Advertisement Banner

ইরান যুদ্ধ এখন যে পর্যায়ে

ইরান যুদ্ধ এখন যে পর্যায়ে
ইরানের পতাকা। ছবি: রয়টার্স

অনির্দিষ্টকালের যুদ্ধবিরতি পারস্য উপসাগরকে আপাতত শান্ত রেখেছে। কিন্তু সেটি কতদিন টিকবে, নাকি পুনরায় যুদ্ধ শুরু হবে, তার কোনো আভাস পাওয়া কঠিন। হরমুজ প্রণালি এখনো ইরানের শক্ত নিয়ন্ত্রণে। পারস্য উপসাগরের ওপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার অবরোধ উঠিয়ে নেয়নি। উভয়পক্ষ একে অপরের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে টেলিফোনে যোগাযোগ করেন। দেড় ঘণ্টা দীর্ঘ ওই আলাপে পুতিন ট্রাম্পকে সতর্ক করে দেন এবং পুনরায় যুদ্ধ শুরু করার বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন। এর পরপরই হোয়াইট হাউজ থেকে জানানো হয় যে, আমেরিকা ইরানের বিরুদ্ধে তার আক্রমণ শেষ করেছে।

তবে অর্থনৈতিক অবরোধ চলবে। তাতে করে ইরানের অর্থনীতি ধসে পড়বে এবং ইরান আত্মসমর্পণ করবে। মার্কিন বিমানবহনকারী জাহাজ জেরাল্ড ফোর্ড ইতিমধ্যে পারস্য উপসাগর ত্যাগ করে দেশের পথে পাড়ি দিয়েছে বলে খবরে প্রকাশ। তাহলে কি আমেরিকা সত্যিই নতুন করে বিমান হামলা সংক্রান্ত কোন অভিযানের কথা ভাবছে না?

এরই পাশাপাশি কূটনৈতিক তৎপরতা থেমে নেই। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি সেন্ট পিটার্সবার্গে সফর করেছেন। সেখানে রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিন তাকে সাদর অভ্যর্থনা জানান। কোনো দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে স্বাগত দেশের প্রেসিডেন্টের পক্ষে এভাবে অভ্যর্থনা জানানো কূটনৈতিক প্রটোকলে বিরল। ইরানের বীর জনতার সাহসকে পুতিন ওই আলাপ চলাকালে প্রশংসা করেন। মার্কিন পরাশক্তিকে রুখে দিয়ে ইরানের জনগণ দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করেছে এবং ইরানি জনগণের দেশপ্রেমের উজ্জ্বল নিদর্শন রেখে গেছে। এই দুর্দান্ত সাফল্যের জন্য তিনি ইরানকে অভিনন্দন জানান।

সফরের তাৎপর্যপূর্ণ দিক ছিল দুই দেশের মধ্যে সামরিক সহযোগিতার ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি নিয়ে বিভিন্ন আলাপ। সে সহযোগিতা বলতে কি বোঝায়, সে সম্পর্কে কোনো তথ্য উভয় পক্ষের কেউ প্রকাশ করেনি। কিন্তু যে সব উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সাথে আব্বাস আরাঘচি বৈঠক মিটিং করেছেন, তা থেকে সহযোগিতা বা সাহায্যের একটা ধারনা পাওয়া কঠিন না। যাদের সাথে তিনি আলাপ করেন, তাদের মধ্যে রয়েছে অ্যাডমিরাল কোস্তুকোভ। তিনি রাশিয়ার সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান। আরাঘচি আরও বৈঠক করেন রাশিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী আন্দ্রেই বেলাউসভ এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী সেরগেই লাভরভের সাথে।

রাশিয়া সফরের আগে আরাঘচি দুই দফায় ইসলামাবাদ সফল করেন। এই দুই সফরের মাঝখানে তিনি ওমানে যান এবং ওমানের আমিরের সাথে সাক্ষাৎ করেন। সেখানে আলোচনার বিষয় যতটুকু অনুমান করতে পারি, সেটি হরমুজ প্রণালি পরিচালনায় ইরান-ওমান যৌথ দায়িত্বের বিষয়টি নিয়ে। তার অর্থ দাঁড়ায় এই যে হরমুজ প্রণালির ওপর ইরান তার নিয়ন্ত্রণ শিথিল করবে না। বরং ওমানের সাথে মিলে তার পরিচালনার ক্ষেত্রে নতুন ব্যবস্থা আরোপ করবে। যে টোল ব্যবস্থা ইতিমধ্যে ইরান আরোপ করেছে, সেটি উল্লেখিত দুই দেশের মধ্যে বণ্টন কীভাবে হবে, সম্ভবত এ সংক্রান্ত আলোচনাও তাদের বৈঠকের মূল বিষয় ছিল।

