তরুণ চক্রবর্তী

আসামের ভোটের ফলাফলে চিরকালই গুরুত্বপূর্ণ ‘আলি-কুলি-বাঙালি’ জনতা-জনার্দন! আলি মানে মুসলমান, তারা জনসংখ্যার প্রায় ৪০ শতাংশ। কুলি, মানে চা শ্রমিক, তাদের সংখ্যাও ২০ শতাংশ ছুঁই ছুঁই। আর বাঙালিদের সংখ্যাও ভোট-বাজারে বেশ গুরুত্বপূর্ণ। অসমীয়াদের পরে বাঙালিরাই সবচেয়ে বড় জনগোষ্ঠী। তবে মুসলিম আর বাঙালিরা নেতাদের পাল্লায় পড়ে দুই ভাগে বিভক্ত। মুসলমানদের ভাগ করা হয়েছে ‘খিলঞ্জিয়া’ ও ‘চালানি’ হিসাবে। খিলঞ্জিয়া শব্দের অর্থ হল ভূমিপুত্র। তারা অসমীয়াভাষী। আর চালানি হচ্ছে বাংলাভাষী। বিজেপির চোখে চালানিদের বড় অংশই বাংলাদেশি। আর বাঙালিদের তো হিন্দু আর মুসলিমে কবে থেকেই ভাগাভাগি চলছে!
অতীতে এই আলি-কুলি-বাঙালি ভোটই বড় ভরসা ছিল কংগ্রেসের। বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী বা বিদেশি খেদানোর নামে আসামে অশান্তি কম হয়নি। আটের দশকের ‘বঙাল খেদা’ আন্দোলন থেকে শুরু করে বিভিন্ন সময়ে বহু মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। এমনকী, বাঙালি অধ্যুষিত বরাক উপত্যকায় বাংলা ভাষায় কথা বলার জন্য ১১ জনকে সরকারি নিরাপত্তা রক্ষীদের গুলিতে শহিদ হতে হয়। জাতীয় নাগরিক পঞ্জী (এনআরসি) থেকে শুরু করে বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় বাঙালিরা আসামে বহু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। আজও হচ্ছেন।
অথচ ঐতিহাসিকভাবেই বাঙালিরাও অসমের ভূমিপুত্র। ১৮৭২ সালে ব্রিটিশরা নিজেদের সুবিধার্থে অবিভক্ত বাংলা থেকে নিঃশব্দ বঙ্গভঙ্গের মাধ্যমে অবিভক্ত কাছাড় ও গোয়ালপাড়া জেলাকে আসামের সঙ্গে যুক্ত করে। সেই ইতিহাস ভুলে এখনো চলছে ‘বঙাল খেদা’। এমনকী, সরকারি পর্যায়েও ‘ঘুষপেটিয়া’ বা ‘বেআইনি অনুপ্রবেশকারী’ আখ্যা দিয়ে বাঙালিদের হয়রানি চলছে।
ভারতের পাঁচ রাজ্যের সঙ্গে আসামেও বিধানসভার ভোট। আগামী ৯ এপ্রিল ১২৬টি আসনের জন্য ২ কোটি ৪৯ লাখ ৫৮ হাজার ১৩৯ জন ভোট দেবেন। পশ্চিমবঙ্গসহ ভোটমুখী বাকি চার রাজ্যেই ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনী (এসআইআর) হলেও বিজেপি শাসিত আসামে হয়েছে বিশেষ সংশোধনী বা এসআর। বাদ গিয়েছে বহু মুসলমান নাম। এসআর নিয়ে অভিযোগের অন্ত নেই।
