চরচা ডেস্ক

খেজুরগাছ ঘেরা ধানখেতের ফাঁক গলে আঁকাবাঁকা গ্রামীণ পথের পর যমুনা নদী পেড়িয়ে নৌকায় প্রায় তিন ঘণ্টার দীর্ঘ যাত্রা। এই পথ পেরিয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) সার্ভেইলেন্স ইমিউনাইজেশন মেডিকেল অফিসার (এসআইএমও) তারিক মোহাম্মদ রেজা এবং সারিয়াকান্দি উপজেলার স্বাস্থ্য পরিদর্শক ইন-চার্জ সেরাজুম মনিরা পৌঁছান বগুড়ার হাতবাড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। সেদিন বিদ্যালয়টি পরিণত হয় একটি অস্থায়ী হাম–রুবেলা (এমআর) টিকাদান কেন্দ্রে।
তাদের লক্ষ্য একটাই—বাংলাদেশের ৬ মাস থেকে ৫ বছরের কম বয়সী প্রতিটি শিশুকে, অবস্থান যেখানেই হোক না কেন, হাম থেকে সুরক্ষার আওতায় আনা।
ডা. তারিক বলেন, “প্রতিটি শিশুরই সমান সুরক্ষা পাওয়ার অধিকার রয়েছে।” বিশ্বের সবচেয়ে দরিদ্র শিশুদের জন্য টিকা কিনতে সহায়তা প্রদানকারী সংস্থা গ্যাভি ও দ্য ভ্যাকসিন অ্যালায়েন্সের অর্থায়নে নিয়োজিত ৬১ জন ডব্লিউএইচওর এসআইএমও-এর একজন ডা. তারিক। তিনি সরকার পরিচালিত এই জরুরি কর্মসূচিতে কাজ করছেন।
ডা. তারিক বলেন, “দূরত্ব, ভৌগোলিক প্রতিবন্ধকতা বা যাতায়াতের সীমাবদ্ধতা–এসবের কোনোটিই নির্ধারণ করতে পারে না কে সুরক্ষা পাবে আর কে পাবে না।”
সম্প্রতি বাংলাদেশে ব্যাপক হারে বেড়েছে হামের প্রাদুর্ভাব। মার্চের মাঝামাঝি থেকে দ্রুত ছড়াতে শুরু করে সংক্রমণ। এরইমধ্যে দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ৫৯টিতে ছড়িয়ে পড়েছে। এরই মধ্যে হাম সন্দেহে মৃত্যু ছাড়িয়েছে ৪০০। যার মধ্যে ৫ বছরের কম বয়সী শিশুর সংখ্যাই বেশি।

ডব্লিউএইচওর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ৫ এপ্রিল দেশের ১৮টি জেলার ৩০টি উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ উপজেলায় টিকা দেওয়া শুরু হয়। ১২ এপ্রিল ঢাকা দক্ষিণ, ঢাকা উত্তর, ময়মনসিংহ ও বরিশাল সিটি করপোরেশন এলাকায় টিকা দেওয়া শুরু হয়। ২০ এপ্রিল থেকে সারা দেশের শহরে ও নগরে টিকা দেওয়া শুরু হয়। চলবে ২০ মে পর্যন্ত। টিকা ক্যাম্পেইনে ১ কোটি ৮০ লাখ ১৬ হাজার ৯১৪ জন শিশুকে টিকাদানের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
ডা. তারিক ও সেরাজুম মনিরার এই সফর সারাদেশে নিরাপদ ও মানসম্মত টিকাদান নিশ্চিতের চলমান প্রচেষ্টার অংশ।
টিকাকেন্দ্রে সেরাজুম মনিরা কখনো টেবিলের পাশে, কখনো রেজিস্টারের কাছে–নিয়মিত ঘুরে ঘুরে দেখছেন পুরো কার্যক্রম। টিকা সংরক্ষণ থেকে শুরু করে প্রয়োগের পদ্ধতি এবং প্রতিটি শিশুর তথ্য সঠিকভাবে নথিভুক্ত হচ্ছে কি না, সবকিছুর ওপরই তার সতর্ক নজর।
এক শিশুর টিকা কার্ড পরীক্ষা করতে করতে এই কর্মকর্তা বলেন, “আমি ২৫০টিরও বেশি টিকাকেন্দ্র তদারকি করি, যার মধ্যে অনেক দুর্গম চরাঞ্চলও রয়েছে। এই মানুষগুলোর পাশে থাকতে পেরে আমি গর্ববোধ করি।”
