Advertisement Banner

ইসলামী ব্যাংক নিয়ে কাটছে না ধোঁয়াশা, বাড়ছে গ্রাহকদের উদ্বেগ

ইসলামী ব্যাংক নিয়ে কাটছে না ধোঁয়াশা, বাড়ছে গ্রাহকদের উদ্বেগ

ইসলামী ব্যাংকের পুরো পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এর নিয়ন্ত্রণ নেয় গত রোববার রাতে। এরপর গত দুই দিনে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে নতুন পরিচালনা পর্ষদ। নতুন বোর্ড কাদের দিয়ে গঠন করা হবে, কে হতে পারেন নতুন চেয়ারম্যান, কারা ঐ তালিকায় জায়গা পাচ্ছেন, কবে নাগাদ নতুন পরিচালনা পর্ষদ গঠিত হবে–সহ নানা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে গ্রাহক ও ব্যাংক খাত সংশ্লিষ্টদের মধ্যে।

অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকাররা দ্রুত অভিজ্ঞ ও রাজনীতি-নিরপেক্ষ ব্যক্তিদের দিয়ে বোর্ড গঠন করে ব্যাংকটি পরিচালনায় গতি আনার তাগিদ দিয়েছেন। অন্যদিকে, গ্রাহকদের একাংশ, যারা ‘সচেতন ফোরাম’-এর ব্যানারে আগের চেয়ারম্যানকে অপসারণসহ নানা দাবিতে আন্দোলন করছিলেন, তারা আজ মঙ্গলবার সকালে দ্রুত সৎ ও যোগ্য লোকদের দিয়ে পরিচালনা পর্ষদ গঠন করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর বরাবর স্মারকলিপি দিয়েছেন।

এ সময় সচেতন গ্রাহক ফোরামের সভাপতি নূরনবী মানিক সাংবাদিকদের বলেন, “ইসলামী ব্যাংকে সুশাসন প্রতিষ্ঠার দাবিতে আমরা যখন নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন করে আসছিলাম, তখন ব্যাংকের পর্ষদ বাতিল করে এক ব্যক্তির হাতে পুরো ব্যাংকের দায়িত্ব তুলে দেওয়া হয়েছে। এমন সিদ্ধান্ত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসনের জন্য কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।”

এখনো বোর্ডের কোনো সদস্য নিয়োগ দেওয়া হয়নি। একজন ব্যক্তি পুরো বোর্ডের ক্ষমতা প্রয়োগ করবেন—এটি দীর্ঘমেয়াদে গ্রহণযোগ্য বা কাঙ্ক্ষিত কোনো সমাধান নয়।

এর মাধ্যমে নতুন এক ষড়যন্ত্রের আভাস পাওয়া যাচ্ছে বলেও দাবি করেন আন্দোলনকারীরা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, তাড়াহুড়ো করে যেনতেন একটি পরিচালনা পর্ষদ গঠন না করে যোগ্যদের দিয়ে ইসলামী ব্যাংকের বোর্ড গঠন করতে চায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন পরিচালক চরচা-কে জানান, এরই মধ্যে ঐ তালিকায় থাকা অভিজ্ঞ অনেকেই এই পরিস্থিতিতে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সদস্য হওয়ার সুযোগ নিতে অনীহা দেখাচ্ছেন। তারপরও, যোগ্য, দক্ষ এবং শরিয়াহ আইনের বিষয়ে পরিষ্কার ধারণা আছে–এমন ব্যক্তিদের দিয়ে বোর্ড গঠনের প্রক্রিয়া ব্যাহত না করে অব্যাহত রাখা হয়েছে।

এক্ষেত্রে যাচাই-বাছাই শেষে প্রাথমিক একটি ছোট পরিচালনা পর্ষদ গঠন করতে ৭ থেকে ১০ দিন সময় লাগতে পারে বলে মনে করছেন এই প্রক্রিয়ার সাথে জড়িত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক কর্মকর্তা। তবে নতুন পরিচালনা পর্ষদ গঠনে তৈরি প্রাথমিক তালিকায় কাদের নাম আসছে–এ বিষয়ে মুখ খুলতে রাজি হননি কেউ।

এদিকে, আমানত নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে যেসব গ্রাহক ইসলামী ব্যাংকের বিভিন্ন সঞ্চয় ও আমানত হিসাব মেয়াদপূর্তির আগেই (প্রি-ম্যাচিউর) ভেঙেছেন–তাদের জন্য বিশেষ সুযোগ ঘোষণা করেছে ব্যাংকটি। ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকরা আগামী সাত কর্মদিবসের মধ্যে হিসাব পুনরায় চালু করলে প্রি-ম্যাচিউর নগদায়নের কারণে আরোপিত সব ধরনের খরচ ও আর্থিক ক্ষতি মওকুফ করা হবে। নোটিশে বলা হয়েছে, ১ থেকে ১৫ জুনের মধ্যে যেসব গ্রাহক MTDRA, MSB, MMPDS এবং MSSA হিসাব প্রি-ম্যাচিউর অবস্থায় বন্ধ বা নগদায়ন করেছেন এবং এর ফলে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তারা আগামী সাত কর্মদিবসের মধ্যে একই ধরনের হিসাব পুনরায় চালু করতে পারবেন।

