পারমাণবিক পরীক্ষা থেকে ট্রাম্পের বেরিয়ে আসার পথ আছে

পারমাণবিক পরীক্ষা থেকে ট্রাম্পের বেরিয়ে আসার পথ আছে
যুক্তরাষ্ট্র এক হাজারের বেশি পারমাণবিক পরীক্ষা চালিয়েছে। ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

১৯৯২ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর, সময়টা বিকেল ৩টার আশেপাশে। এসময় লাস ভেগাসের উত্তর-পশ্চিমে দিকে প্রায় ৬৫ মাইল দূরে মাটি প্রবলভাবে কেঁপে ওঠে। কারণ আর কিছু নয়, ভূগর্ভে পরিচালিত একটি পারমাণবিক বিস্ফোরণ। এতে বিস্ফোরিত হয় প্রায় পাঁচ হাজার টন টিএনটি-সমমান শক্তি। সেটিই ছিল আমেরিকার সর্বশেষ পারমাণবিক পরীক্ষা। এর প্রায় তেত্রিশ বছর পর এসে আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আবারও এমন পরীক্ষা চালানোর ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন।

কয়েকদিন আগে ট্রাম্প তার ট্রুথ সোশালে পোস্ট দিয়ে এই ইচ্ছের কথা জানান।

তিনি বলেন, “অন্যান্য সবদেশ পারমাণবিক পরীক্ষা চালাচ্ছে। তাই আমিও আমাদের পারমাণবিক অস্ত্রের পরীক্ষা শুরু করার জন্য যুদ্ধ বিভাগকে নির্দেশ দিয়েছি।”

এর পরের দিনই একটি সাক্ষাৎকারে তিনি আরও জোর দিয়ে বলেন, “পারমাণবিক অস্ত্র পরীক্ষা না করা একমাত্র দেশ আমরা হই তা আমি মোটেও চাই না।”

আমেরিকার পারমাণবিক অস্ত্র পরীক্ষা পুনরায় শুরু করা মানে পারমাণবিক বিশৃঙ্খলার দিকে এগিয়ে যাওয়া। তবে ট্রাম্প চাইলেই এই বিশৃঙ্খলা এড়াতে পারে। এজন্য তাকে কিছুটা কৌশলী হতে হবে। পারমানবিক অস্ত্র পরীক্ষা মানেই যে সবসময় ওয়ারহেডস বিস্ফোরণ ঘটাতে হবে তা নয়। তারা চাইলে অস্ত্রের বিভিন্ন উপকরণ পরীক্ষার মাধ্যমেও এটা করা যেতে পারে। আর জ্বালানি বিষয়ক মন্ত্রী ক্রিস রাইটের কথায় এমন ইঙ্গিতই পাওয়া যায়। আবার তারা অস্ত্রের যে ফ্লাইট টেস্ট নিয়মিত করে, সেটাও চালিয়ে যেতে পারে। 

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: রয়টার্স
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: রয়টার্স

পারমাণবিক অস্ত্র পরীক্ষার পক্ষে ট্রাম্পের প্রধান যুক্তি হলো তার দৃঢ় বিশ্বাস যে চীন ও রাশিয়া ইতোমধ্যেই আবার পারমাণবিক অস্ত্র পরীক্ষা শুরু করেছে। তবে আমেরিকান গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এত স্পষ্ট করে কিছুই জানায়নি। ২০২৪ সালে স্টেট ডিপার্টমেন্ট এক প্রতিবেদনে জানায়, ওয়াশিংটন মনে করছে যে বেইজিং ও মস্কো পরীক্ষা চালাচ্ছে আর এতে তারা বেশ উদ্বিগ্ন। তবে এটি কোনো স্পষ্ট অভিযোগ নয়, বরং আশঙ্কা মাত্র।

কিন্তু গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর রাশিয়া আর চায়নার অস্ত্র পরীক্ষা নিয়ে এই যে অনিশ্চয়তা, এটা নিয়ে অনেকের মধ্যেই প্রশ্ন আছে। পারমাণবিক অস্ত্র পরীক্ষায় তো বিশাল বিস্ফোরণের ঘটে।

আর এমন কিছু ঘটলে তা শনাক্ত করা কি খুব কঠিন? নিশ্চয় না।

খুব ছোট্ট পারমাণবিক পরীক্ষাও হয়। এসব পরীক্ষায় বিস্ফোরণের শক্তি খুব কম থাকে, যেমন, এক আউন্স টিএনটির খুব সামান্য অংশ পুড়িয়ে এই ধরনের কিছু পরীক্ষা করা হয়।

