ব্যাংক ও আর্থিক খাত ঢেলে সাজাতে বাংলাদেশকে এক হাজার ২৬১ কোটি টাকা ঋণ দিচ্ছে বিশ্বব্যাংক। ‘ফিন্যান্সিয়াল সেক্টর সাপোর্ট প্রজেক্ট-২’ বা এফএসএসপি-২-এর আওতায় দেওয়া এ ঋণের বড় অংশ ব্যয় হবে প্রযুক্তি অবকাঠামো, সফটওয়্যার, তদারকি ব্যবস্থা ও ব্যাংক পুনর্গঠনে। জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় গত ২৯ সেপ্টেম্বর প্রকল্পটি অনুমোদন পেয়েছে।
তবে শুধু প্রযুক্তি ও অবকাঠামোতে বিনিয়োগ করলেই ব্যাংক খাতের সংকট কাটবে না বলে মনে করছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে মুজেরি। চরচাকে তিনি বলেন, “অতীতের সংস্কার প্রকল্পগুলোর অভিজ্ঞতায় বাস্তবায়নের দুর্বলতা ও দক্ষ জনবলের ঘাটতি বড় সমস্যা ছিল। তাই নতুন প্রকল্পের সুফল পেতে প্রযুক্তির পাশাপাশি দক্ষ জনবল, নীতিগত স্বচ্ছতা ও কার্যকর তদারকি নিশ্চিত করা জরুরি।”
এই প্রসঙ্গে বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটান বিভাগের পরিচালক জ্যঁ পেসমে এক নিবন্ধে লিখেছেন, “এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পৌঁছানোর বাংলাদেশের লক্ষ্য অর্জনের জন্য একটি স্থিতিশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক আর্থিক খাত প্রয়োজন। কিন্তু দেশের মোট আর্থিক খাতের সম্পদের প্রায় ৯০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণকারী ব্যাংকিং খাত বর্তমানে ক্রমবর্ধমান চাপের মুখে রয়েছে।”
ব্যাংকিং খাতে স্থিতিশীলতা ফেরাতে প্রকল্পটি কাজ করবে জানিয়ে তিনি বলেন, “এই প্রকল্পের মাধ্যমে ছোট আমানতকারীদের সুরক্ষা দেওয়া, তাদের আস্থা ধরে রাখা এবং ব্যাংকিং খাতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজনীয় বিভিন্ন ব্যবস্থা, প্রযুক্তি ও সুরক্ষা কাঠামো গড়ে তোলা হবে। এর ফলে ব্যাংকিং খাত আবারও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে কার্যকরভাবে ভূমিকা রাখতে পারবে।”
এনপিএল ও দুর্বল তদারকিতে সংকটে ব্যাংক খাত
পরিকল্পনা বিভাগ জানিয়েছে, প্রকল্পটির মোট ব্যয় এক হাজার ২৬১ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন মাত্র ১৪ কোটি ৭৬ লাখ টাকা। বাকি এক হাজার ২৪৬ কোটি টাকার মতো অর্থ ঋণ হিসেবে দেবে বিশ্বব্যাংক।
প্রকল্পের মেয়াদ ধরা হয়েছে ২০২৬ সালের জুলাই থেকে ২০৩১ সালের জুন পর্যন্ত। পরিকল্পনা বিভাগের সচিব এস এম শাকিল আখতার সাংবাদিকদের বলেন, “আর্থিক খাতে স্থিতিশীলতার ঘাটতি, সম্পদ ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা, প্রশাসনিক অদক্ষতা এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এসব সমস্যা দূর করাই প্রকল্পটির অন্যতম উদ্দেশ্য।”
বর্তমানে দেশের ব্যাংকিং খাত বড় ধরনের চাপের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। উচ্চমাত্রার খেলাপি ঋণ, দুর্বল সুশাসন, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার ঘাটতি এবং দীর্ঘদিনের পুরোনো প্রযুক্তি অবকাঠামো ব্যাংকগুলোর কার্যক্রমকে দুর্বল করে তুলেছে। বিশেষ করে কিছু সরকারি ও ইসলামী ব্যাংক তারল্য ও মূলধন সংকটে পড়েছে। কয়েকটি ব্যাংকের মূলধন ঋণাত্মক পর্যায়েও চলে গেছে।
ব্যাংকিং খাতের এ সংকট শুধু কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। দুর্বল ব্যাংকগুলোতে আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়া, তারল্য ব্যবস্থাপনা, মূলধন ঘাটতি পূরণ এবং ব্যাংক পুনর্গঠন এখন আর্থিক খাতের বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।
