অবনি বনসাল

পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচনের সমীকরণ বদলে গেছে। কিন্তু একটি গভীর প্রশ্ন এখনো রয়ে গেছে–একজন নারীর ক্ষমতার ওপর নিয়ন্ত্রণকে কেন নেতৃত্বের অধিকারের বদলে আজও কেবল অবাধ্যতা বা স্পর্ধা হিসেবে দেখা হয়? এখানে আগ্রহ কেবল একক কোনো ব্যক্তির প্রতি নয়, বরং তার এই দীর্ঘ পথচলা নারীর নেতৃত্বের অধিকারের ক্ষেত্রে বিদ্যমান সামাজিক ও রাজনৈতিক শর্তাবলী সম্পর্কে কী প্রকাশ করে–সেটাই মূল বিষয়।
‘খেলা হবে’– একসময় স্লোগানটি প্রতিবাদের কণ্ঠস্বর হিসেবে ধ্বনিত হয়েছিল। কিন্তু একটি নির্বাচনী পরাজয়ের পরবর্তী নিস্তব্ধতায় এটি এখন অন্য কিছুর কথা মনে করিয়ে দেয়। আর তা হলো, নারীদের জন্য এই খেলার ময়দান কখনোই সমান ছিল না। এই নির্বাচন চক্রটি একটি নাটকীয় দৃশ্যগত বৈসাদৃশ্য তৈরি করেছে।
ভারতের চারটি প্রধান রাজ্যে নেতৃত্বের লড়াই মূলত পুরুষদের দ্বারাই সংজ্ঞায়িত হয়েছে। আসাম, তামিলনাড়ু এবং কেরালায় ক্ষমতার মুখগুলো ছিল মূলত পুরুষতান্ত্রিক। পশ্চিমবঙ্গ সেখানে আলাদা হয়ে দাঁড়িয়েছে কেবল রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার কারণে নয়, বরং এই লড়াইয়ের কেন্দ্রে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নামের একজন নারীকে স্থাপন করার কারণে।
এই পার্থক্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, যখন একজন নারী কেবল উপস্থিত থাকেন না, বরং ক্ষমতার কেন্দ্রে অবস্থান করেন, তখন তার মূল্যায়নের মানদণ্ড বদলে যায়। রাজনৈতিক পরাজয়ের পরের দিন মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি হলো, একজন নেতাকে কেবল সংখ্যার হিসেবে বিচার করা। কয়টি আসন জয় হলো, কয়টি হারালো, কিংবা কত ভোটের ব্যবধানে পরিবর্তন এল।
কিন্তু কঠিন কাজ হলো এটি জিজ্ঞাসা করা যে, একটি রাজনৈতিক জীবন সেই ব্যবস্থা সম্পর্কে কী প্রকাশ করে, যার মধ্যে সে বসবাস করছে। আগ্রহের জায়গা কেবল একজন ব্যক্তি নয়, বরং তার পথচলা নারী নেতৃত্বের সুযোগ ও শর্তগুলোকে কীভাবে উন্মোচিত করে, সেটাই দেখার বিষয়।
বিশ্বজুড়ে নারীর সাথে ক্ষমতার সম্পর্ক সবসময়ই কিছুটা অস্বস্তিকর। ইরানে নারীরা তাদের শরীর ও পরিচয়ের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য কারাবরণ এবং সহিংসতার ঝুঁকি নিচ্ছেন। অন্যান্য গণতন্ত্রেও রাজনীতিতে নারীদের আচরণকে একটি সংকীর্ণ গণ্ডির মধ্যে বিচার করা হয়, যেখানে তাদের শক্তিকে প্রায়ই বাড়াবাড়ি এবং উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে সীমালঙ্ঘন হিসেবে তুলে ধরা হয়। প্রশ্নটি থেকেই যায়, একজন নারী কতটুকু জায়গা দখল করলে তাকে ‘অতিরিক্ত’ বা ‘মাত্রাতিরিক্ত’ হিসেবে গণ্য করা হবে?
