এটি একই সঙ্গে প্রমাণ করে যে, মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলকে বিচ্ছিন্ন করার ইরানি পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়েছে। এই ফাঁসের মাধ্যমে নেতানিয়াহু সংযুক্ত আরব আমিরাতকে তাদের মধ্যকার সহযোগিতার সম্পর্কটিকে আরও বেশি দৃশ্যমান করার জন্য এক প্রকার বাধ্য করছেন, যা আবুধাবি সবসময় পর্দার আড়ালে রাখতে পছন্দ করে।
চরচা ডেস্ক

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কার্যালয় থেকে কিছুদিন আগে প্রকাশিত একটি সংক্ষিপ্ত অথচ নাটকীয় বিবৃতিকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে নতুন করে আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। ওই বিবৃতিতে দাবি করা হয়, ইরানের সাথে যুদ্ধ চলাকালে নেতানিয়াহু সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) সফর করেন এবং প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ বিন জায়েদের সাথে একটি ‘ঐতিহাসিক ও যুগান্তকারী’ বৈঠক করেন। তবে এই তথ্য জনসমক্ষে আসতেই সংযুক্ত আরব আমিরাতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে এটিকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দেয়। এবং স্মরণ করিয়ে দেয় যে, ২০২০ সালের আব্রাহাম অ্যাকর্ডসের অধীনে দুই দেশের সম্পর্ক সম্পূর্ণ খোলামেলা।
মিডল ইস্ট আই-তে প্রকাশিত আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক বিশ্লেষক ও ইবনে খালদুন সেন্টারের সহকারী গবেষণা অধ্যাপক আলী বাকির বিষয়টি একটু গভীরভাবে দেখার চেষ্টা করেছেন। তিনি বোঝার চেষ্টা করেছেন, কেন ইসরায়েল এটা ফাঁস করে দিল। তিনি লিখেছেন, ইসরায়েলি গণমাধ্যম, বিশেষ করে নেতানিয়াহুর ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ‘দ্য টাইমস অব ইসরায়েল’ আবুধাবির এই অস্বীকারকে ভুল প্রমাণ করতে সফরের নিখুঁত বিবরণ প্রকাশ করে। তাদের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, বৈঠকটি ২৬ মার্চ ওমানের সীমান্তবর্তী আল-আইন শহরের একটি প্রাসাদে কয়েক ঘণ্টা ধরে চলে। এবং বিমানবন্দর থেকে প্রাসাদে যাওয়ার সময় খোদ মোহাম্মদ বিন জায়েদ নিজের ব্যক্তিগত গাড়িতে নেতানিয়াহুকে বসিয়ে নিজে চালিয়ে নিয়ে যান। একই সাথে বিভিন্ন ফ্লাইট-ট্র্যাকিং ডেটা এবং নেতানিয়াহুর সাবেক চিফ অব স্টাফ জিভ অ্যাগমনের ফেসবুক পোস্ট এই সফরের সত্যতা নিশ্চিত করে। আলী বাকিরের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই ঘটনার মূল বিতর্ক সফরটি নিয়ে নয়। বরং প্রশ্ন হলো, কেন নেতানিয়াহু এই অত্যন্ত সংবেদনশীল ও গোপন সফরের তথ্য ইচ্ছাকৃতভাবে ফাঁস করলেন। আর কেনই বা আবুধাবি এটি পুরোপুরি অস্বীকার করার পথ বেছে নিল।
আলী বাকিরের মতে, এই তথ্য ফাঁসের পেছনে নেতানিয়াহুর নিজস্ব গভীর রাজনৈতিক ও কৌশলগত হিসাব-নিকাশ কাজ করছে। ইসরায়েলের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদে দায়িত্ব পালনকারী এই প্রধানমন্ত্রী বর্তমানে একাধারে নিজ দেশে দুর্নীতির মামলা, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) গ্রেপ্তারি পরোয়ানা এবং আসন্ন নির্বাচনের তীব্র চাপের মুখে রয়েছেন। এই পরিস্থিতিতে নিজেকে আন্তর্জাতিকভাবে একঘরে হওয়া নেতার পরিবর্তে একজন প্রভাবশালী রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে প্রমাণ করার জন্য তার একটি বড় কূটনৈতিক সাফল্যের প্রয়োজন ছিল। তাই যুদ্ধ চলাকালে একটি প্রভাবশালী আরব দেশের প্রেসিডেন্টের সাথে এই গোপন বৈঠকের কথা প্রকাশ করে নেতানিয়াহু মূলত ইসরায়েলি জনগণকে এই বার্তা দিতে চেয়েছেন যে, গাজা যুদ্ধ বা ইরানের সাথে সংঘাতের পরেও আব্রাহাম অ্যাকর্ডস অটুট রয়েছে।
