এশিয় প্রতিবেশী দেশগুলো যখন তীব্র জ্বালানি সংকটে ভুগছে, তখন বেইজিং এই সংকটকে কাজে লাগিয়ে নিজস্ব কৌশলগত লক্ষ্য হাসিল করছে।
চরচা ডেস্ক

কারো পৌষ মাস, কারো সর্বনাশ–এই প্রবাদটি ইরান যুদ্ধের সময়ে চীনের জন্য বিশেষভাবে প্রযোজ্য হয়ে উঠেছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েল ও আমেরিকার হটকারি হামলার কারণে ইরান তেল পরিবহনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়। এতে বিপদে পড়ে দক্ষিণ ও দক্ষিণ–পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো। কারণ হরমুজ দিয়ে পরিবাহিত জ্বালানি তেলের ৮০ শতাংশ এই দেশগুলোতে আসে। বিপদের দিনে চীন এই দেশগুলোর দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। ফলে কিছুটা হলেও কষ্ট কমেছে ফিলিপাইন, অস্ট্রেলিয়া, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, লাওস, থাইল্যান্ড, মিয়ানমার ও বাংলাদেশসহ অনেক দেশের। আর এ কারণেই চীনের ভাবমূর্তি এশিয়ার এই অঞ্চলে এখন অনেক উজ্জ্বল।
সম্প্রতি নিউইয়র্ক টাইমস-এ প্রকাশিত আলেকজান্দ্রা স্টিভেনসন এবং মারফি ঝাও-এর সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুসারে, চলতি মে মাসে ইরানে চলমান যুদ্ধ এবং তার প্রেক্ষাপটে সৃষ্ট জ্বালানি সংকট এশীয় অঞ্চলে চীনের প্রভাব বিস্তারের এক অভূতপূর্ব সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে। বর্তমানে হংকং থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে দেখা যাচ্ছে যে, ইরান যুদ্ধের দীর্ঘসূত্রতা এবং হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে এশিয় প্রতিবেশী দেশগুলো যখন তীব্র জ্বালানি সংকটে ভুগছে, তখন বেইজিং এই সংকটকে কাজে লাগিয়ে নিজস্ব কৌশলগত লক্ষ্য হাসিল করছে।
যুদ্ধের সূচনালগ্নে যখন ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র ইরানে আক্রমণ চালায় এবং জ্বালানি সরবরাহের প্রধান পথটি রুদ্ধ হয়ে যায়, তখন চীন প্রাথমিকভাবে তার পরিশোধিত তেল রপ্তানি নিষিদ্ধ করে। এই পদক্ষেপটি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোকে এক কঠিন সংকটের মুখে ঠেলে দেয়। কারণ তারা যারা মূলত চীনা শোধনাগারের জেট ফুয়েল, পেট্রল এবং ডিজেলের ওপর নির্ভরশীল।
তবে এই সংকটটিই চীনের জন্য একটি শক্তিশালী দর কষাকষির হাতিয়ার হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। বিশ্বের বৃহত্তম অপরিশোধিত তেল আমদানিকারক হওয়া সত্ত্বেও চীন গত কয়েক দশকে তার মজুত বিশাল বৃদ্ধি করেছে এবং বিদেশি তেলের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রযুক্তিতে শত শত বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে। ফলে বর্তমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে বেইজিং একটি সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে।
প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে যে, ভিয়েতনামের মতো দেশগুলো তাদের আসন্ন জেট ফুয়েল সংকট কাটাতে বেইজিংয়ের কাছে আবেদন জানিয়েছে। অন্যদিকে, ফিলিপাইন চীনকে সার রপ্তানি সীমিত না করার জন্য অনুরোধ করেছে। এমনকি অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী গত মাসে চীন সফর করে জ্বালানি সরবরাহের বিষয়ে বেইজিংয়ের সহযোগিতা নিশ্চিত করেছেন।