ইসলামাবাদ সফর থেকে ইরান বিশেষ বাণিজ্য সুবিধা পেয়েছে। পারস্য উপসাগরকে পাশ কাটিয়ে কীভাবে বিকল্প হিসেবে স্থলপথে বাণিজ্য চালু রাখা যায়, দুই দেশের মধ্যে সে সংক্রান্ত একটি চুক্তি সই হয়। সেই চুক্তি অনুযায়ী পাকিস্থান ইরানকে তার ভূখণ্ড দিয়ে ছয়টি বাণিজ্য করিডোরের সুবিধা দেবে। এতে করে স্থলপথে তেল রপ্তানি এবং অন্যান্য পণ্য সরবরাহ অক্ষুন্ন থাকবে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাঘচি তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে টেলিফোনে আলাপ করেছেন। ইরানের এই ঝটিকা কূটনৈতিক তৎপরতা থেকে বোধগম্য যে বিশ্বে ইরানের শক্তিশালী মিত্র আছে, যারা ইরানকে সমর্থন করে এবং সাহায্য করতে প্রস্তুত। কূটনৈতিক মহলে এটি স্বীকৃত যে, যে তিনজন পররাষ্ট্রমন্ত্রী সবচেয়ে দক্ষতার সাথে বর্তমান বিশ্বে তাদের দায়িত্ব পালন করছেন, তাদের মধ্যে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি একজন। বাকি দুইজন হচ্ছেন রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সেরগেই লাভরভ এবং চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই।

সার্বিক পরিস্থিতির কথা বিচার করে তিনটি সম্ভবনার কথা ভাবা সম্ভব। এক. আমেরিকা পুনরায় বিমান হামলা চালানোর সিদ্ধান্ত নিতে পারে। এই সম্ভবনা রয়ে গেছে এ কারণে যে ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্রের ওপর প্রচণ্ড চাপ বজায় রেখেছে। ইসরাইলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইরানকে প্রস্তর যুগে পাঠানোর পরিকল্পনা থেকে এক বিন্দু সরে আসেনি। আমেরিকা তার নৌ এবং স্থল বাহিনীর শক্তিকে আরও জোরদার করছে। আমেরিকা চায় ইরানের তেল, বিদ্যুৎসহ অন্যান্য অবকাঠামো ধ্বংস করে দেশকে অকেজো করে দিতে।

ইরানও যুক্তরাষ্ট্রকে এই বলে সতর্ক করে দিচ্ছে যে সেক্ষেত্রে ইরান তার সব শক্তি নিয়োগ করবে। এই সতর্কবাণী আমরা শুনতে পেয়েছি ইরানের ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতাবা খামেনির দেওয়া এক অডিও ভাষণে। যেটি ওই ভাষণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক, সেটি হচ্ছে পারমাণবিক শক্তির ব্যবহার সংক্রান্ত তার হুঁশিয়ারি। তিনি বলেছেন, ইরান প্রয়োজনে সব শক্তি ব্যবহার করবে এবং তার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত পারমাণবিক শক্তি। তিনি অস্ত্র শব্দটি ব্যবহার করেননি। এর অর্থ কী–সেটি বোঝা কঠিন। এটি কি সম্ভব যে ইরান ইতিমধ্যে পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকারী হয়েছে? যদি তাই হয়, তাহলে যুদ্ধের সার্বিক পরিস্থিতি উল্টে যেতে পারে। ইরান কিন্তু সাম্প্রতিককালে নানা হুঁশিয়ারিতে বিশেষ কোনো ‘ওয়ান্ডার ওয়েপনের’ কথা বলে এসেছে। সেটি কি তাহলে তার ভাণ্ডারে ইতিমধ্যে অন্তর্ভুক্ত হওয়া এই পারমাণবিক অস্ত্র?

যাই হোক, যুক্তরাষ্ট্র্রের পক্ষে এখনই নতুন উদ্যোগ নিয়ে বোমা হামলার সম্ভাবনা দেখি না। অর্থনৈতিক অবরোধকে এখন মার্কিন নীতি নির্ধারকেরা সবচেয়ে ঝুঁকিহীন বিকল্প হিসেবে ভাবছেন। সেটি এই কারণে যে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রভাণ্ডার বর্তমানে এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, তার পক্ষে ক্ষেপণাস্ত্রের বাকি মজুত খালি করার সিদ্ধান্ত অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হবে। তবে এমন একজন রাষ্ট্র নেতার কথা আমাদের ভাবতে হচ্ছে, যিনি যুক্তি প্রয়োগ করে সিদ্ধান্ত নেন কি না সন্দেহ। অন্তত যে সব সিদ্ধান্ত তিনি এ পর্যন্ত নিয়েছেন, তার অধিকাংশ তিনি নিয়েছেন সামরিক বাহিনীর জেনারেলদের পরামর্শ অবজ্ঞা করে। ফক্স টেলিভিশনে ইরানের বিরুদ্ধে আক্রমণ শুরু করার সমর্থনে নানা হুংকার প্রতিনিয়ত শুনতে পাচ্ছি। ফলে ইসরায়েল লবি এবং মার্কিন নিওকন ধারার রাজনীতিবিদদের প্ররোচনায় যদি নতুন করে কোনো বিমান হামলা শুরু হয়, তাহলে অবাক হব না।