ইসলামী ব্যাংক জানিয়েছে, চলমান পরিস্থিতি বিবেচনায় এসব গ্রাহকের ক্ষেত্রে প্রি-ম্যাচিউর নগদায়নের কারণে যে খরচ, চার্জ বা আর্থিক ক্ষতি হয়েছে, তা সম্পূর্ণ মওকুফ করা হবে। পাশাপাশি হিসাবগুলোকে নতুন হিসাব হিসেবে নয়, বরং চলমান হিসাব হিসেবে গণ্য করা হবে। ফলে গ্রাহকরা আগের আমানতের ধারাবাহিক সুবিধা ফিরে পাবেন।

একই সাথে, ইসলামী ব্যাংক কর্তৃপক্ষ গ্রাহকদের অযথা গুজব বা বিভ্রান্তিতে কান না দিয়ে প্রয়োজনীয় তথ্যের জন্য সংশ্লিষ্ট শাখা ও ব্যাংকের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করার আহ্বান জানিয়ে মূলধারার পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়েছে।

গত রোববার ও গতকাল সোমবার পরপর দুই দফায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক আড়াই হাজার কোটি টাকা করে মোট ৫ হাজার কোটি টাকা ইসলামী ব্যাংককে তারল্য সরবরাহ করেছে। গ্রাহক আস্থা ফেরাতে নেওয়া নানামুখী উদ্যোগের প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। ইসলামী ব্যাংকের মতিঝিল, কারওয়ান বাজারসহ কয়েকটি ব্রাঞ্চে গিয়ে দেখা গেছে, অনেক গ্রাহকই তাদের অ্যাকাউন্ট পুনরায় চালুর উদ্যোগ নিয়েছেন।

আবার উল্টো চিত্রও দেখা গেছে কয়েকটি ব্রাঞ্চে। রাজধানীর মতিঝিল ব্রাঞ্চে টাকা তুলতে শনির আখড়া থেকে আসা গ্রাহক মোস্তারিন তুলি অভিযোগ করে বলেন, পঞ্চাশ হাজার টাকা তোলার জন্য বিভিন্ন বুথে চেষ্টা করেও সফল হননি তিনি। চেক দিয়ে টাকা তোলার ক্ষেত্রেও ২০ হাজার টাকার বেশি দিতে অস্বীকার করেছে যাত্রাবাড়ী ব্রাঞ্চ। তবে মতিঝিল শাখার কর্মকর্তারা বলছেন, তাদের অর্থের কোনো ঘাটতি নেই। তাদের প্রত্যাশা, দ্রুতই গ্রাহকদের মধ্যে আস্থা ফিরে আসবে।

এদিকে, নতুন পরিচালনা পর্ষদ গঠনে দেরি গ্রাহকদের মাঝে অনাস্থা তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন ব্যাংক খাত বিশ্লেষকরা। মোহাম্মদ জহির হোসেনকে ব্যাংকটির দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়টিকে “অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে নেওয়া সিদ্ধান্ত” বলে মন্তব্য করেছেন ব্র্যাক ব্যাংকের ভাইস চেয়ারম্যান ও ব্যাংকার ফারুক মঈনউদ্দীন আহমেদ।

চরচা-কে ফারুক মঈনউদ্দীন আহমেদ বলেন, “এখনো বোর্ডের কোনো সদস্য নিয়োগ দেওয়া হয়নি। একজন ব্যক্তি পুরো বোর্ডের ক্ষমতা প্রয়োগ করবেন—এটি দীর্ঘমেয়াদে গ্রহণযোগ্য বা কাঙ্ক্ষিত কোনো সমাধান নয়।”

এই ব্যাংকার মনে করেন, সংকট নিরসনের জন্য যত দ্রুত সম্ভব একটি দক্ষ, স্বচ্ছ ও সর্বমহলে গ্রহণযোগ্য পরিচালনা পর্ষদ গঠন করতে হবে।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (বিআইআইএসএস)-এর গবেষণা পরিচালক অর্থনীতিবিদ মাহফুজ কবির চরচা-কে বলেন, “দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি কতদিন দায়িত্বে থাকবেন এবং নতুন পর্ষদ কবে গঠন হবে—এসব বিষয়ে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া প্রয়োজন। এতে ধোঁয়াশা কমবে।”

মাহফুজ কবির বলেন, দেশের বৃহত্তম ব্যাংকগুলোর একটিতে অস্থিরতা তৈরি হলে শুধু ওই ব্যাংক নয়, পুরো আর্থিক খাত এবং আন্তর্জাতিক লেনদেনেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। তার মতে, পুনর্গঠন প্রক্রিয়াটি স্বচ্ছ, পেশাদার ও বিতর্কমুক্ত থাকা দেশের বর্তমান আর্থিক খাতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সম্পর্কিত