অপারেশন ম্যাডম্যান: ট্রাম্পকে ঠেকাতে যে ছক কষেছিল ইরান

অপারেশন ম্যাডম্যান: ট্রাম্পকে ঠেকাতে যে ছক কষেছিল ইরান
ছবি: এআই দিয়ে বানানো

গত শনিবারে ইরানে যৌথভাবে হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। যুদ্ধের প্রথম দিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছিলেন, ইরানে প্রকৃত পরিবর্তন আসবে দেশের ভেতর থেকেই। তাদের ধারণা ছিল, সামরিক অভিযানে দুর্বল হয়ে পড়া সরকারের বিরুদ্ধে রাস্তায় ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু হতে পারে এবং সেটিই সরকার পতনের কারণ হতে পারে।

কিন্তু তাদের আশার গুঁড়ে রীতিমত বালি পড়তে দেখা গেছে। কারণ যেমনটা ভেবেছিলেন, এখন পর্যন্ত এমন কিছুই ঘটেনি। বরং ইরানের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণে যুক্তরাষ্ট্র কতটা ভূমিকা নেবে-এ বিষয়ে ট্রাম্প প্রায় প্রতিদিনই নিজের অবস্থান বদলেছেন।

গত শুক্রবার ট্রাম্প বলেন, যুদ্ধ শেষে ইরানে যদি আবারও একটি স্বৈরাচারী ধর্মীয় নেতৃত্ব থাকে, তাতেও তার আপত্তি নেই। যদি না তারা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ‘অন্যায্য আচরণ’ করে।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমস এক প্রতিবেদনে বলছে, হোয়াইট হাউস থেকে ইরানের এমন কিছু কর্মকর্তাকে চিহ্নিত করা হয়েছিল, দেশটির শীর্ষ নেতৃত্ব নিহত হলে যারা দ্রুত যুদ্ধ শেষ করার জন্য আলোচনায় বসতে রাজি হতে পারেন।

তবে গোয়েন্দা তথ্যে জানা যায়, হোয়াইট হাউস যাদের সম্ভাব্য আলোচনাকারী হিসেবে ভাবছিল, তাদের কয়েকজন যুদ্ধের প্রথম দিকের হামলায় নিহত হন এবং পরে তেহরানে হামলায় আরও কয়েকজন মারা যান। এ কারণে হোয়াইট হাউস নতুন রাজনৈতিক কৌশল খুঁজতে শুরু করে।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলার পরও ইরানের মৌলিক ক্ষমতা কাঠামো অক্ষত রয়েছে। সরকারের বিভিন্ন শাখার প্রধান এবং অনেক শীর্ষ রাজনৈতিক নেতা এখনও জীবিত আছেন এবং নিহত সামরিক কমান্ডারদের জায়গায় নতুনদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ফলে ট্রাম্প ও তার শীর্ষ উপদেষ্টারা পরবর্তী পথ নির্ধারণে এখনও পরিস্থিতি যাচাই করছেন বলে প্রতিবেদনে জানিয়েছে নিউইয়র্ক পোস্ট।

আবার, শুক্রবার ইরানের কাছে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ দাবি করেন ট্রাম্প। এতে মার্কিন কর্মকর্তারা ধারণা করছেন, এই সংঘাত কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত দীর্ঘায়িত হতে পারে।

ট্রাম্প বলেছেন, বর্তমান সরকার ভেঙে পড়লে ইরানের পরবর্তী নেতৃত্ব কে হবে-সেখানে তারও মতামত থাকবে। তবে এখন এমন কাউকে খুঁজে বের করা কঠিন হবে, যিনি একদিকে দেশের ভেতরে গ্রহণযোগ্য নেতৃত্ব দিতে পারবেন এবং অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কাজ করতেও রাজি থাকবেন।

গোয়েন্দা প্রতিবেদনে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে, ভবিষ্যতে যেই ক্ষমতায় আসুক না কেন, ইরানের ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক কাঠামো সম্ভবত টিকে থাকবে।

অপারেশন ম্যাডম্যান: যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলকে ঠেকাতে ইরানের প্রস্তুতি

ইরানে যতটা সহজে জয় পাবেন বলে আশা করেছিলেন ট্রাম্প, বাস্তবে তার উল্টো চিত্রই দেখা গেছে। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলার জবাবে উপসাগরীয় দেশগুলোর মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করেছে ইরান।

ফাইল ছবি
ফাইল ছবি

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে দুই হাজারের বেশি স্বল্পমূল্যের ড্রোন হামলা চালিয়েছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এর উদ্দেশ্য আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেঙে দেওয়া এবং পুরো অঞ্চলে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা। এ পর্যন্ত মার্কিন বাহিনীর ওপর সবচেয়ে প্রাণঘাতী হামলাটি হয়েছে কুয়েতে একটি সামরিক ঘাঁটিতে। সেখানে ইরানের ড্রোন হামলার ঘটনায় ছয়জন মার্কিন সেনা নিহত হন।

ইরানের নেতৃত্বে শূন্যতা তৈরি করা এবং সামরিকভাবে দুর্বল করে দেওয়ার পশ্চিমা পরিকল্পনার সামনে এখনও টিকে আছে ইরান। যা অনেককেই বিম্মিত করেছে।