এই কূটনৈতিক তৎপরতার ফলে চীন তার প্রতিবেশীদের জ্বালানি নিরাপত্তার আশ্বাস দেওয়ার পাশাপাশি দেশগুলোকে নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পে সহযোগিতার জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ করছে। এই প্রক্রিয়ায় বেইজিং গত কয়েক মাসে ফিলিপাইন, অস্ট্রেলিয়া, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, লাওস, থাইল্যান্ড, মিয়ানমার এবং বাংলাদেশের কর্মকর্তাদের সাথে উচ্চপর্যায়ের আলোচনা সম্পন্ন করেছে।
চীনের এই বার্তার মূল কথা হলো, তারা যুদ্ধের জন্য দায়ী নয় এবং হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকুক তাও তারা চায় না। তবে তারা জীবাশ্ম জ্বালানির বিকল্প হিসেবে তাদের উন্নত প্রযুক্তি দিতে প্রস্তুত।
অক্সফোর্ড ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি স্টাডিজের চীনা জ্বালানি–বিষয়ক গবেষণা প্রধান মিশাল মেইডান এই বিষয়টিকে চীনের ‘সফট পাওয়ার’ বা কোমল শক্তির একটি হাতিয়ার হিসেবে অভিহিত করেছেন। তার মতে, চীন এই সংকটকে ব্যবহার করে নিজের জ্বালানি নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিয়ে প্রতিবেশীদের সাহায্য করছে এবং ভবিষ্যতে সবুজ প্রযুক্তি বিক্রির একটি মজবুত ভিত্তি তৈরি করছে।
ইউরেশিয়া গ্রুপের চীন বিষয়ক পরিচালক ড্যান ওয়াংয়ের মতে, চীন তার বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ-এর মাধ্যমে অতীতে যে বিপুল ঋণ দিয়েছিল, তার ফলে সৃষ্ট নেতিবাচক ভাবমূর্তি কাটিয়ে ওঠার একটি উপায় হিসেবে এখন পরিচ্ছন্ন জ্বালানি প্রযুক্তিকে ব্যবহার করছে। যুদ্ধের প্রথম মাসেই দেখা গেছে যে, চীনের এই তেল রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা সম্পূর্ণ ছিল না। বরং তা ছিল অত্যন্ত কৌশলগত ও চয়নমূলক। যাদের সাথে বেইজিংয়ের কূটনৈতিক সম্পর্ক ভালো, তারা এই সংকটের মাঝেও সরবরাহ পেয়েছে। যেমন মার্চ মাসে ভিয়েতনামে জেট ফুয়েল রপ্তানি ৩৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং ফিলিপাইনে সার ও ডিজেল রপ্তানি উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। এটি প্রমাণ করে যে, সংকটকালে বেইজিং তাদের মিত্রদের প্রতি পুরস্কার দেওয়ার নীতি অনুসরণ করছে।
তবে এই সাহায্যের পেছনে অনেক সময় রাজনৈতিক শর্তও জুড়ে দেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে তাইওয়ানের ক্ষেত্রে চীন একটি প্রচ্ছন্ন প্রস্তাব দিয়েছে যে, ‘শান্তিপূর্ণ পুনর্মিলন’ হলে তাইওয়ান একটি শক্তিশালী মাতৃভূমির সমর্থনে আরও ভালো জ্বালানি নিরাপত্তা ভোগ করতে পারবে। তাইওয়ান যেহেতু তার জ্বালানির ৯৬ শতাংশের বেশি আমদানি করে এবং এর বড় অংশই হরমুজ প্রণালি দিয়ে আসে, তাই এই প্রস্তাবটি চীনের জন্য একটি বড় রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে কাজ করছে।

কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার অন গ্লোবাল এনার্জি পলিসির সিনিয়র রিসার্চ স্কলার এরিকা ডাউন্সের মতে, এই দ্বন্দ্ব চীনকে একটি ‘এনার্জি পাওয়ার হাউস’ বা জ্বালানি শক্তিকেন্দ্রে পরিণত হওয়ার পথে বসন্তের বাতাসের মতো কাজ করছে। চীন বর্তমানে সোলার ফার্ম, উইন্ড ফার্ম, স্মার্ট গ্রিড এবং বৈদ্যুতিক গাড়ি উৎপাদনের ক্ষেত্রে বিশ্বকে নেতৃত্ব দিচ্ছে। এই সবুজ পণ্যগুলো বিদেশে রপ্তানি করার মাধ্যমে চীন তার নিজস্ব স্থবির অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিকে সচল রাখার চেষ্টা করছে।
যুদ্ধের কয়েক সপ্তাহ আগে চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত একটি নিবন্ধে যুক্তি দেওয়া হয়েছিল যে, একটি জ্বালানি শক্তিকেন্দ্র হওয়া চীনের কৌশলগত উদ্যোগকে শক্তিশালী করবে। ন্যাশনাল এনার্জি অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বিভাগের পরিচালক ওয়েই জিয়াওয়েই-এর দেওয়া তথ্যানুযায়ী, যুদ্ধের পর থেকেই চীন কয়েক ডজন দেশে তার জ্বালানি কূটনীতি জোরদার করেছে, যার মধ্যে কাজাখস্তান ও মন্টেনিগ্রোর উইন্ড ফার্ম এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত, আর্জেন্টিনা ও আলজেরিয়ার সৌর বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো উল্লেখযোগ্য।
মধ্যপ্রাচ্যের এই যুদ্ধ চীনের জন্য তাদের বৈদ্যুতিক যান এবং সোলার প্যানেলের বিশাল মজুদের একটি নতুন বাজার উন্মুক্ত করে দিয়েছে। যদিও অনেক দেশ আগে চীনের সস্তা পণ্যের আধিক্য নিয়ে অভিযোগ তুলত, কিন্তু বর্তমান জ্বালানি সংকটের তীব্রতায় সেই অভিযোগগুলো স্তিমিত হয়ে এসেছে। সংকটের এই মুহূর্তে চীনের সুলভ প্রযুক্তি এবং জ্বালানি পণ্যগুলো এশিয়ার দেশগুলোর কাছে এখন আর বোঝা নয়, বরং বেঁচে থাকার অন্যতম অবলম্বন হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদে এশীয় রাজনীতিতে চীনের প্রভাবকে আরও গভীর ও স্থায়ী করে তুলছে।

কারো পৌষ মাস, কারো সর্বনাশ–এই প্রবাদটি ইরান যুদ্ধের সময়ে চীনের জন্য বিশেষভাবে প্রযোজ্য হয়ে উঠেছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েল ও আমেরিকার হটকারি হামলার কারণে ইরান তেল পরিবহনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়। এতে বিপদে পড়ে দক্ষিণ ও দক্ষিণ–পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো। কারণ হরমুজ দিয়ে পরিবাহিত জ্বালানি তেলের ৮০ শতাংশ এই দেশগুলোতে আসে। বিপদের দিনে চীন এই দেশগুলোর দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। ফলে কিছুটা হলেও কষ্ট কমেছে ফিলিপাইন, অস্ট্রেলিয়া, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, লাওস, থাইল্যান্ড, মিয়ানমার ও বাংলাদেশসহ অনেক দেশের। আর এ কারণেই চীনের ভাবমূর্তি এশিয়ার এই অঞ্চলে এখন অনেক উজ্জ্বল।
সম্প্রতি নিউইয়র্ক টাইমস-এ প্রকাশিত আলেকজান্দ্রা স্টিভেনসন এবং মারফি ঝাও-এর সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুসারে, চলতি মে মাসে ইরানে চলমান যুদ্ধ এবং তার প্রেক্ষাপটে সৃষ্ট জ্বালানি সংকট এশীয় অঞ্চলে চীনের প্রভাব বিস্তারের এক অভূতপূর্ব সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে। বর্তমানে হংকং থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে দেখা যাচ্ছে যে, ইরান যুদ্ধের দীর্ঘসূত্রতা এবং হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে এশিয় প্রতিবেশী দেশগুলো যখন তীব্র জ্বালানি সংকটে ভুগছে, তখন বেইজিং এই সংকটকে কাজে লাগিয়ে নিজস্ব কৌশলগত লক্ষ্য হাসিল করছে।