এটি একই সাথে প্রমাণ করে যে মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলকে বিচ্ছিন্ন করার ইরানি পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়েছে। এই ফাঁসের মাধ্যমে নেতানিয়াহু সংযুক্ত আরব আমিরাতকে তাদের মধ্যকার সহযোগিতার সম্পর্কটিকে আরও বেশি দৃশ্যমান করার জন্য এক প্রকার বাধ্য করছেন, যা আবুধাবি সবসময় পর্দার আড়ালে রাখতে পছন্দ করে। আলী বাকির তার বিশ্লেষণে উল্লেখ করেছেন যে, এই ঘটনার মাধ্যমে আমিরাত যদি শেষ পর্যন্ত বৈঠকের কথা স্বীকার করে তবে তা নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক লিগ্যাসি বা গৌরব হিসেবে গণ্য হবে। আর যদি তারা অস্বীকার করে যায়, তবুও নেতানিয়াহু ইতিমধ্যে মিডিয়াতে যা চেয়েছিলেন সেই ফায়দা লুটে নিয়েছেন। এছাড়া এই ফাঁসের পেছনে ইরানের প্রতি একটি প্রচ্ছন্ন সামরিক ও গোয়েন্দা সতর্কবার্তাও ছিল। যা মূলত এটিই দেখায় যে একটি পুরোদস্তুর যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতেও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী এবং তার গোয়েন্দা ও সামরিক প্রধানরা অনায়াসে উপসাগরীয় অঞ্চলে যাতায়াত করতে সক্ষম।
অন্য দিকে, সংযুক্ত আরব আমিরাতের এই সফর অস্বীকার করার পেছনে বেশ কিছু গুরুতর অভ্যন্তরীণ ও আঞ্চলিক বাধ্যবাধকতা রয়েছে বলে আলী বাকির মনে করেন। প্রথমত, গাজার ভয়াবহ পরিস্থিতির পর মধ্যপ্রাচ্যের সাধারণ জনমনে যে তীব্র ইসরায়েল-বিরোধী ক্ষোভ তৈরি হয়েছে, সেই বাস্তবতায় নেতানিয়াহুর মতো একজন বিতর্কিত নেতাকে স্বাগত জানানোর কথা স্বীকার করা আবুধাবির জন্য চরম রাজনৈতিক ও সামাজিক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। যদিও সংযুক্ত আরব আমিরাত নিজেদের পরমতসহিষ্ণুতা এবং সহাবস্থানের কেন্দ্র হিসেবে প্রচার করে। কিন্তু যুদ্ধ পরিস্থিতিতে ইসরায়েলের সাথে এমন ঘনিষ্ঠ সামরিক ও গোয়েন্দা আঁতাত তাদের নিজস্ব জনগণের মধ্যেও অসন্তোষ তৈরি করতে পারত।
দ্বিতীয়ত, ২০২১ সালের উপসাগরীয় সংকটের অবসানের পর থেকে তুরস্ক এবং কাতারের মতো আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সাথে আমিরাত যে নতুন করে সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা চালাচ্ছিল, নেতানিয়াহুর এই একতরফা তথ্য ফাঁস সেই প্রচেষ্টাকে মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত করেছে। বিশেষ করে ইয়েমেন, সোমালিয়া, সুদান ও লিবিয়ার মতো সংঘাতে আরব আমিরাতকে যখন অনেকেই ইসরায়েলের প্রক্সি বা প্রতিনিধি হিসেবে সন্দেহ করছে, তখন এই গোপন সফরের খবর তাদের আঞ্চলিকভাবে আরও বেশি কোণঠাসা ও সমালোচিত করে তুলেছে।
আলী বাকির আরও উল্লেখ করেছেন যে, ইরানের সামরিক চাপও আবুধাবির এই অস্বীকারের অন্যতম প্রধান কারণ। যুদ্ধ চলাকালীন আমিরাতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, তাদের ভূখণ্ড লক্ষ্য করে ইরান প্রায় ৫৫০টি মিসাইল এবং ২২০০টি ড্রোন নিক্ষেপ করেছিল। এই অবস্থায় ইসরায়েলের সাথে তাদের গোয়েন্দা সহযোগিতার কথা প্রকাশ্যে স্বীকার করার অর্থ হলো ইরানের এই অভিযোগকে সত্য বলে মেনে নেওয়া যে উপসাগরীয় দেশগুলো ইসরায়েলের সহযোগী হিসেবে কাজ করছে। এটি তেহরানের কট্টরপন্থীদের আরও ক্ষুব্ধ করতে পারত, যার ফলে আমিরাতের ওপর নতুন করে এমন সব সামরিক হামলা আসতে পারত যা সামাল দেওয়ার সক্ষমতা তাদের নেই।
