির রিয়াদে গিয়ে সৌদি প্রতিরক্ষামন্ত্রী প্রিন্স খালিদ বিন সালমানের সঙ্গে বৈঠক করেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে সৌদির প্রতিরক্ষামন্ত্রী জানান, বৈঠকে সৌদি আরবের ওপর ইরানের হামলা এবং পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তির আওতায় তা বন্ধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ যত তীব্র হচ্ছে দুই ঘনিষ্ঠ অংশীদার ইরান ও সৌদি আরবের মধ্যে ভারসাম্য ধরে রাখা পাকিস্তানের জন্য ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।

গত বছরের ১৭ সেপ্টেম্বর রিয়াদে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরীফ ও সেনাপ্রধান আসিম মুনিরের উপস্থিতিতে দুই দেশের মধ্যে প্রতিরক্ষা চুক্তিটি সই করা হয়। এটিকে গত কয়েক দশকের মধ্যে পাকিস্তানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আনুষ্ঠানিক প্রতিরক্ষা প্রতিশ্রুতি হিসেবে গণ্য করা হয়।

এই চুক্তির মূল ধারাটি অনেকটা ন্যাটোর ‘আর্টিকেল ৫’-এর মতো, যেখানে বলা হয়েছে, যেকোনো এক দেশের ওপর আক্রমণ উভয় দেশের ওপর আক্রমণ হিসেবে গণ্য হবে। তবে বিশ্লেষকেরা সতর্ক করেছেন, এটি সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপের স্বয়ংক্রিয় নির্দেশনা হিসেবে ব্যাখ্যা করা ঠিক হবে না।

গত বছরের সেপ্টেম্বরে দোহায় হামাস কর্মকর্তাদের ওপর ইসরায়েলের হামলার পর এই চুক্তি হয়। ওই ঘটনা উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের ছয় দেশের (বাহরাইন, কুয়েত, ওমান, কাতার, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত) মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চয়তা নিয়ে আস্থায় বড় ধাক্কা দেয়।

পারমাণবিক অস্ত্রধারী পাকিস্তান বহু দশক ধরে সৌদি আরবের সঙ্গে সামরিক সম্পর্ক বজায় রেখে চলেছে। এই সম্পর্কের অংশ হিসেবে বর্তমানে সৌদি আরবে প্রায় এক হাজার ৫০০ থেকে দুই হাজার পাকিস্তানি সেনা মোতায়েন রয়েছে বলে ধারণা করা হয়। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে এই প্রতিরক্ষা চুক্তি এমন এক পরীক্ষার মুখে পড়েছে, যা দুই পক্ষের কেউই আগে কল্পনা করেনি।

রিয়াদভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান কিং ফয়সাল সেন্টার ফর রিসার্চ অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজের সহযোগী ফেলো উমের করিমের মতে, পাকিস্তানের বর্তমান সংকট মূলত একটি ভুল হিসাবের ফল। তার ভাষ্য, ইসলামাবাদ সম্ভবত কখনোই ভাবেনি যে তারা তেহরান ও রিয়াদের মাঝখানে এমন অবস্থায় পড়বে। বিশেষ করে চীনের মধ্যস্থতায় ২০২৩ সালে সৌদি আরব ও ইরানের সম্পর্ক পুনরুদ্ধারের পর।

ফাইল ছবি: রয়টার্স
ফাইল ছবি: রয়টার্স

উমের করিম বলেন, “পাকিস্তানের নেতারা সবসময় সৌদি প্রতিরক্ষার বিষয়ে সরাসরি আনুষ্ঠানিক অঙ্গীকার করতে সতর্ক ছিলেন। বর্তমান সেনাপ্রধান প্রথমবারের মতো তা করেছেন। এতে সম্ভাব্য লাভ যেমন বড়, তেমনি ঝুঁকিও অনেক।”

এই বিশ্লেষক আরও বলেন, “সম্ভবত শেষবারের মতো পাকিস্তানকে এভাবে পরীক্ষা করবে সৌদি আরব। আর যদি পাকিস্তান এবার তাদের অঙ্গীকার পূরণ না করে, তাহলে দুই দেশের সম্পর্ক অপূরণীয়ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।”