যমুনা নদীর বুকে গড়ে ওঠা হাতবাড়ি এমনই একটি চর। নিচু বালুচরের এই ভূখণ্ড বর্ষা এলে কখনো ডুবে যায় , আবার ভেঙেও যায়। ফলে এসব এলাকায় বসবাসকারী মানুষের জন্য স্বাস্থ্যসেবা পাওয়া হয়ে ওঠে কঠিন ও অনিশ্চিত।
হাতবাড়ির বাসিন্দা ১৮ বছর বয়সী শাব্বানার কাছে এই কর্মসূচি তার ১৪ মাস বয়সী কন্যার জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হয়ে এসেছে।

লাইনে দাঁড়িয়ে তিনি বলেন, “এই প্রথম সাদিকা হাম টিকা পাচ্ছে। ও যেন সুস্থ ও নিরাপদ থাকে, সে জন্যই নিয়ে এসেছি।”
২০ বছর বয়সী শাব্বানা জানান, তিনি প্রাদুর্ভাব সম্পর্কে জানতেন না। কেবল টিকাদানের আহ্বানই তার কানে পৌঁছেছিল।
চার বছর বয়সী মেয়ে মারিয়ামকে পাশে দাঁড় করিয়ে তিনি বলেন, “হামজনিত মৃত্যুর কথা জানতাম না। এখানে টেলিভিশন বা সংবাদমাধ্যম নেই। ঘোষণা শুনেই মেয়েকে টিকা দিতে নিয়ে এসেছি।”
একেকটি চর পেরিয়ে সুরক্ষা পৌঁছে দেওয়া
হাতবাড়িতে পর্যবেক্ষণ কার্যক্রম শেষ করে ডা. তারিক ও সেরাজুম মনিরা আবারও নৌকায় চড়ে রওনা দেন তাদের পরবর্তী গন্তব্যে। আধ ঘণ্টার যাত্রাশেষে তারা পৌঁছান দলিকা নামে পরিচিত আরেকটি চরে।
সেখানে দেখা যায়, ১৬ বছরের অভিজ্ঞতা সম্পন্ন স্বাস্থ্য সহকারী মো. আমিনুল ইসলাম দুপুরের গরমের মধ্যেই কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। তিনি প্রায় ১০ কিলোমিটার দক্ষিণে চালুয়াবাড়ি থেকে এসে এই কার্যক্রমে যুক্ত হয়েছেন।
সকালের শুরুতেই টিকাকেন্দ্রটি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে শিশুদের জন্য ভয়ের পরিবেশ কমানোর চেষ্টা করেন আমিনুল। মনিটরিং টিমকে তিনি বলেন, “প্রথমেই কেন্দ্রটি পরিষ্কার করেছি ও সাজিয়েছি, যাতে শিশুরা ভয় না পায়। এরপর টিকা কার্ড প্রস্তুত করে কাজ শুরু করি।”
পরিবারগুলোর কাছে বার্তা পৌঁছাতে তিনি মসজিদের মাইক ব্যবহার করেন। পুরো চরজুড়ে ঘোষণা দিয়ে মানুষকে কেন্দ্রে আসতে আহ্বান জানান। তিনি বলেন, সাড়া ছিল ভালো। সারা বিকেলই শিশুদের ভিড় ছিল।
রেজিস্টার দেখে আমিনুল বলেন, এই ওয়ার্ডে টিকা দেওয়ার জন্য ৪৫২টি শিশু রয়েছে। প্রয়োজনে তিনি অভিভাবকদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলেও টিকার গুরুত্ব বোঝান বলে জানান।
বিকেলের তাপমাত্রা কিছুটা কমে এলে ডা. তারিক ও সেরাজুম মনিরা নৌকার দিকে ফিরে যান। পথে বালুচরে শুকাতে দেওয়া ভুট্টা ও চিনাবাদামের স্তূপ আর আশপাশে চরে বেড়ানো গবাদিপশুর দৃশ্য চোখে পড়ে। নৌকাটি ধীরে ধীরে চরের ভেতর দিয়ে আঁকাবাঁকা পথে এগিয়ে চলে।
ডা. তারিক বলেন, “এখানে বসে মানুষের সেবাকেন্দ্রে আসার অপেক্ষা করলে হবে না, সেবাকেই মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। এভাবেই প্রাদুর্ভাব থামানো যায়। এভাবেই ভবিষ্যতের জন্য সুরক্ষা এবং সেবার সুযোগ তৈরি হয়।”

