তাসীন মল্লিক

‘জুলাই জাতীয় সনদ’ বাস্তবায়ন জাতীয় সংসদে এক জটিল ও বহুস্তরীয় বিতর্কে পরিণত হয়েছে। ঠিক ছয় মাস আগে সনদটি প্রণয়ন এবং বাস্তবায়ন পদ্ধতি নিয়ে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনেও ছিল একই চিত্র। সনদের আইনি বৈধতা এবং বাস্তবায়নের পথ নিয়ে মতপার্থক্য নানা পথ ঘুরে শেষমেশ যেন আবার একই বিন্দুতে এসে পৌঁছেছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে স্পষ্ট সমাধানের পথ এখনো দেখা যাচ্ছে না। একদিকে সরকার সংবিধানসম্মত প্রক্রিয়ার ওপর জোর দিচ্ছে, অন্যদিকে বিরোধীরা গণভোট ও পূর্বনির্ধারিত কাঠামোর বাস্তবায়ন চাইছে। এই দুই অবস্থানের মধ্যে সমন্বয় না হলে সংকট আরো গভীর হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ঐকমত্য কমিশনের ধারণা মূলত সমন্বয়ের জন্যই সামনে এসেছিল। কিন্তু এখন সেটিই বিতর্কের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে–এই ঐকমত্য আদৌ বাস্তবায়নের পথে ফিরে আসবে, নাকি রাজনৈতিক ও আইনি দ্বন্দ্বের ভেতরেই আটকে থাকবে?
সনদ বাস্তবায়ন বিতর্ক: এদিন এবং সেদিন
জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নকে ঘিরে রাজনৈতিক বিভাজন নতুন নয়। বরং ‘সেদিন’; অর্থাৎ, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় থেকে শুরু হওয়া মতভিন্নতা ‘এদিন’ সংসদের আলোচনায় এসে আরো স্পষ্ট রূপ নিয়েছে।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ক্ষমতায় বসা অন্তর্বর্তী সরকার রাষ্ট্র সংস্কারের পদক্ষেপ নেয়। গঠন করা হয় বিভিন্ন কমিশন। এসব কমিশনের সুপারিশ দেওয়ার পর সেগুলো নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোকে এক জায়গায় আনতে গঠন করা জাতীয় ঐকমত্য কমিশন।
দীর্ঘ এক বছরের আলোচনা, সংলাপ ও তর্কবিতর্কের পর রাষ্ট্র সংস্কারের উদ্যোগগুলো নিয়ে জুলাই জাতীয় সনদ চূড়ান্ত করা হয়, যা স্বাক্ষর হয় গত বছরের ১৭ অক্টোবর।
জুলাই জাতীয় সনদের সংবিধান সম্পর্কিত ৪৮টি সংস্কার প্রস্তাবের বাস্তবায়নের উপায় ঠিক করে দিয়ে গত ১৩ নভেম্বর ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ’ জারি করা হয়। সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়নের বিষয়ে জনগণের সম্মতি নিতে ১২ ফেব্রুয়ারি সংসদ নির্বাচনের দিনই হয় গণভোট।
গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হওয়ায় ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ’ অনুযায়ী, সংসদ সদস্যদের সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবেও ভূমিকা রাখার কথা। সংসদের মতোই সংসদ নির্বাচনের ফল ঘোষিত হওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে পরিষদের প্রথম অধিবেশন ডাকার কথা।
নির্বাচনে জয়ীরা একই দিনে সংসদ সদস্য ও সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে দুটি শপথ নেওয়ার কথা ছিল। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি সে প্রস্তুতি রেখেছিল সংসদ সচিবালয়।
জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) বিরোধী দলের সদস্যরা সেদিন দুটি শপথ নেন। তবে বিএনপির সংসদ সদস্যরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেননি। ফলে নির্ধারিত ৩০ দিন সময়ে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠিত হয়নি।
সংসদে বসার শুরু থেকেই বিরোধী জোট বিষয়টি নিয়ে সোচ্চার। ঐকমত্য কমিশনে যে বিতর্ক ছিল, সেটিই ‘এদিন’; অর্থাৎ, গত ৩১ মার্চ সংসদে বিরোধী দলের মুলতবি প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হয়। সরকারি দল বিএনপি তাদের আগের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে বলেছে, নোট অব ডিসেন্টসহ যেভাবে সনদে সই হয়েছে, তা অক্ষরে অক্ষরে মেনে সংসদের নিয়মিত প্রক্রিয়ায় সংবিধান সংশোধন করা হবে।
সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এই প্রক্রিয়াকে বৈধতা দিয়ে সনদ বাস্তবায়ন আদেশকে ‘কালারেবল লেজিসলেশন’ হিসেবে আখ্যা দেন এবং সাংবিধানিক সংশোধনের মাধ্যমেই পরিবর্তনের কথা বলেন।
বিপরীতে বিরোধী দলগুলো–বিশেষত জামায়াত ও এনসিপি সংবিধানের কাঠামোগত সংস্কারের প্রশ্নে অনড় থেকে সংবিধান সংস্কার পরিষদের প্রয়োজনীয়তার কথা পুনরায় তুলে ধরে। তাদের যুক্তি, বিদ্যমান কাঠামোর মধ্যে সীমিত সংশোধন ফ্যাসিবাদী পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে যথেষ্ট নয়।
এভাবে দেখা যায়, ‘সেদিন’ যেখানে প্রক্রিয়া নির্ধারণের বিতর্ক ছিল, ‘এদিন’ তা রূপ নিয়েছে বৈধতা ও বাস্তবায়ন পদ্ধতির রাজনৈতিক দ্বন্দ্বে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ের মতভিন্নতা সংসদে এসে আরো প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে, কিন্তু সমাধান এখনো অধরা। ফলে জুলাই সনদ একটি ঐকমত্যের দলিল হয়েও বাস্তবায়নের প্রশ্নে বিভক্তির প্রতীক হয়ে রয়েছে।
সংসদীয় কমিটি বনাম সংস্কার পরিষদ
সরকারি দল সংবিধান সংশোধনে একটি বিশেষ সংসদীয় কমিটি গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে। যেখানে সব রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিত্ব থাকবে। এই কমিটি আলোচনা করে সংবিধান সংশোধনের প্রস্তাব তৈরি করবে এবং তা সংসদে উত্থাপন করা হবে।
সরকারের মতে, এটি একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সাংবিধানিকভাবে বৈধ প্রক্রিয়া, যা রাজনৈতিক ঐকমত্যের ভিত্তিতে এগোতে পারে। কিন্তু বিরোধী দল এই প্রস্তাবকে যথেষ্ট মনে করছে না। তাদের দাবি, পূর্বনির্ধারিত সংবিধান সংস্কার পরিষদকে সক্রিয় না করে সংসদীয় কমিটির মাধ্যমে এগোনো হলে তা সনদের মূল কাঠামোকে দুর্বল করে ফেলবে।
ফলে এখানে দ্বন্দ্বটি শুধু প্রক্রিয়াগত নয়, বরং কাঠামোগত–কোন প্রতিষ্ঠান এই সংস্কার প্রক্রিয়া পরিচালনা করবে, তা নিয়েই বিরোধ তীব্র হচ্ছে।
তিন সমান্তরাল বাস্তবতায় আটকে প্রক্রিয়া