এর আগে ২০১৫ সালে ইয়েমেনে লড়াইয়ে সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোটে যোগ দেওয়ার সরাসরি অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেছিল পাকিস্তান। তখন সংসদের একটি প্রস্তাবে বলা হয়েছিল, পাকিস্তানকে নিরপেক্ষ থাকতে হবে।

গালফ ইন্টারন্যাশনাল ফোরামের জ্যেষ্ঠ নন-রেসিডেন্ট ফেলো ও সৌদি গবেষক আবদুলআজিজ আলঘাশিয়ান আল জাজিরাকে বলেন, ‘‘সৌদি-পাকিস্তান চুক্তির সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট। চুক্তি কেবল ততটাই শক্তিশালী, যতটা শক্তিশালী তার পেছনের রাজনৈতিক হিসাব ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা।”

অন্যদিকে ইসলামাবাদের কায়েদ-ই আজম ইউনিভার্সিটির ইতিহাসের অধ্যাপক ইলহান নিয়াজ মনে করেন, যদি সৌদি আরব ইরানের কাছ থেকে বড় ধরনের হুমকি অনুভব করে এবং আনুষ্ঠানিকভাবে পাকিস্তানের সামরিক সহায়তা চায়, তাহলে পাকিস্তান সৌদি আরবকে সহায়তা করবে। তিনি আল জাজিরাকে বলেন, “এটা না করলে পাকিস্তানের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।”

বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তানের জন্য বড় জটিলতা হলো-সৌদি আরব যদি সামরিক সহায়তা চায়, তবুও পাকিস্তান ইরানকে সরাসরি শত্রু হিসেবে বিবেচনা করতে পারে না।

দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে, গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক সম্পর্ক আছে এবং সাম্প্রতিক সময়ে কূটনৈতিক যোগাযোগও বেড়েছে। ২০২৫ সালের আগস্টে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ইসলামাবাদ সফর করেন এবং দুই দেশের মধ্যে বিভিন্ন আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগ বজায় রয়েছে।

তবে অধ্যাপক ইলহান নিয়াজ এও স্বীকার করেন, তেহরান ‘কঠিন প্রতিবেশী’ হিসেবেও পরিচিত। তারপরও তিনি মনে করেন, ইরানের স্থিতিশীলতা ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা বজায় রাখা পাকিস্তানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় স্বার্থের বিষয়।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা এবং ইরানের পাল্টা প্রতিক্রিয়ার প্রভাব পাকিস্তানের ভেতরেও দ্রুত দেখা গেছে। আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর পাকিস্তানে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। এতে অন্তত ২৩ জন নিহত হওয়ার পর গিলগিট-বালতিস্তানে সেনা মোতায়েন করা হয় এবং তিন দিনের কারফিউ জারি করা হয়। পাকিস্তানের প্রায় ২৫ কোটি জনসংখ্যার মধ্যে আনুমানিক ১৫ থেকে ২০ শতাংশ শিয়া মুসলিম, যারা ঐতিহাসিকভাবেই ইরানের ঘটনাকে কেন্দ্র করে আন্দোলনে সক্রিয় হয়ে ওঠে।

পাকিস্তানের সহিংস সাম্প্রদায়িক ইতিহাস এই পরিস্থিতিকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের প্রশিক্ষণ, অর্থায়ন ও নেতৃত্বে গঠিত পাকিস্তানের শিয়া মিলিশিয়া ‘জয়নাবিয়ুন ব্রিগেড’ গত এক দশকে পাকিস্তান থেকে হাজারো যোদ্ধা নিয়োগ করেছে। তাদের অনেকেই সিরিয়ায় আইএসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে, যদিও সিরীয় কিছু কর্মী তাদের বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার অভিযোগ এনেছেন।

দুই বছর আগে জয়নাবিয়ুন ব্রিগেডের প্রধান নিয়োগ কেন্দ্র পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের কুররম জেলায় সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষে ১৩০ জনের বেশি মানুষ নিহত হন। ২০২৪ সালে এই গোষ্ঠীটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে নিষিদ্ধ করে পাকিস্তান। তবে অনেক বিশ্লেষকের মতে, এই নিষেধাজ্ঞায় তাদের নেটওয়ার্ক পুরোপুরি ভাঙা যায়নি।

