হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের রথযাত্রা উৎসবের সমাপনী আয়োজন ‘উল্টোরথ’ ঘিরে নাশকতার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। শুক্রবার সন্ধ্যায় ঢাকেশ্বরী মন্দির থেকে শুরু হয়ে স্বামীবাগে শেষ হওয়া এই উল্টোরথের যাত্রাপথেই মিলেছে শক্তিশালী ইমপ্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস (আইইডি)। ছাতার মধ্যে রাখা শক্তিশালী বোমাটি শনাক্ত করে সফলভাবে নিষ্ক্রিয় করা হয়।
ঘটনার পর থেকে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট বিষয়টি নিয়ে তদন্ত করছে। পাশাপাশি ছায়া তদন্ত করছে পুলিশের একাধিক সংস্থা। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তদন্তে গুরুত্ব পাচ্ছে, গত ১৬ জুলাই রথযাত্রার আয়োজন ঘিরে জঙ্গি হামলার হুমকিকে। আট দিন আগের আয়োজনে জঙ্গি হামলার হুমকির পর সবোর্চ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করেও বোমা পাওয়ার ঘটনা ভাবাচ্ছে প্রশাসনকে। এতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। আবার একই সঙ্গে স্পষ্ট হয়েছে যে, ভাগ্যক্রমেই ভেস্তে গেল জঙ্গি হামলার পরিকল্পনা।
শুক্রবার বিকেল ৪টার দিকে রাজধানীর ঢাকেশ্বরী মন্দির থেকে উল্টোরথের শোভাযাত্রা শুরু হয়। বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রাটি স্বামীবাগ ইসকন মন্দিরের উদ্দেশে মতিঝিল মেট্রো স্টেশন পার হয়। ওই সময়ই মেট্রো স্টেশনের নিচে দায়িত্বরত একজন পুলিশ সদস্য খেয়াল করেন পিলার ঘেঁষে একটি ছাতা রাখা। সাধারণ ছাতা ভেবে কাছে যান তিনি। বুঝতে পারেন এটি কোনো সাধারণ ছাতা নয়। সংযুক্ত টাইমার দেখে ধারণা করেন এটি টাইম বোমা হতে পারে। খবর পেয়ে তাৎক্ষণিকভাবে ডিএমপির বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিট এসে বোমাটি নিষ্ক্রিয় করে। এটির বিস্ফোরণ ঘটানোর সময় একজন পথচারীও আহত হন। পরে জানা যায়, এটি সাধারণ বোমা ছিল না বরং আধুনিক প্রযুক্তি অনুসরণ করে তৈরি করা আইইডি।
শনিবার বোমাটি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়। ডিএমপির বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিটের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা চরচাকে জানান, ছাতার মধ্যে বিস্ফোরক ডিভাইসটি স্থাপন করা হয়েছিল। ছাতা খোলার বোতামটিতে আইইডির টাইমারের সংযোগ ছিল। কেউ এটিকে সাধারণ ছাতা মনে করে খোলার চেষ্টা করলেই ঘটতে পারত বড় ধরনের বিস্ফোরণ। ফলে প্রাণহানির ঘটনাও ঘটতে পারত বলে শঙ্কা প্রকাশ করেন এই কর্মকর্তা।
বিস্ফোরকটি কতটা শক্তিশালী ছিল জানতে চাইলে তিনি বলেন, “এটি তৈরিতে এক থেকে দেড় কেজি সালফার ব্যবহার করা হয়েছে। সঙ্গে ছিল ছোট ছোট লোহার বল এবং অসংখ্য তারকাটা। এটি বিস্ফোরিত হলে ৫০–৬০ জন হতাহত হতে পারত।”
ডিএমপির বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিট বোমাটি নিষ্ক্রিয় করে। সংগৃহীত ছবি
ঘটনার পর রাজধানীর মতিঝিল থানায় দায়ের হওয়া বিস্ফোরক আইনের মামলাটির তদন্ত চলছে জঙ্গি হামলার হুমকির বিষয়টিকে প্রাধান্য দিয়েই। ডিএমপির গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) অতিরিক্ত কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম চরচাকে বলেন, “বোমাটি কারা, কী উদ্দেশ্যে রেখেছিল তা আমরা তদন্ত করছি। এখনো সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য আমরা পাইনি।”