এগুলোকে বলা হয় সুপারক্রিটিক্যাল পরীক্ষা। সুপারক্রিটিক্যাল পরীক্ষা করা হয় পুরনো পারমাণবিক বোমার নকশা ঠিকঠাক আছে কি না তা দেখতে।

এই সময়, পরমাণুগুলকে এত কম চাপ দেওয়া হয়, যাতে মাত্র এক সেকেন্ডের জন্য একটা চেইন বিক্রিয়া শুরু হয়। দেশলাই কাঠিতে ধীরে আঘাত করলে যেমন খুব অল্প একটু আগুন জ্বলে আর সঙ্গে সঙ্গে নিভে যায়, ঠিক তেমন।

তবে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর আসল সমস্যা কিন্তু সুপারক্রিটিক্যাল পরীক্ষাগুলো ধরতে না পারা নয়, বরং সেগুলোকে সাবক্রিটিক্যাল পরীক্ষা থেকে আলাদা করা।

পারমাণবিক জিনিসপত্র সময় পেরোনোর সঙ্গে সঙ্গে কীভাবে পাল্টে যায় বোঝার জন্য সাবক্রিটিক্যাল পরীক্ষাগুলি করা হয়।

এই পরীক্ষাগুলিতে, পারমাণবিক উপাদানকে চাপ দেওয়া হয়, কিন্তু একটি চেইন বিক্রিয়া শুরু হওয়ার ঠিক আগের মুহূর্তে থামিয়ে দেওয়া হয়।

দেশলাই কাঠিতে আঘাত করলে যখন স্ফুলিঙ্গ বের হয় ঠিকই, কিন্তু আগুনটা ঠিক ধরে না, এটাকে সাবক্রিটিক্যাল পরীক্ষাগুলির একটা রূপক হিসেবে ধরা যেতে পারে।

সুপারক্রিটিক্যাল এবং সাবক্রিটিক্যাল পরীক্ষার মধ্যকার পার্থক্য হয়তো খুব জটিল এবং দুর্বোধ্য মনে হতে পারে। সত্যি বলতে, এটা জটিলই।

এই দুই ধরনের পরীক্ষাতেই একই ধরনের, বা হয়তো একই যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা হয়।

এটাই প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর জন্য এই পরীক্ষা দুটির মধ্যে পার্থক্য খুঁজে বের করা ভীষণ কষ্টসাধ্য করে তোলে।

কেউ দেশলাই কাঠি ঘষছে, এটা লক্ষ্য করা এক জিনিস, কিন্তু তারা এমনভাবে ঘষছে কি না যে তাতে এক মুহূর্তের জন্য শুধু ছোট্ট একটা শিখা তৈরি হচ্ছে, তা দেখা সম্পূর্ণ ভিন্ন জিনিস।

কিন্তু এই পার্থক্যটা বোঝা জরুরি। কারণ ওয়াশিংটনের কাছে এই পার্থক্যটাই ঠিক করে দেয় যে পারমাণবিক উপাদান নিয়ে করা একটি পরীক্ষাকে কখন একটি পারমাণবিক অস্ত্র পরীক্ষ হিসেবে ধরা হবে।

তবে আমেরিকার কিন্তু সাবক্রিটিক্যাল পরীক্ষাগুলোকে পারমাণবিক অস্ত্র পরীক্ষা হিসেবে ধরে না। কারণ তারা নিজেরাই এই পরীক্ষাগুলি করে। তাদের মাথাব্যথা হলো চীন এবং রাশিয়ার সাবক্রিটিক্যাল পরীক্ষাগুলো সীমা পেরিয়ে অন্যদিকে চলে যাচ্ছে কিনা, অর্থাৎ, তারা সুপারক্রিটিক্যাল পরীক্ষা করছে কি না।

চীন এ পর্যন্ত ৪৫টি পারমাণবিক অস্ত্রের পরীক্ষা চালিয়েছে। ছবি: রয়টার্স
চীন এ পর্যন্ত ৪৫টি পারমাণবিক অস্ত্রের পরীক্ষা চালিয়েছে। ছবি: রয়টার্স

কিন্তু যদি চীন এবং রাশিয়া খুব কম শক্তিসম্পন্ন পারমাণবিক পরীক্ষা করেও থাকে, তাহলেও আমেরিকার জন্য নিজেরাও আবার পরীক্ষা শুরু করা অনেক ব্যয়বহুল হবে।

