তরুণ চক্রবর্তী

ভোট আসে, ভোট যায়। সঙ্গে বদলায় রাজনৈতিক চরিত্রের রংও। ভারতীয় রাজনীতিতে দলবদল এখন জলভাত। দলবদলুদের নিয়ে কোনো মাথাব্যাথা নেই সাধারণ মানুষেরও। কারণ ভোটের আগে এবং ভোটের পরে দলবদলটাই হয়ে উঠেছে ভবিতব্য। রাজনৈতিক আদর্শের কোনো বালাই নেই। জাতীয় দল থেকে আঞ্চলিক দল, আবার আঞ্চলিক দল থেকে জাতীয় দলে যাওয়া-আসাতেও নেই কোনো চমক। প্রয়াত প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী ঘটা করে দলত্যাগ বিরোধী আইন করলেও সেই আইনের ফাঁক গলে মুড়ি-মুড়কির মতো চলছে দলবদল। আগে তবু ‘দলবদলু’ বলে একটা গালি চালু ছিল। এখন সেটাও জৌলুস হারিয়েছে।
সামনেই ভারতের পশ্চিমবঙ্গসহ পাঁচ রাজ্যে বিধানসভা ভোট। সেই ভোটের আগে যথারীতি দলবদল শুরু হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে এবারের দলবদলে সবচেয়ে বেশি চর্চায় আছেন প্রতীক উর রহমান। তিনি সিপিএম ছেড়ে তৃণমূলে যোগ দিয়েছেন। এতকাল সিপিএমের হয়ে মমতা ব্যানার্জির নেতৃত্বাধীন তৃণমূলের বিরুদ্ধে গলা ফাটালেও এখন শাসক দলের হয়ে প্রচারে ব্যস্ত। সঙ্গে কাঁসর বাজাচ্ছেন, ‘সিপিএমে গণতন্ত্র নেই’, ‘দলে গোষ্ঠীবাজি চলছে’, ‘বিজেপিকে ঠেকাতে তৃণমূলই ভরসা’ ইত্যাদি। তৃণমূল তাকে নিয়ে ধন্য ধন্য করলেও বিজেপি ও সিপিএমের তরফে ধেয়ে আসছে কটাক্ষও। আদর্শ নিয়েও কচকচানি চলছে। কিন্তু আদর্শের কি কোনো বালাই আদৌ আছে?
ভারতীয় রাজনীতিতে দলবদলের কাণ্ডকারখানা দেখলে আদর্শের কোনো বালাইকে খুঁজে পাওয়া যায় না। এই তো সেদিনও তৃণমূলকে গাল দিয়ে যারা বিজেপির হাত ধরেছিলেন, তারাই আবার ফিরে এলেন তৃণমূলে। আজ বিজেপি সাম্প্রদায়িক, তৃণমূল দুর্নীতিগ্রস্ত; তো কাল উল্টোটা। কে কবে কী বলছেন শত ঝামেলায় তা আর কেই-বা মনে রাখে! নেতাদের চাহিদা মূলত দুটি, এক ভোটে নমিনেশন এবং জয়ের নিশ্চয়তা। জয় পেলে মন্ত্রিত্ব বা সরকারি সুবিধা। ইদানীং অবশ্য অতিরিক্ত হিসেবে জেল খাটা থেকে রেহাইয়ের পাকা বন্দোবস্তও চাইছেন অনেকে। যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোয় এই জেলখাটা থেকে মুক্তির অপর নাম ‘ওয়াশিংমেশিন’। বুঝলেন? ওয়াশিংমেশিন যেমন পোশাকের সব ময়লা দূর করে, ঠিক তেমনি শাসক দলে গেলেই দুর্নীতির নোংরা দাগ উঠে যায়! তাই ওয়াশিংমেশিনের চাহিদাও তুঙ্গে।