ভারত এই উত্তেজনাকে তার নিজস্ব উপায়ে প্রতিফলিত করে। এখানে এমন অনেক নারী নেতা তৈরি হয়েছেন, যারা বিভিন্ন আঙ্গিকে ক্ষমতা প্রয়োগ করেছেন। সোনিয়া গান্ধী সাংগঠনিক ধৈর্য ও সংযমের মাধ্যমে একটি জাতীয় দলের দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। সুষমা স্বরাজ তার মানবিক ও গ্রহণযোগ্য বাচনভঙ্গির মাধ্যমে আদর্শিক সীমানা পেরিয়ে সবার শ্রদ্ধা অর্জন করেছিলেন।

এই দৃষ্টিভঙ্গিগুলো ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু তারা সবাই একটি সাধারণ সীমাবদ্ধতার মধ্য দিয়ে এগিয়েছেন–একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি, যা নারীর নেতৃত্বের সীমানা নির্ধারণ করে দেয়। এই প্রেক্ষাপটেই মমতার রাজনৈতিক জীবন বিশ্লেষণের জন্য অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। তার পথচলা কেবল এক ব্যক্তির উত্থানের গল্প নয়; বরং এটি একটি কেস স্টাডি যে, কোনো উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া রাজনৈতিক নেটওয়ার্ক ছাড়াই একটি পুরুষতান্ত্রিক রাজনৈতিক স্পেসে টিকে থাকতে একজন নারীকে কী ধরনের সংগ্রাম করতে হয়। তিনি যে প্রায়শই সংঘাতময় এবং উচ্চকিত পদ্ধতি গ্রহণ করেছেন, তা মূলত একটি কাঠামোগত বাস্তবতারই প্রতিফলন। আর তা হলো, উত্তরাধিকারহীনভাবে ক্ষমতায় প্রবেশের জন্য এক ভিন্নধর্মী রাজনৈতিক ভাষার প্রয়োজন ছিল।
এখানেই অসামঞ্জস্যতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। মমতাকে প্রায়শই অস্থির, কর্কশ বা জেদি হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। এই তকমাগুলো কেবল বর্ণনা নয়, বরং তার ব্যক্তিত্বকে একটি নির্দিষ্ট ছকে বাঁধার চেষ্টা। একই ধরনের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য পুরুষ নেতাদের মধ্যে থাকলে সেটিকে দৃঢ়তা বা আত্মপ্রত্যয় হিসেবে দেখা হয়। এই পার্থক্যই ক্ষমতার প্রতি দৃষ্টিভঙ্গিকে বদলে দেয়।
রাজনীতিতে অংশগ্রহণ না করেও যেসব তরুণী দূর থেকে চিত্রগুলোর মাধ্যমে রাজনীতিকে দেখছেন, তাদের জন্য এই মুহূর্তগুলো একটি নীরব শিক্ষা বহন করে।
একই সাথে, তার রাজনীতির সমালোচনা কেবল ভাষার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। তার দলের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক সহিংসতার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে এবং পশ্চিমবঙ্গে সুশাসনের অভাব নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। এই উদ্বেগগুলোকে উপেক্ষা করা যায় না। কিন্তু প্রশ্ন হলো, জনসমক্ষে হওয়া এই সমালোচনা কি শাসনব্যবস্থা ও জবাবদিহির ওপর নিবদ্ধ থাকে, নাকি এটি প্রায়ই একজন নারীর আচরণের ব্যক্তিগত বিশ্লেষণে পর্যবসিত হয়?
