দক্ষিণ এশিয়ায় সাম্প্রতিক ঘটনাবলীতে এক অদ্ভুত মিল লক্ষ্য করা যাচ্ছে। নেপালে সেপ্টেম্বরে প্রধানমন্ত্রী কে.পি. শর্মা ওলিকে ক্ষমতাচ্যুত করে জেনারেশন জি-এর নেতৃত্বাধীন বিক্ষোভ। এর সঙ্গে গত বছর বাংলাদেশে শেখ হাসিনার পতনের ‘মনসুন রেভল্যুশন’ এবং ২০২২ সালে শ্রীলঙ্কায় গোতাবায়া রাজাপক্ষের পদত্যাগের ‘আরাগালায়া’ আন্দোলনের সঙ্গে মিলে যায়। এই গণ আন্দোলনগুলো রাজনৈতিক অকার্যকারিতা, অর্থনৈতিক সংকট এবং জনসংখ্যাগত চাপের মতো রাষ্ট্রের কাঠামোগত সমস্যাগুলোর ইঙ্গিত দেয়।
নেপালে ২০০৮ সালে রাজতন্ত্রের অবসানের পর ১৭ বছরে ১৪টি সরকার দেখা গেছে। দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনা এবং ২৬টি সামাজিক মাধ্যমে নিষেধাজ্ঞার কারণে তরুণরা রাস্তায় নেমেছে। নেপালের জনসংখ্যার এক-চতুর্থাংশ ১৫ বছরের নিচে। দেশটিতে গড় বয়স ২৫, এবং এক-পঞ্চমাংশ যুবক বেকার।
এই ঘটনাগুলো ভারতের বৈশ্বিক পরাশক্তি হওয়ার উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। ভারত অস্থিতিশীল দেশগুলোর মধ্যে ঘেরা। এরমধ্যে চারটি দেশ-বাংলাদেশ, নেপাল, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা অর্থনৈতিক সংকটের কারণে আইএমএফ থেকে আর্থিক সহায়তা নিচ্ছে। আফগানিস্তান ও মিয়ানমার ব্যর্থ বা প্রায়-ব্যর্থ রাষ্ট্র। চীন ও পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের ভূখণ্ডগত বিরোধ রয়েছে এবং এই দুই দেশেরই পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে।
দক্ষিণ এশিয়া অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সবচেয়ে কম সমন্বিত অঞ্চল। এই অঞ্চলের দেশগুলোর মোট বাণিজ্যের মাত্র ৫ শতাংশ হয় পরস্পরের সঙ্গে। দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থার (সার্ক) সর্বশেষ শীর্ষ সম্মেলন হয়েছে ২০১৪ সালে।
গত কয়েক বছরে ভারতের আলোচনা ও বিশ্লেষণে প্রাধান্য পেয়েছে দেশটির বৈশ্বিক ভূমিকা ও উচ্চাকাঙ্ক্ষা। ২০২৩ সালে জি-২০ সম্মেলনে সভাপতিত্ব, মহাকাশ অভিযান, বিশ্বের দ্রুততম প্রবৃদ্ধির বৃহৎ অর্থনীতি হিসেবে অবস্থান এবং দশকের শেষে তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতিতে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা-এসব বিষয়ই অভ্যন্তরীণ আলোচনায় এসেছে বেশি। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়া ও ইউরোপের মতো শক্তিধর দেশগুলোর সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক নিয়েও হয়েছে ব্যাপক আলোচনা। কিন্তু ভারতের মধ্যে এই আলোচনায় নিকট প্রতিবেশীরা উপেক্ষিত। ভারতের নরেন্দ্র মোদি ২০১৪ সালে ‘প্রতিবেশী প্রথম’ নীতি ঘোষণা করলেও, ভারত এখন বৈশ্বিক শক্তি হিসেবে নিজেকে তুলে ধরতে বেশি আগ্রহী। এ বছরের রাইসিনা ডায়ালগে ইউক্রেন, গাজা, এআই, এবং মহাকাশ শাসন নিয়ে আলোচনা হলেও, প্রতিবেশী