আসামে এবার লড়াইও বিজেপি ও আঞ্চলিক দলের জোটের সঙ্গে কংগ্রেস ও অন্যান্য দলের জোটের। এছাড়াও মমতা ব্যানার্জির তৃণমূলসহ অন্যরাও নির্বাচনের ময়দানে রয়েছে। মনোনয়ন প্রক্রিয়া শেষ। এবারের নির্বাচনে ৭২২ জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। ৮১৫ জন প্রার্থী ১,৩৮৯টি মনোয়ন দাখিল করেছিলেন। মনোনয়নপত্র পরীক্ষার পর ৭৮৯টি মনোনয়ন বৈধ বলে ঘোষিত হয়। কিন্তু ৬৭ জন প্রার্থী তাদের মনোনয়ন প্রত্যাহার করেন। তাই ১২৬টি আসনে ৭২২ জন প্রার্থী থাকছেন ভোটে।
আসামে এখন ভোট প্রচার তুঙ্গে। বিজেপি স্লোগান তুলেছে, ‘হাতত বিড়ি মুখত পান ভাগৌ মিঞা পাকিস্তান’। এখানে ‘পাকিস্তান’ বলতে বাংলাদেশকেই বোঝানো হয়েছে। এমনকী, রাজ্য কংগ্রেসের সভাপতি তথা জাতীয় সংসদে কংগ্রেসের উপনেতা গৌরব গগৈকেও ‘পাকিস্তানি চর’ বলে কটাক্ষ করছেন খোদ মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা। ভোটপ্রচারে তিনি বলছেন, “অসমিয়ারা আর কখনই বাংলাদেশিদের স্বীকার করবে না। বাংলাদেশিদের বিরুদ্ধে লড়াই করে জিতবেও অসমিয়ারা। ভয়ঙ্কর লড়াই হবে এবার।”
বিজেপি আসামের ভোটে উগ্র অসমীয়া আধিপত্যবাদের পক্ষে প্রচার করছে। দশ বছর ধরে ক্ষমতায় রয়েছে বিজেপি। গত পাঁচ বছরে ভাষিক ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে ব্যাপক উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়েছে। এর পরেও মুখ্যমন্ত্রীর হুমকি, “গত পাঁচ বছরে টানা উচ্ছেদ অভিযান চালিয়ে দেড় লাখ বিঘা জমি দখলমুক্ত করা হয়েছে। আগামী পাঁচ বছরে আরও পাঁচ লাখ বিঘা জমিতে উচ্ছেদ অভিযান চালানো হবে। শান্তিতে থাকতে দেওয়া হবে না বাংলাদেশিদের। এমনি লড়াই নয়। ভয়ঙ্কর লড়াই হবে। এতে হারতেই হবে বাংলাদেশিদের। অসমিয়া মানুষই জিতবে। তাই কংগ্রেসকে নতুন ডায়লগ লেখা উচিত।”
বিজেপির হয়ে প্রচারে নেমে অসমীয়া যুবমঞ্চ, জাতীয় সংগ্ৰামী সেনা, বীর লাচিত সেনা, খিলঞ্জীয়া ঐক্য মঞ্চ রাজ্য জুড়ে স্লোগান তুলেছে ‘মিঞা খেদাওক আসাম বাঁচাওক’। বিভাজনের রাজনীতিই বিজেপির বড় ভরসা।
মুসলিমদের ভোট কিন্তু আসামের নির্বাচনে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। ২০১১ সালের জনগণনা অনুযায়ী আসামের ৩৪.২২ শতাংশ মুসলিম। ৩৭টি বিধানসভা কেন্দ্রেও মুসলিমরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ। মুখ্যমন্ত্রীর মতে, রাজ্যে বর্তমানে ৪০ শতাংশই মুসলমান। তাই তিনি মিঞাদের বিরুদ্ধে হিন্দু অসমিয়া ও বাঙালিদের ক্ষেপিয়ে তুলতে চাইছেন।
