শুধু সংবিধান পাল্টে নয়, মানুষের জীবনে অর্থপূর্ণ পরিবর্তন আনতে হবে

মানজুর-আল-মতিন
মানজুর-আল-মতিন
শুধু সংবিধান পাল্টে নয়, মানুষের জীবনে অর্থপূর্ণ পরিবর্তন আনতে হবে
শেখ হাসিনার পতনের পর আনন্দ মিছিল করছে ছাত্র-জনতা। ফাইল ছবি: চরচা

ফার্মগেটের মোড়ে নতুন সিগনাল বাতি বসেছে। হঠৎ কোনো এক দিন সে পথ দিয়ে পাড়ি দেওয়ার সময় মনে হয়, আসলেই বুঝি সবুজ বাতিতে গাড়ি চলছে আর লাল বাতিতে গাড়ি থেমে আছে। কি জানি! ভুলও হতে পারে। আবার এও হতে পারে যে ঢাকায় আবার ট্রাফিকের বাতি মেনে গাড়ি চলতে শুরু করেছে!

২৪-এর বিপুল জাগরণের শুরুটা বোধকরি ২০১৮-র কোটা আন্দোলন আর নিরাপদ সড়ক আন্দোলনে লুকিয়ে আছে। সে সময় যারা পথে বেরিয়েছিল, আবার মার খেয়ে ঘর ফিরে যেতে বাধ্য হয়েছিল, তারাই আরও সংগঠিত হয়ে ফিরে এসেছিল ২০২৪-এ। এবারে তাদের সাথে যুক্ত হয়েছিল গোটা দেশের মানুষ। তাই স্বৈরাচারের হাত থেকে মুক্তি মিলেছে।

৫ আগস্টে সরকার পতনের পর নতুন সরকার গঠনের আগ পর্যন্ত দেশ যখন পুরোই কর্তৃত্ববিহীন, তখন সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে রাস্তায় ছিল স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা। নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের সময় যেমন তারা রাস্তায় অনেকাংশে শৃঙ্খলা এনে দেখিয়েছিল, ২৪-এর ওই কয়েকটি দিনও তার ব্যতিক্রম হয়নি।

২৪-এর বিপুল জাগরণের শুরুটা বোধকরি ২০১৮-র কোটা আন্দোলন আর নিরাপদ সড়ক আন্দোলনে লুকিয়ে আছে। ফাইল ছবি: চরচা
২৪-এর বিপুল জাগরণের শুরুটা বোধকরি ২০১৮-র কোটা আন্দোলন আর নিরাপদ সড়ক আন্দোলনে লুকিয়ে আছে। ফাইল ছবি: চরচা

তারপর সরকার গঠন হয়েছে, থানায় ফিরেছেন পুলিশ সদস্যরা। ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব আবারও ট্রাফিক পুলিশের হাতে। এ দফায় অবশ্য কিছু ছাত্রছাত্রীকে নিয়োগ করা হয়েছে ট্রাফিক পুলিশকে সহায়তা করার জন্য। কিন্তু ঢাকার রাস্তা পুরোনো চেহারায় ফিরে যেতে খুব বেশি সময় লাগেনি। অবস্থা এমন যে উল্টো-সোজা বোঝাই দুস্কর হয়ে পড়েছে। তার ওপর আছে ফুটপাথের ওপর অবাধে যান-চলাচল।

তার মধ্যে এই ট্রাফিক বাতি মেনে চলার চেষ্টা যেন সর্বব্যাপী বিশৃঙ্খলার মাঝে ক্ষীণ এক চেষ্টা। এমনি আরও বহু চেষ্টা আছে সমাজে। কিন্তু প্রতিদিনের জীবনে সে চেষ্টার প্রভাব খুঁজে পাওয়া কঠিন।

২৪-এর জুলাই মানুষকে স্বপ্ন দেখিয়েছিল নতুন জীবনের। যেখানে আমাদের প্রতিদিনের বেঁচে থাকা কিছুটা সহজ হবে। মানুষের ভালো-মন্দের খবর নেবে রাষ্ট্র। বদলে যাবে দেশের খোলনলচে। এখন ২০২৬ দরজায় কড়া নাড়ছে। ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন। সে দিকেই ধেয়ে চলেছে সব কিছু। সরকার আর রাজনৈতিক দল মিলে দীর্ঘ সংলাপের পর তৈরি হয়েছে জুলাই সনদ। সেখানে সংবিধান থেকে শুরু করে বহু কিছু্ই পাল্টে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি। কিছু বিষয়ে মতের অমিল থাকলেও, অনেক বিষয়েই একমত সব পক্ষ। কিন্তু বাস্তবে তার প্রতিফলন কতটা দেখা গেল সে প্রশ্ন থেকেই যায়।

