ধান, নদী আর খালের জেলা বরিশাল। একটি সিটি করপোরেশন ও ১০টি উপজেলা নিয়ে গঠিত এ জেলায় সংসদীয় আসন ছয়টি। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ছয় আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন মোট ৩৬ জন প্রার্থী। শেষ মুহূর্তে নানা কৌশলে চলছে তাদের জোর প্রচারণা।
প্রতিটি আসনেই একাধিক প্রার্থী মাঠে থাকলেও মূল আলোচনায় বিএনপি, জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থীদের ঘিরে। কোথাও কোথাও আলোচনায় আসছেন জাতীয় পার্টি ও যুক্তফ্রন্ট সমর্থিত প্রার্থীরাও। জয়ের বিষয়ে সবাই আশাবাদী হলেও বরাবরের মতো এবারও বরিশালকে বিএনপির শক্ত ঘাঁটি হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
অন্যদিকে নিজেদের শক্ত অবস্থান জানান দিতে মাঠে সক্রিয় অন্যান্য দলগুলোও। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই জেলায় বড় প্রভাব ফেলতে পারে আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংক।
বরিশাল-১ (গৌরনদী-আগৈলঝাড়া)
এবারের নির্বাচনে এই আসনে মোট ভোটার তিন লাখ ২৮ হাজার ১১৯ জন। তাদের মধ্যে এক লাখ ৮৬ হাজার ৬১৪ ভোটার গৌরনদীর ও এক লাখ ৪১ হাজার ৫০৫ জন আগৈলঝাড়ার বাসিন্দা। এ আসনের মোট ভোটারের ৪০ শতাংশ হিন্দু ধর্মাবলম্বী। আর আগৈলঝাড়ার ভোট মোটারের প্রায় ৬০ শতাংশই হিন্দু।
এই আসনে এবার বিএনপির প্রার্থী হয়েছে দলের উপদেষ্টা জহির উদ্দিন স্বপন। তিনি ২০০১ সালের নির্বাচনে এখানে জয়ী হয়েছিলেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে রয়েছে বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী আব্দুস সোবাহান।
২০০১ সালের নির্বাচনের পর দেশজুড়ে আলোচিত হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর নির্যাতনের ঘটনা সামনে এবারের ভোটের মাঠে আলোচনায় আছে। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরাও এটি সামনে রাখছেন। স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ায় বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত আব্দুস সোবাহান সরাসরিই বলছেন, “হিন্দুদের রক্ষার জন্য প্রার্থী হয়েছি। হিন্দুরা অতীতের মতো অত্যাচারিত হয়ে রামশীল যেতে চান না।”
এ ছাড়া এ আসনে ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী হয়েছেন মো. রাসেল সরদার এবং জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মো. কামরুল ইসলাম।
বরিশাল-২ (বানারীপাড়া–উজিরপুর)
এ আসনে ভোটার সংখ্যা তিন লাখ ৮৫ হাজার ৮০৭ জন। এর মধ্যে উজিরপুর উপজেলায়ই রয়েছে দুই লাখ ৩৬ হাজার ২১৫ জন ভোটার।
আসনটিতে এবার আওয়ামী লীগ প্রার্থী না থাকায় বিএনপির জয়ের সম্ভাবনা থাকলেও দলীয় বিভক্তি সেই হিসাবকে জটিল করে তুলেছে।
এবার বিএনপি মনোনয়ন দিয়েছে সরদার সরফুদ্দিন আহমেদ সান্টুকে। তিনি ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থীর কাছে হেরে যান। ২০১৮ সালের নির্বাচনের আগে হামলা ও মামলার মুখে এলাকা ছাড়তে বাধ্য হন তিনি। দীর্ঘদিন পর মাঠে ফিরলেও এবার তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে দলের অভ্যন্তরীণ বিরোধ।
সম্প্রতি বানারীপাড়া উপজেলা বিএনপির সহসভাপতি গোলাম মাহবুব এবং পৌর কৃষক দলের নেতা আবদুল গাফফার হোসেনসহ কয়েকশ নেতাকর্মী জামায়াতে ইসলামীতে যোগ দিয়েছেন। তারা জামায়াত প্রার্থী আবদুল মন্নানের পক্ষে দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে প্রচারে নেমেছেন। গোলাম মাহবুব বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক এবং দীর্ঘদিন সান্টুবিরোধী একটি গ্রুপের নেতৃত্বে ছিলেন। ৪৫ বছর পর দল ছাড়ার বিষয়ে তিনি দলীয় বঞ্চনা ও সান্টুর দাম্ভিকতাকে দায়ী করেছেন।
এই আসনে মোট আটজন প্রার্থী থাকলেও সক্রিয় রয়েছেন চারজন। বিএনপি ও জামায়াতের প্রার্থী ছাড়াও প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আছেন বাংলাদেশ জাসদের আবুল কালাম আজাদ এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মো. নেছার উদ্দিন।
