বেইজিংয়ে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার (এসসিও) শীর্ষ সম্মেলনটি একটি নজরকাড়া সামরিক কুচকাওয়াজ এবং একাধিক উচ্চাভিলাষী অর্থনৈতিক প্রস্তাবের সাক্ষী। বিশ্বজুড়ে অনেকেই এই ঘটনাকে আমেরিকার আধিপত্য থেকে একটি নতুন চীনা শতকের রূপান্তরের আরেকটি প্রমাণ হিসেবে দেখছেন। কিন্তু এই ধরনের ভাবনা আসলে বাস্তবতার অতিসরলীকরণ। এসসিও সম্মেলনটি আসলে একটি বহুকেন্দ্রিক বিশ্বের যথবদ্ধ ধারনাকে তুলে ধরেছে, যেখানে কোনো একটি একক রাষ্ট্রই একচ্ছত্র আধিপত্য চালাতে পারবে না। মধ্যপ্রাচ্যের জন্য এই পরিবর্তন কোনো বিমূর্ত ধারণা নয়। এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব রয়েছে দেশগুলোর সার্বভৌমত্ব, উন্নয়ন এবং এই অঞ্চলকে বাহ্যিক আধিপত্য থেকে মুক্ত করার সংগ্রামের ওপর।
দশকের পর দশক ধরে, মধ্যপ্রাচ্য আমেরিকার আধিপত্যেই ছিল। ইসরায়েল ও পারস্য উপসাগরের প্রধান প্রধান রাজতন্ত্রগুলোর সঙ্গে আমেরিকার জোট, বিশাল সামরিক উপস্থিতি এবং অর্থকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের মাধ্যমে এই অঞ্চলের রাজনীতি নিয়ন্ত্রিত হয়েছে। ইরান, সিরিয়া ও লেবাননের ওপর দেওয়া নিষেধাজ্ঞাগুলো প্রমাণ করে, কীভাবে ডলার এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর ওয়াশিংটনের নিয়ন্ত্রণ বশ্যতা আদায়ের জন্য ব্যবহৃত হয়েছে। আর্ন্তজাতিক মুদ্রা তহবিল বা আইএমএফ এবং বিশ্ব ব্যাংকের মতো পশ্চিমা-সমর্থিত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো এমন কিছু শর্ত আরোপ করেছে যা সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থাকে দুর্বল করে দিয়েছে এবং অনেক অর্থনীতিকে নির্ভরশীল ও দুর্বল করে তুলেছে। এসসিও সম্মেলন, যার মধ্যে একটি এসসিও উন্নয়ন ব্যাংক প্রতিষ্ঠা এবং বাণিজ্যে স্থানীয় মুদ্রার ব্যবহারের প্রস্তাব রয়েছে, যা একটি বিকল্প সম্ভাবনার ইঙ্গিত দেয়।
এর মানে এই নয় যে, চীন বা রাশিয়া মধ্যপ্রাচ্যকে মুক্ত করবে। উভয় দেশই নিজেদের স্বার্থ সুরক্ষিত করতে চায়। চীন চায় জ্বালানি নিরাপত্তা এবং বাজারের নাগাল; আর রাশিয়া সিরিয়ায় তার সামরিক উপস্থিতি এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সঙ্গে সম্পর্ককে কাজে লাগাতে ইচ্ছুক। কিন্তু বহুকেন্দ্রিকতার ধারনা এই সমীকরণটিও বদলে দেয়। এর অর্থ হলো, মার্কিন আধিপত্য আর একচ্ছত্র নয়। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো তাদের অংশীদারত্বকে বহুমুখী করতে, পশ্চিমা-নিয়ন্ত্রিত অর্থের ওপর নির্ভরতা কমাতে এবং আরও বেশি শক্ত অবস্থান থেকে আলোচনা করার সুযোগ পেতে পারে। এখন চ্যালেঞ্জ হলো, মধ্যপ্রচ্যের আঞ্চলিক সরকারগুলো এই সুযোগ কাজে লাগাতে পারবে, নাকি নতুন ধরনের নির্ভরশীলতার ফাঁদে পড়বে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোর কিছু উদাহরণ ঝুঁকি ও সম্ভাবনা তুলে ধরে। এর মধ্যে আছে, এক. আমেরিকার কঠোর নিষেধাজ্ঞার শিকার ইরান এশীয় অংশীদারদের সঙ্গে পণ্য বিনিময় বাণিজ্য এবং স্থানীয় মুদ্রায় লেনদেনের দিকে ঝুঁকেছে। এটি প্রমাণ করে যে, জবরদস্তির মুখেও আর্থিক উদ্ভাবন কিছুটা স্বস্তির সুযোগ দিতে পারে। দুই. তুরস্ক তার অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করার জন্য মুদ্রা বিনিময় এবং আঞ্চলিক চুক্তির পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছে। তিন. উপসাগরীয় দেশগুলো চীনা বিনিয়োগকে স্বাগত জানিয়েছে এবং অ-পশ্চিমা সংস্থাগুলোতে যোগদানের আগ্রহ প্রকাশ করেছে। চার. এই পদক্ষেপগুলো এখনও ছাড়াছাড়া। একটি সুসংহত আঞ্চলিক কৌশলের অভাবে, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিগুলোর দ্বারা ব্যবহৃত হতে পারে।
