সাইরুল ইসলাম

একবিংশ শতাব্দীর শুরুতে আফগানিস্তান ও ইরাকে মার্কিন হস্তক্ষেপের যে চিত্র বিশ্ব দেখেছিল, ২০২৬ সালে এসে ভেনেজুয়েলায় ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক পদক্ষেপ সেই স্মৃতিকেই উসকে দিচ্ছে। গত শনিবার ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে এক ঝটিকা অভিযান চালিয়ে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করেছে মার্কিন স্পেশাল ফোর্স।
ট্রাম্প এই অভিযানকে ‘নিখুঁত’ বলে দাবি করলেও আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা একে দেখছেন এক ‘বিপজ্জনক জুয়া’ হিসেবে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্স বলছে, শনিবারের এই অভিযানে মার্কিন বিমান হামলা ও নৌবাহিনীর সহায়তায় বিশেষ বাহিনী কারাকাসে প্রবেশ করে মাদুরোকে নিজেদের হেফাজতে নেয়। পেন্টাগন জানিয়েছে, এই অভিযানে কোনো মার্কিন সেনার মৃত্যু হয়নি। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প একে তার শক্তির প্রকাশ হিসেবে উদযাপন করছেন।
তবে নির্বাচনী প্রচারণায় বারবার ‘অন্তহীন যুদ্ধ’ বন্ধের প্রতিশ্রুতি দেওয়া ট্রাম্পের এই আকস্মিক সামরিক হস্তক্ষেপ তার নিজের সমর্থকদের মধ্যেই প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। আর মনে করিয়ে দিচ্ছে আমেরিকার এক ‘লজ্জাজনক’ ইতিহাস।
ইতিহাসের শিক্ষা
সংবাদমাধ্যম ফরেন পলিসি বলছে, ভেনেজুয়েলায় সাম্প্রতিক মার্কিন অভিযানের পর বিশ্বজুড়ে আবারও আলোচনায় এসেছে আমেরিকার ‘রেজিম চেঞ্জ’ বা শাসন পরিবর্তনের রাজনীতি। ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মার্কিন হস্তক্ষেপের পর সংশ্লিষ্ট দেশগুলো দীর্ঘমেয়াদী অস্থিতিশীলতা ও সংকটে পড়েছে।
আমেরিকা যে দেশগুলোতে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে হস্তক্ষেপ করেছে, তাদের পরিণতির একটি সংক্ষিপ্ত চিত্র নিচে দেওয়া হলো–
আফগানিস্তান (২০০১-২০২১): দীর্ঘ ২০ বছরের যুদ্ধের পর প্রায় ২.৩ ট্রিলিয়ন ডলার খরচ করেও দেশটিতে টেকসই গণতন্ত্র ফেরাতে ব্যর্থ হয়েছে আমেরিকা। আমেরিকার বিদায়ের পর মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যে তালেবানরা আবারও ক্ষমতায় ফিরে আসে, যার ফলে দেশটির সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা এবং অধিকার চরম সংকটের মুখে পড়েছে।

ইরাক (২০০৩-২০১১): সাদ্দাম হোসেনকে হটাতে মার্কিন অভিযান দেশটিকে এক ভয়াবহ গৃহযুদ্ধের দিকে ঠেলে দেয়। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো ভেঙে পড়ার ফলে সেখানে আইএসের মতো উগ্রবাদী গোষ্ঠীর উত্থান ঘটে। বর্তমানে দেশটি আঞ্চলিক শক্তির প্রভাবে বিভক্ত এবং দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
লিবিয়া (২০১১): মোয়াম্মর গাদ্দাফিকে ক্ষমতাচ্যুত করার জন্য মার্কিন নেতৃত্বাধীন ন্যাটোর হস্তক্ষেপ দেশটিকে একটি ‘ব্যর্থ রাষ্ট্রে’ পরিণত করেছে। আজও সেখানে কোনো একক কার্যকর সরকার নেই এবং দেশটি গৃহযুদ্ধ ও শরণার্থী সংকটে জর্জরিত।
পানামা (১৯৮৯): মাদক পাচারের অভিযোগে প্রেসিডেন্ট ম্যানুয়েল নরিয়েগাকে আটক করতে আমেরিকা সরাসরি হামলা চালায়। নরিয়েগাকে ক্ষমতাচ্যুত করা সম্ভব হলেও এই হামলা আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হয় এবং দেশটির সার্বভৌমত্ব মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
গুয়াতেমালা ও চিলি (১৯৫৪ ও ১৯৭৩): স্নায়ুযুদ্ধের সময় নির্বাচিত বামপন্থী সরকারকে হটাতে সিআইএর মদতপুষ্ট অভ্যুত্থান এই দেশগুলোতে কয়েক দশকের রক্তক্ষয়ী সামরিক স্বৈরশাসন উপহার দিয়েছিল। চিলিতে অগাস্টো পিনোচেটের শাসনকাল ছিল দেশটির ইতিহাসের সবচেয়ে অন্ধকার অধ্যায়।
বিশ্লেষকদের মতে, আফগানিস্তানে হামিদ কারজাইয়ের মতো পুতুল সরকার বসানোর মার্কিন চেষ্টা শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়েছে। কারজাই একসময় মার্কিন সরকারের প্রতি তীব্র ক্ষোভ ঝেড়ে বলেছিলেন, “আমেরিকান জনগণের প্রতি আমার কৃতজ্ঞতা থাকলেও, তাদের সরকারের প্রতি রয়েছে চরম ঘৃণা।”
আমেরিকার হাত, যেন মরণফাঁদ?
গত ১২০ বছরে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের প্রায় ৩৫ জন রাষ্ট্রপ্রধানকে ক্ষমতাচ্যুত করেছে। পরিসংখ্যান বলছে, এ ধরনের বিদেশি মদতপুষ্ট শাসন পরিবর্তনের ফলে এক-তৃতীয়াংশ দেশেই এক দশকের মধ্যে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়।