২০২১ সালে ভোটের আগে দলবদলের জোয়ার আসে পশ্চিমবঙ্গে। তৃণমূল দলের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা, সদ্য প্রয়াত মুকুল রায় সদলবলে চলে যান বিজেপিতে। বর্তমান বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীও সেই পথেরই পথিক ছিলেন। বহুকাল বিজেপিকে সাম্প্রদায়িক বলে গালি দিলেও দল বদলাতে অসুবিধা হয়নি তাদের। কিন্তু ভোটে বিজেপি হারতেই অনেকেই ফিরে আসেন তৃণমূলে। মুকুল রায়ও ফিরে আসেন। বিজেপির প্রতীকে জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হয়েও তিনি দলবদল করেন সদস্য পদ না ছেড়েই। কেউ কেউ অবশ্য নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির পদ ছেড়েও দলবদল করেছেন। আবার গাছের ও তলার খাওয়ার উদাহরণ কম নেই! আসামেও একই ছবি দেখা গেছে। সে যা হোক ২৯৪ সদস্যের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় দলবদলের হাত ধরে বিজেপির শক্তি ৭৭ থেকে কমে হয়েছে ৬৪, আর তৃণমূলের ২১৩ থেকে ২২৪।
অথচ ভারতে রয়েছে দলত্যাগ-বিরোধী আইন। সেই আইনে বলা হয়েছে এক-তৃতীয়াংশ দলীয় জনপ্রতিনিধির সমর্থন ছাড়া দলত্যাগ বা দলের হুইপ-বিরোধী অবস্থানে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির সদস্য পদ খারিজ হয়ে যাবে। কিন্তু সেই আইনের ফাঁক সবসময়ই থাকে শাসক দলের অনুকূলে। তাই ফাঁক গলতে অসুবিধা হয় না কারও। দিব্যি চলছে দলবদলুদের অবাধ চলাফেরা। ফলে কংগ্রেস ক্ষমতা থেকে অনেক দূরে থাকলেও বহু রাজ্যেই প্রাক্তন কংগ্রেসিরাই মুখ্যমন্ত্রীর কুর্সিতে!
নেতাদের আয়ারাম, গয়ারামের খুব ভালো দুটি ছবি ধরা পড়ে ২০১৭ সালে মণিপুর ও গোয়ায়। ৬০ সদস্যের মণিপুর বিধানসভায় কংগ্রেস জিতেছিল ২৮টি আসনে এবং বিজেপি ২১টিতে। কিন্তু সরকার গঠন করে বিজেপি। দিল্লির শক্তিকে কাজে লাগিয়ে ব্যাপক দলবদল ঘটিয়ে এবং ছোটখাটো দলগুলোকে সঙ্গে নিয়ে মণিপুরে তারা ক্ষমতায় আসে। ভোটের আগেই অবশ্য এন বীরেন সিংকে কংগ্রেস থেকে ছাড়িয়ে নিজেদের দলে নিয়ে এসেছিলেন বিজেপি নেতারা। অনেকটা আসামের স্টাইলে। আসামে ২০১৪ সালে হিমন্ত বিশ্বশর্মাকে কংগ্রেস থেকে ছাড়িয়ে বিজেপিতে নিয়ে আসা হয়। তার আগে হিমন্তের বিরুদ্ধে প্রচুর দুর্নীতির অভিযোগ তুলে জমি তৈরি করেছিল বিজেপি। তদন্তও শুরু হয়েছিল। কিন্তু ওয়াশিং মেশিন চিনতে ভুল করেননি হিমন্ত। বিজেপিও সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে গোটা উত্তর পূর্বাঞ্চলে কংগ্রেস ভাঙিয়ে নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করে। এখন উত্তর-পূর্ব ভারতের আট রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীই প্রাক্তন কংগ্রেসি।