মিঞাদের পাশাপাশি কুলিরাও কিন্তু আসামের নির্বাচনে বড় ফ্যাক্টর। গত এক যুগ ধরে বিজেপিই চা বাগানে আধিপত্য দেখিয়েছে। কিন্তু এবার চা বাগানগুলোতে বিভিন্ন দাবিদাওয়া নিয়ে বিক্ষোভের সুর শোনা যাচ্ছে। মোট ভোটারের ১৭ থেকে ২০ শতাংশের মধ্যে বিক্ষোভের সুর চিন্তায় রেখেছে বিজেপিকে। মুসলমানদের মতোই চা বাগানগুলোতেও বিভাজনের রাজনীতি করতে চাইছে বিজেপি।
কিন্তু এই বিভাজনের রাজনীতিতেও পুরো ভরসা নেই বিজেপির। তাই কংগ্রেস ভাঙিয়ে দলের শক্তি বাড়াতে হচ্ছে তাদের। এক সময় কংগ্রেস মুক্ত উত্তর পূর্বাঞ্চলের ডাক দিলেও আজ এই অঞ্চলের সবচেয়ে বড় রাজ্যেই দলছুট কংগ্রেসীদের ঘনঘটা! মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মাও এক সময়ে কংগ্রেসের নেতা ও মন্ত্রী ছিলেন। এবারে তার দলের প্রার্থীদের ৩০ জনই দলবদলু। ভোটের মুখে প্রদেশ কংগ্রেসের সাবেক সভাপতি ভূপেন বরা, জাতীয় সংসদের সদস্য প্রদ্যুৎ বরদলৈসহ এক ঝাঁক কংগ্রেসি নেতাকে বিজেপি দলে টেনেছে। শুধু তাই নয়, গত ৫ বছরে আরও ৯ জন কংগ্রেস বিধায়ককে বাধ্য করা হয়েছে দলবদলুর তালিকায় নাম লেখাতে।
দল ভাঙিয়েও স্বস্তিতে নেই বিজেপি। কারণ দলবদলুদের টিকিট দিতে গিয়ে ঘরের লোক বলে পরিচিত প্রবীন নেতাদের বঞ্চিত করা হয়েছে। তাই বিজেপিতেও চলছে বিদ্রোহের সুর। রাজ্যের মন্ত্রী নন্দিতা গার্লোসা বিজেপির টিকিট না পেয়ে কংগ্রেসের হয়ে ভোটে লড়ছেন। সাবেক রাজ্য সভাপতি সিদ্ধার্থ ভট্টাচার্য, প্রবীন বিধায়ক অতুল বরা, জয়ন্ত দাসরা প্রকাশ্যেই বিদ্রোহ ঘোষণা করে নির্বাচনী লড়াইকে বেশ জনপ্রিয় করে তুলেছেন।
গতবার বিধানসভা ভোটে ১২৬টি কেন্দ্রের ফলাফলে বিজেপির নেতৃত্বাধীন জোট পেয়েছিল ৭৫টি আসন। বিজেপি একাই পেয়েছিল ৬০টি। অন্যদিকে, কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন মহাজোট পায় ৫১টি। এরমধ্যে কংগ্রেস পেয়েছিল ২৯টি। এই জোটের দ্বিতীয় বৃহত্তম দল এআইইউডিএফ গতবার ২০টি আসন পেলেও এবার তারা আলাদা লড়ছে। ভোটের ফলে হাড্ডাহাড্ডির ইঙ্গিত মিললেও পরবর্তীতে দল ভাঙানোর খেলায় বিরোধীদের শক্তি অনেকটাই কমিয়ে দেয় বিজেপি। দলবদলের হাত ধরে বিজেপি জোটের বর্তমানে আসন সংখ্যা ৮০ আর প্রধান বিরোধী জোটের ২৩। বাকি আসনগুলোতে রয়েছে অন্যরা।
