Advertisement Banner

২৫ মার্চ রাতের গণহত্যা নিয়ে কী বলেছিলেন টিক্কা খান?

২৫ মার্চ রাতের গণহত্যা নিয়ে কী বলেছিলেন টিক্কা খান?
১৯৮৮ সালে টিক্কা খান যেমন ছিলেন। ছবি: সংগৃহীত

‘বাংলার মানুষ নয়, চাই মাটি’—কথাটা শুনতে সাধারণ হলেও এর মধ্যে লুকিয়ে আছে এক ধরনের হিংস্রতা, নৃশংসতা। উক্তিটা করেছিলেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল টিক্কা খান। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালরাতে বাঙালির ওপর যে হিংস্রতা নিয়ে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, তার মূলে ছিল টিক্কা খানের সেই উক্তি।

‘বেলুচিস্তানের কসাই’ হিসেবে পরিচিত টিক্কা খান ২৫ মার্চের রাতে নিজের হিংস্র ভাবনা, নিজের নৃশংস চেতনা তার সেনাদলের মধ্যে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন। পাকিস্তানি বাহিনী পেয়েছিল নির্বিচারে হত্যা, লুট আর ধর্ষণের লাইসেন্স। বেলুচিস্তানের কসাই টিক্কা হয়ে উঠেছিলেন ‘বাংলার কসাই’। ১৯৭১ সালের মার্চ থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত টিক্কা খান বাংলাদেশে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন গণহত্যার।

কিন্তু মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ মাথায় নিয়ে এই সেনা কর্মকর্তা পাকিস্তানে ফিরে বহাল তবিয়তেই ছিলেন। বাংলাদেশ স্বাধীন হয়ে যাওয়ার পর তিনি পাকিস্তানে সেনাপ্রধানের পদে বসেছিলেন। অবসরের পর শান–শওকতের সঙ্গেই জীবনযাপন করেছেন। কোনো ধরনের জবাবদিহির মুখে পড়তে হয়নি তাকে। রাজনীতিতে যোগ দিয়েছিলেন, জুলফিকার আলী ভুট্টোর পাকিস্তান পিপলস পার্টির (পিপিপি) সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়েছিলেন। যদিও ১৯৭৯ সালে ভুট্টোকে সরিয়ে জেনারেল জিয়াউল হক পাকিস্তানে সামরিক শাসন জারি করার পর অবশ্য রাজনৈতিক নিপীড়নের শিকার হয়েছিলেন। তারপরও ১৯৭১ সালে সাবেক পূর্ব পাকিস্তানে নৃশংস গণহত্যার জন্য তাকে দায়ী করা হয়নি। ভুট্টোর সময় একবার অবশ্য একাত্তরে নিজেদের ব্যর্থতা তদন্তে গঠিত হামুদুর রহমান কমিশনের সামনে দাঁড়াতে হয়েছিল তাকে।

পিপিপির সঙ্গে সম্পৃক্ততা টিক্কা খানকে দিয়েছিল পাঞ্জাবের গভর্নরের পদ। ১৯৮৮ সালে সাধারণ নির্বাচনের পর জুলফিকার আলী ভুট্টোর কন্যা বেনজির ভুট্টো প্রধানমন্ত্রী তখন। মুক্তিযুদ্ধের ১৭ বছর পেরিয়ে গেছে। এই ১৭ বছরে এক হামুদুর রহমান কমিশন ছাড়া টিক্কা খানের কাছে কেউ জানতে চায়নি ১৯৭১ সালে তার ভূমিকার কথা। ‘মানুষ নয়, মাটি চাই’ বলে বাঙালিদের ওপর চালানো নৃশংসতার কথা বা লাখো মানুষকে হত্যা করার কথা। মুক্তিযুদ্ধের সময় পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর হিসেবে যেহেতু ৬ মাস দায়িত্ব পালন করেছিলেন, তাই ঐক্যবদ্ধ পাকিস্তানকে রক্ষা করতে না পারার দায়ভারের অনেকটাই তার ওপর বর্তানোর কথা। কিন্তু কিছুই হয়নি।

