বাঙালির রাজনৈতিক ইতিহাসে নতুন কর্মসূচির অভাব কখনো ছিল না। কখনো মিছিল, কখনো সমাবেশ, কখনো মানববন্ধন, আবার কখনো হরতাল-অবরোধের মতো পরীক্ষিত অস্ত্রের মহড়া চলে। তবে এসব কর্মসূচির একঘেয়েমি কাটিয়ে রাজনীতিতে নতুনত্বের যে অপার সম্ভাবনা রয়েছে, তা এবার যেন আবিষ্কার করেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি বা এনসিপি। বিএনপির এক শ্রেণির নেতা-কর্মীর চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে হাসনাত আবদুল্লাহ ও নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীরা ভিক্ষা কর্মসূচি পালন করেছেন। সৃজনশীলতার বিচারে এটা এক অভিনব সংযোজন। মনে হচ্ছে, দেশের রাজনৈতিক সমস্যার সমাধানে এত দিন আমরা ভুল দরজায় কড়া নেড়েছি; অথচ সমাধানটি পড়ে ছিল ফুটপাতের এক কোণে, একটি ‘মুক্ত হস্তে দান করুন’ বাক্সের আড়ালে!
চাঁদাবাজি বন্ধ করতে ভিক্ষা—বিষয়টি শুনতে অনেকটা জ্বর সারাতে রোগীকে বরফের পানিতে ডুবিয়ে রাখার মতো। রোগের সঙ্গে চিকিৎসার সম্পর্ক আছে বটে, কিন্তু চিকিৎসাপদ্ধতি দেখে রোগী সুস্থ হওয়ার আগেই চিকিৎসকের বুদ্ধিমত্তা নিয়ে সন্দেহ জাগে।
অবশ্য রাজনীতিতে এমন অভিনব পদ্ধতির জন্ম হয়, যেগুলো প্রথমে হাস্যকর মনে হলেও পরে দলীয় কর্মসূচির গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে পরিণত হয়। কে জানে, আগামী দিনে চুরি বন্ধ করতে চোরের কাছে অনুদান চাওয়া হবে, দুর্নীতি বন্ধ করতে দুর্নীতিবাজদের জন্য দানবাক্স বসানো হবে, আর দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে বাজারের সামনে দাঁড়িয়ে ক্রেতাদের কাছে ভিক্ষা চাওয়া হবে! তখন হয়তো নতুন অর্থনৈতিক সূত্র আবিষ্কৃত হবে—সমস্যা যত বড়, সমাধানের থালা তত গভীর।
ধরা যাক, রাজধানীর কোনো ব্যস্ত সড়কে একজন ব্যবসায়ী দোকান খুলেছেন। সকাল হতে না হতেই একদল লোক এসে বলল, দোকান চালাতে হলে নির্দিষ্ট অঙ্কের চাঁদা দিতে হবে। ব্যবসায়ী টাকা বের করতে যাবেন, ঠিক তখনই দুই রাজনৈতিক নেতা ভিক্ষার থালা হাতে হাজির। তারা বলবেন, “ভাই, চাঁদাবাজদের টাকা দেবেন না। আমাদের থালায় দান করুন। আপনার এই ক্ষুদ্র অনুদানই চাঁদাবাজিমুক্ত বাংলাদেশের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করবে।” ব্যবসায়ী তখন মহা মুশকিলে পড়বেন। একদিকে টাকা না দিলে দোকানের শাটার নামানোর আশঙ্কা, অন্যদিকে টাকা দিলে দেশের সংস্কার প্রকল্পে অবদান কমে যাওয়ার ভয়। শেষ পর্যন্ত তিনি হয়তো দুই পক্ষকেই কিছু দিয়ে বলবেন, “ভাই, আপনারা দেশ বাঁচান, আমি আপাতত দোকানটা বাঁচাই!”