এবারের নির্বাচনে মুসলমান বিদ্বেষ বনাম সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিই প্রধান ইস্যু। সঙ্গে রয়েছে সরকারি সাফল্যের ঢালাও প্রচার বনাম দুর্নীতির অভিযোগ। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, ব্রহ্মপুত্রের বন্যা, বেকার সমস্যাও রয়েছে ভোট প্রচারে। কিন্তু এইসবের বাইরেও ভোটের ময়দানের উঠে আসছেন অকাল প্রয়াত সংগীত শিল্পী, অসমিয়া অস্মিতার প্রতীক জুবিন গর্গ। গত বছর ১৯ সেপ্টেম্বর সিঙ্গাপুরে স্কুবা ডাইভিং করতে গিয়ে পানিতে ডুবে প্রাণ হারান অসমীয়াদের হৃদয় সম্রাট জুবিন। তার মৃত্যু রহস্য উদঘাটন নিয়ে এখনও মানুষ বিচার চাইছেন।
সামনেই অসমিয়াদের প্রাণের উৎসব রঙালি বিহু। ভোটের উত্তাপেও চলছে বিহুর প্রস্তুতি। কিন্তু এবারের বিহুতে থাকবেন না তাদের প্রাণপ্রিয় শিল্পী। তাই শোকের ছায়া সর্বত্র। সেই শোকই জন্ম দিচ্ছে ক্ষোভের। ক্ষুব্ধ জুবিন-অনুরাগীরা ভোট প্রচারে ব্যস্ত ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের সামনেও জুবিন হত্যার বিচার চেয়ে স্লোগান দিতে কার্পণ্য করেননি। জুবিন মৃত্যুর আগে বিজেপির বিরুদ্ধে ভোট দিতে বলেছিলেন। এখন দেখার তার ভক্তরা সেই ডাকে সাড়া দেন কিনা। বোঝা যাবে ৪ মে, গণনার দিন। আপাতত আশঙ্কার দোলাচলে বিজেপি।
লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক, কলকাতা (ভারত)

আসামের ভোটের ফলাফলে চিরকালই গুরুত্বপূর্ণ ‘আলি-কুলি-বাঙালি’ জনতা-জনার্দন! আলি মানে মুসলমান, তারা জনসংখ্যার প্রায় ৪০ শতাংশ। কুলি, মানে চা শ্রমিক, তাদের সংখ্যাও ২০ শতাংশ ছুঁই ছুঁই। আর বাঙালিদের সংখ্যাও ভোট-বাজারে বেশ গুরুত্বপূর্ণ। অসমীয়াদের পরে বাঙালিরাই সবচেয়ে বড় জনগোষ্ঠী। তবে মুসলিম আর বাঙালিরা নেতাদের পাল্লায় পড়ে দুই ভাগে বিভক্ত। মুসলমানদের ভাগ করা হয়েছে ‘খিলঞ্জিয়া’ ও ‘চালানি’ হিসাবে। খিলঞ্জিয়া শব্দের অর্থ হল ভূমিপুত্র। তারা অসমীয়াভাষী। আর চালানি হচ্ছে বাংলাভাষী। বিজেপির চোখে চালানিদের বড় অংশই বাংলাদেশি। আর বাঙালিদের তো হিন্দু আর মুসলিমে কবে থেকেই ভাগাভাগি চলছে!