ভেনেজুয়েলায় মাদুরোকে সরিয়ে ট্রাম্প প্রশাসন সেখানে কী ধরনের সরকার গঠন করবে, তা এখনো অস্পষ্ট। ট্রাম্প মাদুরোকে একটি অপরাধী চক্রের প্রধান হিসেবে চিহ্নিত করে এই অভিযান বৈধ করার চেষ্টা করছেন। কিন্তু ইতিহাস বলছে, বল প্রয়োগ করে শাসন পরিবর্তন কখনোই দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা বয়ে আনেনি।
গুয়াতেমালা থেকে পানামা, আর এখন ভেনেজুয়েলা–ওয়াশিংটনের এই ‘রেজিম চেঞ্জ’ বা ক্ষমতা পরিবর্তনের রাজনীতি লাতিন আমেরিকায় নতুন কোনো রক্তক্ষয়ী সংঘাতের সূচনা করে কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ওয়াশিংটন কোনো দেশের সরকার পরিবর্তন করতে পারলেও দেশ গঠনের ক্ষেত্রে তাদের রেকর্ড অত্যন্ত নাজুক। ভেনেজুয়েলায় মাদুরোকে আটকের পর ট্রাম্প প্রশাসনের পরবর্তী পদক্ষেপ সেই একই ঐতিহাসিক ভুলের পুনরাবৃত্তি কি না, তা নিয়ে এখন বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ বাড়ছে। আর বিশ্বনেতারা ভাবছেন, তখন তাদের দেশে পড়ে আমেরিকার চোখ।

একবিংশ শতাব্দীর শুরুতে আফগানিস্তান ও ইরাকে মার্কিন হস্তক্ষেপের যে চিত্র বিশ্ব দেখেছিল, ২০২৬ সালে এসে ভেনেজুয়েলায় ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক পদক্ষেপ সেই স্মৃতিকেই উসকে দিচ্ছে। গত শনিবার ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে এক ঝটিকা অভিযান চালিয়ে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করেছে মার্কিন স্পেশাল ফোর্স।
ট্রাম্প এই অভিযানকে ‘নিখুঁত’ বলে দাবি করলেও আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা একে দেখছেন এক ‘বিপজ্জনক জুয়া’ হিসেবে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্স বলছে, শনিবারের এই অভিযানে মার্কিন বিমান হামলা ও নৌবাহিনীর সহায়তায় বিশেষ বাহিনী কারাকাসে প্রবেশ করে মাদুরোকে নিজেদের হেফাজতে নেয়। পেন্টাগন জানিয়েছে, এই অভিযানে কোনো মার্কিন সেনার মৃত্যু হয়নি। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প একে তার শক্তির প্রকাশ হিসেবে উদযাপন করছেন।
তবে নির্বাচনী প্রচারণায় বারবার ‘অন্তহীন যুদ্ধ’ বন্ধের প্রতিশ্রুতি দেওয়া ট্রাম্পের এই আকস্মিক সামরিক হস্তক্ষেপ তার নিজের সমর্থকদের মধ্যেই প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। আর মনে করিয়ে দিচ্ছে আমেরিকার এক ‘লজ্জাজনক’ ইতিহাস।
ইতিহাসের শিক্ষা
সংবাদমাধ্যম ফরেন পলিসি বলছে, ভেনেজুয়েলায় সাম্প্রতিক মার্কিন অভিযানের পর বিশ্বজুড়ে আবারও আলোচনায় এসেছে আমেরিকার ‘রেজিম চেঞ্জ’ বা শাসন পরিবর্তনের রাজনীতি। ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মার্কিন হস্তক্ষেপের পর সংশ্লিষ্ট দেশগুলো দীর্ঘমেয়াদী অস্থিতিশীলতা ও সংকটে পড়েছে।
আমেরিকা যে দেশগুলোতে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে হস্তক্ষেপ করেছে, তাদের পরিণতির একটি সংক্ষিপ্ত চিত্র নিচে দেওয়া হলো–
আফগানিস্তান (২০০১-২০২১): দীর্ঘ ২০ বছরের যুদ্ধের পর প্রায় ২.৩ ট্রিলিয়ন ডলার খরচ করেও দেশটিতে টেকসই গণতন্ত্র ফেরাতে ব্যর্থ হয়েছে আমেরিকা। আমেরিকার বিদায়ের পর মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যে তালেবানরা আবারও ক্ষমতায় ফিরে আসে, যার ফলে দেশটির সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা এবং অধিকার চরম সংকটের মুখে পড়েছে।