দেশগুলোর উল্লেখ ছিল না। রাইসিনা ডায়ালগ হলো একটি বহুপাক্ষিক সম্মেলন যা ২০১৬ সাল থেকে ভারতের নয়াদিল্লিতে বার্ষিক অনুষ্ঠিত হয়। এই সম্মেলন বাংলাদেশের মনসুন রেভল্যুশনের মাত্র ছয় মাস পর এবং এপ্রিলে কাশ্মীর হামলার আগে অনুষ্ঠিত হয়। এই হামলা ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কে দুই দশকের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি তৈরি করেছে।
গত বছর বাংলাদেশে শেখ হাসিনার পতনের পর উদযাপন করছেন ছাত্র-জনতা। ছবি: চরচাসম্মেলনে ইউক্রেনে শান্তিরক্ষী পাঠানো নিয়ে আলোচনা হলেও, আফগানিস্তান বা মিয়ানমারে ভারতের ভূমিকা নিয়ে কোনো আলোচনা ছিল না, যা প্রতিবেশী কূটনীতিতে উদাসীনতার ইঙ্গিত দেয়। যুক্তরাজ্যে একটি রুদ্ধদ্বার আলোচনায় এক ভারতীয় এমপি বলেন, ভারত প্রতিবেশীকে ভৌগোলিক নৈকট্য দিয়ে নয়, বরং সাধারণ স্বার্থ দিয়ে সংজ্ঞায়িত করে। যদিও দেশটির কাছে কোয়াড বা ব্রিকসের মতো জোট গুরুত্ব পাচ্ছে, এগুলো প্রতিবেশীদের সঙ্গে দৃঢ় সম্পর্কের বিকল্প নয়।
ভারতের অনেকেই দক্ষিণ এশিয়ায় আঞ্চলিক সংকটের কারণ হিসেবে দীর্ঘদিনের ভারত–পাকিস্তান সম্পর্কের জটিলতাকে দায়ী করে থাকেন। পাকিস্তান সার্কের সদস্যদেশ। এটি হয়তো সার্কের অচলাবস্থা ব্যাখ্যা করতে পারে, কিন্তু এতে ব্যাখ্যা মেলে না। কারণ অন্যান্য আঞ্চলিক সংগঠনও প্রায় অকার্যকর হয়ে আছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, বঙ্গোপসাগর-ভিত্তিক আঞ্চলিক সংগঠন ‘বিমসটেক’-এর কথা। পাকিস্তান এর সদস্য নয়, তবু ১৯৯৭ সালে গঠনের পর থেকে সংগঠনটি মাত্র ছয়বার শীর্ষ সম্মেলন করেছে।
দক্ষিণ এশিয়ার অস্থিরতার সঙ্গে আঞ্চলিক ঘটনাবলিকে নয়াদিল্লির গুরুত্ব না দেওয়ার প্রবণত-গভীরভাবে বিশ্লেষণের দাবি রাখে, যা অনেক সময় অনুপস্থিত থেকেছে।
বেশিরভাগ দেশের নিরাপত্তা হুমকি আসে তাদের সীমান্তবর্তী অঞ্চল থেকে। যেমন রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণ ইউরোপের জন্য অস্তিত্ব সংকট তৈরি করেছে। আবার স্নায়ুযুদ্ধকালে কিউবা ক্ষেপণাস্ত্র সংকটে আমেরিকার সবচেয়ে বড় হুমকি এসেছিল নিজের ‘পেছনের উঠান’ থেকেই। কিউবান মিসাইল সংকট হয়েছিল ১৯৬২ সালের অক্টোবর মাসে। এটি ছিল ১৩ দিনের একটি মারাত্মক সংকট, যখন সোভিয়েত ইউনিয়ন কিউবায় পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন করে, যা যুক্তরাষ্ট্রকে পারমাণবিক হামলার ঝুঁকিতে ফেলেছিল। অবৈধ অভিবাসনও অনেক দেশের রাজনীতিতে একইভাবে সংবেদনশীল ইস্যু।
ভারতের পররাষ্ট্রনীতি যদি নিজেকে কেবল বৈশ্বিক শক্তি হিসেবে তুলে ধরে, কিন্তু আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে নিজের দায়িত্বকে উপেক্ষা করে—তাহলে তা দীর্ঘ মেয়াদে টিকবে না।