গোয়াতেও চমক ছিল ২০১৭ সালে। ৪০ সদস্যের বিধানসভায় কংগ্রেস জেতে ১৭টি আসনে এবং বিজেপি ১৩টিতে। ছোটখাটো দলগুলি কংগ্রেসকে সমর্থন দিতে প্রস্তুত ছিল। কিন্তু দল ভাঙানোর খেলায় পারদর্শী বিজেপি সরকার গঠন করে গোয়াতেও। সেই একই ফর্মুলায় মধ্যপ্রদেশের নির্বাচিত কংগ্রেসের সরকার ফেলে দেয় বিজেপি। কমল নাথের নেতৃত্বে মধ্যপ্রদেশের ভোটে কংগ্রেস জিতেছিল। কিন্তু বিজেপি দল ভাঙিয়ে সেই সরকার ফেলে দিয়ে নিজেদের সরকার গঠন করে। সেই দল ভাঙানোর খেলায় বিজেপিকে মদদ দেওয়ার পুরষ্কার হিসেবে ভারতের মন্ত্রী হয়েছেন প্রাক্তন কংগ্রেসি জ্যোতিরাদিত্য সিন্ধিয়া।
২০১৯ সালে অবশ্য মহারাষ্ট্রে অন্য খেলা দেখা গিয়েছিল। বিজেপি ও শিব সেনা জোট বেঁধে নির্বাচনে নামে। ২৮৮ সদস্যের রাজ্য বিধানসভায় ১০৫টি আসন পায় বিজেপি। শিব সেনা পায় ১২৬টি। মুখ্যমন্ত্রিত্ব নিয়ে বিরোধ দেখা দিতেই শিবসেনা কংগ্রেস ও এনসিপির সঙ্গে জোট বেঁধে সরকার গঠন করে। পরবর্তীকালে শিবসেনা ও এনসিপি ভেঙে নতুন সরকার গঠন করে বিজেপি বদলা নেয়। বুঝিয়ে দেয় জোট রাজনীতিতেও নীতি-আদর্শ বড় ঠুনকো!
সর্বভারতীয় রাজনীতিতে জোটের জটিলতা বহুবার দেখা গিয়েছে। কংগ্রেস আর বিজেপি–এই দুটি প্রধান রাজনৈতিক শক্তি হলেও অতীতে বহুবার জোটকেই ভরসা করেছে ভোটের ফলাফল। তবে সেইসব সরকারের স্থায়িত্ব খুবই কম ছিল। প্রয়াত প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ীর প্রথম মন্ত্রিসভা টিকেছিল মাত্র ১৩ দিন। জোটের জটিলতায় মোরারজি দেশাই, চৌধুরি চরণ সিং, বিশ্বনাথ প্রতাপ সিং, চন্দ্রশেখর, এইচডি দেবগৌড়া ও আইকে গুজরালরা কেউই পূর্ণ মেয়াদে সরকার চালাতে পারেননি। আবার সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেয়েও পিভি নরসিমা রাও, মনমোহন সিং সক্ষম হয়েছেন পূর্ণ মেয়াদে সরকার চালাতে। পশ্চিমবঙ্গে ৩৪ বছর বামফ্রন্টও চলেছে জোটের ভরসাতেই। কিন্তু ইদানীং দলবদলের মতোই জোট বদলও হয়ে উঠেছে সহজলভ্য।
সামনেই যে নির্বাচন, সেখানেও জোট নিয়ে বিচিত্র ছবি ফুটে উঠছে। পশ্চিমবঙ্গে হবে চতুর্মুখী লড়াই। তৃণমূল, বিজেপি, বামদলগুলো এবং কংগ্রেস লড়ছে এখানে। আসামে কংগ্রেসের জোটসঙ্গী বামেরা। কেরলমে (কেরালার নতুন নাম) আবার মূল লড়াই বামেদের সঙ্গে কংগ্রেসের। আবার সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে বিজেপির বিরুদ্ধে কংগ্রেস, বাম, তৃণমূল–সবাই একজোট। সেই পুরনো স্লোগান–দিল্লিতে দোস্তি, রাজ্যে রাজ্যে কুস্তি! নীতির রং ফিকে হয়ে যাচ্ছে আরও।
প্রশ্ন উঠছে, ক্ষমতাই কি নেতাদের একমাত্র লক্ষ্য? নীতি-নৈতিকতা এই সব সাবেকিয়ানা, এখন চাই শুধু ক্ষমতা ও প্রতিপত্তি? ধর্ম বা রাজনীতি সবই কি উহ্য? মানুষও কি দান-খয়রাতিতেই অভ্যস্ত? দলবদলুরাও ভোটে জেতেন, সমাজও কি আদর্শচ্যুত? এভাবেই চলবে গণতন্ত্রের চোরাগলি? এটাই ভবিতব্য?
লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক, কলকাতা (ভারত)

ভোট আসে, ভোট যায়। সঙ্গে বদলায় রাজনৈতিক চরিত্রের রংও। ভারতীয় রাজনীতিতে দলবদল এখন জলভাত। দলবদলুদের নিয়ে কোনো মাথাব্যাথা নেই সাধারণ মানুষেরও। কারণ ভোটের আগে এবং ভোটের পরে দলবদলটাই হয়ে উঠেছে ভবিতব্য। রাজনৈতিক আদর্শের কোনো বালাই নেই। জাতীয় দল থেকে আঞ্চলিক দল, আবার আঞ্চলিক দল থেকে জাতীয় দলে যাওয়া-আসাতেও নেই কোনো চমক। প্রয়াত প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী ঘটা করে দলত্যাগ বিরোধী আইন করলেও সেই আইনের ফাঁক গলে মুড়ি-মুড়কির মতো চলছে দলবদল। আগে তবু ‘দলবদলু’ বলে একটা গালি চালু ছিল। এখন সেটাও জৌলুস হারিয়েছে।
সামনেই ভারতের পশ্চিমবঙ্গসহ পাঁচ রাজ্যে বিধানসভা ভোট। সেই ভোটের আগে যথারীতি দলবদল শুরু হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে এবারের দলবদলে সবচেয়ে বেশি চর্চায় আছেন প্রতীক উর রহমান। তিনি সিপিএম ছেড়ে তৃণমূলে যোগ দিয়েছেন। এতকাল সিপিএমের হয়ে মমতা ব্যানার্জির নেতৃত্বাধীন তৃণমূলের বিরুদ্ধে গলা ফাটালেও এখন শাসক দলের হয়ে প্রচারে ব্যস্ত। সঙ্গে কাঁসর বাজাচ্ছেন, ‘সিপিএমে গণতন্ত্র নেই’, ‘দলে গোষ্ঠীবাজি চলছে’, ‘বিজেপিকে ঠেকাতে তৃণমূলই ভরসা’ ইত্যাদি। তৃণমূল তাকে নিয়ে ধন্য ধন্য করলেও বিজেপি ও সিপিএমের তরফে ধেয়ে আসছে কটাক্ষও। আদর্শ নিয়েও কচকচানি চলছে। কিন্তু আদর্শের কি কোনো বালাই আদৌ আছে?
ভারতীয় রাজনীতিতে দলবদলের কাণ্ডকারখানা দেখলে আদর্শের কোনো বালাইকে খুঁজে পাওয়া যায় না। এই তো সেদিনও তৃণমূলকে গাল দিয়ে যারা বিজেপির হাত ধরেছিলেন, তারাই আবার ফিরে এলেন তৃণমূলে। আজ বিজেপি সাম্প্রদায়িক, তৃণমূল দুর্নীতিগ্রস্ত; তো কাল উল্টোটা। কে কবে কী বলছেন শত ঝামেলায় তা আর কেই-বা মনে রাখে! নেতাদের চাহিদা মূলত দুটি, এক ভোটে নমিনেশন এবং জয়ের নিশ্চয়তা। জয় পেলে মন্ত্রিত্ব বা সরকারি সুবিধা। ইদানীং অবশ্য অতিরিক্ত হিসেবে জেল খাটা থেকে রেহাইয়ের পাকা বন্দোবস্তও চাইছেন অনেকে। যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোয় এই জেলখাটা থেকে মুক্তির অপর নাম ‘ওয়াশিংমেশিন’। বুঝলেন? ওয়াশিংমেশিন যেমন পোশাকের সব ময়লা দূর করে, ঠিক তেমনি শাসক দলে গেলেই দুর্নীতির নোংরা দাগ উঠে যায়! তাই ওয়াশিংমেশিনের চাহিদাও তুঙ্গে।
