শারম আল-শেখে অনুষ্ঠিত মধ্যপ্রাচ্য শান্তি সম্মেলনের পর ডোনাল্ড ট্রাম্পের গাজা যুদ্ধবিরতি চুক্তিকে কেউ কেউ তুলনা করেছেন উত্তর আয়ারল্যান্ডে সংঘাতের অবসান ঘটানো গুড ফ্রাইডে অ্যাগ্রিমেন্ট এবং বালকান অঞ্চলে স্থায়ী শান্তি এনে দেওয়া ডেটন অ্যাকর্ডস-এর সঙ্গে। কিন্তু বাস্তবে ট্রাম্পের এই চুক্তি তাদের থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন।
এটি মূলত বাইরের থেকে চাপিয়ে দেওয়া এক সমঝোতা। এর স্বভাব অত্যন্ত লেনদেন নির্ভর। আর এতে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কোনো স্পষ্ট নির্দেশনা নেই।
তবে এটাও সত্য যে, একজন রাজনীতিক হিসেবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো-তিনি সাধারণত নিজের সাফল্যকে অতিরঞ্জিতভাবে তুলে ধরেন, যার ভিত্তিতে পরবর্তীতে গোটা বিশ্ব প্রতিক্রিয়া জানায়। যেমন, এই যুদ্ধবিরতি নিয়ে তিনি ঘোষণা দেন: “এটা শুধু যুদ্ধের সমাপ্তি নয়, এটি সন্ত্রাস ও মৃত্যুর যুগের অবসান।”
অনেকে আবার ‘গুড ফ্রাইডে অ্যাগ্রিমেন্ট’-এর সঙ্গে তুলনা করেছেন। ক্রিশ্চিয়ান সায়েন্স মনিটর ২ অক্টোবর, অর্থাৎ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার ২০ দফা পরিকল্পনা ঘোষণা করার পরদিন লিখেছিল:
“ট্রাম্পের পরিকল্পনার ভিত্তি হলো এই আশা-যা উত্তর আয়ারল্যান্ডে কাজ করেছিল, তা গাজাতেও কাজ করবে। এবং সবচেয়ে বড় অনুমান হলো, ইসরায়েলি ও ফিলিস্তিনিরা এখন উপলব্ধি করেছে যে, সহিংসতা তাদের কারও কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনে সাহায্য করবে না।”
অবশ্য এটি এক বিশাল অনুমান-যার পক্ষে কোনো দৃঢ় প্রমাণ নেই।
ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে যে চুক্তি হয়েছে, তা মূলত যুদ্ধবিরতি, বন্দি ও জিম্মিদের মুক্তি সংক্রান্ত। কিন্তু গুরুতর বাধা এখনো রয়ে গেছে। হামাসের নিরস্ত্রীকরণ মোটেও নিশ্চিত নয়–বরং দিন দিন তা আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠছে।
এদিকে গাজা থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের বিষয়টিও বেশ অস্পষ্ট। পরিকল্পনায় স্পষ্ট করে বলা হয়নি যে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) পুরোপুরি গাজা ছাড়বে কি না। শাসনব্যবস্থা, ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র গঠনের রোডম্যাপ ও পুনর্গঠনের ব্যয়সংক্রান্ত প্রশ্নগুলোও এখনো অমীমাংসিত।
কিন্তু সবচেয়ে বড় বাধা হলো–দুই পক্ষের মধ্যকার গভীর অবিশ্বাস।
এই প্রতিবন্ধকতাগুলোর পরিপ্রেক্ষিতে যুদ্ধবিরতি, জিম্মি ফেরত ও ফিলিস্তিনি বন্দিদের মুক্তি নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ, তবে এগুলো সংঘাতের সমাপ্তির ‘সহজ ফল’। এগুলো আসলে এক দীর্ঘ, কঠিন ও অনিশ্চিত কূটনৈতিক যাত্রার প্রথম ধাপ মাত্র–যার পথচলা দীর্ঘদিন ধরে ব্যর্থতা ও হতাশায় পরিপূর্ণ।
অন্যদিকে, ডেটন ও উত্তর আয়ারল্যান্ডের শান্তি প্রক্রিয়া ছিল বহু বছর ধরে জটিল ও ধৈর্যশীল আলোচনার ফল। সব পক্ষই সেখানে বিস্তারিত আলোচনায় যুক্ত ছিল। এসব চুক্তিতে জটিল ক্ষমতা ভাগাভাগির কাঠামো তৈরি হয়েছিল, যা দীর্ঘস্থায়ী সাম্প্রদায়িক বিভাজন মোকাবিলায় নতুন সাংবিধানিক পরিবর্তন ও প্রাতিষ্ঠানিক নিশ্চয়তা দিয়েছিল।
আকাঙ্ক্ষা চুক্তি নয়
‘ট্রাম্প ডিক্লারেশন ফর এনডিউরিং পিস অ্যান্ড প্রসপারিটি’ নামে কোনো দলিলের মধ্যে তেমন বিস্তারিত কিছুই নেই। এটি মাত্র ৪৬২ শব্দের এক বিবৃতি, যা মিশরে স্বাক্ষরিত হয়েছে কয়েকজন আন্তর্জাতিক নেতার মধ্যে। তবে সেখানে ইসরায়েল বা হামাসের কোনো প্রতিনিধিই ছিল না।
তাতে বলা হয়েছে: “আমরা, নিম্নস্বাক্ষরকারীরা, সব পক্ষের ঐতিহাসিক অঙ্গীকার ও বাস্তবায়নকে স্বাগত জানাই, যা ট্রাম্প শান্তি চুক্তির মাধ্যমে দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা দুঃখ-কষ্ট ও ক্ষতির অবসান ঘটিয়েছে–এবং অঞ্চলের জন্য আশা, নিরাপত্তা ও যৌথ সমৃদ্ধির এক নতুন অধ্যায় উন্মোচন করেছে।”
এই বক্তব্য যতই আকর্ষণীয় শোনাক, এটি মূলত এক আকাঙ্ক্ষা–বিস্তারিত বাস্তব চুক্তি নয়। তাই ট্রাম্পের এই উদযাপন সময়ের আগেই এসেছে বলা চলে।
চুক্তিটি যতটা ভঙ্গুর এবং অক্টোবরের এই যুদ্ধবিরতি ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে করা কিন্তু পরে ভঙ্গ হওয়া আগের চুক্তির প্রায় অনুরূপ, তাতে প্রশ্ন ওঠে—এত উচ্ছ্বাসের কারণ কী? এটা কি সত্যিই, ট্রাম্পের ভাষায়, “নতুন মধ্যপ্রাচ্যের ঐতিহাসিক ভোর”?