মুস্তফা কে মুজেরি বলেন, “আর্থিক খাত সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে কোনো দ্বিমতের সুযোগ নেই। সংস্কার ছাড়া ব্যাংক ও আর্থিক খাতকে বর্তমান রুগ্ণ অবস্থা থেকে বের করে আনা কঠিন। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে নেওয়া নতুন প্রকল্পটি আগের সংস্কার কর্মসূচিরই ধারাবাহিকতা। এর আওতায় সফটওয়্যার, ডিজিটাল প্রযুক্তি, আর্থিক খাতের কার্যক্রম আধুনিকায়ন এবং তদারকি ব্যবস্থা শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আধুনিক ও কার্যকর আর্থিক খাত গড়ে তুলতে এসব উদ্যোগ সময়োপযোগী।”
এক হাজার ৭৭ কোটি টাকা যাবে প্রযুক্তি অবকাঠামোতে
প্রকল্পটির ব্যয় বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মোট অর্থের বড় অংশই প্রযুক্তি অবকাঠামো উন্নয়নে রাখা হয়েছে। শুধু আইসিটি সরঞ্জাম কেনার জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৭১১ কোটি ৭১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা। কম্পিউটার সফটওয়্যারের জন্য রাখা হয়েছে আরও ৩৫৫ কোটি ৩৬ লাখ পাঁচ হাজার টাকা। ডাটাবেজ তৈরিতে ব্যয় হবে সাত কোটি ৬৪ লাখ ১৯ হাজার টাকা। এছাড়া কম্পিউটার ও আনুষঙ্গিক সামগ্রী কেনার জন্য রাখা হয়েছে এক কোটি পাঁচ লাখ ৪৬ হাজার টাকা। সব মিলিয়ে মূলধন খাতে প্রকল্পটির বরাদ্দ এক হাজার ৭৭ কোটি ২৪ লাখ ৪৩ হাজার টাকা।
প্রকল্পের আওতায় আর্থিক খাতের তদারকি ব্যবস্থা আরও আধুনিক করার পাশাপাশি আইসিটি অবকাঠামো উন্নয়ন এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। ব্যাংকিং খাতের তথ্য সংগ্রহ, বিশ্লেষণ, নজরদারি ও ঝুঁকি শনাক্তকরণে ডিজিটাল ব্যবস্থা চালুর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
মুস্তফা কে মুজেরি বলছেন, “বর্তমানে দেশের ব্যাংকিং খাতে যে সংকট তৈরি হয়েছে, তার অন্যতম কারণ বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকি বা ওভারসাইট ব্যবস্থার দুর্বলতা। শক্তিশালী তদারকি ব্যবস্থা থাকলে ব্যাংকিং খাতে ঘটে যাওয়া অনেক অনিয়ম ও অদক্ষতা আগেই শনাক্ত করা সম্ভব হতো। ব্যাংক ও আর্থিক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য শক্তিশালী ওভারসাইট এবং মনিটরিং-ইভালুয়েশন ব্যবস্থা প্রয়োজন। আধুনিক সময়ে শুধু ম্যানুয়ালি তদারকি করে ব্যাংকিং খাতের বিশাল তথ্য ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা করা সম্ভব নয়। তাই তদারকি ও মনিটরিং ব্যবস্থাকে ডিজিটাল করা জরুরি।”
শুধু প্রযুক্তি নয়, দক্ষ জনবলও জরুরি
প্রকল্পে প্রযুক্তির পাশাপাশি প্রশিক্ষণ ও পরামর্শক নিয়োগেও বড় অঙ্কের অর্থ রাখা হয়েছে। এফএসএসপি-২-এর আওতায় তিন হাজার ৫৬৫ জনকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। এ জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৭০ কোটি ৭৭ লাখ ৪৭ হাজার টাকা। এর মধ্যে বিশ্বব্যাংকের আইডিএ অর্থায়ন করবে ৬৭ কোটি ৭৭ লাখ ৪৭ হাজার টাকা এবং বাংলাদেশ ব্যাংক দেবে তিন কোটি টাকা। এছাড়া ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানভিত্তিক পরামর্শক নিয়োগে মোট ৯৪ কোটি ৪৩ লাখ ৬২ হাজার টাকা রাখা হয়েছে। ব্যক্তিগত পরামর্শকের জন্য ২৯ কোটি নয় লাখ ৭৫ হাজার টাকা এবং প্রতিষ্ঠানভিত্তিক পরামর্শক সেবার জন্য ৬৫ কোটি ৩৩ লাখ ৮৭ হাজার টাকা বরাদ্দ রয়েছে।
প্রকল্পের রাজস্ব খাতে ব্যয় ধরা হয়েছে ১৮৮ কোটি ২৯ লাখ ২৯ হাজার টাকা। সেমিনার ও সম্মেলনের জন্য প্রায় ২০ কোটি টাকা এবং যানবাহন ব্যবহারের জন্য দেড় কোটি টাকা রাখা হয়েছে। তবে প্রকল্পের আওতায় নতুন গাড়ি কেনার সুযোগ থাকছে না। প্রয়োজনে চুক্তিভিত্তিক পরিবহন নেওয়া যাবে, তবে এ জন্য অর্থ বিভাগের পূর্বানুমোদন প্রয়োজন হবে।