২০২১ সালে ভোটের আগে দলবদলের জোয়ার আসে পশ্চিমবঙ্গে। তৃণমূল দলের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা, সদ্য প্রয়াত মুকুল রায় সদলবলে চলে যান বিজেপিতে। বর্তমান বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীও সেই পথেরই পথিক ছিলেন। বহুকাল বিজেপিকে সাম্প্রদায়িক বলে গালি দিলেও দল বদলাতে অসুবিধা হয়নি তাদের। কিন্তু ভোটে বিজেপি হারতেই অনেকেই ফিরে আসেন তৃণমূলে। মুকুল রায়ও ফিরে আসেন। বিজেপির প্রতীকে জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হয়েও তিনি দলবদল করেন সদস্য পদ না ছেড়েই। কেউ কেউ অবশ্য নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির পদ ছেড়েও দলবদল করেছেন। আবার গাছের ও তলার খাওয়ার উদাহরণ কম নেই! আসামেও একই ছবি দেখা গেছে। সে যা হোক ২৯৪ সদস্যের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় দলবদলের হাত ধরে বিজেপির শক্তি ৭৭ থেকে কমে হয়েছে ৬৪, আর তৃণমূলের ২১৩ থেকে ২২৪।
অথচ ভারতে রয়েছে দলত্যাগ-বিরোধী আইন। সেই আইনে বলা হয়েছে এক-তৃতীয়াংশ দলীয় জনপ্রতিনিধির সমর্থন ছাড়া দলত্যাগ বা দলের হুইপ-বিরোধী অবস্থানে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির সদস্য পদ খারিজ হয়ে যাবে। কিন্তু সেই আইনের ফাঁক সবসময়ই থাকে শাসক দলের অনুকূলে। তাই ফাঁক গলতে অসুবিধা হয় না কারও। দিব্যি চলছে দলবদলুদের অবাধ চলাফেরা। ফলে কংগ্রেস ক্ষমতা থেকে অনেক দূরে থাকলেও বহু রাজ্যেই প্রাক্তন কংগ্রেসিরাই মুখ্যমন্ত্রীর কুর্সিতে!
নেতাদের আয়ারাম, গয়ারামের খুব ভালো দুটি ছবি ধরা পড়ে ২০১৭ সালে মণিপুর ও গোয়ায়। ৬০ সদস্যের মণিপুর বিধানসভায় কংগ্রেস জিতেছিল ২৮টি আসনে এবং বিজেপি ২১টিতে। কিন্তু সরকার গঠন করে বিজেপি। দিল্লির শক্তিকে কাজে লাগিয়ে ব্যাপক দলবদল ঘটিয়ে এবং ছোটখাটো দলগুলোকে সঙ্গে নিয়ে মণিপুরে তারা ক্ষমতায় আসে। ভোটের আগেই অবশ্য এন বীরেন সিংকে কংগ্রেস থেকে ছাড়িয়ে নিজেদের দলে নিয়ে এসেছিলেন বিজেপি নেতারা। অনেকটা আসামের স্টাইলে। আসামে ২০১৪ সালে হিমন্ত বিশ্বশর্মাকে কংগ্রেস থেকে ছাড়িয়ে বিজেপিতে নিয়ে আসা হয়। তার আগে হিমন্তের বিরুদ্ধে প্রচুর দুর্নীতির অভিযোগ তুলে জমি তৈরি করেছিল বিজেপি। তদন্তও শুরু হয়েছিল। কিন্তু ওয়াশিং মেশিন চিনতে ভুল করেননি হিমন্ত। বিজেপিও সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে গোটা উত্তর পূর্বাঞ্চলে কংগ্রেস ভাঙিয়ে নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করে। এখন উত্তর-পূর্ব ভারতের আট রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীই প্রাক্তন কংগ্রেসি।
