Advertisement Banner

ইরান যুদ্ধে ট্রাম্পের কী লাভ হলো?

লিওন হাদার
লিওন হাদার
ইরান যুদ্ধে ট্রাম্পের কী লাভ হলো?
ইরান-আমেরিকা। ছবি: রয়টার্স

ওয়াশিংটনের রাজনীতিতে একটি অদ্ভুত রীতি রয়েছে। সেখানে প্রতিটি যুদ্ধের শেষেই কোনো না কোনো ‘মিশন অ্যাকমপ্লিশড’ বা সফল অভিযানের ঘোষণা আসে। কখনো কোনো বিশাল ব্যানার টাঙিয়ে, আবার কখনো-বা ট্রুথ সোশ্যাল অ্যাকাউন্টে তড়িঘড়ি কোনো পোস্ট লিখে নীতিনির্ধারকরা বিজয়োল্লাস করেন। মূলত রূঢ় বাস্তবতা আবারও মাথাচাড়া দেওয়ার আগেই তারা কোনোমতে দায় ঝেড়ে প্রস্থান করতে চান।

গত ৭ এপ্রিল ‘পাকিস্তান সরকারের মধ্যস্থতায়’ আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে যে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করা হয়েছে, তাকেও ঠিক এমনই এক মুহূর্ত হিসেবে উদ্‌যাপন করা হচ্ছে। আসন্ন মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সময়সীমা এবং বিশ্বজুড়ে ভয়াবহ জ্বালানি সংকটের চাপের মুখে অনেকটা তাড়াহুড়ো করেই এই চুক্তি করা হয়েছে।

কিন্তু বিজয়ের এই উৎসবের ডামাডোলে একটি মৌলিক প্রশ্ন হারিয়ে যাচ্ছে–আসলে আমেরিকা এখানে কী জিতল? ট্রাম্পের কী লাভ হলো?

হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিটের দাবি, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বলিষ্ঠ সামরিক পদক্ষেপের কারণেই ইরান হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে বাধ্য হয়েছে। ট্রাম্প নিজেও স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে একে ‘বিশ্ব শান্তির এক মহিমান্বিত দিন’ এবং মধ্যপ্রাচ্যের ‘স্বর্ণযুগের সূচনা’ বলে অভিহিত করেছেন। অন্যদিকে, ইরানও পিছিয়ে নেই। তাদের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল দাবি করেছে, তারা যুদ্ধের সব লক্ষ্য অর্জন করেছে।

যখন যুদ্ধের মাত্র ৪০ দিন পর দুই পক্ষই একযোগে নিজেদের বিজয়ী ঘোষণা করে, তখন বিচক্ষণ পর্যবেক্ষকের উচিত শ্যাম্পেনের গ্লাস সরিয়ে রেখে ইতিহাসের পাতায় নজর দেওয়া।

প্রথমেই আসা যাক পারমাণবিক প্রসঙ্গে, যা ছিল এই যুদ্ধের মূল কারণ। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যখন ট্রাম্প প্রশাসন ইরানে হামলা শুরু করে, তখন যুক্তি দেওয়া হয়েছিল যে, তেহরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির একেবারে শেষ পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। অথচ আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ) স্পষ্ট জানিয়েছে, ইরানের উচ্চাকাঙ্ক্ষী কর্মসূচি থাকলেও ২০২৬-এর এই যুদ্ধ শুরুর আগে দেশটিতে কোনো সুসংগঠিত পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ছিল না।

ছবি: এআই দিয়ে বানানো
ছবি: এআই দিয়ে বানানো

সবচাইতে বড় ব্যর্থতার দিকটি তুলে ধরেছে খোদ মার্কিন প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থা (ডিআইএ)। তাদের প্রাথমিক রিপোর্ট বলছে, হামলার আগেই ইরান তাদের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের বড় অংশ নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিয়েছিল। ফলে মার্কিন হামলায় ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা বড়জোর কয়েক মাসের জন্য পিছিয়ে গেছে। মাত্র কয়েক মাসের একটি ব্যবধান তৈরির জন্য যুক্তরাষ্ট্র ২০০৩ সালের ইরাক আক্রমণের পর মধ্যপ্রাচ্যে সবচাইতে বড় সামরিক অভিযান পরিচালনা করল। আর এর জন্য মার্কিন মর্যাদা, বিশ্ব অর্থনীতি এবং অগণিত সাধারণ মানুষের প্রাণ চড়া মূল্যে দিতে হলো।