সব মিলিয়ে, জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন এখন তিনটি সমান্তরাল বাস্তবতায় আটকে আছে। প্রথমত, রাজনৈতিকভাবে প্রায় সব পক্ষ সনদের পক্ষে অবস্থান নিলেও আইনি ভিত্তি নিয়ে রয়েছে তীব্র মতবিরোধ।
দ্বিতীয়ত, গণভোট হলেও তার ফলাফলের কার্যকারিতা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
তৃতীয়ত, বাস্তব পদক্ষেপ হিসেবে সরকার যেখানে সংসদীয় সংশোধনের পথে এগোতে চায়, সেখানে বিরোধীরা পূর্বনির্ধারিত সংস্কার কাঠামো বাস্তবায়নের দাবিতে অনড়।

এই তিনটি স্তরের অমিলই ঐকমত্য কমিশনকে ঘিরে বিতর্ককে সংসদের কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। কারণ, যে ঐকমত্য একসময় একটি সম্ভাব্য সমাধানের পথ দেখাচ্ছিল, এখন তা ভিন্ন আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাখ্যার কারণে বিভক্ত হয়ে পড়েছে।
জুলাই জাতীয় সনদ অনুযায়ী রাষ্ট্র সংস্কারে অনুষ্ঠিত গণভোটের রায় বাস্তবায়নে সরকারকে চাপে রাখতে এবার দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক কর্মসূচির দিকে যাচ্ছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় ঐক্য। সনদ বাস্তাবায়নের দাবিতে আজ শনিবার সমাবেশ করেছে জোট। সমাবেশে জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান অভিযোগ করেছেন, ‘‘বার্তা পরিষ্কার। যেদিন তারা গণভোটের রায় অস্বীকার করেছেন, আমি বলেছিলাম, বিএনপি আজকে থেকে ফ্যাসিবাদের পথে যাত্রা শুরু করল। এটা ফ্যাসিবাদ।’’
অর্থাৎ, ঐকমত্য কমিশনের আলাপ সংসদ হয়ে এখন গড়িয়েছে রাজপথে। দুই পক্ষের এই ভিন্ন অবস্থান একটি সংঘাতময় রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি করছে। সংসদীয় প্রক্রিয়া ও রাজপথের চাপ–এই দুই সমান্তরাল পথ এখন মুখোমুখি অবস্থানে, যা ভবিষ্যতে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা আরো বাড়ানোর ইঙ্গিত দিচ্ছে।

‘জুলাই জাতীয় সনদ’ বাস্তবায়ন জাতীয় সংসদে এক জটিল ও বহুস্তরীয় বিতর্কে পরিণত হয়েছে। ঠিক ছয় মাস আগে সনদটি প্রণয়ন এবং বাস্তবায়ন পদ্ধতি নিয়ে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনেও ছিল একই চিত্র। সনদের আইনি বৈধতা এবং বাস্তবায়নের পথ নিয়ে মতপার্থক্য নানা পথ ঘুরে শেষমেশ যেন আবার একই বিন্দুতে এসে পৌঁছেছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে স্পষ্ট সমাধানের পথ এখনো দেখা যাচ্ছে না। একদিকে সরকার সংবিধানসম্মত প্রক্রিয়ার ওপর জোর দিচ্ছে, অন্যদিকে বিরোধীরা গণভোট ও পূর্বনির্ধারিত কাঠামোর বাস্তবায়ন চাইছে। এই দুই অবস্থানের মধ্যে সমন্বয় না হলে সংকট আরো গভীর হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ঐকমত্য কমিশনের ধারণা মূলত সমন্বয়ের জন্যই সামনে এসেছিল। কিন্তু এখন সেটিই বিতর্কের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে–এই ঐকমত্য আদৌ বাস্তবায়নের পথে ফিরে আসবে, নাকি রাজনৈতিক ও আইনি দ্বন্দ্বের ভেতরেই আটকে থাকবে?