ভারতের এই ‘পাড়াপ্রতিবেশী উপেক্ষা’ তার নিজস্ব সীমান্ত অঞ্চলেও প্রতিফলিত হচ্ছে। চীন ও পাকিস্তান সীমান্তবর্তী লাদাখে সাম্প্রতিক অস্থিরতা ও ২০২৩ সালের মিয়ানমার সীমান্তবর্তী মণিপুরের অস্থিরতা এরই অংশ। উভয় ক্ষেত্রেই ভারতীয় সরকারের প্রতিক্রিয়া ধীর ছিল। যেমন, প্রধানমন্ত্রী মোদি মণিপুর সফরে যান ঘটনার দুই বছর পর।
ভারতের দক্ষিণ এশিয়া নীতির প্রভাব তার বৃহত্তর পররাষ্ট্রনীতিতেও পড়েছে। “লুক ইস্ট” নীতির আওতায় ভারতের পূর্বমুখী সম্পর্ক, যা মোদি সরকার “অ্যাক্ট ইস্ট” নামে পুনঃপ্রচার করেছে। কিন্তু মিয়ানমারের সংঘাত এবং বাংলাদেশের কম ভারতবান্ধব সরকারের কারণে ধীর হয়ে পড়েছে। এর ফলে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে সরাসরি স্থল যোগাযোগ স্থাপনের প্রচেষ্টা ব্যাহত হয়েছে।
ভারতের পশ্চিমমুখী সম্পর্ক (মধ্যপ্রাচ্য বা ভারতের পরিভাষায় “পশ্চিম এশিয়া”) আরও জটিল। কারণ পাকিস্তানের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী বিরোধ ও আফগানিস্তানের অস্থিরতা। যদিও কাবুলে তালেবান সরকারের সঙ্গে ভারতের সাম্প্রতিক যোগাযোগ এই বাধা দূর করার ইঙ্গিত দেয়।
এই প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে উঠতে ভারত আকাশপথ, সমুদ্র ও জনসংযোগের মাধ্যমে অঞ্চলটির সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করার চেষ্টা করছে। যেমন: ইরানে ভারতের পরিচালিত চাবাহার বন্দর, এবং ভারতের জি-২০ সভাপতিত্বের সময় ঘোষিত ইন্ডিয়া-মিডল ইস্ট-ইউরোপ ইকোনমিক করিডোর। তবে পাকিস্তান ও সৌদি আরবের মধ্যে সেপ্টেম্বরে ঘোষিত প্রতিরক্ষা চুক্তির তুলনায় ভারতের মধ্যপ্রাচ্য নীতি এখনও দুর্বল।
অর্থনৈতিক দিক থেকেও আঞ্চলিক সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ। চীন যেমন বৈশ্বিক পরাশক্তি হওয়ার আগে আঞ্চলিকভাবে অর্থনীতি ও অবকাঠামোকে একীভূত করেছিল। এটাই তাকে বৈশ্বিক উৎপাদন নেটওয়ার্কের কেন্দ্রে নিয়ে গেছে। ভারতকেও বৈশ্বিক উৎপাদন কেন্দ্র হতে চাইলে একই পথ অনুসরণ করতে হবে।
পশ্চিমা দেশগুলোও ভারতের প্রতি একধরনের বিচ্ছিন্ন মনোভাব রাখে, যেখানে তারা দক্ষিণ এশিয়ার সামগ্রিক প্রেক্ষাপটকে উপেক্ষা করে। এর পেছনে আংশিক কারণ প্রশাসনিক জটিলতা; যেমন যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্র দপ্তরে ‘ইন্ডিয়া অ্যান্ড ইন্ডিয়ান ওশান ডিরেক্টরেট’ আলাদা বিভাগ, আর আফগানিস্তান ও পাকিস্তান নিয়ে কাজ করে আরেকটি বিভাগ— ‘আফগানিস্তান অ্যান্ড পাকিস্তান ডিরেক্টরেট।’ একইভাবে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বিভাগে ভারত “ইন্দো-প্যাসিফিক কমান্ড”-এর অধীনে, কিন্তু আফগানিস্তান ও পাকিস্তান “সেন্ট্রাল কমান্ড”-এর অধীনে।