দ্বিতীয় বিকল্প– হরমুজ প্রণালি জাহাজ চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করতে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক পদক্ষেপ নিতে পারে। কিন্তু সে সম্ভবনা বাস্তবে রূপ দেওয়া কঠিন বলে মনে করি। যদি স্থলবাহিনী অথবা নৌবাহিনী ব্যবহার করে সেটি সম্পন্ন করার কথা ভাবা হয়, তাহলে তারা ইরানের ড্রোন এবং মিসাইল আক্রমণের শিকার হবে। এতে মার্কিন ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কতটুকু হতে পারে, সেটি পরিমাপ করা কঠিন। হরমুজ প্রণালির উপকুল ঘেঁষে যে পর্বতমালা, তার গভীরে ইরানের ড্রোন ঘাঁটি আছে। ১২০০ কিলোমিটার ব্যাপী উপকূল মাঝারি পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন ব্যবহার করে ইরান তার প্রতিরক্ষা ব্যুহ গড়ে তুলেছে। ফলে সামরিক দিক থেকে এই আগ্রাসন সঠিক বলে মনে করি না। হরমুজ প্রণালি জাহাজ চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করার জন্য বহু সংখ্যক যুদ্ধ জাহাজের প্রয়োজন। সেগুলোকে স্থায়ীভাবে প্রণালির আশপাশে মোতায়েন রাখতে হবে। সামরিক কৌশলগত দিক থেকে এটি অকার্যকর বলে ধারনা করি।

তৃতীয় বিকল্প হতে পারে, বিমান ও স্থলবাহিনী ব্যবহার করে ইরানের অভ্যন্তরে লুকিয়ে রাখা পরিশোধিত ইউরেনিয়াম উদ্ধার করার চেষ্টা। এটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ একটি অপারেশন। প্রথমত, আমেরিকা ইউরেনিয়ামের অবস্থান সম্পর্কে কতটুকু অবগত, তার গোয়েন্দা তথ্য কতটুকু সঠিক এবং নিখুঁত, সে সম্পর্কে সন্দেহ আছে। অনেকে মনে করে ওই ইউরেনিয়াম ইরানের ইসফাহান শহরে পাহাড়ের গভীরে রয়েছে। ফলে প্রথম কাজ হবে সেখানে পৌঁছানো। তারপর পাহাড়ের গভীরে প্রবেশের সমস্যা তো আছেই। আরও আছে সেখান থেকে নিরাপদে বেরিয়ে আসা। এই জটিল প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার পথে বাধার সংখ্যা একাধিক। তার প্রমাণ আমরা ইতিমধ্যে পেয়েছি এফ ১৫ ভূপাতিত হওয়ার পর আটকে পড়া বৈমানিক উদ্ধারের প্রচেষ্টায়। সে সময় অন্ততপক্ষে ১২টি মার্কিন বিমান ও হেলিকপ্টার ধ্বংস হয়েছিল। আটকে পড়া বৈমানিককে আদৌও উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে কি না সেটিও সন্দেহজনক। বৈমানিকের নাম কী, তাকে টেলিভিশনে দেখানো হল না কেন, তাকে নিয়ে বিশেষ উৎসাহ অতি দ্রুত শেষ হয়ে গেল কেন, তারও কোনো উত্তর নেই। ফলে সেটি আসলে ব্যর্থ অপারেশন ছিল কি না আমরা জানি না।

সবশেষে, ইরান পাকিস্থানের মাধ্যমে আমেরিকার কাছে সাম্প্রতিক যে শান্তি প্রস্তাব পাঠিয়েছে, তার কয়েকটি দিক উল্লেখ করতে চাই। প্রথমত, আমেরিকাকে যুদ্ধ বন্ধের প্রতিশ্রুতি দিতে হবে এবং সে ভবিষ্যতে কোনো আক্রমন চালাবে না। যুদ্ধ বন্ধের এই প্রস্তাব কেবল ইরানের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না। লেবাননে হিজবুল্লাহ, গাজায় হামাসও অন্তর্ভুক্ত হবে। দ্বিতীয়ত, হরমুজ প্রণালি নিয়ন্ত্রণ এবং পরিচালনা করার লক্ষ্যে একটি কাঠামো তৈরি করা। তৃতীয়ত, এরপর পারমাণবিক এবং ইউরেনিয়াম সংক্রান্ত আলাপের কথা ভাবা যেতে পারে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ইরানের এই সর্বশেষ প্রস্তাব নাকচ করে দিয়েছেন।

লেখক: অধ্যাপক, ওয়েস্টার্ন সিডনি ইউনিভার্সিটি, অস্ট্রেলিয়া।

সম্পর্কিত