কী কারণে নেপালের রাস্তায় জেন-জি'রা

ইয়াসিন আরাফাত
ইয়াসিন আরাফাত
কী কারণে নেপালের রাস্তায় জেন-জি'রা
নেপালের রাজপথে জেন-জি তরুণেরা। ছবি: কাঠমান্ডু পোস্টের সৌজন্যে

নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুতে জেন-জি প্রজন্মের তরুণদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। দুর্নীতি ও বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাপ নিষিদ্ধের প্রতিবাদে রাস্তায় নামে জেন-জি'রা।

দ্য কাঠমান্ডু পোস্ট জানিয়েছে, কারফিউ ভেঙে বিক্ষোভকারীরা সংসদ ভবনের কাছাকাছি সংরক্ষিত এলাকায় প্রবেশ করলে সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়। বিক্ষোভকারীরা গাছের ডাল, পানির বোতল ছুড়ে মারে এবং সরকারবিরোধী স্লোগান দেয়। জবাবে পুলিশ জলকামান, টিয়ার গ্যাস ও রাবার বুলেট ব্যবহার করে। কয়েকজন বিক্ষোভকারী সংসদ প্রাঙ্গণেও প্রবেশ করতে সক্ষম হয়, ফলে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়।

এরই মধ্যে কাঠমান্ডুতে কারফিউ ঘোষণা করা হয়েছে। জেলা প্রশাসক ছবি লাল রিজাল জানিয়েছেন, স্থানীয় সময় দুপুর ১২টা ৩০ মিনিট থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত কারফিউ বলবৎ থাকবে। এ সময় জনসমাগম, মিছিল বা বিক্ষোভ কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।

প্রেসিডেন্টের বাসভবন শীতল নিবাস, ভাইস-প্রেসিডেন্টের বাসভবন, সিংহ দরবারের চারপাশ, প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন বালুওয়াটারসহ বিভিন্ন স্থাপনা ও গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে।

এ পরিস্থিতিতে জরুরি বৈঠক ডেকেছেন নেপালের প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা অলি।

হঠাৎ কেন উত্তপ্ত নেপাল

নেপালে ফেসবুক, ইউটিউব ও এক্সসহ অন্তত ২৬টি স্থানীয়ভাবে নিবন্ধনবিহীন সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম শুক্রবার থেকে বন্ধ করে দিয়েছে সরকার। এর ফলে কোটি কোটি ব্যবহারকারী জনপ্রিয় অ্যাপগুলো ব্যবহার করতে না পেরে ক্ষোভ ও বিভ্রান্তিতে পড়েছেন। ইনস্টাগ্রাম ও স্ন্যাপচ্যাটের মতো প্ল্যাটফর্মও এর আওতায় পড়েছে।

এই সিদ্ধান্তে দেশজুড়ে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে, বিশেষত তরুণদের মধ্যে। তারা অভিযোগ করছে, সরকার মতপ্রকাশের স্বাধীনতা দমন করছে, অথচ দীর্ঘদিনের দুর্নীতির সংস্কৃতি দূর করতে ব্যর্থ হচ্ছে। সোমবার হাজারো জেন জি তরুণ রাজধানী কাঠমান্ডুতে বিক্ষোভ মিছিল বের করে।

২৪ বছর বয়সী শিক্ষার্থী যুবান রাজভান্ডারি এএফপিকে বলেন, ‘সোশ্যাল মিডিয়ার নিষেধাজ্ঞাই আমাদের রাস্তায় নামতে উদ্বুদ্ধ করেছে। তবে এটিই একমাত্র কারণ নয়। আমরা প্রতিবাদ করছি নেপালে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির বিরুদ্ধে।’

২০ বছরের ইক্ষামা তুমরোক বলেন, ‘আমরা সরকারের একনায়কতান্ত্রিক মনোভাবের বিরুদ্ধেও প্রতিবাদ করছি। পরিবর্তন চাই। আগের প্রজন্ম সহ্য করেছে, কিন্তু আমাদের প্রজন্মের হাতে এটার অবসান ঘটাতে হবে।’

এদিকে নিষেধাজ্ঞার পর থেকেই টিকটকে ভাইরাল হচ্ছে সাধারণ নেপালিদের কষ্টের জীবন ও রাজনীতিবিদদের সন্তানদের বিলাসবহুল জীবনযাপনের ভিডিও।

প্রতিবাদকারী ভূমিকা ভারতী বলেন, ‘বিদেশে দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন হয়েছে, সরকার ভয় পাচ্ছে সেটি এখানে ছড়িয়ে পড়তে পারে।’

কেন অ্যাপ নিষিদ্ধ হলো?

গত মাসে মন্ত্রিসভা সিদ্ধান্ত নেয়, ফেসবুক, ইউটিউব ও এক্সসহ ২৬টি কোম্পানিকে সাত দিনের মধ্যে নেপালে নিবন্ধন করতে হবে। সেইসঙ্গে তাদের একটি যোগাযোগের ঠিকানা রাখতে হবে। পাশপাশি অভিযোগ নিষ্পত্তি কর্মকর্তা ও কমপ্লায়েন্স অফিসার নিয়োগ দিতে হবে। এর আগে গত বছর সেপ্টেম্বরে সুপ্রিম কোর্টও এ বিষয়ে নির্দেশ দিয়েছিল।

সরকার রোববার এক বিবৃতিতে বলেছে, তারা মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে সম্মান করে এবং এর সুরক্ষা ও নির্বিঘ্ন ব্যবহারের জন্য পরিবেশ তৈরিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

উল্লেখ্য, নেপাল এর আগেও অনলাইন প্ল্যাটফর্মে বিধিনিষেধ দিয়েছে। চলতি বছরের জুলাইয়ে অনলাইন জালিয়াতি ও অর্থপাচার বেড়ে যাওয়ার অজুহাতে টেলিগ্রাম অ্যাপ ব্লক করা হয়। নেপালি নিয়ম মেনে চলতে সম্মত হওয়ায় গত বছর আগস্টে নয় মাস পর টিকটকের ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয় সরকার।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, তরুণেরা অনলাইনের মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন আন্দোলন দেখে অনুপ্রাণিত হচ্ছে। তাদের মতে, সামাজিক ও রাজনৈতিক মতপ্রকাশের ওপর সরকারি নিয়ন্ত্রণ এবং দীর্ঘমেয়াদি দুর্নীতির প্রতিবাদ মিলিয়ে জেন-জিদের এই রাস্তায় নামা।

তথ্যসূত্র: কাঠমান্ডু পোস্ট, এএফপি, এনডিটিভি, ইন্ডিয়া টাইমস

সম্পর্কিত