তদুপরি, আরব আমিরাতের মূল অর্থনৈতিক ভিত্তি দাঁড়িয়ে আছে আন্তর্জাতিক পুঁজি, বৈশ্বিক প্রতিভা এবং পর্যটনের ওপর একটি নিরাপদ ও স্থিতিশীল হাব বা কেন্দ্র হিসেবে। ইরানের সাথে যুদ্ধের মধ্যে ইসরায়েলের সাথে এমন প্রকাশ্য নিরাপত্তা অংশীদারিত্ব তাদের সেই অর্থনৈতিক ব্র্যান্ড বা ভাবমূর্তিকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে, যা বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আশঙ্কিত করে তুলবে। উপরন্তু, কূটনৈতিক রীতিনীতি লঙ্ঘন করে নেতানিয়াহুর এই আকস্মিক ও একতরফা প্রকাশকে আবুধাবির শাসকগোষ্ঠী তাদের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির সস্তা হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের একটি নোংরা চেষ্টা বলে মনে করেছে, যা তাদের আত্মসম্মানে আঘাত হেনেছে।

আলী বাকির এই ঘটনার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট টেনে দেখিয়েছেন যে, নেতানিয়াহুর পক্ষ থেকে এমন গোপন সফর ফাঁসের ঘটনা এটিই প্রথম নয়। এর আগে ২০২০ সালের শেষের দিকে তিনি সৌদি আরবের নেওম শহরে ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানের সাথে তার একটি গোপন বৈঠকের খবর একইভাবে ফাঁস করে দিয়েছিলেন। সে সময় রিয়াদ এই চালটি ধরে ফেলে এবং ইসরায়েলের সাথে স্বাভাবিকীকরণের প্রক্রিয়া থেকে নিজেদের পিছিয়ে নিয়ে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করে, যা আজও বহাল রয়েছে। নেতানিয়াহুর এই সাম্প্রতিক পদক্ষেপ হয়তো স্বাভাবিকীকরণের বিষয়ে সৌদি আরবের সেই অনড় অবস্থানকে আরও জোরালো করবে।
তবে সংযুক্ত আরব আমিরাতের ক্ষেত্রে এটি কতটা প্রভাব ফেলবে তা দেখার বিষয়, কারণ ইসরায়েলের সাথে আবুধাবির সম্পর্ক সৌদির তুলনায় অনেক বেশি গভীর এবং প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছে। তবুও আলী বাকিরের মতে, নেতানিয়াহুর এই ফাঁসের ফলে সংযুক্ত আরব আমিরাতের নীতিনির্ধারকদের মধ্যেও এখন এই প্রশ্নটি উঠতে শুরু করেছে যে, ইসরায়েলের সাথে এই সম্পর্কের জন্য তারা যে বিশাল রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা মূল্য দিচ্ছে তা আসলেই দীর্ঘমেয়াদে যুক্তিযুক্ত কি না, নাকি এটি তাদের নিজস্ব কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনকে খর্ব করে এমন এক সংঘাতে জড়িয়ে ফেলছে যার নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতে নেই।

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কার্যালয় থেকে কিছুদিন আগে প্রকাশিত একটি সংক্ষিপ্ত অথচ নাটকীয় বিবৃতিকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে নতুন করে আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। ওই বিবৃতিতে দাবি করা হয়, ইরানের সাথে যুদ্ধ চলাকালে নেতানিয়াহু সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) সফর করেন এবং প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ বিন জায়েদের সাথে একটি ‘ঐতিহাসিক ও যুগান্তকারী’ বৈঠক করেন। তবে এই তথ্য জনসমক্ষে আসতেই সংযুক্ত আরব আমিরাতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে এটিকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দেয়। এবং স্মরণ করিয়ে দেয় যে, ২০২০ সালের আব্রাহাম অ্যাকর্ডসের অধীনে দুই দেশের সম্পর্ক সম্পূর্ণ খোলামেলা।