চাঁদাবাজি ও ভিক্ষার মধ্যে অবশ্য মৌলিক পার্থক্য আছে। ভিক্ষা সাধারণত স্বেচ্ছায় সাহায্য চাওয়া; আর চাঁদাবাজি হলো ভয় দেখিয়ে কিংবা জবরদস্তি করে অর্থ আদায়। একটি নির্ভর করে দাতার ইচ্ছার ওপর, অন্যটি নির্ভর করে গ্রহীতার ক্ষমতা প্রদর্শনের ওপর। কিন্তু সাধারণ মানুষ যখন একাধিক পক্ষের অর্থসংগ্রহের চাপে পড়ে, তখন দুই হাতের ব্যবধানও কখনো খুব বেশি মনে হয় না। একটি হাত বাড়ানো হয় অনুরোধের ভঙ্গিতে, অন্যটি কর্তৃত্বের ভঙ্গিতে; মাঝখানে পড়ে থাকা মানুষের পকেট থেকে টাকা বেরিয়ে যাওয়ার দৃশ্যটি প্রায় একই রকম। পার্থক্যটা তখন টাকার অঙ্কে নয়, বরং টাকা না দিলে কী ঘটতে পারে, সেই আশঙ্কায়।
এনসিপির কর্মসূচির সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো এর অর্থনৈতিক দর্শন। চাল, ডাল, তেল, পেঁয়াজ, গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম যখন সাধারণ মানুষের আয়কে পেছনে ফেলে দৌড়াচ্ছে, তখন দান বা ভিক্ষা সংগ্রহ করে কোটি টাকার চাঁদাবাজি বন্ধ করার পরিকল্পনা এক অভিনব অর্থনৈতিক পরীক্ষা হতে পারে। প্রচলিত অর্থনীতিতে আয়, ব্যয়, সঞ্চয় ও বিনিয়োগের আলোচনা আছে। ভবিষ্যতে হয়তো সেখানে নতুন অধ্যায় যুক্ত হবে, ‘ভিক্ষাভিত্তিক চাঁদাবাজি প্রতিরোধ অর্থনীতি’। এই তত্ত্ব অনুসারে, জনগণের পকেট থেকে যত বেশি খুচরা টাকা সংগ্রহ করা যাবে, সমাজ থেকে তত বেশি বড় অঙ্কের চাঁদাবাজি উধাও হবে। অবশ্য প্রশ্ন থেকে যায়, চাঁদাবাজির বাজার যদি কোটি টাকার হয়, আর বাক্সে জমা হয় কয়েক হাজার টাকা, তাহলে অবশিষ্ট অর্থের ঘাটতি পূরণ হবে কীভাবে? নাকি অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াইও কিস্তিতে কিস্তিতে চলবে?
প্রকল্পটির সফলতা নির্ভর করবে অর্থসংগ্রহের স্বচ্ছতার ওপরও। বাক্সে কত টাকা উঠল, কে কত দিল, সেই টাকা কোথায় গেল, চাঁদাবাজি কতটা কমল—এসব বিষয়ে হিসাব রাখা জরুরি। নইলে একসময় দেখা যাবে, চাঁদাবাজি বন্ধের জন্য খোলা দান-বাক্সটিই নিজস্ব অর্থনৈতিক সত্তা অর্জন করেছে। বাক্স পরিচালনার জন্য কমিটি, কমিটির জন্য উপকমিটি, অর্থ গণনার জন্য নিরীক্ষক, আর নিরীক্ষকের কার্যক্রম তদারকির জন্য নতুন কমিটি গঠিত হয়েছে। এভাবে চাঁদাবাজি বন্ধ হোক বা না হোক, কর্মসংস্থানের নতুন ক্ষেত্র তৈরি হবে। শুধু ব্যবসায়ীর পকেটের দরজাটিই হয়তো বন্ধ হওয়ার সুযোগ পাবে না।