নিউইয়র্ক টাইমসের এক বিশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত জুনে ১২ দিনের যুদ্ধের পর ইরানি কর্মকর্তারা দ্বিতীয় একটি সম্ভাব্য যুদ্ধের জন্য একটি কৌশল তৈরি করেন, যার নাম দেওয়া হয় ‘অপারেশন ম্যাডম্যান’।

ছয়জন ইরানি কর্মকর্তা নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেছেন, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনি নির্দেশ দিয়েছিলেন, যদি আবার ইরানের ওপর হামলা হয়, বিশেষ করে যদি তাকে হত্যা করা হয়, তাহলে পুরো মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত ছড়িয়ে দিতে হবে। একই সঙ্গে যুদ্ধের সময় ক্ষমতার শূন্যতা এড়াতে সামরিক কমান্ডার ও কর্মকর্তাদের জন্য চার স্তরের উত্তরসূরি নির্ধারণ করা হয়।

এই পরিকল্পনার উদ্দেশ্য ছিল ইরানের সঙ্গে যুদ্ধকে শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের জন্য নয়, বরং আরব দেশগুলোর অর্থনীতি, পর্যটন, জ্বালানি বাজার, পরিবহন ও নৌপরিবহনের জন্যও অত্যন্ত ব্যয়বহুল করে তোলা।

ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকারের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা মাহদি মোহাম্মদি সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশিত এক অডিও বিশ্লেষণে বলেন, “আমরা জানি যুক্তরাষ্ট্র একটি আঞ্চলিক যুদ্ধ নিয়ে খুবই উদ্বিগ্ন। এতে তাদের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং তাদের মিত্ররাও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।”

মাহদি আরও বলেন, “আমাদের পরিকল্পনা হলো যুদ্ধের পরিধি এবং সময় দুটোই বাড়ানো। এটিই ট্রাম্পকে সবচেয়ে বড় আঘাত দিতে পারে, এবং আমাদের অন্য কোনো বিকল্প নেই।”

অপারেশন ম্যাডম্যানের এই পরিকল্পনার প্রথম ধাপে ইসরায়েলের ওপর হামলা, দ্বিতীয় ধাপে আরব দেশগুলোতে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে আক্রমণ এবং তৃতীয় ধাপে বিমানবন্দর, হোটেল বা দূতাবাসের মতো বেসামরিক স্থাপনাগুলোতে আরও বিস্তৃত আক্রমণ করার কথা বলা হয়েছে।

যুদ্ধ শুরু হওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই ইরান এই তিনটি ধাপই বাস্তবায়ন করেছে বলে জানানো হয়।

জর্জ ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটির মধ্যপ্রাচ্য রাজনীতি বিষয়ের সহকারী অধ্যাপক সিনা আজোদি বলেন, “এটি তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া নয়। ইরানের সামরিক পরিকল্পনা দীর্ঘদিন ধরে তৈরি করা হয়েছে, যাতে আঞ্চলিক মিত্রদের ওপর চাপ বাড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্রকেও বড় মূল্য দিতে বাধ্য করা যায়।”

নিউইয়র্ক টাইমস বলছে, যুদ্ধ শুরুর কয়েক সপ্তাহ আগেই ইরান তার কৌশল সম্পর্কে প্রতিবেশী দেশগুলোর কাছে কোনো গোপনীয়তা রাখেনি। ইরানি কর্মকর্তারা মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন আরব দেশের কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিয়মিত বৈঠক করে সতর্ক করেছিলেন যে, যদি ইরানের ওপর হামলা হয়, তাহলে তারা যেখানে সম্ভব যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ ও স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করবে। এমনকি এর ফলে পুরো অঞ্চল যুদ্ধে জড়িয়ে পড়লেও তারা পিছপা হবেন না।

আরব দেশের কর্মকর্তারা এসব সতর্কবার্তাকে গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছিলেন। তারা বারবার ট্রাম্প প্রশাসনের কাছে অনুরোধ জানিয়েছিলেন, যেন ইরানের ওপর হামলা থেকে বিরত থাকা হয়।

উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর দিকে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়ে ইরান এমন একটি কৌশল ব্যবহার করছে, যা অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করে ট্রাম্প ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক নেতাদের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে প্রভাব পড়তেও শুরু করেছে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন অনেক বিশ্লেষক।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্ব জ্বালানি বাজার কয়েক দশকের মধ্যে অন্যতম বড় ধাক্কার মুখে পড়তে পারে। ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আশঙ্কায় উপসাগরীয় অঞ্চলের কিছু জ্বালানি স্থাপনা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হয়েছে। এর মধ্যে কাতারের এলএনজি স্থাপনাও রয়েছে, যা বৈশ্বিক সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশের সঙ্গে যুক্ত। ফলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা আরও বেড়েছে।

এমিরেটস পলিসি সেন্টারের প্রেসিডেন্ট এবতেসাম আল কেতবি রয়টার্সকে বলেন, বর্তমান যে হারে হামলা চলছে, তা অব্যাহত থাকলে এবং দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত মোকাবিলা করতে উপসাগরীয় অঞ্চল ব্যর্থ হলে তেল পরিবহন পথ ব্যাহত হওয়া বা হরমুজ প্রণালী বন্ধ হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে। এতে বৈশ্বিক স্বার্থ সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় অন্যান্য দেশও পরিস্থিতিতে হস্তক্ষেপ করতে পারে।

সম্পর্কিত