হরমুজ প্রণালি সংকট এই তথাকথিত ‘কৌশলগত বিজয়কে’ আরও প্রশ্নবিদ্ধ করে। তেলের বাজার ১২৬ ডলারে পৌঁছে গিয়েছিল, যা ৭০-এর দশকের তেলের সংকটের পর সবচাইতে বড় বিপর্যয়। জ্বালানি তেলের দাম কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় আসা ট্রাম্প নিজের তৈরি করা যুদ্ধের ফাঁদেই রাজনৈতিকভাবে আটকা পড়েছিলেন। বর্তমান যুদ্ধবিরতিটি আসলে কোনো স্থায়ী শান্তি নয়; বরং চাপের মুখে এক ধরনের ‘প্রেশার রিলিজ ভাল্ভ’ মাত্র। সাগরে বর্তমানে প্রায় এক হাজার জাহাজ আটকা পড়ে আছে, যা ইরানের সমন্বয়ে দিনে মাত্র ১০-১৫টি করে পার হতে পারবে। এই ধীরগতির সমাধান যুদ্ধবিরতির দুই সপ্তাহের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও সংকটকে জিইয়ে রাখবে।

সবচেয়ে বড় বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে ইরানের দেওয়া ১০ দফার শান্তি প্রস্তাব নিয়ে। ট্রাম্প প্রথমে একে ইতিবাচক বললেও কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ‘প্রতারণা’ বলে নাকচ করে দেন। মজার ব্যাপার হলো, চুক্তির ফার্সি সংস্করণে ইউরেনিয়াম ‘সমৃদ্ধকরণের স্বীকৃতি’র কথা উল্লেখ থাকলেও ইংরেজি সংস্করণে তা ছিল না। যখন দুই পক্ষ একটি চুক্তিনামার উপাদান নিয়েই একমত হতে পারে না, তখন বুঝতে হবে যুদ্ধ আসলে শেষ হয়নি; বরং এটি কেবল একটি দীর্ঘশ্বাসের বিরতি মাত্র।

ছকটি সবারই চেনা, গত চার দশকে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন নীতির একটি পরিচিত ধারা এটি। যুক্তরাষ্ট্র সবসময়ই অসম্ভব এবং পরস্পরবিরোধী কিছু লক্ষ্য নিয়ে যুদ্ধে নামে। পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস, শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা–সবই একসঙ্গে পেতে চায়। ফলে কৌশলগত সংগতির চেয়ে আক্রমণকে জায়েজ করার অজুহাতই প্রধান হয়ে ওঠে। সামরিক বাহিনী হয়তো তার সক্ষমতা দেখায়, কিন্তু কঠিন প্রশ্নগুলো অমীমাংসিত থেকে যায়।

এরপর কী? ইরান কে শাসন করবে? পাঁচ বছর পর তাদের আবারও পারমাণবিক সক্ষমতা অর্জন করা থেকে কে ঠেকাবে?

আমি ১৯৯২ সালে আমেরিকার এই পথ হারানোকে ‘চোরাবালি’ এবং ২০০৫ সালে একে ‘ধূলিঝড়’ বলে অভিহিত করেছিলাম। তিন দশক পর প্রশাসন বদলেছে, লক্ষ্যবস্তু বদলেছে, কিন্তু এই আত্মঘাতী প্যাটার্ন বদলায়নি। আমেরিকা রণক্ষেত্রে জয়ী হলেও যুদ্ধের পরবর্তী পরিস্থিতিতে সবসময়ই পথ হারিয়ে ফেলে।

২০২৬-এর ইরান যুদ্ধের জয়-পরাজয় ট্রুথ সোশ্যালের পোস্ট দিয়ে নির্ধারিত হবে না। এর আসল উত্তর মিলবে ভবিষ্যতে–ইরানের পারমাণবিক জ্ঞান কি আসলেই শেষ হয়েছে? খামেনি-পরবর্তী ইরানের শাসনব্যবস্থা কি আরও উগ্র হবে? এই ধ্বংসযজ্ঞ কি মধ্যপ্রাচ্যে নতুন কোনো শূন্যতা ও বিশৃঙ্খলার জন্ম দেবে?

কার্নেগি এনডাওমেন্টের করিম সাদজাদপুর ঠিকই বলেছেন, এটি কোনো সমাপ্তি নয় বরং ৪৬ বছর ধরে চলা মার্কিন-ইরান ছায়া যুদ্ধের এক নতুন রক্তাক্ত অধ্যায়ের শুরু মাত্র। ইতিহাস কেবল বর্তমানের হেডলাইন দিয়ে বিচার করা যায় না।

লেখক: মধ্যপ্রাচ্য ও মার্কিন ইস্যুতে দীর্ঘদিন ধরে লেখালেখি করা ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষক

(লেখাটি এশিয়া টাইমস থেকে নেওয়া)

সম্পর্কিত