বিশ্লেষকদের সতর্কবার্তা, যদি ইরান ও পাকিস্তানের উপসাগরীয় মিত্রদের মধ্যে সংঘাত বাড়ে, তাহলে পাকিস্তানের ভেতরেই প্রতিরক্ষামূলক অবস্থান থেকে আক্রমণাত্মক অবস্থানে চলে যেতে পারে সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে অভিজ্ঞ হয়ে ওঠা এই যোদ্ধারা।

ইসলামাবাদভিত্তিক নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও পাক ইনস্টিটিউট অব পিস স্টাডিজের নির্বাহী পরিচালক আমির রানা আল জাজিরাকে বলেন, “পাকিস্তানের শিয়া সংগঠনগুলোর ওপর ইরানের উল্লেখযোগ্য প্রভাব রয়েছে। আর বেলুচিস্তান তো আগেই অত্যন্ত অস্থির এলাকা। যদি কোনো মুখোমুখি সংঘাত ঘটে, তাহলে পাকিস্তানের জন্য তার প্রভাব হবে খুবই খারাপ।”

প্রসঙ্গত, পাকিস্তানের বেলুচিস্তান প্রদেশ ইরানের সীমান্তঘেঁষা এবং বহু দশক ধরে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের কেন্দ্র।

তেহরানভিত্তিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক মোহাম্মদ খাতিবি বলেন, ভৌগোলিক বাস্তবতার কারণেও ইসলামাবাদের সিদ্ধান্ত সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছে।

পাকিস্তানের সামনে কী কী বিকল্প?

বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক পদক্ষেপ, যেমন যুদ্ধবিমান মোতায়েন করা বা ইরানের ভেতরে হামলা চালানোর মতো সিদ্ধান্ত পাকিস্তানের জন্য বাস্তবসম্মত নয়। কারণ দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাজনিত সীমাবদ্ধতা রয়েছে।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক আমির রানা বলেন, ইসলামাবাদ বর্তমানে এমন অবস্থান নেওয়ার চেষ্টা করছে যাতে দুই পক্ষকেই সন্তুষ্ট রাখা যায়। তিনি বলেন, “ইরানের দিক থেকে আসা প্রধান হুমকি হলো ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা। এই ক্ষেত্রে পাকিস্তান সৌদি আরবকে সহায়তা দিতে পারে। কিন্তু তাতে পাকিস্তান সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়বে-এটাই বড় প্রশ্ন।”

তার মতে, পাকিস্তানের সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পথ হতে পারে সৌদি আরবকে গোপনে সামরিক সহায়তা দেওয়া, একই সঙ্গে ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ বজায় রাখা।

গালফ ইন্টারন্যাশনাল ফোরামের আবদুলআজিজও আমির রানার সঙ্গে সহমত পোষণ করেছেন। তার মতে, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় সহযোগিতা পাকিস্তানের সবচেয়ে স্পষ্ট ভূমিকা হতে পারে। এটি সামরিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এবং রাজনৈতিকভাবেও গ্রহণযোগ্য পদক্ষেপ।

বাহরাইনে ইরানের ড্রোন হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনা। ছবি: রয়টার্স
বাহরাইনে ইরানের ড্রোন হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনা। ছবি: রয়টার্স

আবদুলআজিজ বলেন, “পাকিস্তান সৌদি আরবের আকাশ প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াতে সহায়তা করতে পারে। এটি বাস্তবসম্মত, প্রতিরক্ষামূলক এবং পাকিস্তানের স্বার্থেও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সৌদি আরবের স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধি পাকিস্তানের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।”

তবে বিশ্লেষক উমের করিম সতর্ক করেছেন, পাকিস্তানের ভারসাম্য রক্ষার সুযোগ হয়তো ইসলামাবাদ যতটা ভাবছে তার চেয়ে দ্রুত শেষ হয়ে যেতে পারে। তিনি বলেন, “পরিস্থিতি যদি সংকটজনক পর্যায়ে পৌঁছে এবং সৌদি আরবের জ্বালানি স্থাপনা ও অবকাঠামোতে হামলা বাড়ে, তাহলে খুব শিগগিরই সৌদি আরব পাকিস্তানের কাছে সরাসরি প্রতিরক্ষা সহায়তা চাইতে পারে।”