অতীতে এই আলি-কুলি-বাঙালি ভোটই বড় ভরসা ছিল কংগ্রেসের। বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী বা বিদেশি খেদানোর নামে আসামে অশান্তি কম হয়নি। আটের দশকের ‘বঙাল খেদা’ আন্দোলন থেকে শুরু করে বিভিন্ন সময়ে বহু মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। এমনকী, বাঙালি অধ্যুষিত বরাক উপত্যকায় বাংলা ভাষায় কথা বলার জন্য ১১ জনকে সরকারি নিরাপত্তা রক্ষীদের গুলিতে শহিদ হতে হয়। জাতীয় নাগরিক পঞ্জী (এনআরসি) থেকে শুরু করে বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় বাঙালিরা আসামে বহু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। আজও হচ্ছেন।
অথচ ঐতিহাসিকভাবেই বাঙালিরাও অসমের ভূমিপুত্র। ১৮৭২ সালে ব্রিটিশরা নিজেদের সুবিধার্থে অবিভক্ত বাংলা থেকে নিঃশব্দ বঙ্গভঙ্গের মাধ্যমে অবিভক্ত কাছাড় ও গোয়ালপাড়া জেলাকে আসামের সঙ্গে যুক্ত করে। সেই ইতিহাস ভুলে এখনো চলছে ‘বঙাল খেদা’। এমনকী, সরকারি পর্যায়েও ‘ঘুষপেটিয়া’ বা ‘বেআইনি অনুপ্রবেশকারী’ আখ্যা দিয়ে বাঙালিদের হয়রানি চলছে।
ভারতের পাঁচ রাজ্যের সঙ্গে আসামেও বিধানসভার ভোট। আগামী ৯ এপ্রিল ১২৬টি আসনের জন্য ২ কোটি ৪৯ লাখ ৫৮ হাজার ১৩৯ জন ভোট দেবেন। পশ্চিমবঙ্গসহ ভোটমুখী বাকি চার রাজ্যেই ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনী (এসআইআর) হলেও বিজেপি শাসিত আসামে হয়েছে বিশেষ সংশোধনী বা এসআর। বাদ গিয়েছে বহু মুসলমান নাম। এসআর নিয়ে অভিযোগের অন্ত নেই।
আসামে এবার লড়াইও বিজেপি ও আঞ্চলিক দলের জোটের সঙ্গে কংগ্রেস ও অন্যান্য দলের জোটের। এছাড়াও মমতা ব্যানার্জির তৃণমূলসহ অন্যরাও নির্বাচনের ময়দানে রয়েছে। মনোনয়ন প্রক্রিয়া শেষ। এবারের নির্বাচনে ৭২২ জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। ৮১৫ জন প্রার্থী ১,৩৮৯টি মনোয়ন দাখিল করেছিলেন। মনোনয়নপত্র পরীক্ষার পর ৭৮৯টি মনোনয়ন বৈধ বলে ঘোষিত হয়। কিন্তু ৬৭ জন প্রার্থী তাদের মনোনয়ন প্রত্যাহার করেন। তাই ১২৬টি আসনে ৭২২ জন প্রার্থী থাকছেন ভোটে।
আসামে এখন ভোট প্রচার তুঙ্গে। বিজেপি স্লোগান তুলেছে, ‘হাতত বিড়ি মুখত পান ভাগৌ মিঞা পাকিস্তান’। এখানে ‘পাকিস্তান’ বলতে বাংলাদেশকেই বোঝানো হয়েছে। এমনকী, রাজ্য কংগ্রেসের সভাপতি তথা জাতীয় সংসদে কংগ্রেসের উপনেতা গৌরব গগৈকেও ‘পাকিস্তানি চর’ বলে কটাক্ষ করছেন খোদ মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা। ভোটপ্রচারে তিনি বলছেন, “অসমিয়ারা আর কখনই বাংলাদেশিদের স্বীকার করবে না। বাংলাদেশিদের বিরুদ্ধে লড়াই করে জিতবেও অসমিয়ারা। ভয়ঙ্কর লড়াই হবে এবার।”