উজিরপুর উপজেলার তিনটি বিল ইউনিয়নে প্রায় ৮০ শতাংশ ভোটার হিন্দু সম্প্রদায়ের। স্থানীয় পর্যবেক্ষকদের মতে, এই তিন ইউনিয়নের ভোটের পাশাপাশি বানারীপাড়ার এক লাখ ৪৯ হাজার ৫৯২ ভোটারের সিদ্ধান্তই শেষ পর্যন্ত প্রার্থীদের ভাগ্য নির্ধারণ করবে।
বরিশাল-৩ (মুলাদী-বাবুগঞ্জ)
এ আসনে মোট ৩ লাখ ৩২ হাজার ৯৭ ভোটার। এ আসনে এবার বিএনপির প্রার্থী হয়েছেন অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন। যার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখা হচ্ছে জামায়াতে ইসলামীর সমর্থনের প্রার্থী আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টির সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান ফুয়াদকে। আরও আছেন জাতীয় পার্টির (জাপা) হয়ে তিনবারের নির্বাচিত সাবেক এমপি গোলাম কিবরিয়া টিপু ও ইসলামী আন্দোলনের সিরাজুল ইসলাম।
পরপর তিনবার এমপি নির্বাচিত হওয়ায় ধারণা করা হচ্ছে এ এলাকায় খুব ভালো জনপ্রিয়তা রয়েছে জাপা প্রার্থী গোলাম কিবরিয়া টিপুর। যদিও এবার তিনি জেলে রয়েছে তবে তার হয়ে প্রচারণায় মাঠে নেমেছে মেয়ে হাবিবা কিবরিয়া।
এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান ফুয়াদ। ছবি: চরচাঅপর দিকে দুই উপজেলার কোথাও এবি পার্টির সাংগঠনিক ভিত্তি নেই। আসাদুজ্জামান ফুয়াদের গণসংযোগে দেখা যাচ্ছে জামায়াতের নেতাকর্মীদের। স্থানীয়রা বলছেন, ইসলামী আন্দোলনের এ আসনে নিজস্ব ভোট ব্যাংক রয়েছে। ফলে এখানে চতুর্মুখী লড়াইয়ের আভাস দেখাখা যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বরিশাল-৫ (মহানগর-সদর)
এ আসনে মোট ভোটার ৫ লাখ ১ হাজার ৩০৪ জন। পুরো বিভাগে মর্যাদার আসন হিসেবে এর পরিচিতি। এখানে ১৯৯১ থেকে ২০০৮ পর্যন্ত জাতীয় ও স্থানীয় সরকারের সব স্তরের নির্বাচনে বিএনপি জিতেছে। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী হয়েছেন চারবারের এমপি ও একবারের সিটি মেয়র মো. মজিবর রহমান সরওয়ার।
তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ইসলামী আন্দোলনের জ্যেষ্ঠ নায়েবে আমির সৈয়দ মুহাম্মাদ ফয়জুল করীম। তবে বর্তমান সময়ের আলোচনায় এসেছে এই আসনসহ গোটা জেলার একমাত্র বাসদের নারী প্রার্থী ডা. মনীষা চক্রবর্তী। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তিনি পরিচিত হলেও ভোটের মাঠে তেমন প্রভাব ফেলতে পারবেন না বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
বরিশাল সদরে বিএনপির প্রার্থী মজিবর রহমান সরওয়ার। ছবি: চরচাঅপর দিকে বিএনপি প্রার্থী সরওয়ারের বড় বাঁধা হতে পারে ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী ফয়জুল করীম। জামায়াতের নেতৃত্বাধীন জোটে ইসলামী আন্দোলন না থাকলেও এ আসনে প্রার্থী দেয়নি জামায়াতে ইসলামী। সর্বশেষ ২০২৪ সালে প্রার্থী ছিলেন ফয়জুল করীম। আওয়ামী লীগ আমলেরও ওই বিতর্কিত নির্বাচনে তিনি ৩৩ হাজার ৮২৮ ভোট পান।
ইসলামী আন্দোলনের সিনিয়র নায়েবে আমির সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করীমের আসনে প্রার্থী দেয়নি জামায়াতে ইসলামী। ছবি: চরচাবরিশাল-৬ (বাকেরগঞ্জ)
এই আসনে মোট ভোটার ৩ লাখ ১৫ হাজার ৫৯৭ জন। এখানে বিএনপির প্রার্থী আবুল হোসেন খানের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ইসলামী আন্দোলনের জ্যেষ্ঠ নায়েবে আমির সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করীম ও জামায়াতের জেলা সেক্রেটারি মো. মাহমুদুন্নবী। ফয়জুল করিমের দাবি, বরিশাল ৫ ও ৬ আসনে আওয়ামী লীগের নিরীহ ভোটাররা তাকে ভোট দেবেন। আওয়ামী লীগের ভোটারদের আকৃষ্ট করতে তিনি মামলা ছাড়া আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের গ্রেপ্তারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছেন।