এরদোয়ানের পর কে?

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
এরদোয়ানের পর কে?
রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ান। ছবি: রয়টার্স

তুরস্কের রাজধানী ইস্তাম্বুলের ঐতিহাসিক একটি সেতু গলাটা। এই সেতুটির নিচ দিয়ে বয়ে যাচ্ছে গোল্ডেন হর্ন। চলতি বছরের শুরুর দিন গাজার সমর্থনে আয়োজিত একটি পদযাত্রায় সেখানে বক্তব্য রেখেছেন চল্লিশোর্ধ্ব এক ব্যক্তি। তার গলায় ছিল একটি স্কার্ফ, যার এক পাশে তুরস্কের পতাকা, অন্য পাশে ফিলিস্তিনের।

বক্তৃতার ভাষা, হাতের ভঙ্গি, গম্ভীর অভিব্যক্তি সবকিছুই যেন পরিচিত। আর কথার বিষয়বস্তুও পরিচিত। তিনি ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে ‘একবিংশ শতাব্দীর হিটলার’ আখ্যা দিয়েছেন।

এই বক্তা আর কেউ নন। তিনি তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের কনিষ্ঠ পুত্র, বিলাল এরদোয়ান।

গত ১ জানুয়ারি গাজার সমর্থনে আয়োজিত সেই পদযাত্রা ছিল বিলাল এরদোয়ানের ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের আরেকটি উদাহরণ। আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো সরকারি পদে না থাকলেও, সাম্প্রতিক সময়ের নানা জনসভা, আন্তর্জাতিক আয়োজন এবং উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে তার উপস্থিতি নতুন করে প্রশ্ন তুলছে , তুরস্ক কি ধীরে ধীরে একটি সম্ভাব্য রাজনৈতিক উত্তরাধিকারীর দিকে এগোচ্ছে?

ব্রিটিশ সাময়িকী ইকোনমিস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বিলাল এরদোয়ান বর্তমানে একাধিক সরকারপন্থী ফাউন্ডেশনের বোর্ড সদস্য। পাশাপাশি তিনি ‘ওয়ার্ল্ড নোম্যাড গেমস’- এর অন্যতম পরিচিত মুখ। তুর্কি বিশ্বের ঐতিহ্যবাহী ক্রীড়া ও সংস্কৃতিকে ঘিরে আয়োজিত একটি আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা এটি । ফিলিস্তিনি ইস্যুতেও তিনি ধারাবাহিকভাবে সোচ্চার।

গত বছরের ডিসেম্বরে বিলা গাজা যুদ্ধের প্রসঙ্গ টেনে এক বিতর্কিত মন্তব্য করেন। তার ভাষায়, প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানকে যদি আরও ক্ষমতা দেওয়া হতো, তাহলে ইসরায়েল এই গণহত্যা চালানোর সাহস পেত না।

তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান ও তার কনিষ্ঠ পুত্র বিলাল এরদোয়ান। ছবি: রয়টার্স
তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান ও তার কনিষ্ঠ পুত্র বিলাল এরদোয়ান। ছবি: রয়টার্স

এই বক্তব্য অনেকের কাছেই বিস্ময়কর। কারণ বাস্তবতা হলো, এরদোয়ান ইতোমধ্যেই তুরস্কের রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রায় সব ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক বাধা অতিক্রম করেছেন।

২০০৩ সাল থেকে টানা দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে তুরস্ক শাসন করে আসছেন এরদোয়ান। তিনি প্রথমে প্রধানমন্ত্রী পরে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন।

সংবিধান অনুযায়ী, বর্তমান মেয়াদ শেষে ২০২৮ সালে তিনি আর নির্বাচনে দাঁড়াতে পারবেন না। তবে সংবিধান সংশোধন বা আগাম নির্বাচনের মাধ্যমে সেই সীমাবদ্ধতা পাশ কাটানোর পথ তার সামনে খোলা রয়েছে।

নতুন সংবিধান পাস করতে সংসদের ৬০০ আসনের মধ্যে ৪০০টির সমর্থন প্রয়োজন, যা বর্তমানে তার হাতে নেই। গণভোটের পথেও ঝুঁকি রয়েছে। ২০১৭ সালের গণভোটে ক্ষমতা বাড়ানোর প্রশ্নে তিনি অল্প ব্যবধানে জয়ী হয়েছিলেন, তাও ছিল ব্যাপক জালিয়াতির অভিযোগের মধ্যে। ফলে বিশ্লেষকদের ধারণা, ২০২৭ সালের শেষ দিকে একটি আগাম নির্বাচনই হতে পারে তার জন্য তুলনামূলক নিরাপদ পথ।

