রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন আর কত দিন থাকবেন

রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন আর কত দিন থাকবেন
কার্টুন চরচা

রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন আর কতদিন পদে থাকবেন, সেটি নির্ভর করছে ক্ষমতাসীন বিএনপির ওপর।

চব্বিশের আগস্টে গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যূত হলে জুলাই যোদ্ধাদের একাংশ তখনই আওয়ামী লীগের রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগ দাবি করেছিলেন। এক পর্যায়ে তারা বঙ্গভবনও ঘেরাও করেন। কিন্তু সাংবিধানিক শূন্যতা তৈরি হবে, এই যুক্তিতে বিএনপি সেটি সমর্থন করেনি। ফলে ‘স্বৈরাচারের আমলের রাষ্ট্রপতি’ই থেকে যান এবং রাষ্ট্র সংস্কারের লক্ষ্যে যে সাংবিধানিক আদেশ হয়, সেটাতেও তিনি স্বাক্ষর করেন।

ছাত্রদের দল হিসেবে পরিচিত জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের স্বাক্ষরে সাংবিধানিক আদেশ দেওয়ার পক্ষপাতী ছিল। কিন্তু সে রকম কিছু হলে ভবিষ্যতে এর আইনি ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন উঠবে, এই বিবেচনায় সেই চিন্তাও বাদ দেওয়া হয়।

সে সময়ে বলা হয়েছিল, স্পিকার না থাকায় রাষ্ট্রপতি স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করতে পারেন না। জাতীয় সংসদ না থাকায় তার বিরুদ্ধে অনাস্থাও আনা যাচ্ছে না। এই প্রেক্ষাপটে সবাই নির্বাচনের জন্য অপেক্ষা করেছিলেন। ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন হয়ে গেছে, সংসদ ও সরকারও গঠিত হয়েছে। কিন্তু এখনো অধিবেশন আহ্বান করা হয়নি। সংসদ সদস্যরা শপথ গ্রহণের এক মাসের মধ্যে অধিবেশন ডাকার বিধান আছে। আশা করা যায়, শিগগিরই অধিবেশন ডাকা হবে। প্রশ্ন হলো অধিবেশন ডাকলেই কি বর্তমান রাষ্ট্রপতি চলে যাবেন?

ক্ষমতাসীন দলের সূত্রে জানা গেছে, তারা এসব নিয়ে ধীরে এগোতে চান। তাড়াহুড়া করার পক্ষপাতী নন। নতুন সংসদ গঠিত হওয়ার পর দুভাবে রাষ্ট্রপতি বিদায় নিতে পারেন। তার বিরুদ্ধে সংসদ সদস্যদের অভিশংসন বা ইমপিচমেন্ট আনা কিংবা স্বেচ্ছায় পদত্যাগ।

বিভিন্ন মহলের সমালোচনার জবাবে রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন ১১ ডিসেম্বর রয়টার্সের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, “আমি বিদায় নিতে আগ্রহী। আমি এখান থেকে চলে যেতে চাই। নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত আমাকে দায়িত্ব পালন করতে হবে। সাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব রয়েছে বলেই আমি এ অবস্থানে আছি।”

সংবিধানের ৫০ (৩) ধারায় বলা আছে, স্পিকারের উদ্দেশ্যে স্বাক্ষরযুক্ত পত্রযোগে রাষ্ট্রপতি তার পদ থেকে পদত্যাগ করতে পারবেন। বিএনপির শীর্ষ মহলের ধারণা, নতুন স্পিকারের কাছে পদত্যাগপত্র পাঠিয়ে রাষ্ট্রপতির পদ থেকে সরে যেতে পারেন মো. সাহাবুদ্দিন। এ রকম হলে জাতীয় সংসদের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতিকে সরানোর কোনো পদক্ষেপ তাদের নিতে হবে না।

এদিকে ইসি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, রাষ্ট্রপতি নিজেই কয়েকবার পদে না থাকার কথা বিভিন্ন মিডিয়ায় বলেছেন। বিভিন্ন মহল থেকে বিষয়টি নিয়ে আলোচনাও হচ্ছে। তাই তারা প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছেন। সংবিধানের ৫০ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, (১) এই সংবিধানের বিধানাবলি সাপেক্ষে রাষ্ট্রপতি কার্যভার গ্রহণের তারিখ হইতে পাঁচ বৎসরের মেয়াদে তাহার পদে অধিষ্ঠিত থাকবেন: তবে শর্ত থাকে যে, রাষ্ট্রপতির পদের মেয়াদ শেষ হওয়া সত্ত্বেও তাহার উত্তরাধিকারী-কার্যভার গ্রহণ না করা পর্যন্ত তিনি স্বীয় পদে বহাল থাকবেন।

(২) একাদিক্রমে হউক বা না হউক-দুই মেয়াদের অধিক রাষ্ট্রপতির পদে কোনো ব্যক্তি অধিষ্ঠিত থাকবেন না।

(৩) স্পিকারের উদ্দেশে স্বাক্ষরযুক্ত পত্রযোগে রাষ্ট্রপতি স্বীয় পদত্যাগ করিতে পারবেন।

