গত সপ্তাহে ফ্লাইদুবাই-এর একটি ফ্লাইট সংবাদমাধ্যমের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছিল। যদিও এতে কোনো ইসরায়েলি নাগরিক হতাহত হননি। বিমানটি নিরাপদে অবতরণ করে এবং সৌদি চিকিৎসকেরা ইসরায়েলি যাত্রীদের পরীক্ষা করে নিশ্চিত হন যে তারা অক্ষত আছেন। কিন্তু এসব বিষয় কোনো গুরুত্বই পায়নি। আন্তর্জাতিকভাবে অভিযুক্ত অপরাধী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে অধিকাংশ আমেরিকান টিভি চ্যানেলে ফলাও করে দেখানো হয়। পশ্চিমা গণমাধ্যমে এটি প্রধান খবর হিসেবেই থেকে যায়; প্রতিটি নেটওয়ার্কে বারবার তা প্রচার করা হয় এবং ইসরায়েলি যাত্রীদের প্রতি কথিত হুমকির বিষয়ে দীর্ঘ আলোচনা-পর্যালোচনা চলতে থাকে। ওই ফ্লাইটে আসলে কী ঘটেছিল, তা নিয়ে গুরুতর কিছু প্রশ্ন অমীমাংসিতই রয়ে গেছে। কিন্তু প্রকৃত ঘটনা এখানে মুখ্য ছিল না। ইসরায়েলিরা নিজেদের অনিরাপদ বোধ করেছিল—আর এই অনিরাপদ বোধটুকুই প্রায় পুরো সপ্তাহজুড়ে সংবাদমাধ্যমকে ব্যস্ত রাখার জন্য যথেষ্ট ছিল।
ঠিক সেই একই সপ্তাহে—১ অক্টোবর রামাল্লাহর কাছে ইয়াসুফ গ্রামের উপকণ্ঠে নিজের বাড়ির সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে থাকা ৫১ বছর বয়সী মাশহুর ইয়াসিনকে সরকারি লাইসেন্সপ্রাপ্ত বন্দুকধারী ইসরায়েলি ইহুদিদের একটি দল গুলি করে হত্যা করে। পরদিন কোবার গ্রামে ইহুদিদের আরেকটি দল ১৯ বছর বয়সী বাহা সামি আমিন আল-নাতশেহকে হত্যা করে। ইসরায়েলি বুলডোজার ফিলিস্তিনিদের বাড়িঘর গুঁড়িয়ে দেয় ও জলপাই গাছ উপড়ে ফেলে। বছরে ফসল তোলার মৌসুমে ইসরায়েলি ইহুদি জনতা ও সৈন্যরা কৃষকদের ওপর হামলা চালায়—অর্থনৈতিকভাবে শ্বাসরুদ্ধ করার এই প্রক্রিয়াটি প্রতি মৌসুমে এতবার ঘটে যে, তা এখন আর তেমন কোনো খবরই হয়ে ওঠে না।
গাজায় ইসরায়েলের বিমান হামলায় বিধ্বস্ত ভবন। ছবি: রয়টার্স
এই ইহুদি খুনিদের কারও বিরুদ্ধেই কোনো অভিযোগ আনা হয়নি। ইসরায়েল—যে রাষ্ট্রটি নিজেকে ইহুদি ‘আইন-শৃঙ্খলার’ ধারক বলে দাবি করে—তারা হাজার হাজার ফিলিস্তিনির বিচার করে অথচ তাদের হত্যাকারী ইহুদিদের সুরক্ষা দেয়। বাস্তবে ইসরায়েলি ইহুদিদের প্রাতিষ্ঠানিক বর্ণবাদী ব্যবস্থার চিত্র এটাই।
বিষয়টি বিবেচনা করুন: ইসরায়েলের প্রেসিডেন্ট এলর আজারিয়াকে ক্ষমা করে দিয়েছিলেন; এই ইসরায়েলি চিকিৎসক একজন আহত ও নিরস্ত্র ফিলিস্তিনির মাথায় গুলি করেছিলেন। গত সপ্তাহে, সৌদি আরবের আরব চিকিৎসকরা ‘ফ্লাই-দুবাই’-এর ইসরায়েলি যাত্রীদের শারীরিক অবস্থার খোঁজখবর নিয়েছিলেন। অথচ এর ঠিক এক সপ্তাহ আগেই একজন ইসরায়েলি ইহুদি চিকিৎসককে এক অ-ইহুদিকে হত্যার দায়েও কোনো শাস্তি না দিয়ে ‘নির্দোষ’ হিসেবে ছাড় দেওয়া হয়েছিল।