উমের করিম আরও বলেন, পাকিস্তান যদি সৌদি আরবে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোতায়েন করে, তাহলে নিজেদের প্রতিরক্ষা দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। আর গভীরভাবে জড়িয়ে পড়লে দেশে রাজনৈতিক চাপও বাড়বে।

এই মুহূর্তে ইসলামাবাদের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো কূটনীতি। রিয়াদ ও তেহরান-দুই রাজধানীর সঙ্গেই পাকিস্তানের যোগাযোগ ও আস্থার সম্পর্ক রয়েছে।

তেহরানভিত্তিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক মোহাম্মদ খাতিবি বলেন, পাকিস্তানের উচিত এই অবস্থান ‘যেকোনো মূল্যে’ ধরে রাখা। তিনি বলেন, “পাকিস্তানের সবচেয়ে বাস্তবসম্মত ভূমিকা হলো মধ্যস্থতাকারী হওয়া এবং দুই পক্ষের সঙ্গে সম্পর্ক কাজে লাগানো। ইরানবিরোধী জোটে পাকিস্তানের সেনা পাঠানোর সম্ভাবনা খুবই কম, কারণ এতে লাভের চেয়ে ঝুঁকিই বেশি।”

ইসলামাবাদের জন্য সবচেয়ে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি হবে উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের দেশগুলোর সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে।

ইতিমধ্যে সৌদি ও সংযুক্ত আরব আমিরাত বলেছে, ইরানের হামলা “রেড লাইন অতিক্রম করেছে।”

১ মার্চ যুক্তরাষ্ট্র, বাহরাইন, জর্ডান, কুয়েত, কাতার, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের এক যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, তারা এই হামলার মুখে ‘আত্মরক্ষার অধিকার পুনর্ব্যক্ত করছে’।

এ ধরনের পরিস্থিতি পাকিস্তানের জন্য গুরুতর প্রভাব ফেলতে পারে। কারণ উপসাগরীয় দেশগুলোতে বসবাসকারী লাখো পাকিস্তানি শ্রমিকের পাঠানো রেমিট্যান্স দেশটির অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

মোহাম্মদ খাতিবি বলেন, দীর্ঘস্থায়ী আঞ্চলিক যুদ্ধ উপসাগরীয় অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করলে পাকিস্তানের আর্থিক অবস্থার ওপরও সরাসরি প্রভাব পড়বে। তিনি আরও বলেন, “জ্বালানির দামও বাড়তে পারে, যা পাকিস্তানের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করবে। কারণ দেশটি জ্বালানির জন্য অনেকটাই উপসাগরীয় দেশের ওপর নির্ভরশীল।”

এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার দুই দিন আগে থেকেই আফগান তালেবানের সঙ্গে নিজস্ব সামরিক উত্তেজনা সামাল দিচ্ছে পাকিস্তান।

বিশ্লেষক উমের করিম সতর্ক করে বলেন, আঞ্চলিক সংঘাতে গভীরভাবে জড়িয়ে পড়লে পাকিস্তানের ভেতরে অস্থিরতা বাড়তে পারে। গবেষক আবদুলআজিজও বলেন, পাকিস্তান এই সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে চাইবে না।

তবে অধ্যাপক ইলহান নিয়াজ বলেন, যদি শেষ পর্যন্ত ইসলামাবাদকে ইরান ও সৌদি আরবের মধ্যে একটিকে বেছে নিতে বাধ্য করা হয়, তাহলে পাকিস্তানের সিদ্ধান্ত স্পষ্ট হবে। তিনি বলেন, “যদি তেহরান পাকিস্তানকে ইরান ও সৌদি আরবের মধ্যে বেছে নিতে বাধ্য করে, তাহলে পাকিস্তান নিঃসন্দেহে সৌদি আরবের পক্ষেই যাবে।”

সম্পর্কিত