গোয়াতেও চমক ছিল ২০১৭ সালে। ৪০ সদস্যের বিধানসভায় কংগ্রেস জেতে ১৭টি আসনে এবং বিজেপি ১৩টিতে। ছোটখাটো দলগুলি কংগ্রেসকে সমর্থন দিতে প্রস্তুত ছিল। কিন্তু দল ভাঙানোর খেলায় পারদর্শী বিজেপি সরকার গঠন করে গোয়াতেও। সেই একই ফর্মুলায় মধ্যপ্রদেশের নির্বাচিত কংগ্রেসের সরকার ফেলে দেয় বিজেপি। কমল নাথের নেতৃত্বে মধ্যপ্রদেশের ভোটে কংগ্রেস জিতেছিল। কিন্তু বিজেপি দল ভাঙিয়ে সেই সরকার ফেলে দিয়ে নিজেদের সরকার গঠন করে। সেই দল ভাঙানোর খেলায় বিজেপিকে মদদ দেওয়ার পুরষ্কার হিসেবে ভারতের মন্ত্রী হয়েছেন প্রাক্তন কংগ্রেসি জ্যোতিরাদিত্য সিন্ধিয়া।
২০১৯ সালে অবশ্য মহারাষ্ট্রে অন্য খেলা দেখা গিয়েছিল। বিজেপি ও শিব সেনা জোট বেঁধে নির্বাচনে নামে। ২৮৮ সদস্যের রাজ্য বিধানসভায় ১০৫টি আসন পায় বিজেপি। শিব সেনা পায় ১২৬টি। মুখ্যমন্ত্রিত্ব নিয়ে বিরোধ দেখা দিতেই শিবসেনা কংগ্রেস ও এনসিপির সঙ্গে জোট বেঁধে সরকার গঠন করে। পরবর্তীকালে শিবসেনা ও এনসিপি ভেঙে নতুন সরকার গঠন করে বিজেপি বদলা নেয়। বুঝিয়ে দেয় জোট রাজনীতিতেও নীতি-আদর্শ বড় ঠুনকো!
সর্বভারতীয় রাজনীতিতে জোটের জটিলতা বহুবার দেখা গিয়েছে। কংগ্রেস আর বিজেপি–এই দুটি প্রধান রাজনৈতিক শক্তি হলেও অতীতে বহুবার জোটকেই ভরসা করেছে ভোটের ফলাফল। তবে সেইসব সরকারের স্থায়িত্ব খুবই কম ছিল। প্রয়াত প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ীর প্রথম মন্ত্রিসভা টিকেছিল মাত্র ১৩ দিন। জোটের জটিলতায় মোরারজি দেশাই, চৌধুরি চরণ সিং, বিশ্বনাথ প্রতাপ সিং, চন্দ্রশেখর, এইচডি দেবগৌড়া ও আইকে গুজরালরা কেউই পূর্ণ মেয়াদে সরকার চালাতে পারেননি। আবার সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেয়েও পিভি নরসিমা রাও, মনমোহন সিং সক্ষম হয়েছেন পূর্ণ মেয়াদে সরকার চালাতে। পশ্চিমবঙ্গে ৩৪ বছর বামফ্রন্টও চলেছে জোটের ভরসাতেই। কিন্তু ইদানীং দলবদলের মতোই জোট বদলও হয়ে উঠেছে সহজলভ্য।
সামনেই যে নির্বাচন, সেখানেও জোট নিয়ে বিচিত্র ছবি ফুটে উঠছে। পশ্চিমবঙ্গে হবে চতুর্মুখী লড়াই। তৃণমূল, বিজেপি, বামদলগুলো এবং কংগ্রেস লড়ছে এখানে। আসামে কংগ্রেসের জোটসঙ্গী বামেরা। কেরলমে (কেরালার নতুন নাম) আবার মূল লড়াই বামেদের সঙ্গে কংগ্রেসের। আবার সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে বিজেপির বিরুদ্ধে কংগ্রেস, বাম, তৃণমূল–সবাই একজোট। সেই পুরনো স্লোগান–দিল্লিতে দোস্তি, রাজ্যে রাজ্যে কুস্তি! নীতির রং ফিকে হয়ে যাচ্ছে আরও।
প্রশ্ন উঠছে, ক্ষমতাই কি নেতাদের একমাত্র লক্ষ্য? নীতি-নৈতিকতা এই সব সাবেকিয়ানা, এখন চাই শুধু ক্ষমতা ও প্রতিপত্তি? ধর্ম বা রাজনীতি সবই কি উহ্য? মানুষও কি দান-খয়রাতিতেই অভ্যস্ত? দলবদলুরাও ভোটে জেতেন, সমাজও কি আদর্শচ্যুত? এভাবেই চলবে গণতন্ত্রের চোরাগলি? এটাই ভবিতব্য?
লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক, কলকাতা (ভারত)