১৯৮৮ সালের ডিসেম্বরে রাওয়ালপিন্ডির গভর্নর হাউজে টিক্কা খানের সাক্ষাৎকার নিচ্ছেন রেজাউর রহমান।। ছবি: সংগৃহীত
১৯৮৮ সালের ডিসেম্বরে রাওয়ালপিন্ডির গভর্নর হাউজে টিক্কা খানের সাক্ষাৎকার নিচ্ছেন রেজাউর রহমান।। ছবি: সংগৃহীত

টিক্কা খান নিজেও হয়তো ভেবেছিলেন যে, তিনি বাংলাদেশে যা কিছু করেছেন, সেসবের জন্য কখনোই তাকে কারও কাছে কোনো প্রশ্নও শুনতে হবে না। এমন একটা সময়ই বাংলাদেশের গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব রেজাউর রহমান মুখোমুখি হয়েছিলেন টিক্কা খানের। প্রশ্নবাণে জর্জরিত করে জানতে চেয়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধের সময় তার ভূমিকার কথা। বিব্রত হয়েছিলেন টিক্কা খান। অস্বীকার করেছিলেন সবকিছু। কিন্তু একের পর এক প্রশ্নে টিকতে না পেরে অজান্তেই তিনি স্বীকার করে নিয়েছিলেন ২৫ মার্চ রাতে বাঙালিদের ওপর চালানো হিংস্রতার কথা।

১৯৮৮ সালে ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত হয়েছিল সার্ক শীর্ষ সম্মেলন। বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি তখন হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ। সার্ক সম্মেলনে যোগ দিয়েছিলেন তিনি। সঙ্গে ছিল তার প্রতিনিধি দল। রেজাউর রহমান ছিলেন সেই প্রতিনিধি দলের একজন সদস্য।

আশির দশকে বিটিভিতে ‘আইন–আদালত’ নামের একটি অপরাধ ও আইন বিষয়ক অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করতেন রেজাউর রহমান। সেই অনুষ্ঠানটি ছিল অসম্ভব জনপ্রিয়। রেজাউর রহমান এই অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে রীতিমতো তারকা খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। ১৯৮৪ সাল থেকে ১৯৮৭ সাল পর্যন্ত বিটিভিতে টানা চলেছিল ‘আইন–আদালত’। এরপর সেটি বন্ধ হয়ে যায়।

আইন–আদালত বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর রেজাউর রহমান ‘এখনই সময়’ নামে একটি সাময়িকী সম্পাদনা করতেন। একই সঙ্গে তিনি জড়িয়ে ছিলেন বিভিন্ন সামাজিক উদ্যোগের সঙ্গে। আইনজীবী হিসেবে পেশাদারি কর্মকাণ্ড তো তার ছিলই। ১৯৮৮ সালে সার্ক সম্মেলনে ‘এখনই সময়’ সাময়িকীর সম্পাদক হিসেবে তিনি বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের সঙ্গে গিয়েছিলেন বাংলাদেশ সরকারের আমন্ত্রণে।

এখনই সময় পত্রিকায় ১৯৮৮ সালে ছাপা হয়েছিল জল্লাদ টিক্কার সাক্ষাৎকার। ছবি: রেজাউর রহমানের সৌজন্যে
এখনই সময় পত্রিকায় ১৯৮৮ সালে ছাপা হয়েছিল জল্লাদ টিক্কার সাক্ষাৎকার। ছবি: রেজাউর রহমানের সৌজন্যে