সাধারণ মানুষের কাছে অবস্থাটি অত্যন্ত ধোঁয়াশাপূর্ণ। ফুটপাতের বাদাম বিক্রেতা, ক্ষুদ্র দোকানি, রিকশাচালক কিংবা ছোট ব্যবসায়ীর কাছে রাজনৈতিক তত্ত্বের চেয়ে দৈনিক আয়ের হিসাব অনেক বেশি জরুরি। দিনের শেষে চাল কিনতে হবে, বাড়িভাড়া দিতে হবে, সন্তানের পড়ার খরচ জোগাতে হবে। সেখানে চাঁদার চাপ এলে যেমন বিপদ, তেমনি নতুন নতুন রাজনৈতিক কর্মসূচির আর্থিক প্রত্যাশাও তাদের জন্য স্বস্তির বিষয় নয়। কোনো বাদাম বিক্রেতা যদি বলেন, “আগে চাঁদা দিয়ে জান বাঁচাতাম, এখন দুই নেতার থালায় দু-টাকা দিলে যদি চাঁদাবাজি যায়, মন্দ কী”—তাহলে তার কথার মধ্যে কৌতুকের চেয়ে দীর্ঘশ্বাসই বেশি শোনা যাবে। দুই টাকা দিয়ে রাজনৈতিক সংস্কার কেনা যায় না, কিন্তু দুই টাকা না থাকলে সংসারের হিসাবও মেলে না।
আসল সমস্যা হলো, চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে প্রতিবাদকে কেবল প্রতীকী প্রদর্শনীতে সীমাবদ্ধ রাখলে ফল হবে সাময়িক। আজ বাক্স, কাল ঝুড়ি, পরশু হয়তো বড়সড় সিন্দুক—কিন্তু চাঁদাবাজির উৎস থেকে গেলে পাত্র বদলালেও সমস্যার চরিত্র বদলাবে না। প্রয়োজন অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, অপরাধীর পরিচয় নির্বিশেষে আইনের প্রয়োগ, ব্যবসায়ীদের নিরাপত্তা এবং ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায়ের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা। কোনো দলের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেই তা প্রমাণিত হয়ে যায় না; আবার দলীয় পরিচয় কাউকে আইনের ঊর্ধ্বেও তুলে দেয় না।
তাই এই ভিক্ষা কর্মসূচি বাংলাদেশের রাজনীতির সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে ধরে: আমরা কি সত্যিই চাঁদাবাজি বন্ধ করতে চাই, নাকি অর্থ আদায়ের প্রতিযোগিতায় নতুন পদ্ধতি আবিষ্কার করতে চাই? প্রতিবাদের থালা যদি অন্যায়ের বিরুদ্ধে মানুষের কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠে, তার প্রতীকী মূল্য থাকতে পারে। কিন্তু সেটি যদি কেবল রাজনৈতিক প্রচারের পাত্র হয়, তাহলে তা দিয়ে বড়জোর সংবাদ শিরোনাম সংগ্রহ করা যাবে, চাঁদাবাজি নির্মূল করা যাবে না।
রাজনীতিতে অভিনবত্ব কাম্য, তবে অভিনবত্বের সঙ্গে কার্যকারিতারও সম্পর্ক থাকা দরকার। নইলে একদিন দেখা যাবে, চাঁদাবাজি বন্ধের প্রকল্প উদ্বোধনের খরচ তুলতেই নতুন ভিক্ষা কর্মসূচি চালু করতে হয়েছে। তারপর সেই কর্মসূচির সাফল্য উদ্যাপনে আবার চাঁদা সংগ্রহের অভিযোগ উঠেছে। এভাবেই এক থালা থেকে আরেক থালায় ঘুরতে থাকবে জাতির ভাগ্য। আর সাধারণ মানুষ ভাববে, এই দেশে অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করতে গেলেও আগে পকেট পরীক্ষা করে নিতে হয়—কারণ, কখন কে কোন নামে টাকা চাইবে, তা আগে থেকে বলা যায় না!
চিররঞ্জন সরকার: কলাম লেখক ও গবেষক।