সম্প্রতি জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের একজন সদস্যের সঙ্গে কথা হচ্ছিল ফেব্রুয়ারির নির্বাচন নিয়ে। তিনি বললেন, যদি সময়মতো নির্বাচন না হয়, দেশে মহাবিপর্যয় দেখা দেবে। তাকে জিজ্ঞেস করি, নির্বাচন হলে দেশ ও গণতন্ত্র রক্ষা পাবে তো? উত্তরে ওই সদস্য বললেন, নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রচার শুরু হওয়ার আগেই রাজনৈতিক দলগুলো যেভাবে দখলদারিতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে, তাতে খুব বেশি আশাবাদী হওয়া যাচ্ছে না। নির্বাচনের নিয়ামক শক্তি যে জনগণ-কেউ তাদের ওপর ভরসা রাখছে না। যে যেখানে পারে জবরদস্তি করছে।
রাজনৈতিক সরকারের আমলে ক্ষমতাসীনেরা জয়ী হওয়ার জন্য প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ব্যবহার করে থাকে। এ কারণে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে অনুষ্ঠিত কোনো নির্বাচন গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে তাতে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারবে কি না সেই প্রশ্ন সামনে এসেছে। কিছু দিন আগে একজন উপদেষ্টা হতাশা ব্যক্ত করে বলেছেন, বিএনপি জামায়াত প্রশাসনকে ভাগাভাগি করে নিয়েছে। যে পক্ষ ভাগাভাগিতে কম পেয়েছে, সেই পক্ষ বেশি ক্ষুব্ধতা দেখাচ্ছে। এর কিছুটা আলামত আমরা দেখলাম সম্প্রতি চট্টগ্রামে দলটির এক সমাবেশে।
শাহজাহান চৌধুরীর বক্তব্য নিয়ে রাজনৈতিক মহলে তোলপাড় চলছে। ছবি: ফেসবুক থেকেজামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্ম পরিষদ সদস্য ও সাবেক সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী সেখানে এই বলে ফরমান জারি করেছেন যে নির্বাচন শুধু জনগণ দিয়ে নয়...যার যার নির্বাচনী এলাকায় প্রশাসনের যারা আছে, তাদের সবাইকে আমাদের আন্ডারে নিয়ে আসতে হবে। আমাদের কথায় উঠবে, আমাদের কথায় বসবে, আমাদের কথায় গ্রেপ্তার করবে, আমাদের কথায় মামলা করবে।
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ক্ষমতাসীন দলের নেতারাও একই ভাষায় কথা বলতেন। প্রশাসনের কর্মকর্তারা যদি কোনো নেতা বা দলের কথায় ওঠবস করেন, তাহলে নির্বাচনের কী দরকার? আজ যারা প্রশাসনকে হুমকিধামকি দিচ্ছেন, তারা যে চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান থেকে কোনো শিক্ষা নেননি সেটা স্পষ্ট।
শাহজাহান চৌধুরী এখানেই থেমে থাকেননি। তিনি নির্বাচনে দায়িত্ব পালনকারী শিক্ষকদেরও সবক দিয়ে বলেছেন, “যার যার নির্বাচনী এলাকায় প্রাইমারি স্কুলের মাস্টারকে দাঁড়িপাল্লার কথা বলতে হবে। উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সমস্ত শিক্ষক, নুরুল আমিন (নগরের সেক্রেটারি) ভাইয়ের ফটিকছড়িতে দাঁড়িপাল্লার কথা বলতে হবে। পুলিশকে আপনার পেছনে পেছনে হাঁটতে হবে। ওসি সাহেব আপনার কী প্রোগ্রাম, তা সকালবেলায় জেনে নেবেন আর আপনাকে প্রটোকল দেবেন।”
এর আগে আমরা দেখেছি রাজনৈতিক দলের নেতারা নির্বাচনের পর ওসি-ডিসিদের প্রটোকল দাবি করতেন। আর জামায়াতের নেতা নির্বাচনের আগেই সেটা দাবি করে বসেছেন। তিনি নির্বাচনের দায়িত্ব পালনকারী শিক্ষকদের কাছে দাঁড়িপাল্লার কথা বলতে বলেছেন। নির্বাচনের দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষকদের তো ধানের শীষ, দাঁড়িপাল্লা বা অন্য কোনো প্রতীকের কথা বলার প্রয়োজন নেই। প্রতীকের কথা বলবেন প্রতিযোগী রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীরা।
সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান বলেছেন, “আমরা চাঁদাবাজমুক্ত দেশ গড়তে চাই, আমরা অতীতেও চাঁদাবাজি করিনি, ভবিষ্যতেও করব না। আমরা দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ চাই। আমাদের অনেক রাজনৈতিক দল এ কথা জোরালোভাবে বলতেও পারে না। কারণ, বলতে গেলে তাদেরও হাসি আসবে, জনগণও হাসবে।” কথাটি তিনি কোন দলকে ইঙ্গিত করে বলেছেন, তা বুঝতে অসুবিধা হয় না।
নির্বাচনের দিন যত কাছে আসছে, বিএনপি ও জামায়াতের নেতাদের বাহাসের ভাষাও তত শানিত হচ্ছে। জামায়াতের এক নেতা বলেছিলেন, দাঁড়িপাল্লায় ভোট দিলে জান্নাতের টিকিট পাওয়া যাবে। বিএনপির নেতারা এই বক্তব্যের প্রতিবাদ করেছেন। ঢাকায় এক আলোচনা সভায় বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর নির্বাচনী প্রচারে ধর্মকে ব্যবহারের বিরোধিতা করে বলেন, “জামায়াতের টিকিট (ভোট) কাটলে জান্নাতের টিকিট কাটা হবে। কোথায় আছে আমাকে বলুক তারা, দেখিয়ে দিক কোথায় আছে।”
জামায়াতকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, “এই মহলটি রাজনৈতিক অঙ্গনে দাঁড়াতে পারছিল না। জিয়াউর রহমান সাহেব তাদের সুযোগ করে দেন রাজনৈতিক অঙ্গনে আসার। (স্বাধীনতার পরে) তারা প্রথমে আইডিএল (ইসলামিক ডেমোক্রেটিক লীগ) নামে এসেছিল। তারপরে তারা বিএনপির সঙ্গে কাজ করেছে। বিএনপিও তাদের নিয়ে কাজ করেছে।”
রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহারের বিরুদ্ধে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ছবি: সংগৃহীতশাহজাহান চৌধুরীর দেওয়া বক্তব্য নিয়ে রাজনৈতিত মহলে তোলপাড় চলছে। সমালোচনার জবাবে চট্টগ্রাম জামায়াতের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছ, যে বক্তব্যটি নিয়ে এত আলোচনা-সমালোচনা, সেটি তার একান্তই ব্যক্তিগত। এটি দলের কোনো বক্তব্য নয়। চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব নাজিমুর রহমান বলেন, “জামায়াতের নেতা শাহাজাহান চৌধুরীর বক্তব্যের মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হয় তারা নতুন করে আরেকটি ফ্যাসিবাদ কায়েম করতে চায়। তার বক্তব্যের মধ্য দিয়ে বোঝা যায়, আসন্ন নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হবে না। এমন বক্তব্যের জন্য আমরা তাকে গ্রেপ্তারের দাবি জানাচ্ছি।”
আমরা মনে করি, দু্ই তরফেই বাড়াবাড়ি আছে। জামায়াত নেতা যদি প্রশাসনের লোকদের ওঠবস করানোর কথা বলে থাকেন, সরকার তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে। ইতিমধ্যে পুলিশ অ্যাসোসিয়নের পক্ষ থেকে প্রতিবাদও করা হয়েছে। এ ধরনের বক্তব্যের প্রতিবাদ বা নিন্দা জানানো যায়। এমনকি তাকে এই বক্তব্য প্রত্যাহার করতেও বলতে পারেন বিএনপির নেতারা। তাই বলে গ্রেপ্তার দাবি করতে পারেন না।
এরই মধ্যে জামায়াতের আমির আরেক বোমা ফাটালেন। চট্টগ্রাম প্যারেড মাঠে তিনি সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘নির্বাচন ও গণভোট একসঙ্গে হলে নির্বাচনের জেনোসাইড হবে।’
জেনোসাইড মানে গণহত্যা। নির্বাচনের জেনোসাইড মানে নির্বাচনী ব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে যাওয়া। জামায়াত ও তাদের জোটসঙ্গীরা জোরেশোরে গণভোটে হ্যাঁ-এর পক্ষে জনসমর্থন আদায়ের জোর প্রচার চালাচ্ছেন। তারপরও তারা কেন ভরসা রাখতে পারছেন না। তারপরও কেন তিনি জেনোসাইডের আশঙ্কা করছেন?
সোহরাব হাসান: সম্পাদক, চরচা।