(৪) রাষ্ট্রপতি তাহার কার্যভারকালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হইবার যোগ্য হইবেন না এবং কোনো সংসদ সদস্য রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হইলে রাষ্ট্রপতিরূপে তাহার কার্যভার গ্রহণের দিনে সংসদে তাহার আসন শূন্য হইবে।

রাষ্ট্রপতির অভিশংসন

অভিসংশন নিয়ে সংবিধানের ৫২ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে–

(১) এই সংবিধান লঙ্ঘন বা গুরুতর অসদাচরণের অভিযোগে রাষ্ট্রপতিকে অভিশংসিত করা যাইতে পারবে; এর জন্য সংসদের মোট সদস্যের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশের স্বাক্ষরে অনুরূপ অভিযোগের বিবরণ লিপিবদ্ধ করে একটি প্রস্তাবের নোটিশ স্পিকারের কাছে দিতে হবে; স্পিকারের কাছে নোটিশ দেওয়ার দিন হতে ১৪ দিনের পূর্বে বা ৩০ দিনের পর এই প্রস্তাব আলোচিত হইতে পারবে না; এবং সংসদ অধিবেশনরত না থাকলে স্পিকার অবিলম্বে সংসদ আহ্বান করবেন।

(২) এই অনুচ্ছেদের অধীন কোনো অভিযোগ তদন্তের জন্য সংসদ কর্তৃক নিযুক্ত বা আখ্যায়িত কোনো আদালত, ট্রাইব্যুনাল বা কর্তৃপক্ষের কাছে সংসদ রাষ্ট্রপতির আচরণ গোচর করিতে পারবেন।

(৩) অভিযোগ-বিবেচনাকালে রাষ্ট্রপতির উপস্থিত থাকবার এবং প্রতিনিধি-প্রেরণের অধিকার থাকবে।

(৪) অভিযোগ-বিবেচনার পর মোট সদস্য-সংখ্যার অন্যূন দুই-তৃতীয়াংশ ভোটে অভিযোগ যথার্থ বলিয়া ঘোষণা করিয়া সংসদ কোনো প্রস্তাব গ্রহণ করিলে প্রস্তাব গৃহীত হওয়ার তারিখে রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হইবে।

সংবিধানের ৪৮ (১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের একজন রাষ্ট্রপতি থাকবেন, যিনি আইন অনুযায়ী সংসদ সদস্যদের দ্বারা নির্বাচিত হবেন।

কিন্তু নির্বাচনটি গোপন না প্রকাশ্য হবে সে বিষয়ে নির্দিষ্ট করে কিছু বলা নেই। নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানের পর একবারই রাষ্ট্রপতি পদে ভোটাভুটি হয়েছিল, ১৯৯১ সালে। ক্ষমতাসীন বিএনপির প্রার্থী ছিলেন আবদুর রহমান বিশ্বাস ও বিরোধী দলের বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরী। এরপর কোনো নির্বাচনে রাষ্ট্রপতি পদে একাধিক প্রার্থী না থাকায় গোপন ভোটের প্রয়োজন হয়নি।

বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের প্রেস উইং জানিয়েছিল, এবারে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নতুন পদ্ধতিতে হবে। নিম্নকক্ষ ও উচ্চকক্ষের সদস্যদের গোপন ভোটে তিনি নির্বাচিত হবেন।

সংসদ সদস্যদের শপথ নিয়ে নতুন সাংবিধানিক সমস্যা দেখা দিয়েছে। সার্বজনীন ভোটের মাধ্যমে ১২ ফেব্রুয়ারি নিম্নকক্ষ গঠিত হলেও উচ্চকক্ষের বিষয়ে এখনো সিদ্ধান্ত হয়নি। বিরোধী দলের দাবি, আনুপাতিক ভোটের ভিত্তিতে উচ্চকক্ষ গঠিত হবে। বিএনপির ৩১ দফা তথা নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী, নিম্নকক্ষের আসনের ভিত্তিতে।

বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা সাংবিধানিক আদেশ মেনে জাতীয় সংসদ সদস্যের পাশাপাশি সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবেও শপথ নিয়েছেন। বিএনপির সদস্যরা কেবল সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নিয়েছেন। তারা যুক্তি দেখিয়েছেন, যে পরিষদ গঠিতই হয়নি, সেই পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নিতে পারেন না। বিরোধী দল, বিএনপির এই অবস্থানের সমালোচনা করে বলেছে, তারা জুলাই চেতনাকে অবজ্ঞা ও অগ্রাহ্য করেছে।

সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়া না নেওয়া নিয়ে সংবিধান বিশেষজ্ঞরাও দ্বিধাবিভক্ত। এক পক্ষ বলেছেন, জুলাই সনদে সই করার পর প্রত্যেক সদস্যের এটি নৈতিক দায়িত্ব। অন্যপক্ষের মতে, ভোটারেরা তাদের সংসদ সদস্য হিসেবেই নির্বাচিত করেছেন। সেখানে অন্য কোনো শপথ নেওয়ার সুযোগ নেই।

এই বিতর্কের অবসান না হওয়া পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের বিষয়টিও অনিশ্চিত না হলেও বিলম্বিত হবে। সেক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন কিছু দিন সময় পাচ্ছেন বলে ধরে নেওয়া যায়। বিএনপির নেতৃত্বও তাড়াহুড়া করতে চাইছে না।

লেখক: সম্পাদক, চরচা।

সম্পর্কিত