যুদ্ধের সূচনালগ্নে যখন ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র ইরানে আক্রমণ চালায় এবং জ্বালানি সরবরাহের প্রধান পথটি রুদ্ধ হয়ে যায়, তখন চীন প্রাথমিকভাবে তার পরিশোধিত তেল রপ্তানি নিষিদ্ধ করে। এই পদক্ষেপটি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোকে এক কঠিন সংকটের মুখে ঠেলে দেয়। কারণ তারা যারা মূলত চীনা শোধনাগারের জেট ফুয়েল, পেট্রল এবং ডিজেলের ওপর নির্ভরশীল।
তবে এই সংকটটিই চীনের জন্য একটি শক্তিশালী দর কষাকষির হাতিয়ার হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। বিশ্বের বৃহত্তম অপরিশোধিত তেল আমদানিকারক হওয়া সত্ত্বেও চীন গত কয়েক দশকে তার মজুত বিশাল বৃদ্ধি করেছে এবং বিদেশি তেলের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রযুক্তিতে শত শত বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে। ফলে বর্তমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে বেইজিং একটি সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে।
প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে যে, ভিয়েতনামের মতো দেশগুলো তাদের আসন্ন জেট ফুয়েল সংকট কাটাতে বেইজিংয়ের কাছে আবেদন জানিয়েছে। অন্যদিকে, ফিলিপাইন চীনকে সার রপ্তানি সীমিত না করার জন্য অনুরোধ করেছে। এমনকি অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী গত মাসে চীন সফর করে জ্বালানি সরবরাহের বিষয়ে বেইজিংয়ের সহযোগিতা নিশ্চিত করেছেন।

এই কূটনৈতিক তৎপরতার ফলে চীন তার প্রতিবেশীদের জ্বালানি নিরাপত্তার আশ্বাস দেওয়ার পাশাপাশি দেশগুলোকে নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পে সহযোগিতার জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ করছে। এই প্রক্রিয়ায় বেইজিং গত কয়েক মাসে ফিলিপাইন, অস্ট্রেলিয়া, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, লাওস, থাইল্যান্ড, মিয়ানমার এবং বাংলাদেশের কর্মকর্তাদের সাথে উচ্চপর্যায়ের আলোচনা সম্পন্ন করেছে।
চীনের এই বার্তার মূল কথা হলো, তারা যুদ্ধের জন্য দায়ী নয় এবং হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকুক তাও তারা চায় না। তবে তারা জীবাশ্ম জ্বালানির বিকল্প হিসেবে তাদের উন্নত প্রযুক্তি দিতে প্রস্তুত।
অক্সফোর্ড ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি স্টাডিজের চীনা জ্বালানি–বিষয়ক গবেষণা প্রধান মিশাল মেইডান এই বিষয়টিকে চীনের ‘সফট পাওয়ার’ বা কোমল শক্তির একটি হাতিয়ার হিসেবে অভিহিত করেছেন। তার মতে, চীন এই সংকটকে ব্যবহার করে নিজের জ্বালানি নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিয়ে প্রতিবেশীদের সাহায্য করছে এবং ভবিষ্যতে সবুজ প্রযুক্তি বিক্রির একটি মজবুত ভিত্তি তৈরি করছে।