এগুলো কোনো ব্যক্তিগত মতামত নয়; জাতিসংঘ, বিভিন্ন গণমাধ্যম এবং মানবাধিকার সংস্থাগুলোর নথিপত্রে এসব ঘটনার প্রমাণ রয়েছে। অথচ সংবাদমাধ্যমে এগুলোর প্রচার ও গুরুত্বের মধ্যে পার্থক্য দেখুন। কোনো শারীরিক ক্ষতি ছাড়াই কেবল হুমকির ঘটনাটিই শিরোনাম দখল করে নেয়। অন্যদিকে, ইসরায়েলিদের হাতে ফিলিস্তিনিদের হত্যা, ফিলিস্তিনিদের বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেওয়া, পরিকল্পিত অগ্নিসংযোগের ঘটনা এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের জন্য রাষ্ট্রপতির ক্ষমা—এসব বিষয় ‘ফ্লাই-দুবাই’ সংক্রান্ত নাটকীয় ঘটনার মতো সংবাদমাধ্যম ও জনমানুষের মনোযোগ পায় না।
ঘটনার বয়ান বা উপস্থাপনার এই ধরণ পরিবর্তন কেবল কোনো সম্পাদকীয় সিদ্ধান্ত নয়। এটি একটি পক্ষপাতদুষ্ট গণমাধ্যম কাঠামোর ফসল; যে কাঠামো প্রায় আট দশক ধরে ফিলিস্তিনিদের জীবনকে ‘দরকষাকষির যোগ্য’ বা তুচ্ছ এবং ইসরায়েলি ইহুদিদের অস্বস্তিকে ‘পবিত্র’ বা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে বিবেচনা করে আসছে।
গাজায় তিন বছর পরেও গণহত্যা, চরম অবমাননা ও অনাহার অব্যাহত রয়েছে। মিশর থেকে চিকিৎসা শেষে ফেরার পথে এক ব্যক্তিকে—যার একটি পা কাটা—ইসরায়েলি সেনাবাহিনী কৃত্রিম পা অথবা হুইলচেয়ার—এর মধ্যে যেকোনো একটি বেছে নেওয়ার নির্দেশ দেয়। তিনি কৃত্রিম পা-টি ইসরায়েলি বাহিনীর কাছে রেখে বাড়িতে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নেন। এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা গত সপ্তাহে জানিয়েছে যে, ইসরায়েলের আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে মানবিক সহায়তা পৌঁছানো ব্যাহত হচ্ছে—এমন এক স্বাস্থ্যব্যবস্থায় যেখানে গাজার একটি হাসপাতালও পুরোপুরি সচল নয়। অনুমোদনের অপেক্ষায় থাকা চিকিৎসা সামগ্রীর চালানগুলোকে সীমান্তে গড়ে ৭৪ দিন অপেক্ষা করতে হয়; এই প্রক্রিয়াটি এতটাই খেয়ালখুশিমতো পরিচালিত হয় যে, কৃত্রিম অঙ্গের একটি চালানই ছয় মাসের মধ্যে চারবার প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। সাধারণ স্বাস্থ্যসেবা কিটগুলো সরাসরি প্রত্যাখ্যান করা হয়; এছাড়া এক্স-রে মেশিন ও জীবাণুমুক্তকরণ সরঞ্জামও নিয়মিতভাবে আটকে দেওয়া হয়।
এদিকে, তথাকথিত ‘শান্তি পর্ষদ’ বা বোর্ড অব পিস গঠনের মাধ্যমে যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছিল, তা গাজায় গণহত্যা বন্ধে কোনো ভূমিকা রাখতে পারেনি। ৩০ সেপ্টেম্বর দুটি পৃথক হামলায় ইসরায়েলি বাহিনীর হাতে সাতজন ফিলিস্তিনি নিহত হন; এর মধ্যে গাজা শহরের একটি অ্যাপার্টমেন্টে বিমান হামলায় এক নারীও প্রাণ হারান। এর তিন দিন পর, ভোর হওয়ার আগেই ইসরায়েল আরেকটি অ্যাপার্টমেন্ট ভবনকে লক্ষ্যবস্তু বানায়; এতে পাঁচজন ফিলিস্তিনি নিহত হন—যাদের মধ্যে চারজনই ছিলেন নারী—এবং ভবনটিতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়।