সনদ বাস্তবায়ন বিতর্ক: এদিন এবং সেদিন
জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নকে ঘিরে রাজনৈতিক বিভাজন নতুন নয়। বরং ‘সেদিন’; অর্থাৎ, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় থেকে শুরু হওয়া মতভিন্নতা ‘এদিন’ সংসদের আলোচনায় এসে আরো স্পষ্ট রূপ নিয়েছে।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ক্ষমতায় বসা অন্তর্বর্তী সরকার রাষ্ট্র সংস্কারের পদক্ষেপ নেয়। গঠন করা হয় বিভিন্ন কমিশন। এসব কমিশনের সুপারিশ দেওয়ার পর সেগুলো নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোকে এক জায়গায় আনতে গঠন করা জাতীয় ঐকমত্য কমিশন।
দীর্ঘ এক বছরের আলোচনা, সংলাপ ও তর্কবিতর্কের পর রাষ্ট্র সংস্কারের উদ্যোগগুলো নিয়ে জুলাই জাতীয় সনদ চূড়ান্ত করা হয়, যা স্বাক্ষর হয় গত বছরের ১৭ অক্টোবর।
জুলাই জাতীয় সনদের সংবিধান সম্পর্কিত ৪৮টি সংস্কার প্রস্তাবের বাস্তবায়নের উপায় ঠিক করে দিয়ে গত ১৩ নভেম্বর ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ’ জারি করা হয়। সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়নের বিষয়ে জনগণের সম্মতি নিতে ১২ ফেব্রুয়ারি সংসদ নির্বাচনের দিনই হয় গণভোট।
গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হওয়ায় ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ’ অনুযায়ী, সংসদ সদস্যদের সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবেও ভূমিকা রাখার কথা। সংসদের মতোই সংসদ নির্বাচনের ফল ঘোষিত হওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে পরিষদের প্রথম অধিবেশন ডাকার কথা।
নির্বাচনে জয়ীরা একই দিনে সংসদ সদস্য ও সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে দুটি শপথ নেওয়ার কথা ছিল। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি সে প্রস্তুতি রেখেছিল সংসদ সচিবালয়।
জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) বিরোধী দলের সদস্যরা সেদিন দুটি শপথ নেন। তবে বিএনপির সংসদ সদস্যরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেননি। ফলে নির্ধারিত ৩০ দিন সময়ে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠিত হয়নি।
সংসদে বসার শুরু থেকেই বিরোধী জোট বিষয়টি নিয়ে সোচ্চার। ঐকমত্য কমিশনে যে বিতর্ক ছিল, সেটিই ‘এদিন’; অর্থাৎ, গত ৩১ মার্চ সংসদে বিরোধী দলের মুলতবি প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হয়। সরকারি দল বিএনপি তাদের আগের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে বলেছে, নোট অব ডিসেন্টসহ যেভাবে সনদে সই হয়েছে, তা অক্ষরে অক্ষরে মেনে সংসদের নিয়মিত প্রক্রিয়ায় সংবিধান সংশোধন করা হবে।
সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এই প্রক্রিয়াকে বৈধতা দিয়ে সনদ বাস্তবায়ন আদেশকে ‘কালারেবল লেজিসলেশন’ হিসেবে আখ্যা দেন এবং সাংবিধানিক সংশোধনের মাধ্যমেই পরিবর্তনের কথা বলেন।
বিপরীতে বিরোধী দলগুলো–বিশেষত জামায়াত ও এনসিপি সংবিধানের কাঠামোগত সংস্কারের প্রশ্নে অনড় থেকে সংবিধান সংস্কার পরিষদের প্রয়োজনীয়তার কথা পুনরায় তুলে ধরে। তাদের যুক্তি, বিদ্যমান কাঠামোর মধ্যে সীমিত সংশোধন ফ্যাসিবাদী পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে যথেষ্ট নয়।