এ ধরনের কম শক্তিসম্পন্ন পারমাণবিক পরীক্ষা সম্ভবত চীন ও রাশিয়ার জন্য খুব একটা লাভজনক হবে না। ২০১২ সালে আমেরিকার ন্যাশনাল অ্যাকাডেমিস এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিল যে, এই ধরনের পরীক্ষা রাশিয়ার নতুন কৌশলগত ক্ষমতা তৈরি করতে সাহায্য করবে, এমন সম্ভাবনা কম। আর পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির নকশায় চীনের অভিজ্ঞতা আরও কম।

তাই বেইজিং এই ধরনের কার্যকলাপ চালাচ্ছে, ট্রাম্পের এমন দাবি খুব একটা বিশ্বাসযোগ্য না।

অন্যদিকে আমেরিকার কোনো রকম পারমাণবিক অস্ত্রের পরীক্ষা করার কোনো প্রযুক্তিগত কারণ নেই।

তারা বড়জোর তাদের বর্তমান অস্ত্রের ভাণ্ডারের নিরাপত্তা এবং নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করতে পারে।

এমনকি, তারা আগের পরীক্ষাগুলোর তথ্যের ওপর ভিত্তি করে নতুন ওয়ারহেডও তৈরি করতে পারে, যদিও সেটা করা ভালো হবে কি না, তা বিতর্কের বিষয়।

আসলে পারমাণবিক পরীক্ষার পক্ষে যারা কথা বলছে, তাদের কাছে পরীক্ষা করার প্রধান কারণটা প্রযুক্তিগত নয়, বরং রাজনৈতিক।

এমন একজন ওয়াশিংটন পোস্ট পত্রিকাকে বলেছেন, “চীন (বেইজিং), রাশিয়া (মস্কো) এবং উত্তর কোরিয়ার (পিয়ংইয়ং) একনায়কদের দ্বারা আমরা ভয় পাবো তা প্রমাণ করার জন্য আমেরিকারও কিছু করা দরকার।”

আর যদি এটাই লক্ষ্য হয়, তাহলে খুব কম শক্তিসম্পন্ন পরীক্ষা যথেষ্ট হবে না। সেক্ষেত্রে মাটি কাঁপানো দরকার হবে, যা অনেকটা জ্বলন্ত দেশলাই কাঠি এক সমুদ্র পেট্রোলের ওপর ছুঁড়ে মারার সমতুল্য। এটা করা আসলে প্যান্ডোরার বাক্স খুলে দেওয়ার মতো হবে।

রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। ছবি: রয়টার্স
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। ছবি: রয়টার্স

যদি আমেরিকা পুরো মাত্রার একটি পারমাণবিক পরীক্ষা চালায়, তাহলে চীন, রাশিয়া এবং উত্তর কোরিয়াও সম্ভবত একই পথে হাঁটবে।

আবার তারা হয়তো আমেরিকার আগেই পরীক্ষা চালাতে পারে, কারণ নেভাডা টেস্ট সাইটে একটি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে এক থেকে তিন বছর পর্যন্ত সময় লাগে।

তাছাড়া, চীনের পরীক্ষা প্রায় অনিবার্যভাবে ভারতকে একটি পরীক্ষা চালাতে উৎসাহিত করবে, এবং ভারতকে দেখলে পাকিস্তানও বসে থাকবে না। এই সব দেশই চাইবে মাটি কাঁপানো বিস্ফোরণ ঘটাতে। বিষয়টি এরচেয়েও খারাপ হতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্র এক হাজারের বেশি পারমাণবিক পরীক্ষা চালিয়েছে, যেখানে রাশিয়া করেছে ৭১৫টি এবং চীন মাত্র ৪৫টি।

তাই আমেরিকার অস্ত্র বিজ্ঞানীরা প্রায় নিশ্চিতভাবে তাদের রুশ ও চীনা প্রতিদ্বন্দীদের চেয়ে পারমাণবিক অস্ত্রের পদার্থবিদ্যা ভালো বোঝেন।

পুরোদমে পরীক্ষা আবার শুরু করলে এক ধরনের সমতাও তৈরি হবে। কারণ রাশিয়া, চীন নতুন ধরনের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করার সুযোগ পাবে।

তাই এমন পরিস্থিতিতে ট্রাম্পের উচিত নিজের পায়ে নিজেই কুড়াল না মেরে পারমাণবিক অস্ত্রের পরীক্ষার সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসা।

লেখক: কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিস সংস্থার নিউক্লিয়ার পলিসি প্রোগ্রামের সহ-পরিচালক হিসেবে কর্মরত

**কার্নেগি এনডাউমেন্টের লেখাটি অনুবাদ করে প্রকাশিত।**

সম্পর্কিত