ইউরেশিয়া গ্রুপের চীন বিষয়ক পরিচালক ড্যান ওয়াংয়ের মতে, চীন তার বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ-এর মাধ্যমে অতীতে যে বিপুল ঋণ দিয়েছিল, তার ফলে সৃষ্ট নেতিবাচক ভাবমূর্তি কাটিয়ে ওঠার একটি উপায় হিসেবে এখন পরিচ্ছন্ন জ্বালানি প্রযুক্তিকে ব্যবহার করছে। যুদ্ধের প্রথম মাসেই দেখা গেছে যে, চীনের এই তেল রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা সম্পূর্ণ ছিল না। বরং তা ছিল অত্যন্ত কৌশলগত ও চয়নমূলক। যাদের সাথে বেইজিংয়ের কূটনৈতিক সম্পর্ক ভালো, তারা এই সংকটের মাঝেও সরবরাহ পেয়েছে। যেমন মার্চ মাসে ভিয়েতনামে জেট ফুয়েল রপ্তানি ৩৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং ফিলিপাইনে সার ও ডিজেল রপ্তানি উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। এটি প্রমাণ করে যে, সংকটকালে বেইজিং তাদের মিত্রদের প্রতি পুরস্কার দেওয়ার নীতি অনুসরণ করছে।
তবে এই সাহায্যের পেছনে অনেক সময় রাজনৈতিক শর্তও জুড়ে দেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে তাইওয়ানের ক্ষেত্রে চীন একটি প্রচ্ছন্ন প্রস্তাব দিয়েছে যে, ‘শান্তিপূর্ণ পুনর্মিলন’ হলে তাইওয়ান একটি শক্তিশালী মাতৃভূমির সমর্থনে আরও ভালো জ্বালানি নিরাপত্তা ভোগ করতে পারবে। তাইওয়ান যেহেতু তার জ্বালানির ৯৬ শতাংশের বেশি আমদানি করে এবং এর বড় অংশই হরমুজ প্রণালি দিয়ে আসে, তাই এই প্রস্তাবটি চীনের জন্য একটি বড় রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে কাজ করছে।

কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার অন গ্লোবাল এনার্জি পলিসির সিনিয়র রিসার্চ স্কলার এরিকা ডাউন্সের মতে, এই দ্বন্দ্ব চীনকে একটি ‘এনার্জি পাওয়ার হাউস’ বা জ্বালানি শক্তিকেন্দ্রে পরিণত হওয়ার পথে বসন্তের বাতাসের মতো কাজ করছে। চীন বর্তমানে সোলার ফার্ম, উইন্ড ফার্ম, স্মার্ট গ্রিড এবং বৈদ্যুতিক গাড়ি উৎপাদনের ক্ষেত্রে বিশ্বকে নেতৃত্ব দিচ্ছে। এই সবুজ পণ্যগুলো বিদেশে রপ্তানি করার মাধ্যমে চীন তার নিজস্ব স্থবির অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিকে সচল রাখার চেষ্টা করছে।
যুদ্ধের কয়েক সপ্তাহ আগে চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত একটি নিবন্ধে যুক্তি দেওয়া হয়েছিল যে, একটি জ্বালানি শক্তিকেন্দ্র হওয়া চীনের কৌশলগত উদ্যোগকে শক্তিশালী করবে। ন্যাশনাল এনার্জি অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বিভাগের পরিচালক ওয়েই জিয়াওয়েই-এর দেওয়া তথ্যানুযায়ী, যুদ্ধের পর থেকেই চীন কয়েক ডজন দেশে তার জ্বালানি কূটনীতি জোরদার করেছে, যার মধ্যে কাজাখস্তান ও মন্টেনিগ্রোর উইন্ড ফার্ম এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত, আর্জেন্টিনা ও আলজেরিয়ার সৌর বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো উল্লেখযোগ্য।
মধ্যপ্রাচ্যের এই যুদ্ধ চীনের জন্য তাদের বৈদ্যুতিক যান এবং সোলার প্যানেলের বিশাল মজুদের একটি নতুন বাজার উন্মুক্ত করে দিয়েছে। যদিও অনেক দেশ আগে চীনের সস্তা পণ্যের আধিক্য নিয়ে অভিযোগ তুলত, কিন্তু বর্তমান জ্বালানি সংকটের তীব্রতায় সেই অভিযোগগুলো স্তিমিত হয়ে এসেছে। সংকটের এই মুহূর্তে চীনের সুলভ প্রযুক্তি এবং জ্বালানি পণ্যগুলো এশিয়ার দেশগুলোর কাছে এখন আর বোঝা নয়, বরং বেঁচে থাকার অন্যতম অবলম্বন হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদে এশীয় রাজনীতিতে চীনের প্রভাবকে আরও গভীর ও স্থায়ী করে তুলছে।