এই প্রেক্ষাপটে দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক বিশেষ দূত সার্জিও গরকে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন রাষ্ট্রদূত হিসেবে নয়াদিল্লিতে নিয়োগ দেওয়া ইতিবাচক পদক্ষেপ। যদিও ভারত উদ্বেগ প্রকাশ করেছে, এই নিয়োগ হয়তো যুক্তরাষ্ট্রকে আবারও ভারত-পাকিস্তানকে একসঙ্গে বিবেচনা করতে উৎসাহিত করবে এবং ভারতকে শুধু দক্ষিণ এশিয়ার শক্তি হিসেবেই দেখবে।
সর্বোপরি পশ্চিমা দেশগুল্কে ভারতের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে। ভারত নীতিকে দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তর প্রেক্ষাপটের সঙ্গে আরও নিবিড়ভাবে যুক্ত করতে হবে। পশ্চিমা দেশগুলো যদি ভারতের দিকে দক্ষিণ এশিয়ার চোখে তাকায়, তবে তারা অঞ্চলটির যৌথ চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায়ও বেশি সক্ষম হবে।
এই চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে রয়েছে— জনসংখ্যা চাপ, কারণ দক্ষিণ এশিয়ার প্রায় ৪০ শতাংশ জনগণ ১৮ বছরের নিচে।
জলবায়ু ঝুঁকি, যেহেতু এটি জলবায়ু পরিবর্তনে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলগুলোর একটি।
অভিবাসন, কারণ দক্ষিণ এশীয়রা অনেক পশ্চিমা দেশে অবৈধ অভিবাসীদের বড় উৎস।
এছাড়া এ অঞ্চলে যখন গণ-আন্দোলন পুরনো রাজনীতিকে ভেঙে দিচ্ছে, তখন বিদেশি সরকারগুলোকেও তাদের কূটনৈতিক কৌশল নতুনভাবে ভাবতে হবে।
সবচেয়ে ভালো উদাহরণ শ্রীলঙ্কা। যেখানে ২০২৪ সালের নির্বাচনে পুরোনো রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরা পরাজিত হয়েছেন। বিজয়ী হয়েছেন বামপন্থী জোটের নেতা অনুড়া কুমারা দিসানায়েকে, যার দল জনতা ভিমুক্তি পেরামুনা একসময় দেশজুড়ে সশস্ত্র আন্দোলন করেছিল। এই অপ্রত্যাশিত নির্বাচনী ফল শ্রীলঙ্কার অস্থির রাজনীতিকে যেমন তুলে ধরেছে, তেমনি দেশের মূলধারার রাজনীতির প্রতি জনগণের গভীর হতাশাও স্পষ্ট করেছে।। এই ফলাফল দেখিয়েছে যে জনগণের হতাশা কতটা তীব্র।
জেন জি আন্দোলনে উত্তাল নেপাল। ছবি: কাঠমান্ডু পোস্টের সৌজন্যেএকই ধরনের প্রবণতা বাংলাদেশ ও নেপালেও দেখা যাচ্ছে। উভয় দেশই বর্তমানে অন্তর্বর্তী সরকার দ্বারা পরিচালিত, যেখানে বাংলাদেশে নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূস ও নেপালে সাবেক প্রধান বিচারপতি সুশীলা কার্কি নেতৃত্ব দিচ্ছেন।
ছাত্র ও তরুণ নেতৃত্বাধীন সংগঠন যেমন: বাংলাদেশে ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি এবং নেপালে হামি নেপাল রাজনীতিতে নতুন শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে।
এর ফলে বাংলাদেশের ‘বেগম রাজনীতি’ যেখানে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে ক্ষমতা পালাবদল হতো এবং নেপালের তিনটি প্রধান দলের (নেপালি কংগ্রেস ও দুটি কমিউনিস্ট দল) প্রবীণ নেতৃত্বের আধিপত্য দুর্বল হচ্ছে।