ফিলিস্তিনের গাজায় খান ইউনিস এলাকায় ইসরায়েলি হামলায় আহত এক শিশুকে উদ্ধার করে ছুটছে এক ব্যক্তি। ছবি: সংগৃহীত
এছাড়াও, ৩০ সেপ্টেম্বর—সাক্ষীদের বিরুদ্ধে তাদের চলমান যুদ্ধেরই অংশ হিসেবে—ইসরায়েল ফিলিস্তিনি সাংবাদিক মুহাম্মদ আবদেল আজিজ আল-নাজ্জারকে হত্যা করে। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ইসরায়েলের হাতে নিহত ২৬৩তম সাংবাদিক তিনি। এটি যেন মুছে ফেলার ২৬৩তম ঘটনা—২৬৩ জন সাক্ষীকে স্তব্ধ করে দেওয়া এবং আরও একটি কলম বা ক্যামেরাকে ধ্বংস করা। প্রতিটি সাংবাদিকের মৃত্যুর পেছনে রয়েছে ইসরায়েলের সেই যুদ্ধের ভয়াবহতা, যা তারা মিডিয়া ব্ল্যাকআউট বা সংবাদ প্রচারের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞার আড়ালে চালিয়েছে। এই কাজে তাদের সহায়তা করেছে পশ্চিমা গণমাধ্যম, যারা নিজেদের সাংবাদিকতার দায়িত্ব বিসর্জন দিয়ে ইসরায়েলকে কেবল যুদ্ধক্ষেত্রই নয়, বরং বিশ্ববাসী কী দেখবে—সেই বয়ান বা আখ্যানটিও নিয়ন্ত্রণ করার সুযোগ করে দিয়েছে।
ইসরায়েল-নিয়ন্ত্রিত পশ্চিমা গণমাধ্যমের দৃষ্টিতে ফিলিস্তিনিদের জীবনের মূল্য সমান নয়। অথচ কোনো ইসরায়েলি নাগরিকের প্রতি সামান্য হুমকিকেও এমন এক সংকট হিসেবে দেখা হয়, যার জন্য জরুরি মনোযোগ প্রয়োজন। ইসরায়েলি ইহুদি উগ্রবাদীদের হাতে ফিলিস্তিনি বেসামরিক নাগরিকদের হত্যার ঘটনা যতটা গুরুত্ব পায়, তার চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয় এমন কোনো ঘটনাকে—যেখানে কোনো ইসরায়েলি আহতও হয়নি। এটি কেবল কোনো একটি পক্ষপাতদুষ্ট শিরোনাম বা বিচ্ছিন্ন সম্পাদকীয় নিবন্ধের বিষয় নয়। এটি একটি ধারাবাহিক ও সপ্তাহ-পর-সপ্তাহ চলতে থাকা প্রক্রিয়া, যার উদ্দেশ্য হলো জনমানসের বিবেককে অসাড় করে দেওয়া; ফিলিস্তিনিদের মৃত্যুকে একটি সাধারণ ও নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনায় পরিণত করা, তাদের দুর্ভোগকে তাদের নিজেদেরই ডেকে আনা বিপদ হিসেবে দেখানো এবং ইহুদি ইসরায়েলিদের সামান্যতম অসুবিধার তুলনায় ফিলিস্তিনিদের জীবনকে কম গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে তুলে ধরা।
এখানেই সেই বৈপরীত্য তার চরম ও বীভৎস রূপে ধরা পড়ে। এক পক্ষের ভয় পাওয়াটা হয়ে ওঠে খবর; আর অন্য পক্ষের ক্ষেত্রে সংঘটিত গণহত্যা গণ্য হয় কেবল ‘পারিপার্শ্বিক-ক্ষতি’ হিসেবে। এটি সাংবাদিকতার কোনো ব্যর্থতা নয়; বরং ব্যবস্থাটি ঠিক সেভাবেই কাজ করছে, যেভাবে তা পরিকল্পিত হয়েছিল। আমেরিকান জায়নবাদীদের মালিকানাধীন ও পরিচালিত একটি ‘ইসরায়েল-কেন্দ্রিক’ ছাঁকনি বা ফিল্টার ব্যবস্থা ইসরায়েলের স্বার্থ রক্ষা করে চলেছে—আর তারাই ঠিক করে দেয় কার ভয়ের বিষয়টি সংবাদযোগ্য আর কার ওপর চলা গণহত্যাকে আড়ালে সরিয়ে দেওয়া হবে।
জামাল কানজ: কলাম লেখক
(এই লেখাটি মিডিল ইস্ট মনিটরের সৌজন্যে প্রকাশিত হলো)