এই পার্থক্যটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যখন কাঠামোগত প্রশ্নগুলোকে ব্যক্তিগত আচরণের সংজ্ঞায় নামিয়ে আনা হয়, তখন বিশ্লেষণ সংকীর্ণ হয়ে পড়ে এবং মানদণ্ড হয়ে দাঁড়ায় অসম।
রাজনীতিতে অংশগ্রহণ না করেও যেসব তরুণী দূর থেকে চিত্রগুলোর মাধ্যমে রাজনীতিকে দেখছেন, তাদের জন্য এই মুহূর্তগুলো একটি নীরব শিক্ষা বহন করে। তারা কেবল নির্বাচনের ফলাফল দেখছেন না, বরং তারা দেখছেন কত দ্রুত কর্তৃত্বকে ব্যর্থতা হিসেবে সাজানো যায়, কত সহজে আত্মবিশ্বাসকে বাড়াবাড়ি হিসেবে গণ্য করা হয় এবং কীভাবে অবিচল থাকাকে অবাধ্যতা হিসেবে রঙ দেওয়া হয়।
সেই অর্থে, ‘খেলা হবে’ স্লোগানটি রাজনীতির ঊর্ধ্বে একটি রূপক হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটি একটি ভিন্ন প্রশ্ন উত্থাপন করে: মাঠের কেন্দ্রে খেলার সুযোগ কে পায়? দীর্ঘ সময় ধরে নারীরা প্রান্তিক পর্যায়ে উপস্থিত থেকেছেন, অংশগ্রহণ করেছেন। কিন্তু খেলার গতিপ্রকৃতি নির্ধারণ করতে পারেননি। মমতার মতো নেতারা যে সংকেত, দেন তা হলো, আদর্শিক মতভিন্নতা যাই থাকুক না কেন, কেন্দ্রে প্রবেশ করা সম্ভব, তবে তার জন্য একটি চড়া মূল্য দিতে হয়। এই মূল্য কোনো একজন নির্দিষ্ট নেতার বা একটি নির্বাচনের জন্য আলাদা নয়। এটি একটি বিশ্বজনীন মুহূর্তের অংশ, যেখানে তেহরানের রাস্তা থেকে দিল্লির আইনসভা পর্যন্ত নারীরা ক্ষমতার সাথে তাদের সম্পর্কের নতুন করে সংজ্ঞা নির্ধারণ করছেন।
এটি আমাদের ঘরের কাছের একটি পুনরাবৃত্তিমূলক ধরণ নিয়ে ভাবারও সময়: এক নারীকে অন্য নারীর বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে দেওয়ার প্রবণতা। কে নারীদের বেশি প্রতিনিধিত্ব করেন, কে বেশি সেবা দেন, কিংবা কার নেতৃত্ব ‘সঠিক’ ধরণের– এসব নিয়ে প্রতিযোগিতামূলক দাবি। একটি গণতন্ত্রে এই পার্থক্যগুলো অনিবার্য। কিন্তু যখন এক নারীর বৈধতা অন্য নারীকে খাটো করার ওপর ভিত্তি করে গড়ে তোলা হয়, তখন সেখানে সীমাবদ্ধ মানসিকতাই কাজ করে। রাজনীতিতে নারীরা তাদের আদর্শ, মেজাজ এবং পদ্ধতিতে ভিন্ন হবেন এবং এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু তাদের বোঝার জন্য একে অপরের বিপরীতে পর্যবসিত করার প্রয়োজন নেই।
নির্বাচন আসবে এবং যাবে। দল জিতবে এবং হারবে। এই আবর্তন গণতন্ত্রের জন্য অপরিহার্য। কিন্তু ফলাফলের গাণিতিক হিসেবের বাইরে অন্য কিছু অবশ্যই টিকে থাকতে হবে। সেই স্বীকৃতিটি হলো– যখন একজন নারী পূর্ণাঙ্গভাবে জায়গা দখলের জন্য জেদ ধরেন, তখন তিনি কেবল রাজনীতিতে অংশগ্রহণই করেন না, বরং রাজনীতির শর্তগুলোকেও বদলে দেন। তার পরাজয় নির্বাচনী পাটিগণিতের অংশ হতে পারে, কিন্তু তার ক্যারিয়ার যে প্রশ্নগুলো তুলেছে তা এক বিশাল পটভূমির অংশ।
প্রকৃত পরীক্ষা নির্বাচনে নারীদের জয়-পরাজয়ের মধ্যে নয়; বরং তারা যখন জয়ী বা পরাজিত হন, তখন আমরা তাদের কীভাবে মূল্যায়ন করি তার মধ্যে নিহিত। ‘খেলা হবে’ কেবল একটি স্লোগান ছিল না; এটি ছিল এমন একটি স্থানে প্রবেশের ঘোষণা, যা নারীদের নিজস্ব শর্তে জায়গা দেওয়ার জন্য তৈরি করা হয়নি। মমতা সেই খেলাটি খেলেছেন। এখন প্রশ্ন হলো, আরও বেশি নারী মাঠের কেন্দ্রে আসবেন কি না এবং আমরা তাদের সংকুচিত হওয়ার কথা না বলে স্বাধীনভাবে খেলতে দিতে প্রস্তুত কি না।
লেখিকা: ভারতের সুপ্রিম কোর্টের একজন আইনজীবী এবং কংগ্রেস পার্টির জাতীয় মুখপাত্র।
(লেখাটি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের সৌজন্যে প্রকাশিত)

পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচনের সমীকরণ বদলে গেছে। কিন্তু একটি গভীর প্রশ্ন এখনো রয়ে গেছে–একজন নারীর ক্ষমতার ওপর নিয়ন্ত্রণকে কেন নেতৃত্বের অধিকারের বদলে আজও কেবল অবাধ্যতা বা স্পর্ধা হিসেবে দেখা হয়? এখানে আগ্রহ কেবল একক কোনো ব্যক্তির প্রতি নয়, বরং তার এই দীর্ঘ পথচলা নারীর নেতৃত্বের অধিকারের ক্ষেত্রে বিদ্যমান সামাজিক ও রাজনৈতিক শর্তাবলী সম্পর্কে কী প্রকাশ করে–সেটাই মূল বিষয়।
‘খেলা হবে’– একসময় স্লোগানটি প্রতিবাদের কণ্ঠস্বর হিসেবে ধ্বনিত হয়েছিল। কিন্তু একটি নির্বাচনী পরাজয়ের পরবর্তী নিস্তব্ধতায় এটি এখন অন্য কিছুর কথা মনে করিয়ে দেয়। আর তা হলো, নারীদের জন্য এই খেলার ময়দান কখনোই সমান ছিল না। এই নির্বাচন চক্রটি একটি নাটকীয় দৃশ্যগত বৈসাদৃশ্য তৈরি করেছে।
ভারতের চারটি প্রধান রাজ্যে নেতৃত্বের লড়াই মূলত পুরুষদের দ্বারাই সংজ্ঞায়িত হয়েছে। আসাম, তামিলনাড়ু এবং কেরালায় ক্ষমতার মুখগুলো ছিল মূলত পুরুষতান্ত্রিক। পশ্চিমবঙ্গ সেখানে আলাদা হয়ে দাঁড়িয়েছে কেবল রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার কারণে নয়, বরং এই লড়াইয়ের কেন্দ্রে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নামের একজন নারীকে স্থাপন করার কারণে।
এই পার্থক্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, যখন একজন নারী কেবল উপস্থিত থাকেন না, বরং ক্ষমতার কেন্দ্রে অবস্থান করেন, তখন তার মূল্যায়নের মানদণ্ড বদলে যায়। রাজনৈতিক পরাজয়ের পরের দিন মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি হলো, একজন নেতাকে কেবল সংখ্যার হিসেবে বিচার করা। কয়টি আসন জয় হলো, কয়টি হারালো, কিংবা কত ভোটের ব্যবধানে পরিবর্তন এল।
কিন্তু কঠিন কাজ হলো এটি জিজ্ঞাসা করা যে, একটি রাজনৈতিক জীবন সেই ব্যবস্থা সম্পর্কে কী প্রকাশ করে, যার মধ্যে সে বসবাস করছে। আগ্রহের জায়গা কেবল একজন ব্যক্তি নয়, বরং তার পথচলা নারী নেতৃত্বের সুযোগ ও শর্তগুলোকে কীভাবে উন্মোচিত করে, সেটাই দেখার বিষয়।
বিশ্বজুড়ে নারীর সাথে ক্ষমতার সম্পর্ক সবসময়ই কিছুটা অস্বস্তিকর। ইরানে নারীরা তাদের শরীর ও পরিচয়ের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য কারাবরণ এবং সহিংসতার ঝুঁকি নিচ্ছেন। অন্যান্য গণতন্ত্রেও রাজনীতিতে নারীদের আচরণকে একটি সংকীর্ণ গণ্ডির মধ্যে বিচার করা হয়, যেখানে তাদের শক্তিকে প্রায়ই বাড়াবাড়ি এবং উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে সীমালঙ্ঘন হিসেবে তুলে ধরা হয়। প্রশ্নটি থেকেই যায়, একজন নারী কতটুকু জায়গা দখল করলে তাকে ‘অতিরিক্ত’ বা ‘মাত্রাতিরিক্ত’ হিসেবে গণ্য করা হবে?
ভারত এই উত্তেজনাকে তার নিজস্ব উপায়ে প্রতিফলিত করে। এখানে এমন অনেক নারী নেতা তৈরি হয়েছেন, যারা বিভিন্ন আঙ্গিকে ক্ষমতা প্রয়োগ করেছেন। সোনিয়া গান্ধী সাংগঠনিক ধৈর্য ও সংযমের মাধ্যমে একটি জাতীয় দলের দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। সুষমা স্বরাজ তার মানবিক ও গ্রহণযোগ্য বাচনভঙ্গির মাধ্যমে আদর্শিক সীমানা পেরিয়ে সবার শ্রদ্ধা অর্জন করেছিলেন।

এই দৃষ্টিভঙ্গিগুলো ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু তারা সবাই একটি সাধারণ সীমাবদ্ধতার মধ্য দিয়ে এগিয়েছেন–একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি, যা নারীর নেতৃত্বের সীমানা নির্ধারণ করে দেয়। এই প্রেক্ষাপটেই মমতার রাজনৈতিক জীবন বিশ্লেষণের জন্য অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। তার পথচলা কেবল এক ব্যক্তির উত্থানের গল্প নয়; বরং এটি একটি কেস স্টাডি যে, কোনো উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া রাজনৈতিক নেটওয়ার্ক ছাড়াই একটি পুরুষতান্ত্রিক রাজনৈতিক স্পেসে টিকে থাকতে একজন নারীকে কী ধরনের সংগ্রাম করতে হয়। তিনি যে প্রায়শই সংঘাতময় এবং উচ্চকিত পদ্ধতি গ্রহণ করেছেন, তা মূলত একটি কাঠামোগত বাস্তবতারই প্রতিফলন। আর তা হলো, উত্তরাধিকারহীনভাবে ক্ষমতায় প্রবেশের জন্য এক ভিন্নধর্মী রাজনৈতিক ভাষার প্রয়োজন ছিল।
এখানেই অসামঞ্জস্যতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। মমতাকে প্রায়শই অস্থির, কর্কশ বা জেদি হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। এই তকমাগুলো কেবল বর্ণনা নয়, বরং তার ব্যক্তিত্বকে একটি নির্দিষ্ট ছকে বাঁধার চেষ্টা। একই ধরনের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য পুরুষ নেতাদের মধ্যে থাকলে সেটিকে দৃঢ়তা বা আত্মপ্রত্যয় হিসেবে দেখা হয়। এই পার্থক্যই ক্ষমতার প্রতি দৃষ্টিভঙ্গিকে বদলে দেয়।
রাজনীতিতে অংশগ্রহণ না করেও যেসব তরুণী দূর থেকে চিত্রগুলোর মাধ্যমে রাজনীতিকে দেখছেন, তাদের জন্য এই মুহূর্তগুলো একটি নীরব শিক্ষা বহন করে।
একই সাথে, তার রাজনীতির সমালোচনা কেবল ভাষার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। তার দলের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক সহিংসতার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে এবং পশ্চিমবঙ্গে সুশাসনের অভাব নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। এই উদ্বেগগুলোকে উপেক্ষা করা যায় না। কিন্তু প্রশ্ন হলো, জনসমক্ষে হওয়া এই সমালোচনা কি শাসনব্যবস্থা ও জবাবদিহির ওপর নিবদ্ধ থাকে, নাকি এটি প্রায়ই একজন নারীর আচরণের ব্যক্তিগত বিশ্লেষণে পর্যবসিত হয়?
এই পার্থক্যটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যখন কাঠামোগত প্রশ্নগুলোকে ব্যক্তিগত আচরণের সংজ্ঞায় নামিয়ে আনা হয়, তখন বিশ্লেষণ সংকীর্ণ হয়ে পড়ে এবং মানদণ্ড হয়ে দাঁড়ায় অসম।
রাজনীতিতে অংশগ্রহণ না করেও যেসব তরুণী দূর থেকে চিত্রগুলোর মাধ্যমে রাজনীতিকে দেখছেন, তাদের জন্য এই মুহূর্তগুলো একটি নীরব শিক্ষা বহন করে। তারা কেবল নির্বাচনের ফলাফল দেখছেন না, বরং তারা দেখছেন কত দ্রুত কর্তৃত্বকে ব্যর্থতা হিসেবে সাজানো যায়, কত সহজে আত্মবিশ্বাসকে বাড়াবাড়ি হিসেবে গণ্য করা হয় এবং কীভাবে অবিচল থাকাকে অবাধ্যতা হিসেবে রঙ দেওয়া হয়।
সেই অর্থে, ‘খেলা হবে’ স্লোগানটি রাজনীতির ঊর্ধ্বে একটি রূপক হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটি একটি ভিন্ন প্রশ্ন উত্থাপন করে: মাঠের কেন্দ্রে খেলার সুযোগ কে পায়? দীর্ঘ সময় ধরে নারীরা প্রান্তিক পর্যায়ে উপস্থিত থেকেছেন, অংশগ্রহণ করেছেন। কিন্তু খেলার গতিপ্রকৃতি নির্ধারণ করতে পারেননি। মমতার মতো নেতারা যে সংকেত, দেন তা হলো, আদর্শিক মতভিন্নতা যাই থাকুক না কেন, কেন্দ্রে প্রবেশ করা সম্ভব, তবে তার জন্য একটি চড়া মূল্য দিতে হয়। এই মূল্য কোনো একজন নির্দিষ্ট নেতার বা একটি নির্বাচনের জন্য আলাদা নয়। এটি একটি বিশ্বজনীন মুহূর্তের অংশ, যেখানে তেহরানের রাস্তা থেকে দিল্লির আইনসভা পর্যন্ত নারীরা ক্ষমতার সাথে তাদের সম্পর্কের নতুন করে সংজ্ঞা নির্ধারণ করছেন।
এটি আমাদের ঘরের কাছের একটি পুনরাবৃত্তিমূলক ধরণ নিয়ে ভাবারও সময়: এক নারীকে অন্য নারীর বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে দেওয়ার প্রবণতা। কে নারীদের বেশি প্রতিনিধিত্ব করেন, কে বেশি সেবা দেন, কিংবা কার নেতৃত্ব ‘সঠিক’ ধরণের– এসব নিয়ে প্রতিযোগিতামূলক দাবি। একটি গণতন্ত্রে এই পার্থক্যগুলো অনিবার্য। কিন্তু যখন এক নারীর বৈধতা অন্য নারীকে খাটো করার ওপর ভিত্তি করে গড়ে তোলা হয়, তখন সেখানে সীমাবদ্ধ মানসিকতাই কাজ করে। রাজনীতিতে নারীরা তাদের আদর্শ, মেজাজ এবং পদ্ধতিতে ভিন্ন হবেন এবং এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু তাদের বোঝার জন্য একে অপরের বিপরীতে পর্যবসিত করার প্রয়োজন নেই।
নির্বাচন আসবে এবং যাবে। দল জিতবে এবং হারবে। এই আবর্তন গণতন্ত্রের জন্য অপরিহার্য। কিন্তু ফলাফলের গাণিতিক হিসেবের বাইরে অন্য কিছু অবশ্যই টিকে থাকতে হবে। সেই স্বীকৃতিটি হলো– যখন একজন নারী পূর্ণাঙ্গভাবে জায়গা দখলের জন্য জেদ ধরেন, তখন তিনি কেবল রাজনীতিতে অংশগ্রহণই করেন না, বরং রাজনীতির শর্তগুলোকেও বদলে দেন। তার পরাজয় নির্বাচনী পাটিগণিতের অংশ হতে পারে, কিন্তু তার ক্যারিয়ার যে প্রশ্নগুলো তুলেছে তা এক বিশাল পটভূমির অংশ।
প্রকৃত পরীক্ষা নির্বাচনে নারীদের জয়-পরাজয়ের মধ্যে নয়; বরং তারা যখন জয়ী বা পরাজিত হন, তখন আমরা তাদের কীভাবে মূল্যায়ন করি তার মধ্যে নিহিত। ‘খেলা হবে’ কেবল একটি স্লোগান ছিল না; এটি ছিল এমন একটি স্থানে প্রবেশের ঘোষণা, যা নারীদের নিজস্ব শর্তে জায়গা দেওয়ার জন্য তৈরি করা হয়নি। মমতা সেই খেলাটি খেলেছেন। এখন প্রশ্ন হলো, আরও বেশি নারী মাঠের কেন্দ্রে আসবেন কি না এবং আমরা তাদের সংকুচিত হওয়ার কথা না বলে স্বাধীনভাবে খেলতে দিতে প্রস্তুত কি না।
লেখিকা: ভারতের সুপ্রিম কোর্টের একজন আইনজীবী এবং কংগ্রেস পার্টির জাতীয় মুখপাত্র।
(লেখাটি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের সৌজন্যে প্রকাশিত)