খেজুরগাছ ঘেরা ধানখেতের ফাঁক গলে আঁকাবাঁকা গ্রামীণ পথের পর যমুনা নদী পেড়িয়ে নৌকায় প্রায় তিন ঘণ্টার দীর্ঘ যাত্রা। এই পথ পেরিয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) সার্ভেইলেন্স ইমিউনাইজেশন মেডিকেল অফিসার (এসআইএমও) তারিক মোহাম্মদ রেজা এবং সারিয়াকান্দি উপজেলার স্বাস্থ্য পরিদর্শক ইন-চার্জ সেরাজুম মনিরা পৌঁছান বগুড়ার হাতবাড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। সেদিন বিদ্যালয়টি পরিণত হয় একটি অস্থায়ী হাম–রুবেলা (এমআর) টিকাদান কেন্দ্রে।
তাদের লক্ষ্য একটাই—বাংলাদেশের ৬ মাস থেকে ৫ বছরের কম বয়সী প্রতিটি শিশুকে, অবস্থান যেখানেই হোক না কেন, হাম থেকে সুরক্ষার আওতায় আনা।
ডা. তারিক বলেন, “প্রতিটি শিশুরই সমান সুরক্ষা পাওয়ার অধিকার রয়েছে।” বিশ্বের সবচেয়ে দরিদ্র শিশুদের জন্য টিকা কিনতে সহায়তা প্রদানকারী সংস্থা গ্যাভি ও দ্য ভ্যাকসিন অ্যালায়েন্সের অর্থায়নে নিয়োজিত ৬১ জন ডব্লিউএইচওর এসআইএমও-এর একজন ডা. তারিক। তিনি সরকার পরিচালিত এই জরুরি কর্মসূচিতে কাজ করছেন।
ডা. তারিক বলেন, “দূরত্ব, ভৌগোলিক প্রতিবন্ধকতা বা যাতায়াতের সীমাবদ্ধতা–এসবের কোনোটিই নির্ধারণ করতে পারে না কে সুরক্ষা পাবে আর কে পাবে না।”
সম্প্রতি বাংলাদেশে ব্যাপক হারে বেড়েছে হামের প্রাদুর্ভাব। মার্চের মাঝামাঝি থেকে দ্রুত ছড়াতে শুরু করে সংক্রমণ। এরইমধ্যে দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ৫৯টিতে ছড়িয়ে পড়েছে। এরই মধ্যে হাম সন্দেহে মৃত্যু ছাড়িয়েছে ৪০০। যার মধ্যে ৫ বছরের কম বয়সী শিশুর সংখ্যাই বেশি।

ডব্লিউএইচওর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ৫ এপ্রিল দেশের ১৮টি জেলার ৩০টি উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ উপজেলায় টিকা দেওয়া শুরু হয়। ১২ এপ্রিল ঢাকা দক্ষিণ, ঢাকা উত্তর, ময়মনসিংহ ও বরিশাল সিটি করপোরেশন এলাকায় টিকা দেওয়া শুরু হয়। ২০ এপ্রিল থেকে সারা দেশের শহরে ও নগরে টিকা দেওয়া শুরু হয়। চলবে ২০ মে পর্যন্ত। টিকা ক্যাম্পেইনে ১ কোটি ৮০ লাখ ১৬ হাজার ৯১৪ জন শিশুকে টিকাদানের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
ডা. তারিক ও সেরাজুম মনিরার এই সফর সারাদেশে নিরাপদ ও মানসম্মত টিকাদান নিশ্চিতের চলমান প্রচেষ্টার অংশ।
টিকাকেন্দ্রে সেরাজুম মনিরা কখনো টেবিলের পাশে, কখনো রেজিস্টারের কাছে–নিয়মিত ঘুরে ঘুরে দেখছেন পুরো কার্যক্রম। টিকা সংরক্ষণ থেকে শুরু করে প্রয়োগের পদ্ধতি এবং প্রতিটি শিশুর তথ্য সঠিকভাবে নথিভুক্ত হচ্ছে কি না, সবকিছুর ওপরই তার সতর্ক নজর।
এক শিশুর টিকা কার্ড পরীক্ষা করতে করতে এই কর্মকর্তা বলেন, “আমি ২৫০টিরও বেশি টিকাকেন্দ্র তদারকি করি, যার মধ্যে অনেক দুর্গম চরাঞ্চলও রয়েছে। এই মানুষগুলোর পাশে থাকতে পেরে আমি গর্ববোধ করি।”