এটি রথযাত্রাকে কেন্দ্র করে জঙ্গি হামলার হুমকির ধারাবাহিক ঘটনা কি না জানাতে চাইলে ডিএমপির গোয়েন্দা প্রধান বলেন, “আমরা এটিকেই ফোকাস করে এগোচ্ছি।”
সুনির্দিষ্ট হুমকি ছিল আগেই
গত ১৬ জুলাই স্বামীবাগ ইসকন মন্দির থেকে শুরু হওয়া রথযাত্রা ঘিরে একাধিক জঙ্গি হামলা হুমকির বিষয়ে গোয়েন্দা তথ্য ছিল। এরই ধারাবাহিকতায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সকল ইউনিট রাজধানীজুড়ে বাড়তি নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেছিল। এ দিন যদিও কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। তবে রথের সমাপনী উল্টোরথের আয়োজনে মিলল আইইডি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ডিএমপির গোয়েন্দা বিভাগের একজন কর্মকর্তা চরচাকে বলেন, “গত ১৬ জুন সকালেই খুব গুরুত্বপূর্ণ গোয়েন্দা তথ্য পাওয়া যায় যে রথযাত্রায় জঙ্গি হামলা হবে। এ দিন নিয়মিত নিরাপত্তার পাশাপাশি আমরা সর্বোচ্চ বাড়তি ব্যবস্থা নিয়েছিলাম। এমনকি প্রতিটি ইউনিটের সকল সিনিয়র কর্মকর্তারাও পুরো সময় রাস্তায় থেকে দায়িত্ব পালন করেছেন। সেদিন কিছু না ঘটায় আমরা এটিকে সাধারণ হুমকি হিসেবে মনে করেছি। কিন্তু উল্টোরথের আয়োজনে এমন কিছু ঘটবে তা আমরা বুঝে উঠতে পারিনি। ১৬ তারিখের নিরাপত্তা যেমন ছিল তেমন থাকলে এই আইইডি রেখে যাবার সুযোগ তৈরি হতো না। আমরা নিশ্চিতভাবে সৌভাগ্যবান যে কোনো দুর্ঘটনা ঘটেনি।”
এই কর্মকর্তা আরও বলেন, “এই ঘটনাটি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল, যে সুযোগ পেলেই অপরাধীরা বড় কিছু করে ফেলতে পারে। তারা ঠান্ডা মাথায় পুরো পরিকল্পনা সাজিয়েছে। তারা আইইডি ডিজাইন করেছে ছাতার মধ্যে। তার অর্থ, তারা পরিকল্পনা করার জন্য ওয়েদার ফোরকাস্টকেও মাথায় রেখেছে। এই কয়েক দিন বৃষ্টি হবে তাই উল্টোরথে যোগ দেওয়া যেকোনো ব্যক্তি একটি ছাতা পড়ে থাকতে দেখলে তা তুলে নিয়ে মাথায় দেওয়ার সম্ভাবনা খুব বেশি। আর সেটি খুলতে গেলেই বিস্ফোরণ ঘটবে।”
ঘটনার পর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক বিপ্লব দে। তিনি বলেন, “রথযাত্রা আয়োজন নিয়ে স্যোশাল মিডিয়াতে হামলার হুমকি ছিল। আমাদের সমাজের একাধিক ব্যক্তি এই হুমকি পেয়েছিলেন। আয়োজনের আগে আমরা পূজা উদযাপন পরিষদের নেতারা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে বৈঠকেও হুমকির বিষয়টি উল্লেখ করেছিলাম। প্রশাসনের পক্ষ থেকেও যথেষ্ট নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু গতকালের (শুক্রবার) এই ঘটনা এখন আরও বেশি উদ্বেগ তৈরি করল, আমরা নিজেরাও এখন ঝুঁকির মধ্যে আছি।”
এদিকে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের আয়োজনকে ঘিরে ঘোষণা দিয়ে হামলার এই চেষ্টাকে আইন-শৃঙ্খলার অবনতি হিসেবে উল্লেখ করেছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষক এয়ার কমোডর (অব.) ইশফাক ইলাহী চৌধুরী। চরচাকে তিনি বলেন, “জঙ্গি হামলার ঝুঁকি বাংলাদেশে আগেও ছিল, এখনো আছে। অন্তর্বর্তী সরকার যেভাবে এই সংকটকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ঘোষণা দিয়ে হালকা করেছিল, সেটা উচিত হয়নি। বর্তমান সরকারের উচিত জঙ্গিবাদ সমস্যাকে ভালভাবে আমলে নেওয়া। জঙ্গিবাদ নিয়ে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যেসব ইউনিট কাজ করত তাদের কার্যপরিধি না কমিয়ে বরং প্রতিটি ইউনিটেই জঙ্গিবাদ নিয়ন্ত্রণে পারদর্শীদের উৎসাহিত করা প্রয়োজন।”