চীন এখন বিশ্বের বিস্ময়। এশিয়ার অনেকেই চীনের ওপর নানান কারণে ভরসা করতে চাইছেন। এক মেরুর বিশ্বে ওয়াশিংটনের খবরদারিতে বিশ্বের অনেকে ক্লান্ত, বিরক্ত। তারা অনেকেই চীনকে মুক্তির দূত ভাবতে চায়।
চীনের অভাবনীয় অগ্রগতির মূল চালক দেশটির কমিউনিস্ট পার্টি। প্রায় ১০৪ বছর হলো এই দলের। যার সদস্য সংখ্যা এখন প্রায় দশ কোটি। জাপানি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে চীনের জনগণের বিজয়ের এ বছর যে ৮০ বছর পূর্তি হলো তারও নেতৃত্ব দিয়েছিল চীনের কমিউনিস্ট পার্টি। আট দশক আগে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বড় ইস্যু ছিল জাপানিদের আগ্রাসন। এখনও সেসব ঘটনাবলির ঐতিহাসিক ছাপ এই অঞ্চলে আছে। চীন সেকারণেই ওই অধ্যায়ের আশি বছর পূর্তিকে বড় আকারে স্মরণ করলো এবার।
উপলক্ষটি উদ্যাপন করতে গিয়ে ৩ সেপ্টেম্বর চীন থিয়ান আনমানে তাদের সমরাস্ত্র সম্ভারের এক দৃষ্টিনন্দন প্রদর্শনী করেছিল। এই সুযোগে সমরাস্ত্র শিল্পে নিজেদের নতুন সব উদ্ভাবন দেখালো তারা। তাইওয়ানসহ নানান বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের যে ঠান্ডা যুদ্ধ চলছে তাতে নিজেদের কারিগরী আত্মবিশ্বাসের দিকটি বেইজিং উপস্থাপন করলো এই প্রদর্শনীর মাধ্যমে। তাদের দলের এক শ বছর পূর্তিকালেও চীন সামরিক সক্ষমতার অনেক স্মারক দেখিয়েছে বিশ্বকে।
কৌতূহল উদ্দীপক দিক হলো, জাপানি আগ্রাসনবিরোধী সংগ্রামের ৮০তম বছর যতটা রঙিন কায়দায় চীনারা উদ্যাপন করতে চেয়েছিল তার চেয়ে বেশি সেটা রঙিন করে দিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। আমেরিকার তরফ থেকে শুল্কযুদ্ধে নাস্তানাবুদ ভারত ঠিক এই সময়েই চীনমুখী হলো। চীনের সঙ্গে সীমান্ত বিরোধ মিটিয়ে দ্রুত তারা উভয়ের বাণিজ্য সম্পর্ক উন্নত করতে চাইছে। স্বভাবত চীনের প্রেসিডেন্ট সি জিন পিং সুযোগটা লুফে নিয়েছেন। ভারতকে বন্ধু হিসেবে পেলে চীনের সামরিক ও বাণিজ্যিক লাভ বিপুল।
সি আর মোদির পাশাপাশি পুতিনও সেপ্টেম্বরে চীন যাওয়ায় আন্তর্জাতিক মিডিয়াতে বিষয়টি দীর্ঘ সময়ের জন্য প্রধান বিষয় হয়ে ওঠে। এই তিন বিশ্ব শক্তি সচেতনভাবে তাদের আসরটিকে আমেরিকাবিরোধী মৈত্রী জোট আকারে দেখানোর চেষ্টা করছে। প্রশ্ন উঠছে, এই মৈত্রীর তাৎপর্য কী হবে দক্ষিণ এশিয়ায়? ভারত প্রকৃতই কি আমেরিকার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে?
আমেরিকা বারবার রাশিয়া থেকে জ্বালানি তেল না কেনার জন্য নয়াদিল্লিকে হুমকি-ধমকি দিলেও মোদি সেটা অগ্রাহ্য করে একদিকে পুতিন এবং অন্যদিকে আংকেল সি-র সঙ্গে যেভাবে হাতে হাত রেখে ছবি তুলেছেন তাতে স্পষ্ট, ভারতের পররাষ্ট্রনীতির ব্যাপারে ওয়াশিংটনের কাছে পুরোপুরি আত্মসমর্পণ করতে অনিচ্ছুক। পাশাপাশি ভারত ও চীন ১৯৬২ সালের যুদ্ধের পর থেকে যেভাবে পরস্পরের প্রতি শীতল হয়ে ছিল তারও বোধহয় অবসান ঘটতে চলেছে। ২০২০ এর সীমান্ত সংঘর্ষের স্মৃতিও তারা আপাতত আর মনে করতে চায় না। ইতিমধ্যে উভয় দেশ তাদের সীমান্ত বাজারগুলো খুলে দিতে শুরু করেছে। আমেরিকাই ভারত ও চীনকে ঘনিষ্ঠ হওয়ার দিকে ঠেলে দিয়েছে বলা যায়। আবার একই সময়ে দেখা যাচ্ছে আমেরিকা পাকিস্তানের শাসকদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়িয়েছে। কিন্তু দক্ষিণ এশিয়ায় প্রভাব ধরে রাখতে আমেরিকার জন্য পাকিস্তান কি ভারতের চেয়ে ভালো বিকল্প?
ভূরাজনৈতিক ভাষ্যকারদের মতে, ভারত ও চীনের সঙ্গে শুল্কযুদ্ধে ট্রাম্পের অতিরিক্ত চাপ দক্ষিণ এশিয়ায় আমেরিকার স্বার্থের জন্য ক্ষতিকর প্রমাণিত হতে পারে। বিশেষ চীন-ভারত মিলে আড়াই শ কোটিরও বেশি মানুষ। এটা এত বিশাল এক বাজার যে, একে বৈরী রাখা ওয়াশিংটনের জন্য লাভজনক ব্যাপার হবে না। এই বাজারে ক্রমাগত একটা বিশাল মধ্যবিত্ত শ্রেণির উত্থান ঘটছে-যারা এই মুহূর্তে বিশ্ব পুঁজিতন্ত্রের প্রধানতম এক টার্গেট।
আবার চীন ও ভারত উভয়ে বিকাশমান সামরিক শক্তি। এরকম দুটি শক্তির জোট এবং তার সঙ্গে রাশিয়ার মৈত্রী চতুর্থ কারও জন্য যে চ্যালেঞ্জ তৈরি করে সেটা অগ্রাহ্য করার মতো নয়।
রাশিয়ার সঙ্গে নয়াদিল্লির বন্ধুত্ব ও বোঝাপড়ার ইতিহাস বহু পুরানো। সেই তুলনায় চীনের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতির জন্য নতুন ঘটনা। চীন বর্তমানে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহৎ অর্থনীতি। ভারত চতুর্থ। যদিও ভোক্তাগোষ্ঠী হিসেবে আমেরিকার বাজার এখনও বিশ্বজুড়ে উৎপাদকদের কাছে প্রধান আকর্ষণ। কিন্তু চীন-ভারতের উদীয়মান মধ্যবিত্তরা সস্তা পণ্য উৎপাদকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প বাজার। বিশ্বের সকল অঞ্চলের মতোই এই দুই শক্তির সঙ্গে রাশিয়ার মৈত্রীর বাড়তি প্রভাব পড়বে দক্ষিণ এশিয়াতেও। বাংলাদেশের জন্যও চীন-ভারত-রাশিয়ার মৈত্রী বহুমুখী বার্তাবহ। বিশেষ করে বাংলাদেশের নতুন সরকারের জন্য।
ট্রাম্পের আমলে ওয়াশিংটনের চীনবিরোধী কূটনীতি নতুন এক উচ্চতায় পৌঁছেছে। আমেরিকাকে মোকাবেলা করতে গিয়ে চীনের প্রয়োজন ছিল আশপাশের দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের উন্নয়ন। ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক চীনকে হঠাৎ করেই সেই সুবিধা এনে দিচ্ছে। এই সম্পর্কের বাণিজ্যিক সম্ভাবনার দিকটিও অচিন্তনীয় হয়ে উঠতে পারে। সীমান্ত লাগোয়া সস্তা পণ্যের এত বড় বাজার চীনকে আমেরিকার বাজারের উচ্চ শুল্কজনিত ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার সহজ উপায় করে দিচ্ছে।
ভারত বাংলাদেশের তিন দিকের প্রতিবেশী এবং চীন বাংলাদেশের অবকাঠামো খাতের বড় এক বিনিয়োগকারী। ছবি: এআই দিয়ে তৈরিপ্রশ্ন হলো এরকম নতুন পরিস্থিতির বিপরীতে বাংলাদেশের করণীয় কী এবং বাংলাদেশ সরকার ও এখানকার রাজনৈতিক দল ও নাগরিক সমাজ এসব বিষয়ে কতটা ভাবছেন?