টিক্কা খানের সঙ্গে হঠাৎ করেই ইসলামাবাদে দেখা হয়নি রেজাউর রহমানের। পাকিস্তানে যাওয়ার আমন্ত্রণ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তিনি ভেবে রেখেছিলেন যে, ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় বাঙালি নিধনে সরাসরি ভূমিকা রাখা পাকিস্তানি সেনা কর্মকর্তাদের সঙ্গে দেখা করার চেষ্টা চালাবেন। সেভাবেই তিনি মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী ও লেফটেন্যান্ট জেনারেল আমির আবদুল্লাহ খান নিয়াজীর ফোন নম্বর জোগাড় করে তাদের সঙ্গে যোগাযোগও করেছিলেন। তখন মোবাইল ফোনের যুগ ছিল না। তিনি তাদের বাড়ির ল্যান্ডফোন নম্বরে যোগাযোগ করে পাননি। টিক্কা খান যে পাঞ্জাবের গভর্নর, সেটা তিনি জানতেন। সার্ক সম্মেলনের সময় তক্কে তক্কে ছিলেন। ঠিকই তিনি পেয়ে যান একাত্তরের খুনী ও যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত টিক্কা খানকে। আর সেটি সার্ক সম্মেলনের অধিবেশন কক্ষেই। পাঞ্জাবের গভর্নর হিসেবে টিক্কা খান বিশেষভাবে আমন্ত্রিত ছিলেন সার্ক সম্মেলনে। সার্কের ভেন্যু ইসলামাবাদ তো পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশেই অবস্থিত।

টিক্কা খানের সাক্ষাৎকার নেওয়াটা তাই যে কোনো হিসাবে বিশেষ ঘটনাই। রেজাউর রহমানের পর আর কোনো সাংবাদিক বা গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব এই লোকের সাক্ষাৎকার যে নেননি, সেটি মোটামুটি নিশ্চিতই। ২০০২ সালে ৮৬ বছর বয়সে মারা যান টিক্কা।

১৯৮৮ সালে নেওয়া টিক্কা খানের সাক্ষাৎকারটি ছাপা হয়েছিল ‘এখনই সময়’ পত্রিকায় ১৯৮৯ সালের শুরুর দিকে। প্রায় ৩৭ বছর পর চরচার সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে রেজাউর রহমান জানিয়েছেন টিক্কা খানের মুখোমুখি হওয়ার আদ্যোপান্ত।

রেজাউর রহমান চরচা’কে জানিয়েছেন, টিক্কা খানকে সাক্ষাৎকারের কথা বলার পর শুরুতে তিনি রাজি হচ্ছিলেন না। রেজাউর রহমানের কথায়, ‘তিনি যখন সাক্ষাৎকার দিতে রাজি হচ্ছিলেন না, তখন আমি তাকে বলি, দেখুন আপনাকে নিয়ে অনেক কথা প্রচলিত আছে। আপনি যদি সাক্ষাৎকার না দেন, তাহলে আমি আপনার সম্পর্কে যা জানি, সেটাই লিখব। এরপর তিনি একটু থমকে গিয়ে সাক্ষাৎকার দিতে রাজি হন রাওয়ালপিন্ডিতে নিজের বাড়িতে।’

রেজাউর রহমান যখন নিজের পরিচয় দিতে গিয়ে বাংলাদেশের নাম টিক্কা খানকে বলেছিলেন, তখন তার অভিব্যক্তি কেমন ছিল? রেজাউর রহমান বলছেন, ‘টিক্কা খান রীতিমতো হকচকিয়ে গিয়েছিলেন।’

পরদিন গভর্নর হাউজে টিক্কা খান শুরুতে রেজাউর রহমানকে বলেছিলেন, তিনি কোনো সাক্ষাৎকার দেবেন না। নিজ বাড়িতে ডেকেও মত পাল্টে ফেলেছিলেন পাকিস্তানের এই যুদ্ধাপরাধী। রেজাউর রহমানের হাতে ছিল টেপ রেকর্ডার। সেটি দেখে টিক্কা বলেছিলেন, ‘আমি সাক্ষাৎকার দেব না। কোনো কিছু রেকর্ড করা যাবে না। আমি যা বলার হামুদুর রহমান কমিশনকেই বলেছি।’