বিজেপি আসামের ভোটে উগ্র অসমীয়া আধিপত্যবাদের পক্ষে প্রচার করছে। দশ বছর ধরে ক্ষমতায় রয়েছে বিজেপি। গত পাঁচ বছরে ভাষিক ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে ব্যাপক উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়েছে। এর পরেও মুখ্যমন্ত্রীর হুমকি, “গত পাঁচ বছরে টানা উচ্ছেদ অভিযান চালিয়ে দেড় লাখ বিঘা জমি দখলমুক্ত করা হয়েছে। আগামী পাঁচ বছরে আরও পাঁচ লাখ বিঘা জমিতে উচ্ছেদ অভিযান চালানো হবে। শান্তিতে থাকতে দেওয়া হবে না বাংলাদেশিদের। এমনি লড়াই নয়। ভয়ঙ্কর লড়াই হবে। এতে হারতেই হবে বাংলাদেশিদের। অসমিয়া মানুষই জিতবে। তাই কংগ্রেসকে নতুন ডায়লগ লেখা উচিত।”
বিজেপির হয়ে প্রচারে নেমে অসমীয়া যুবমঞ্চ, জাতীয় সংগ্ৰামী সেনা, বীর লাচিত সেনা, খিলঞ্জীয়া ঐক্য মঞ্চ রাজ্য জুড়ে স্লোগান তুলেছে ‘মিঞা খেদাওক আসাম বাঁচাওক’। বিভাজনের রাজনীতিই বিজেপির বড় ভরসা।
মুসলিমদের ভোট কিন্তু আসামের নির্বাচনে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। ২০১১ সালের জনগণনা অনুযায়ী আসামের ৩৪.২২ শতাংশ মুসলিম। ৩৭টি বিধানসভা কেন্দ্রেও মুসলিমরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ। মুখ্যমন্ত্রীর মতে, রাজ্যে বর্তমানে ৪০ শতাংশই মুসলমান। তাই তিনি মিঞাদের বিরুদ্ধে হিন্দু অসমিয়া ও বাঙালিদের ক্ষেপিয়ে তুলতে চাইছেন।
মিঞাদের পাশাপাশি কুলিরাও কিন্তু আসামের নির্বাচনে বড় ফ্যাক্টর। গত এক যুগ ধরে বিজেপিই চা বাগানে আধিপত্য দেখিয়েছে। কিন্তু এবার চা বাগানগুলোতে বিভিন্ন দাবিদাওয়া নিয়ে বিক্ষোভের সুর শোনা যাচ্ছে। মোট ভোটারের ১৭ থেকে ২০ শতাংশের মধ্যে বিক্ষোভের সুর চিন্তায় রেখেছে বিজেপিকে। মুসলমানদের মতোই চা বাগানগুলোতেও বিভাজনের রাজনীতি করতে চাইছে বিজেপি।
কিন্তু এই বিভাজনের রাজনীতিতেও পুরো ভরসা নেই বিজেপির। তাই কংগ্রেস ভাঙিয়ে দলের শক্তি বাড়াতে হচ্ছে তাদের। এক সময় কংগ্রেস মুক্ত উত্তর পূর্বাঞ্চলের ডাক দিলেও আজ এই অঞ্চলের সবচেয়ে বড় রাজ্যেই দলছুট কংগ্রেসীদের ঘনঘটা! মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মাও এক সময়ে কংগ্রেসের নেতা ও মন্ত্রী ছিলেন। এবারে তার দলের প্রার্থীদের ৩০ জনই দলবদলু। ভোটের মুখে প্রদেশ কংগ্রেসের সাবেক সভাপতি ভূপেন বরা, জাতীয় সংসদের সদস্য প্রদ্যুৎ বরদলৈসহ এক ঝাঁক কংগ্রেসি নেতাকে বিজেপি দলে টেনেছে। শুধু তাই নয়, গত ৫ বছরে আরও ৯ জন কংগ্রেস বিধায়ককে বাধ্য করা হয়েছে দলবদলুর তালিকায় নাম লেখাতে।