ইরাক (২০০৩-২০১১): সাদ্দাম হোসেনকে হটাতে মার্কিন অভিযান দেশটিকে এক ভয়াবহ গৃহযুদ্ধের দিকে ঠেলে দেয়। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো ভেঙে পড়ার ফলে সেখানে আইএসের মতো উগ্রবাদী গোষ্ঠীর উত্থান ঘটে। বর্তমানে দেশটি আঞ্চলিক শক্তির প্রভাবে বিভক্ত এবং দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
লিবিয়া (২০১১): মোয়াম্মর গাদ্দাফিকে ক্ষমতাচ্যুত করার জন্য মার্কিন নেতৃত্বাধীন ন্যাটোর হস্তক্ষেপ দেশটিকে একটি ‘ব্যর্থ রাষ্ট্রে’ পরিণত করেছে। আজও সেখানে কোনো একক কার্যকর সরকার নেই এবং দেশটি গৃহযুদ্ধ ও শরণার্থী সংকটে জর্জরিত।
পানামা (১৯৮৯): মাদক পাচারের অভিযোগে প্রেসিডেন্ট ম্যানুয়েল নরিয়েগাকে আটক করতে আমেরিকা সরাসরি হামলা চালায়। নরিয়েগাকে ক্ষমতাচ্যুত করা সম্ভব হলেও এই হামলা আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হয় এবং দেশটির সার্বভৌমত্ব মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
গুয়াতেমালা ও চিলি (১৯৫৪ ও ১৯৭৩): স্নায়ুযুদ্ধের সময় নির্বাচিত বামপন্থী সরকারকে হটাতে সিআইএর মদতপুষ্ট অভ্যুত্থান এই দেশগুলোতে কয়েক দশকের রক্তক্ষয়ী সামরিক স্বৈরশাসন উপহার দিয়েছিল। চিলিতে অগাস্টো পিনোচেটের শাসনকাল ছিল দেশটির ইতিহাসের সবচেয়ে অন্ধকার অধ্যায়।
বিশ্লেষকদের মতে, আফগানিস্তানে হামিদ কারজাইয়ের মতো পুতুল সরকার বসানোর মার্কিন চেষ্টা শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়েছে। কারজাই একসময় মার্কিন সরকারের প্রতি তীব্র ক্ষোভ ঝেড়ে বলেছিলেন, “আমেরিকান জনগণের প্রতি আমার কৃতজ্ঞতা থাকলেও, তাদের সরকারের প্রতি রয়েছে চরম ঘৃণা।”
আমেরিকার হাত, যেন মরণফাঁদ?
গত ১২০ বছরে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের প্রায় ৩৫ জন রাষ্ট্রপ্রধানকে ক্ষমতাচ্যুত করেছে। পরিসংখ্যান বলছে, এ ধরনের বিদেশি মদতপুষ্ট শাসন পরিবর্তনের ফলে এক-তৃতীয়াংশ দেশেই এক দশকের মধ্যে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়।

ভেনেজুয়েলায় মাদুরোকে সরিয়ে ট্রাম্প প্রশাসন সেখানে কী ধরনের সরকার গঠন করবে, তা এখনো অস্পষ্ট। ট্রাম্প মাদুরোকে একটি অপরাধী চক্রের প্রধান হিসেবে চিহ্নিত করে এই অভিযান বৈধ করার চেষ্টা করছেন। কিন্তু ইতিহাস বলছে, বল প্রয়োগ করে শাসন পরিবর্তন কখনোই দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা বয়ে আনেনি।
গুয়াতেমালা থেকে পানামা, আর এখন ভেনেজুয়েলা–ওয়াশিংটনের এই ‘রেজিম চেঞ্জ’ বা ক্ষমতা পরিবর্তনের রাজনীতি লাতিন আমেরিকায় নতুন কোনো রক্তক্ষয়ী সংঘাতের সূচনা করে কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ওয়াশিংটন কোনো দেশের সরকার পরিবর্তন করতে পারলেও দেশ গঠনের ক্ষেত্রে তাদের রেকর্ড অত্যন্ত নাজুক। ভেনেজুয়েলায় মাদুরোকে আটকের পর ট্রাম্প প্রশাসনের পরবর্তী পদক্ষেপ সেই একই ঐতিহাসিক ভুলের পুনরাবৃত্তি কি না, তা নিয়ে এখন বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ বাড়ছে। আর বিশ্বনেতারা ভাবছেন, তখন তাদের দেশে পড়ে আমেরিকার চোখ।