টিক্কা খান, রেজাউর রহমানের ক্যামেরায়।
টিক্কা খান, রেজাউর রহমানের ক্যামেরায়।

তবুও টিক্কা খান ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে নিজের ভূমিকা নিয়ে কথা বলেছিলেন। অস্বীকার করেছিলেন প্রায় সবকিছুই। রেজাউর রহমান বলেন, ‘টিক্কা খানরা কখনোই দায় স্বীকার করেন না। তিনি বলেছিলেন, তেমন কিছু হয়নি তখন, শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের বাগে আনা যাচ্ছিল না। তবে তিনি সেখানে যা হয়েছে, সেসবেরও দায় স্বীকার করেননি। উল্টো বলেছেন, যদি অনেক মানুষ মারা যায়, তাহলে এত মৃতদেহ কে সরিয়ে ফেলল ইত্যাদি ইত্যাদি।’

১৯৮৮ সালে ‘এখনই সময়’ পত্রিকায় টিক্কা খানের একটা মন্তব্য ছাপা হয়েছিল। সেটি এমন—‘বিশ্ববিদ্যালয়ে আসলে কেউই হতাহত হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ছিল, শিক্ষক ও ছাত্র–ছাত্রীরা সবাই যে যার বাড়িতে ছিল। শুধু দু’জন লোক সেখানে ছিল, যারা ছাত্র নয়, তারা কিছুটা প্রতিরোধ করার চেষ্টা করেছিল। সেনাবাহিনী তা প্রতিহত করেছিল।’

এই মন্তব্যের মধ্য দিয়ে টিক্কা কতবড় মিথ্যাচার করেছিলেন, সেটি ভাবতেও অবাক লাগবে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানা যে কারও। টিক্কার এই মন্তব্যের পর স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে ২৫ মার্চ রাতে অধ্যাপক গোবিন্দ্রচন্দ্র দেব, জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা, অধ্যাপক মনিরুজ্জামানসহ বিভিন্ন হলে থাকা শত শত ছাত্রদের কে বা কারা হত্যা করেছিল? বিশ্ববিদ্যালয়ে রক্তগঙ্গা কে বা কারা বইয়ে দিয়েছিল? জগন্নাথ হলে যে বিশাল গণকবর, সেটি কারা তৈরি করেছিল? বুয়েটের ইলেকট্রিকাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক নুরুল উলা নিজের কাছে থাকা টেলিভিশন টেপ ক্যামেরা দিয়ে বুয়েটের আবাসিক এলাকার ফ্ল্যাটের জানালা দিয়ে যে হত্যাকাণ্ডের ছবি তুলেছিলেন, সেটি কী! তার ক্যামেরায় পরিষ্কার ধরা পড়েছিল যে, জগন্নাথ হলেও ছাত্র ও কর্মচারীদের লাইনে দাঁড় করিয়ে পাকিস্তানি সেনাদের হাতে থাকা অস্ত্র দিয়ে ব্রাশফায়ার করে হত্যার ঘটনা। আণবিক শক্তি কমিশনের বিজ্ঞানী ড. এমএম আলম ২৫ মার্চ রাতে রেডিওর নব ঘুরিয়ে শর্টওয়েভ ফ্রিকোয়েন্সিতে যে ওয়ারল্যাস কথোপকথন ধরে ফেলেছিলেন, সেখানে তো স্পষ্টভাবে হত্যার নির্দেশ দেওয়া হচ্ছিল, দেওয়া হয়েছিল নির্বিচারে গুলির নির্দেশ। উর্দু ও ইংরেজিতে সেই কথাগুলো তাহলে কারা বলেছিল?

টিক্কা খানরা অবশ্য এসব প্রশ্নের উত্তর কখনোই দিতে পারেননি!

সম্পর্কিত