যমুনা নদীর বুকে গড়ে ওঠা হাতবাড়ি এমনই একটি চর। নিচু বালুচরের এই ভূখণ্ড বর্ষা এলে কখনো ডুবে যায় , আবার ভেঙেও যায়। ফলে এসব এলাকায় বসবাসকারী মানুষের জন্য স্বাস্থ্যসেবা পাওয়া হয়ে ওঠে কঠিন ও অনিশ্চিত।
হাতবাড়ির বাসিন্দা ১৮ বছর বয়সী শাব্বানার কাছে এই কর্মসূচি তার ১৪ মাস বয়সী কন্যার জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হয়ে এসেছে।

লাইনে দাঁড়িয়ে তিনি বলেন, “এই প্রথম সাদিকা হাম টিকা পাচ্ছে। ও যেন সুস্থ ও নিরাপদ থাকে, সে জন্যই নিয়ে এসেছি।”
২০ বছর বয়সী শাব্বানা জানান, তিনি প্রাদুর্ভাব সম্পর্কে জানতেন না। কেবল টিকাদানের আহ্বানই তার কানে পৌঁছেছিল।
চার বছর বয়সী মেয়ে মারিয়ামকে পাশে দাঁড় করিয়ে তিনি বলেন, “হামজনিত মৃত্যুর কথা জানতাম না। এখানে টেলিভিশন বা সংবাদমাধ্যম নেই। ঘোষণা শুনেই মেয়েকে টিকা দিতে নিয়ে এসেছি।”
একেকটি চর পেরিয়ে সুরক্ষা পৌঁছে দেওয়া
হাতবাড়িতে পর্যবেক্ষণ কার্যক্রম শেষ করে ডা. তারিক ও সেরাজুম মনিরা আবারও নৌকায় চড়ে রওনা দেন তাদের পরবর্তী গন্তব্যে। আধ ঘণ্টার যাত্রাশেষে তারা পৌঁছান দলিকা নামে পরিচিত আরেকটি চরে।
সেখানে দেখা যায়, ১৬ বছরের অভিজ্ঞতা সম্পন্ন স্বাস্থ্য সহকারী মো. আমিনুল ইসলাম দুপুরের গরমের মধ্যেই কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। তিনি প্রায় ১০ কিলোমিটার দক্ষিণে চালুয়াবাড়ি থেকে এসে এই কার্যক্রমে যুক্ত হয়েছেন।
সকালের শুরুতেই টিকাকেন্দ্রটি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে শিশুদের জন্য ভয়ের পরিবেশ কমানোর চেষ্টা করেন আমিনুল। মনিটরিং টিমকে তিনি বলেন, “প্রথমেই কেন্দ্রটি পরিষ্কার করেছি ও সাজিয়েছি, যাতে শিশুরা ভয় না পায়। এরপর টিকা কার্ড প্রস্তুত করে কাজ শুরু করি।”
পরিবারগুলোর কাছে বার্তা পৌঁছাতে তিনি মসজিদের মাইক ব্যবহার করেন। পুরো চরজুড়ে ঘোষণা দিয়ে মানুষকে কেন্দ্রে আসতে আহ্বান জানান। তিনি বলেন, সাড়া ছিল ভালো। সারা বিকেলই শিশুদের ভিড় ছিল।
রেজিস্টার দেখে আমিনুল বলেন, এই ওয়ার্ডে টিকা দেওয়ার জন্য ৪৫২টি শিশু রয়েছে। প্রয়োজনে তিনি অভিভাবকদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলেও টিকার গুরুত্ব বোঝান বলে জানান।
বিকেলের তাপমাত্রা কিছুটা কমে এলে ডা. তারিক ও সেরাজুম মনিরা নৌকার দিকে ফিরে যান। পথে বালুচরে শুকাতে দেওয়া ভুট্টা ও চিনাবাদামের স্তূপ আর আশপাশে চরে বেড়ানো গবাদিপশুর দৃশ্য চোখে পড়ে। নৌকাটি ধীরে ধীরে চরের ভেতর দিয়ে আঁকাবাঁকা পথে এগিয়ে চলে।
ডা. তারিক বলেন, “এখানে বসে মানুষের সেবাকেন্দ্রে আসার অপেক্ষা করলে হবে না, সেবাকেই মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। এভাবেই প্রাদুর্ভাব থামানো যায়। এভাবেই ভবিষ্যতের জন্য সুরক্ষা এবং সেবার সুযোগ তৈরি হয়।”