প্রেসিডেন্টের স্বাস্থ্য তুরস্কে কার্যত একটি রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তা। তবে ৭১ বছর বয়সে তার শারীরিক গতি যে আগের মতো নেই, তা প্রকাশ্যেই দৃশ্যমান। যদি তিনি নির্বাচনে না দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন, তাহলে জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (একে) পার্টি থেকে একজন উত্তরসূরি মনোনীত করা হবে এমনটাই ধরে নেওয়া হচ্ছে।

দলটি বর্তমানে পুরোপুরি এরদোয়ানকেন্দ্রিক। প্রকাশ্যে একে পার্টির নেতারা ‘এরদোয়ান-পরবর্তী ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলতে নারাজ। দলের এক জ্যেষ্ঠ নেতা অকপটে বলেছেন, “আমাদের কোনো প্ল্যান-বি নেই।”

তবে আড়ালে চলছে তীব্র প্রতিযোগিতা। শোনা যাচ্ছে, চারজন ব্যক্তি এই দৌড়ে এগিয়ে আছেন-প্রেসিডেন্টের জামাতা ও ড্রোন প্রকল্পের স্থপতি সেলচুক বায়রাক্তার, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সুলেইমান সয়লু, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও সাবেক গোয়েন্দা প্রধান হাকান ফিদান এবং বিলাল এরদোয়ান।

ডিসেম্বরের এক জরিপের বরাত দিয়ে ইকোনমিস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়, একে পার্টির সম্ভাব্য নেতা হিসেবে হাকান ফিদানের পক্ষে সমর্থন সবচেয়ে বেশি-৩৩.৪ শতাংশ। সুলেইমান সয়লু পেয়েছেন ৩২.৫ শতাংশ। বিলাল ১৪.২ শতাংশ নিয়ে তৃতীয় স্থানে থাকলেও, তিনি বায়রাক্তারের চেয়েও এগিয়ে।

একে পার্টির সম্ভাব্য নেতা হিসেবে হাকান ফিদানের পক্ষে সমর্থন সবচেয়ে বেশি। ছবি: রয়টার্স
একে পার্টির সম্ভাব্য নেতা হিসেবে হাকান ফিদানের পক্ষে সমর্থন সবচেয়ে বেশি। ছবি: রয়টার্স

তবে রাজনৈতিক উত্তরাধিকার প্রশ্নে বিলাল এরদোয়ানের সামনে বড় বাধা রয়েছে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী সেদা ডেমিরাল্প মনে করেন, একে পার্টির ভোটারদের বড় একটি অংশ সরকারকে ‘পারিবারিক ব্যবসা’ হিসেবে দেখার ধারণার বিরোধী। আরেক শিক্ষাবিদ বুরাক বিলগেহান ওজপেকের মতে, ‘‘এরদোয়ান স্বৈরাচারী হতে পারেন, কিন্তু তার একটি গণতান্ত্রিক বৈধতা রয়েছে—বিলালের ক্ষেত্রে তা নেই।’’

এর ওপর রয়েছে অর্থনৈতিক বাস্তবতা। উচ্চ সুদের হার, নতুন কর এবং ব্যয় সংকোচনের কারণে জনজীবনে চাপ বেড়েছে। তুরস্কে মুদ্রাস্ফীতি এখনও ৩০ শতাংশের ওপরে। একাধিক জরিপে দেখা যাচ্ছে, এরদোয়ান বর্তমানে বিরোধী নেতা একরেম ইমামোগ্লু এবং আঙ্কারার মেয়র মনসুর ইয়াভাসের চেয়ে পিছিয়ে।

বিশ্লেষকদের মতে, এরদোয়ান ক্ষমতায় থাকবেন না কি তিনি নিজেই একজন উত্তরসূরি গড়ে তুলবেন এই প্রশ্নের উত্তর এখনও স্পষ্ট নয়। তবে এটুকু পরিষ্কার, বিলাল এরদোয়ান আর শুধু প্রেসিডেন্টের ছেলে নন; তিনি ধীরে ধীরে একটি রাজনৈতিক সম্ভাবনায় রূপ নিচ্ছেন।

তবে সেই সম্ভাবনা রাজবংশে পরিণত হবে কি না-তা নির্ধারণ করবে তুরস্কের রাজনীতি, অর্থনীতি এবং সবচেয়ে বড় কথা, ভোটারদের মনোভাবের ওপর।

সম্পর্কিত