বাংলাদেশের পার্শ্ববর্তী মিয়ানমারে ইতিমধ্যে চীন-ভারত মৈত্রীর সরাসরি প্রভাব পড়ে গেছে। দেশটির সামরিক শাসকদের প্রতি চীনের এতদিনকার মদদের পাশাপাশি এখন ভারতও প্রকাশ্যে তাদের সমর্থক হয়ে উঠেছে। এর ফলে সেখানে অং সান সুচি ও তাঁর দলের প্রতি শাসকদের কঠোর অবস্থান আরও বাড়বে। শিগগির এখানে সামরিক সরকার যে লোকদেখানো নির্বাচন করতে চাইছে তাতে চীন-ভারত উভয়ের সমর্থন থাকবে। এরকম অবস্থা মিয়ানমারের ভেতরে সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে সংগ্রামরত গেরিলা দলগুলোর জন্য দীর্ঘ এক খারাপ অবস্থার ইঙ্গিতবহ। বাংলাদেশের জন্যও এটা স্পষ্ট যে, রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের জন্য এখন তাকে আমেরিকা ও পশ্চিমা বিশ্বের বদলে চীন-ভারতের ওপর বেশি নির্ভর করতে হবে। চীন-ভারতের স্বার্থকে গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনায় নিতে হবে।
গত ৭-৮ বছর রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবর্তনের বিষয়ে পশ্চিমের আনুকূল্যের প্রতি ঢাকার যে নির্ভরতা ছিল সেই অবস্থান আর তেমন কাজ করবে বলে মনে হয় না। বরং এই ইস্যুতে মিয়ানমারের জান্তা এবং আরাকান আর্মির ওপর চীন ও ভারতের প্রভাব কাজে লাগানোই বাংলাদেশের জন্য কার্যকর পথ হতে পারে এখন।
রাশিয়া অনেক আগে থেকে মিয়ানমারের সামরিক শাসকদের অন্যতম সহায়ক শক্তি। এখন চীন ও ভারতের বন্ধুত্ব মিয়ানমারের সামরিক শাসকদের নিশ্চিতভাবে রোহিঙ্গা বিষয়ে পশ্চিমা যেকোনো চাপ অগ্রাহ্য করতে সাহস ও শক্তি জোগাবে। আবার চীন ও ভারত এই বিষয়ে বাংলাদেশকে কতটা সাহায্য করবে সেটা নির্ভর করবে ঢাকা ও ওয়াশিংটনের সম্পর্কের ধরনের ওপর। নিশ্চয়ই বাংলাদেশে নির্বাচিত সরকার না আসা পর্যন্ত এ বিষয়ে দৃশ্যপট পরিষ্কার হবে না। আবার অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে বাংলাদেশে ওয়াশিংটনের প্রভাব যেভাবে বেড়েছে তা থেকে বেরিয়ে একটা স্বতন্ত্র ও স্বাধীন কূটনৈতিক অবস্থান নেওয়া বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সরকারের জন্য কতটা সহজ হবে? বাংলাদেশ সেটা পারবে কি না?