এভাবে দেখা যায়, ‘সেদিন’ যেখানে প্রক্রিয়া নির্ধারণের বিতর্ক ছিল, ‘এদিন’ তা রূপ নিয়েছে বৈধতা ও বাস্তবায়ন পদ্ধতির রাজনৈতিক দ্বন্দ্বে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ের মতভিন্নতা সংসদে এসে আরো প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে, কিন্তু সমাধান এখনো অধরা। ফলে জুলাই সনদ একটি ঐকমত্যের দলিল হয়েও বাস্তবায়নের প্রশ্নে বিভক্তির প্রতীক হয়ে রয়েছে।
সংসদীয় কমিটি বনাম সংস্কার পরিষদ
সরকারি দল সংবিধান সংশোধনে একটি বিশেষ সংসদীয় কমিটি গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে। যেখানে সব রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিত্ব থাকবে। এই কমিটি আলোচনা করে সংবিধান সংশোধনের প্রস্তাব তৈরি করবে এবং তা সংসদে উত্থাপন করা হবে।
সরকারের মতে, এটি একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সাংবিধানিকভাবে বৈধ প্রক্রিয়া, যা রাজনৈতিক ঐকমত্যের ভিত্তিতে এগোতে পারে। কিন্তু বিরোধী দল এই প্রস্তাবকে যথেষ্ট মনে করছে না। তাদের দাবি, পূর্বনির্ধারিত সংবিধান সংস্কার পরিষদকে সক্রিয় না করে সংসদীয় কমিটির মাধ্যমে এগোনো হলে তা সনদের মূল কাঠামোকে দুর্বল করে ফেলবে।
ফলে এখানে দ্বন্দ্বটি শুধু প্রক্রিয়াগত নয়, বরং কাঠামোগত–কোন প্রতিষ্ঠান এই সংস্কার প্রক্রিয়া পরিচালনা করবে, তা নিয়েই বিরোধ তীব্র হচ্ছে।
তিন সমান্তরাল বাস্তবতায় আটকে প্রক্রিয়া
সব মিলিয়ে, জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন এখন তিনটি সমান্তরাল বাস্তবতায় আটকে আছে। প্রথমত, রাজনৈতিকভাবে প্রায় সব পক্ষ সনদের পক্ষে অবস্থান নিলেও আইনি ভিত্তি নিয়ে রয়েছে তীব্র মতবিরোধ।
দ্বিতীয়ত, গণভোট হলেও তার ফলাফলের কার্যকারিতা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
তৃতীয়ত, বাস্তব পদক্ষেপ হিসেবে সরকার যেখানে সংসদীয় সংশোধনের পথে এগোতে চায়, সেখানে বিরোধীরা পূর্বনির্ধারিত সংস্কার কাঠামো বাস্তবায়নের দাবিতে অনড়।

এই তিনটি স্তরের অমিলই ঐকমত্য কমিশনকে ঘিরে বিতর্ককে সংসদের কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। কারণ, যে ঐকমত্য একসময় একটি সম্ভাব্য সমাধানের পথ দেখাচ্ছিল, এখন তা ভিন্ন আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাখ্যার কারণে বিভক্ত হয়ে পড়েছে।
জুলাই জাতীয় সনদ অনুযায়ী রাষ্ট্র সংস্কারে অনুষ্ঠিত গণভোটের রায় বাস্তবায়নে সরকারকে চাপে রাখতে এবার দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক কর্মসূচির দিকে যাচ্ছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় ঐক্য। সনদ বাস্তাবায়নের দাবিতে আজ শনিবার সমাবেশ করেছে জোট। সমাবেশে জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান অভিযোগ করেছেন, ‘‘বার্তা পরিষ্কার। যেদিন তারা গণভোটের রায় অস্বীকার করেছেন, আমি বলেছিলাম, বিএনপি আজকে থেকে ফ্যাসিবাদের পথে যাত্রা শুরু করল। এটা ফ্যাসিবাদ।’’
অর্থাৎ, ঐকমত্য কমিশনের আলাপ সংসদ হয়ে এখন গড়িয়েছে রাজপথে। দুই পক্ষের এই ভিন্ন অবস্থান একটি সংঘাতময় রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি করছে। সংসদীয় প্রক্রিয়া ও রাজপথের চাপ–এই দুই সমান্তরাল পথ এখন মুখোমুখি অবস্থানে, যা ভবিষ্যতে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা আরো বাড়ানোর ইঙ্গিত দিচ্ছে।