এর পাশাপাশি, বৃহত্তর ভূ-রাজনৈতিক পরিবর্তনও ঘটছে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো এখন ভারত ও চীনের প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে কাজে লাগিয়ে উভয়ের কাছ থেকেই সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করছে। চীন এরইমধ্যে দক্ষিণ এশিয়ায় প্রধান বাণিজ্য অংশীদার, বিনিয়োগ উৎস এবং প্রতিরক্ষা সহযোগী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ছবি: এক্স থেকে নেওয়াঅন্যদিকে, ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক জটিল থেকে গেছে। অনেক দেশের রাজনৈতিক দল ও প্রার্থী নির্বাচনে “ভারত-বিরোধী” অবস্থান নেয়। যেমন মালদ্বীপ ও বাংলাদেশের সাম্প্রতিক নির্বাচনের প্রচারে “ইন্ডিয়া আউট” স্লোগান ছিল একটি বড় অংশ।
তবুও, বাস্তবে ভারতই অঞ্চলটির প্রধান শক্তি হিসেবে রয়ে গেছে। এর প্রমাণ হলো, মালদ্বীপ ও শ্রীলঙ্কার সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক সংকটে ‘শেষ আশ্রয়ের ঋণদাতা’ হিসেবে ভারতের সহায়তা।
বিশ্বব্যাপী যখন প্রচলিত নীতি ও প্রতিষ্ঠানগুলো চাপের মুখে, তখন আঞ্চলিক জোটগুলো নতুন গুরুত্ব পাচ্ছে। এর ফলে দক্ষিণ এশিয়ায় আঞ্চলিক সংহতি ও সহযোগিতা জোরদারের প্রয়োজনীয়তা আরও তীব্র হয়ে উঠেছে।
এই প্রস্তাবটি আমি যখন ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রী এস. জয়শঙ্করের কাছে তুলে ধরেছিলাম, তিনি ভারতের বিভিন্ন উদ্যোগের উদাহরণ দেন—যেমন অবকাঠামো প্রকল্প, আর্থিক সহায়তা, টিকা বিতরণ এবং খাদ্যশস্য সরবরাহ। যেগুলোর মাধ্যমে ভারত আঞ্চলিক সংযোগ জোরদার করতে চেয়েছে। কিন্তু এসব উদ্যোগ সত্ত্বেও দক্ষিণ এশিয়ায় আঞ্চলিক সংহতি ও পারস্পরিক আস্থা কেন এখনও দুর্বল, তার ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না। স্পষ্টতই, উন্নতির সুযোগ এখনও রয়েছে।
এই বিষয়টি পশ্চিমা দেশগুলোর জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ অভিবাসন, জলবায়ু পরিবর্তন এবং চীনের বৈশ্বিক ভূমিকা নিয়ে চলমান বিতর্ক দক্ষিণ এশিয়ার ঘটনাবলির সঙ্গে বিভিন্নভাবে জড়িত। যদিও তারা আঞ্চলিক সংহতি জোরপূর্বক আরোপ করতে পারে না, তবুও মতাদর্শগতভাবে মিল থাকা দেশগুলো তাদের শক্তি ও সমন্বয় ক্ষমতা ব্যবহার করে জলবায়ু সহনশীলতা, অভিবাসন এবং শারীরিক ও ডিজিটাল সংযোগ জোরদারের মতো নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে সহযোগিতা সহজতর করতে পারে।
তবে এটি বাস্তবায়ন সহজ হবে না, কারণ বৈশ্বিকভাবে উন্নয়ন সহায়তা হ্রাস, পররাষ্ট্রনীতির প্রতিযোগিতামূলক অগ্রাধিকার এবং আর্থিক চাপ রয়েছে। কিন্তু দক্ষিণ এশিয়ায় বিশ্বের এক-চতুর্থাংশ জনসংখ্যা বসবাস করে, তাই এই অঞ্চলে যা ঘটে তা গোটা বিশ্বের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
ফরেন পলিসির ওয়েবসাইটে প্রকাশিত নিবন্ধ থেকে অনুবাদ করে প্রকাশ করা হলো।
চেইতিজ বাজপেয়ী চ্যাথাম হাউসের এশিয়া-প্যাসিফিক প্রোগ্রামে দক্ষিণ এশিয়ার সিনিয়র রিসার্চ ফেলো।