চ্যালেঞ্জটা এই অঞ্চলে এসময়ে বাংলাদেশের একার নয়। চীন-ভারত ঘনিষ্ঠতার মুখে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশ–যেমন, নেপাল, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপকেও তাদের আমেরিকা-নীতি পুনর্বিবেচনা করতে হবে। এসব দেশ চীন-ভারত সম্পর্ক এবং তার নাটকীয় পরিবর্তনের তাৎপর্যকে অগ্রাহ্য করতে পারবে না। আবার এও খেয়াল রাখার ব্যাপার, দক্ষিণ এশিয়ার ছোট ছোট দেশগুলোতে প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতায় চীন ও ভারতের মাঝেও অদৃশ্য, কিন্তু সক্রিয় প্রতিযোগিতা ছিল ও আছে। সম্পর্কের নতুন পর্যায়ে নয়াদিল্লি ও বেইজিং তাদের সেই প্রতিযোগিতাকে কতটা নমনীয় দরকষাকষিতে পরিণত করতে পারে সেটা পর্যবেক্ষণ সাপেক্ষ।
আমেরিকার প্রতি বাংলাদেশের বিগত দশকগুলোতে সুসম্পর্কের দুটি প্রধান দায় ছিল। একটা হলো আমেরিকা বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের প্রধান বাজার। এই বাজারটি ঢাকার রপ্তানি আয়ের বেশ বড় অংশ।
দ্বিতীয় দায় হলো, জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কাজে বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর বিপুল সদস্যের যুক্ত থাকা। এ দুটোই নির্বিঘ্ন থাকা বাংলাদেশের দিক থেকে বড় চাওয়া। কিন্তু সেটা আর নির্বিঘ্ন নেই। জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কাজে অন্যান্য দেশের পাশাপাশি বাংলাদেশিদের অংশগ্রহণও কিছুটা কমে যেতে পারে বলে বার্তা মিলছে। মিয়ানমারমুখী মানবিক করিডর ধারণায় অসম্মত হওয়া নিয়ে বাংলাদেশের সামরিক আমলাতন্ত্রের ওপর রুষ্ট হয়ে থাকতে পারে ওয়াশিংটন।
অন্যদিকে, ভারত বাংলাদেশের তিন দিকের প্রতিবেশী এবং চীন বাংলাদেশের অবকাঠামো খাতের বড় এক বিনিয়োগকারী। বলা যায়, তিনটি ভিন্নধর্মী কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ কারণে এই তিন দেশই বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ও অপরিহার্য। কিন্তু আন্তর্জাতিক এবং আঞ্চলিক রাজনীতি ও মেরুকরণ যেভাবে দ্রুত পাল্টাচ্ছে বাংলাদেশ চাইলেও এই তিন দেশের সঙ্গে সমান তালে সম্পর্ক সমান উচ্চতায় রাখতে পারবে না। গত ১৫ বছরের অভিজ্ঞতা আমাদের জানাচ্ছে বাংলাদেশের পক্ষে চীন-ভারত-আমেরিকা কোন এক দেশের দিকে হেলে পড়া এবং বাকিদের অগ্রাহ্য করা বিপজ্জনক।
গত দেড় দশকে আগের সরকার ভারতের দিকে রাজনৈতিকভাবে হেলে পড়ে ছিল এবং চীনকে অর্থনৈতিক সুযোগ-সুবিধা দিয়ে ভারসাম্য বজায় রাখতে চেয়েছে। কিন্তু ‘তিস্তা প্রকল্প’ ভারতকে দিতে চেয়ে সেই ভারসাম্য রক্ষা করতে পারেনি। এই ঘটনা থেকে শিক্ষা নিতে হবে বাংলাদেশের ভবিষ্যতের সরকারকেও। উপরোক্ত তিন দেশের সঙ্গেই সম্পর্ক রাখার জটিল এক কায়দা অব্যাহত রাখতে হবে আগামীর সরকারকে। এর মাঝে ভারতকে খুশি করে গঙ্গা চুক্তি নবায়ন করার পাশাপাশি তিস্তা নিয়েও চুক্তি করার চ্যালেঞ্জ রয়েছে। তিস্তার পানি নিয়ে দরকষাকষি বাদ দিয়ে সেখানে অবকাঠামোগত উপায়ে পানির সমস্যা মোকাবিলা করার ধারণা পরিবেশগত ও কূটনীতিক–উভয় দিক থেকে বাংলাদেশের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ, যা অপ্রয়োজনীয়ভাবে ডেকে আনা হয়েছে।