প্রযুক্তিনির্ভর তদারকি ব্যবস্থা গড়ে তোলার পাশাপাশি দক্ষ জনবল তৈরি না হলে প্রকল্পের কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন বলে মনে করেন মুস্তফা কে মুজেরি। তিনি বলেন, “অতীতেও একই ধরনের উদ্দেশ্যে অবকাঠামোগত সংস্কার প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেসব প্রকল্প বাস্তবায়নে বড় সমস্যা ছিল বাস্তবায়নের দুর্বলতা ও দক্ষ জনবলের অভাব। দক্ষ জনবল, নীতিগত স্বচ্ছতা এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া আর্থিক খাতের তদারকি সংস্থাগুলো কার্যকরভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারে না।”
মুস্তফা কে মুজেরি আরও বলেন, “শুধু হার্ডওয়্যার বা সফটওয়্যার এনে প্রযুক্তিগতভাবে সবকিছু ডিজিটাইজ করলেই সুফল পাওয়া যাবে না। প্রযুক্তির পাশাপাশি দক্ষ জনবল ও রাজনৈতিক সদিচ্ছার মতো “সফটওয়্যারও” প্রয়োজন। নতুন প্রকল্পে প্রযুক্তি কেনা ও স্থাপনের পাশাপাশি এসব প্রযুক্তির সঠিক এবং অনিয়মহীন ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। তা না হলে অতীতের ভুলের পুনরাবৃত্তি হতে পারে।”
ব্যাংক পুনর্গঠন ও আমানত সুরক্ষায় গুরুত্বারোপ
এফএসএসপি-২ প্রকল্পে শুধু প্রযুক্তি অবকাঠামো উন্নয়ন নয়, আর্থিক খাতের সুরক্ষা ব্যবস্থাকেও শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পারফরম্যান্সভিত্তিক শর্ত বা পিবিসির মাধ্যমে আর্থিক খাতের নিরাপত্তা বাড়ানো এবং ব্যাংকিং খাতের সংস্কার কার্যক্রমে সহায়তা করার কথা রয়েছে।
একই সঙ্গে ডিপোজিট ইন্স্যুরেন্স কার্যক্রমের আর্থিক সক্ষমতা বাড়ানো হবে। ব্যাংক সমস্যায় পড়লে আমানতকারীদের অর্থ সুরক্ষা এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অর্থ পরিশোধের সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়টিও প্রকল্পের আওতায় থাকছে।
এছাড়া, ব্যাংক রেজ্যুলেশন ও ব্যাংক পুনর্গঠনের কার্যকর বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে। অর্থাৎ কোন ব্যাংক আর্থিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়লে সেটিকে কীভাবে পুনর্গঠন, একীভূত বা প্রয়োজনীয় অন্য ব্যবস্থার মাধ্যমে স্থিতিশীল করা হবে, সেই প্রক্রিয়া আরও কার্যকর করার লক্ষ্য রয়েছে।
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর শাসনব্যবস্থা এবং আর্থিক স্থিতিশীলতা উন্নয়নও প্রকল্পের অন্যতম লক্ষ্য। ফলে বর্তমান ব্যাংকিং খাতের সংকট মোকাবিলায় প্রকল্পটি শুধু প্রযুক্তিগত আধুনিকায়নের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না।
দেশের ব্যাংকিং খাতে বর্তমানে খেলাপি ঋণ, মূলধন ঘাটতি, তারল্য সংকট ও দুর্বল সুশাসন বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এসব সমস্যার পাশাপাশি ব্যাংকগুলোর ঝুঁকি শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। নতুন প্রকল্পের মাধ্যমে তদারকি ব্যবস্থা আধুনিক করা গেলে ব্যাংকগুলোর আর্থিক অবস্থা সম্পর্কে দ্রুত ও নির্ভুল তথ্য পাওয়ার সুযোগ বাড়বে।
তবে অর্থনীতিবিদরা আরও বলছেন, প্রকল্পের অর্থ কীভাবে এবং কতটা কার্যকরভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে, সেটিই শেষ পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। কারণ আগের সংস্কার প্রকল্পগুলোর অভিজ্ঞতা থেকে দেখা গেছে, প্রযুক্তি ও অবকাঠামো তৈরি করলেই আর্থিক খাতের সংস্কার সম্পন্ন হয় না। নিয়মের প্রয়োগ, তদারকির কার্যকারিতা, দক্ষ জনবল এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করতে না পারলে বড় অঙ্কের বিনিয়োগও কাজে আসবে না।