দল ভাঙিয়েও স্বস্তিতে নেই বিজেপি। কারণ দলবদলুদের টিকিট দিতে গিয়ে ঘরের লোক বলে পরিচিত প্রবীন নেতাদের বঞ্চিত করা হয়েছে। তাই বিজেপিতেও চলছে বিদ্রোহের সুর। রাজ্যের মন্ত্রী নন্দিতা গার্লোসা বিজেপির টিকিট না পেয়ে কংগ্রেসের হয়ে ভোটে লড়ছেন। সাবেক রাজ্য সভাপতি সিদ্ধার্থ ভট্টাচার্য, প্রবীন বিধায়ক অতুল বরা, জয়ন্ত দাসরা প্রকাশ্যেই বিদ্রোহ ঘোষণা করে নির্বাচনী লড়াইকে বেশ জনপ্রিয় করে তুলেছেন।
গতবার বিধানসভা ভোটে ১২৬টি কেন্দ্রের ফলাফলে বিজেপির নেতৃত্বাধীন জোট পেয়েছিল ৭৫টি আসন। বিজেপি একাই পেয়েছিল ৬০টি। অন্যদিকে, কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন মহাজোট পায় ৫১টি। এরমধ্যে কংগ্রেস পেয়েছিল ২৯টি। এই জোটের দ্বিতীয় বৃহত্তম দল এআইইউডিএফ গতবার ২০টি আসন পেলেও এবার তারা আলাদা লড়ছে। ভোটের ফলে হাড্ডাহাড্ডির ইঙ্গিত মিললেও পরবর্তীতে দল ভাঙানোর খেলায় বিরোধীদের শক্তি অনেকটাই কমিয়ে দেয় বিজেপি। দলবদলের হাত ধরে বিজেপি জোটের বর্তমানে আসন সংখ্যা ৮০ আর প্রধান বিরোধী জোটের ২৩। বাকি আসনগুলোতে রয়েছে অন্যরা।
এবারের নির্বাচনে মুসলমান বিদ্বেষ বনাম সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিই প্রধান ইস্যু। সঙ্গে রয়েছে সরকারি সাফল্যের ঢালাও প্রচার বনাম দুর্নীতির অভিযোগ। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, ব্রহ্মপুত্রের বন্যা, বেকার সমস্যাও রয়েছে ভোট প্রচারে। কিন্তু এইসবের বাইরেও ভোটের ময়দানের উঠে আসছেন অকাল প্রয়াত সংগীত শিল্পী, অসমিয়া অস্মিতার প্রতীক জুবিন গর্গ। গত বছর ১৯ সেপ্টেম্বর সিঙ্গাপুরে স্কুবা ডাইভিং করতে গিয়ে পানিতে ডুবে প্রাণ হারান অসমীয়াদের হৃদয় সম্রাট জুবিন। তার মৃত্যু রহস্য উদঘাটন নিয়ে এখনও মানুষ বিচার চাইছেন।
সামনেই অসমিয়াদের প্রাণের উৎসব রঙালি বিহু। ভোটের উত্তাপেও চলছে বিহুর প্রস্তুতি। কিন্তু এবারের বিহুতে থাকবেন না তাদের প্রাণপ্রিয় শিল্পী। তাই শোকের ছায়া সর্বত্র। সেই শোকই জন্ম দিচ্ছে ক্ষোভের। ক্ষুব্ধ জুবিন-অনুরাগীরা ভোট প্রচারে ব্যস্ত ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের সামনেও জুবিন হত্যার বিচার চেয়ে স্লোগান দিতে কার্পণ্য করেননি। জুবিন মৃত্যুর আগে বিজেপির বিরুদ্ধে ভোট দিতে বলেছিলেন। এখন দেখার তার ভক্তরা সেই ডাকে সাড়া দেন কিনা। বোঝা যাবে ৪ মে, গণনার দিন। আপাতত আশঙ্কার দোলাচলে বিজেপি।
লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক, কলকাতা (ভারত)

একসময় ইন্টারনেটকে দেখা হতো অগ্রগতির প্রায় অনিবার্য বাহন হিসেবে। মনে করা হতো, প্রযুক্তি যত ছড়াবে, তথ্যপ্রবাহ তত উন্মুক্ত হবে; সংযোগ যত বাড়বে, বিশ্ব তত সহযোগিতামূলক হবে; ডিজিটাল যোগাযোগ যত সহজ হবে, সমাজ তত গণতান্ত্রিক হবে। এই ধারণার ভেতরে আশাবাদ ছিল, কিন্তু বাস্তবতার তুলনায় সরলতাও ছিল। কারণ ইন্টারনেট