নতুন আর্থিক ব্যবস্থার ওপর এসসিও যে এই জোর দিচ্ছে তার বিশেষভাবে শক্তিশালী প্রভাব এমন সব অঞ্চলে পড়ছে, যেখানে ঋণ ও উন্নয়নে অর্থায়ন অনেকটাই রাজনৈতিক বশ্যতার সঙ্গে যুক্ত। একটি এসসিও ব্যাংক, এমনকি তার প্রাথমিক রূপেও, এমন একটি বিশ্বের প্রতীক হবে যেখানে দেশগুলো তাদের সার্বভৌমত্ব বিসর্জন না দিয়েই ঋণ নিতে পারে। ডলারের প্রভার মুক্ত হওয়াও এর সুদুরপ্রসারী লক্ষ্য, যা ইতিমধ্যেই রাশিয়া-চীনের ককাজে এবং মার্কিন আর্থিক নীতির অস্থিরতায় দৃশ্যমান। যুদ্ধ, কঠোরতা এবং নির্ভরশীলতার চক্রে ক্লান্ত সমাজগুলোর (পড়ুন দেশগুলোর) জন্য এই পরিবর্তনগুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
তাপপরেও এটা মানতে হবে যে, বহুকেন্দ্রিকতা ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তা দেয় না। যে মধ্যপ্রাচ্য প্রশ্নহীন আনুগত্যে ওয়াশিংটনের ওপর নির্ভর করে, তারা তাহলে বেইজিং বা মস্কোর ওপর নির্ভর হয়ে পড়বে। তারা নির্ভরশীলতার চক্র থেকে মুক্ত হতে পারবে না। সত্যিকারের সার্বভৌমত্বের জন্য মধ্যপ্রচ্যের দেশগুলোর প্রয়োজন কৌশল, সমন্বয় এবং দূরদর্শিতা। আঞ্চলিক শক্তিগুলোকে কেবল বাহিরের শক্তির প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র হিসেবে কাজ না করে সামাজিক উন্নয়ন, স্থিতিস্থাপকতা এবং সমতাপূর্ণ প্রবৃদ্ধিকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। সুশীল সমাজেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তাদের উচিত সরকারগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি করা, যাতে তারা অ-পশ্চিমা শক্তিগুলোর সঙ্গে তাদের সম্পর্কের ক্ষেত্রে আরও ন্যায্য, আরও স্বচ্ছতা এবং প্রকৃত স্বাধীনতা দাবি করে। এই পদক্ষেপগুলো ছাড়া, বহুকেন্দ্রিকতা হয়তো নতুন মোড়কে পুরোনো শ্রেণিবিন্যাসকেই ফিরিয়ে আনবে।
তাত্ত্বিকভাবে, এসসিও সম্মেলনটি একটি ব্যাপক রূপান্তরের ইঙ্গিত দেয়। অমিতাভ আচার্যের মতো পণ্ডিতদের মতে, ভবিষ্যতের বিশ্বব্যবস্থা কোনো একক পরাশক্তি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হবে না, বরং এটি হবে 'আর্কিটেকচার অফ পাওয়ারস' বা 'শক্তির দ্বীপপুঞ্জ'। মধ্যপ্রাচ্যের জন্য এই 'দ্বীপপুঞ্জ' একটি সুযোগ হতে পারে।
এই ব্যবস্থার ফলে অঞ্চলটি একপাক্ষিক নির্ভরতা থেকে বেরিয়ে এসে নিজেদের ভূমিকা প্রতিষ্ঠা করতে পারবে। তবে ঐক্য ও কৌশল ছাড়া এই অঞ্চলটি শক্তির বিভিন্ন দ্বীপের মধ্যে দিশাহীনভাবে ভেসে বেড়াতে পারে, নিজেদের পথ তৈরি করতে পারবে না। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মূল কাজ হলো বহুকেন্দ্রিকতাকে কেবল দর্শক হিসেবে না দেখে, নতুন এই বিশ্বব্যবস্থাকে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সক্রিয় ভূমিকা রাখা।
বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত এসসিও সম্মেলনের সময়টি কিছু মানুষের কাছে তার ক্ষেপণাস্ত্র ও যুদ্ধবিমানের প্রদর্শনের জন্য মনে থাকবে। কিন্তু এর গভীর তাৎপর্য লুকিয়ে আছে পশ্চিমা আধিপত্যে চিড় ধরানোর প্রক্রিয়া হিসেবে। এটা অন্যদের জন্য যে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের জন্য এর শিক্ষা খুবই পরিষ্কার: আমেরিকার একচ্ছত্র আধিপত্যের যুগ শেষ হচ্ছে। কিন্তু এর উত্তরসূরি কে হবে, তা এখনো অনির্ধারিত। এটি হতে পারে নির্ভরশীলতার আরেকটি চক্র, অথবা এটি হতে পারে আরও ভারসাম্যপূর্ণ, ন্যায্য ও বহুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থা। এই পার্থক্য নির্ভর করবে একটি বিষয়ের ওপর: মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো কি সম্মিলিতভাবে কাজ করার, নিজেদের স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠার এবং একবিংশ শতাব্দীর কাঠামো গঠনে নিজেদের স্থান করে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেবে, নাকি শুধু দর্শক হয়ে থাকবে।
পেইমান সালেহি: একজন ইরানি রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও লেখক
(মিডিল ইস্ট মনিটর-এ প্রকাশিত লেখাটি বাংলায় অনুবাদ করে প্রকাশ করা হলো।)