স্পষ্টত, ট্রাম্প এই প্রক্রিয়ায় যে প্রশংসা পেয়ে যাচ্ছেন, তা তিনি ভীষণ উপভোগ করছেন। তবে এর পেছনে রাজনৈতিক কৌশলও রয়েছে। আমেরিকা যদি প্রকাশ্যে এই শান্তি প্রক্রিয়ার পক্ষে অবস্থান নেয়, তবে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর পক্ষে পুনরায় সংঘাত শুরু করা কঠিন হয়ে পড়ে, কারণ তা হলে তাদেরকে আমেরিকার অসন্তোষের মুখে পড়তে হবে।
যত বেশি এই প্রক্রিয়াকে প্রদর্শনীর মতো সাজানো হয়, তত বেশি এর ব্যাঘাত ঘটানোদের ওপর রাগ ঝাড়তে পারবেন ট্রাম্প–বিশেষত যদি তিনি মনে করেন, এতে তার ‘অর্জন’ ও নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়ার সম্ভাবনা নষ্ট হয়েছে।
‘ট্রাম্প ডিক্লারেশন ফর এনডিউরিং পিস অ্যান্ড প্রসপারিটি’ নামে কোনো দলিলের মধ্যে তেমন বিস্তারিত কিছুই নেই। এটি মাত্র ৪৬২ শব্দের এক বিবৃতি। ছবি: এআই দিয়ে তৈরি
অন্য নেতাদের লাভ কী?
ট্রাম্পের এই শান্তি সম্মেলনে এত বিশ্বনেতার উপস্থিতিরও আলাদা ব্যাখ্যা আছে। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ, যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কেয়ার স্টারমার এবং কানাডার মার্ক কারনি নিশ্চয়ই ভাবছিলেন–তাদের উপস্থিতি আসলে কেন জরুরি? তারা যেন এক রাজনৈতিক নাটকের সহ-অভিনেতা মাত্র।
হাসিমুখ আর করতালির আড়ালে তারা নিশ্চয়ই বুঝেছিলেন–এই ধরনের ‘শোবিজ’ তাদের নিজ দেশে নেতিবাচকভাবে দেখা হবে। স্থানীয় সংবাদমাধ্যম ও জনগণ একে ট্রাম্পের প্রশংসা লাভের সুযোগ হিসেবে সমালোচনা করবে। হাঙ্গেরির ভিক্টর অরবানও সেখানে উপস্থিত ছিলেন, যা এই ধারণা আরও জোরাল করে যে, ট্রাম্প আসলে নিজের ‘ভক্তক্লাব’কেই মিশরে জড়ো করেছেন।
তবু কেন তারা গেলেন? এরও রাজনৈতিক হিসাব আছে। তারা চান এই শান্তি প্রক্রিয়া টিকে থাকুক এবং এর ব্যর্থতার খরচ আরও বেড়ে যাক। একই সঙ্গে, তারা ভবিষ্যতের বড় কূটনৈতিক খেলায়ও নজর দিচ্ছেন।
তাদের আশা, ট্রাম্পকে ‘শান্তির দূত’ হিসেবে নিজেকে দেখার ধারণার দিকে ঠেলে দেওয়া। এর ফলে হয়তো তিনি রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের ওপর চাপ সৃষ্টি করবেন ইউক্রেনে আগ্রাসন থামাতে।
বেশির ভাগ মার্কিন প্রেসিডেন্টের দ্বিতীয় মেয়াদের মতো ট্রাম্পও এখন নিজের উত্তরাধিকার বা লিগ্যাসি নিয়ে চিন্তিত। যদি তার অহংবোধে একটু তেল দিয়ে তাকে সত্যিকারের আন্তর্জাতিক নেতৃত্বের দিকে ধাবিত করা যায়, তবে মাখোঁ, কারনি ও স্টারমারের এই ‘ট্রাম্প শো’-তে অংশগ্রহণ ইতিহাসের বিচারে হয়তো অমূল্য হিসেবেই বিবেচিত হবে।
ডেভিড হেস্টিংস ডান: অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিভাগ, ইউনিভার্সিটি অব বার্মিংহাম