তিস্তা প্রকল্প চীনকে দেওয়া-না-দেওয়ার বাইরেও এটা জরুরি বাস্তবতা যে বাংলাদেশে চীনের বিনিয়োগ ধারা অব্যাহত রাখতে হবে। আবার বড় ধরনের বিনিয়োগের বেলায় চীনের বিকল্প উৎসগুলোও খুঁজে পেতে হবে। যেকোনো বিষয়ে এক দেশ নির্ভরতা দরকষাকষিতে ঢাকাকে দুর্বল করে দিচ্ছে। সে জন্য রপ্তানি পণ্যের বিকল্প বাজার বের করতে হবে। সেই কাজ আগে হয়নি বলেই বাংলাদেশকে ওয়াশিংটনের খবরদারি মানতে হয় এখন।
মোটকথা, বিশ্বে চীন-আমেরিকা রেষারেষির বর্তমান এই সময়টি বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর জন্য বেশ চ্যালেনজিং। মুখস্থ আবেগ ও তথাকথিত আদর্শনির্ভর কূটনীতির বদলে এসময় বাস্তববাদী ও ব্যবহারিকভাবে কেজো অবস্থান নেওয়াই সংগত হবে। আমেরিকা আগামী বিশ্বে হয়তো তার এতদিনকার মুরুব্বিপণা চালাতে পারবে না। কিন্তু আমরা এখনি তাকে ছুড়ে ফেলে দিতে পারব না।
চীন সম্প্রতি বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে ডানে-বামে যেভাবে ‘বিনিয়োগ’ করছে তা দেখে স্পষ্ট তারা এখানকার রাজনীতিকে ভবিষ্যতে ভারতের মতোই প্রভাবিত করতে চেষ্টা করবে। আবার ভারতও সীমান্ত লাগোয়া দেশসমূহে তার প্রভাব হারাতে চাইবে না। তবে এই দুই আঞ্চলিক পরাশক্তি যেহেতু যুদ্ধংদেহী মনোভাবে নেই সেটা বাংলাদেশকে সকল বিষয়ে ভাবনা-চিন্তার কিছু পরিসর দিচ্ছে। এই সময়টুকুতে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সরকারকে কিছু বিষয় নতুন করে ভাবা দরকার। তার মধ্যে একটা হলো চীনের সাথে সংশ্লিষ্ট বর্তমান ও ভবিষ্যতের উন্নয়ন প্রকল্পগুলোতে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত স্বচ্ছতার বিষয় নিশ্চিত করা। আবার ভারতের সঙ্গে সম্পর্ককে অতিরিক্ত পক্ষপাত ও অপ্রয়োজনীয় বিরোধিতার জায়গা থেকে পারস্পরিক লাভালাভের জায়গায় আনার চেষ্টা করা।
বিগত দিনগুলোতে চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক করার সময় বাংলাদেশের সব সরকার যেভাবে বিষয়গুলো মুখ্যত অর্থনৈতিক চোখ দিয়ে দেখেছে তেমনি ভারত ও আমেরিকার সঙ্গে সম্পর্কেও পারস্পরিক জাতীয় স্বার্থের আলোকে সাজানো দরকার। এখানে রাজনীতি, ঐতিহাসিক আবেগ, ধর্ম ইত্যাদি বিবেচনাকে অগ্রাধিকার দিয়ে বাংলাদেশ বেশি দূর এগোতে পারবে না। এগুলো একটা ফাঁদ–যা একালের কূটনীতিতে তেমন ভালো ফল দেয় না। সমকালীন কূটনীতি জাতীয় স্বার্থচিন্তা দ্বারাই বেশি চালিত হচ্ছে। বাংলাদেশকেও কূটনীতিতে মূলত জাতীয় অর্থনৈতিক স্বার্থকেই গুরুত্ব দেয়া লাভজনক হবে।
আলতাফ পারভেজ: গবেষক ও লেখক।