সংবিধানে ক্ষমতার ভারসাম্য প্রয়োজন। রাষ্ট্রের যে প্রতিষ্ঠানগুলো ধুলোয় মিশে গিয়েছিল, সেগুলো আবার গড়ে তোলা প্রয়োজন। এই অতি জরুরী কাজগুলোর পাশাপাশি প্রয়োজন মানুষের প্রতিদিনের জীবন আরেকটু সহজ করার প্রয়াস। যেখানে অমত নেই কারোরই। কিন্তু কেন যেন নিয়মের দিকে না গিয়ে অনিয়মের পথেই ছুটে চলেছি সবাই।

ঢাকা শহরে বাস রুট ফ্রেঞ্চাইজের মতো সহজ সমাধানও আলোর মুখ দেখে না। ফাইল ছবি: চরচা
ঢাকা শহরে বাস রুট ফ্রেঞ্চাইজের মতো সহজ সমাধানও আলোর মুখ দেখে না। ফাইল ছবি: চরচা

মানুষের জীবনে টের পাওয়া যায় এমন পরিবর্তন আনতে অনেক বড় আলোচনার প্রয়োজন নেই। দরকার একটু সদিচ্ছার। সেটা যেমন দরকার সরকারের পক্ষ থেকে, তেমনি দরকার রাজনৈতিক দলগুলোর তরফেও। ৫ আগস্টের পর পুরোনো সিন্ডিকেটের লোকজন সটকে পড়েছিল। তাই টেম্পো ভাড়া থেকে শুরু করে বাজারে নিত্যপণ্যের দাম সবই কমেছিল এক রকম হঠাৎ করেই। কিন্তু লুটপাটের ব্যবস্থা এত সহজে হার মানে না। আগের লুটেরার জায়গা বুঝে নেয় নতুন কেউ। তাই আগের মাত্রায় না হলেও, সেই চাঁদাবাজি, সেই সিন্ডিকেট সমাজ থেকে মুছে যায়নি। অনেক জায়গায় তারা খুঁজে পেয়েছে নতুন আশ্রয়।

তাই ঢাকা শহরে বাস রুট ফ্রেঞ্চাইজের মতো সহজ সমাধানও আলোর মুখ দেখে না। স্বৈরাচারের আমলে শুনতাম, বাস মালিকেরা সব আওয়ামী লীগের ক্ষমতাশালী লোক, নয়তো পুলিশের সদস্য। তাই তাদের নাখোশ করে কিছু করা যাচ্ছে না। এখন তো তারা নেই। তবু ঢাকা শহরে গণপরিহনের বেহাল দশার কোনো পরিবর্তন নেই। কে হবেন মেয়র, কে হবেন প্রশাসক এই বাহাসের ভিড়ে নাগরিক সুবিধাগুলো অধরাই থেকে গেল।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ফুরিয়ে এল। আর মাস তিনেক পরে নির্বাচন। সব রাজনৈতিক দলের মুখেই নির্বাচনের পর নতুন দেশ গড়ার প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি। কেমন সংস্কার হবে, কীভাবে হবে, সে নিয়ে আলাপে ঢের সময় গেল। নির্বাচনের পর কথার চেয়ে কাজ বেশি দেখতে চাইবে এ দেশের মানুষ। সে কাজ কেবল আইন কিংবা সংবিধান পরিবর্তন করে নয়, বরং মানুষের প্রতিদিনের জীবনে অর্থপূর্ণ পরিবর্তন এনে দেখাতে হবে।

নির্বাচনের পর কথার চেয়ে কাজ বেশি দেখতে চাইবে এ দেশের মানুষ। ছবিটি প্রতীকী
নির্বাচনের পর কথার চেয়ে কাজ বেশি দেখতে চাইবে এ দেশের মানুষ। ছবিটি প্রতীকী

তখন যেই ক্ষমতায় আসুক, অন্যের কাঁধে দায় দিয়ে পার পাওয়া সহজ হবে না। সিন্ডিকেটের কারণে জীবন অসম্ভব হয়ে উঠলে ‘সিন্ডিকেট ভাঙা অসম্ভব’ বলে পার পাওয়া যাবে না। দায়িত্ব নিয়ে তার বিহিত করতে হবে রাজনৈতিক সরকারকে। সড়কে শৃঙ্খলা আনতে হবে, দ্রব্যমূল্য রাখতে হবে মানুষের হাতের নাগালে। আদালতে গিয়ে যাতে মানুষ বিচার পায় তা নিশ্চিত করতে হবে।

এ দেশের মানুষ ধৈর্যশীল। তারা সময় দেয়, বোঝার চেষ্টা করে তাদের নেতারা তাদের কথা ভাবছেন কি না। কিন্তু ২৪ যে বিপুল প্রত্যাশা তৈরি করেছে, তার পুরো ভার নিয়েই পরবর্তী সরকারকে সামনে এগোতে হবে। আলাপ তো অনেক হল, এবার করে দেখানোর সময়।

মানজুর-আল-মতিন: আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট

সম্পর্কিত