মিডল ইস্ট আই-তে প্রকাশিত আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক বিশ্লেষক ও ইবনে খালদুন সেন্টারের সহকারী গবেষণা অধ্যাপক আলী বাকির বিষয়টি একটু গভীরভাবে দেখার চেষ্টা করেছেন। তিনি বোঝার চেষ্টা করেছেন, কেন ইসরায়েল এটা ফাঁস করে দিল। তিনি লিখেছেন, ইসরায়েলি গণমাধ্যম, বিশেষ করে নেতানিয়াহুর ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ‘দ্য টাইমস অব ইসরায়েল’ আবুধাবির এই অস্বীকারকে ভুল প্রমাণ করতে সফরের নিখুঁত বিবরণ প্রকাশ করে। তাদের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, বৈঠকটি ২৬ মার্চ ওমানের সীমান্তবর্তী আল-আইন শহরের একটি প্রাসাদে কয়েক ঘণ্টা ধরে চলে। এবং বিমানবন্দর থেকে প্রাসাদে যাওয়ার সময় খোদ মোহাম্মদ বিন জায়েদ নিজের ব্যক্তিগত গাড়িতে নেতানিয়াহুকে বসিয়ে নিজে চালিয়ে নিয়ে যান। একই সাথে বিভিন্ন ফ্লাইট-ট্র্যাকিং ডেটা এবং নেতানিয়াহুর সাবেক চিফ অব স্টাফ জিভ অ্যাগমনের ফেসবুক পোস্ট এই সফরের সত্যতা নিশ্চিত করে। আলী বাকিরের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই ঘটনার মূল বিতর্ক সফরটি নিয়ে নয়। বরং প্রশ্ন হলো, কেন নেতানিয়াহু এই অত্যন্ত সংবেদনশীল ও গোপন সফরের তথ্য ইচ্ছাকৃতভাবে ফাঁস করলেন। আর কেনই বা আবুধাবি এটি পুরোপুরি অস্বীকার করার পথ বেছে নিল।
আলী বাকিরের মতে, এই তথ্য ফাঁসের পেছনে নেতানিয়াহুর নিজস্ব গভীর রাজনৈতিক ও কৌশলগত হিসাব-নিকাশ কাজ করছে। ইসরায়েলের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদে দায়িত্ব পালনকারী এই প্রধানমন্ত্রী বর্তমানে একাধারে নিজ দেশে দুর্নীতির মামলা, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) গ্রেপ্তারি পরোয়ানা এবং আসন্ন নির্বাচনের তীব্র চাপের মুখে রয়েছেন। এই পরিস্থিতিতে নিজেকে আন্তর্জাতিকভাবে একঘরে হওয়া নেতার পরিবর্তে একজন প্রভাবশালী রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে প্রমাণ করার জন্য তার একটি বড় কূটনৈতিক সাফল্যের প্রয়োজন ছিল। তাই যুদ্ধ চলাকালে একটি প্রভাবশালী আরব দেশের প্রেসিডেন্টের সাথে এই গোপন বৈঠকের কথা প্রকাশ করে নেতানিয়াহু মূলত ইসরায়েলি জনগণকে এই বার্তা দিতে চেয়েছেন যে, গাজা যুদ্ধ বা ইরানের সাথে সংঘাতের পরেও আব্রাহাম অ্যাকর্ডস অটুট রয়েছে।
এটি একই সাথে প্রমাণ করে যে মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলকে বিচ্ছিন্ন করার ইরানি পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়েছে। এই ফাঁসের মাধ্যমে নেতানিয়াহু সংযুক্ত আরব আমিরাতকে তাদের মধ্যকার সহযোগিতার সম্পর্কটিকে আরও বেশি দৃশ্যমান করার জন্য এক প্রকার বাধ্য করছেন, যা আবুধাবি সবসময় পর্দার আড়ালে রাখতে পছন্দ করে। আলী বাকির তার বিশ্লেষণে উল্লেখ করেছেন যে, এই ঘটনার মাধ্যমে আমিরাত যদি শেষ পর্যন্ত বৈঠকের কথা স্বীকার করে তবে তা নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক লিগ্যাসি বা গৌরব হিসেবে গণ্য হবে। আর যদি তারা অস্বীকার করে যায়, তবুও নেতানিয়াহু ইতিমধ্যে মিডিয়াতে যা চেয়েছিলেন সেই ফায়দা লুটে নিয়েছেন। এছাড়া এই ফাঁসের পেছনে ইরানের প্রতি একটি প্রচ্ছন্ন সামরিক ও গোয়েন্দা সতর্কবার্তাও ছিল। যা মূলত এটিই দেখায় যে একটি পুরোদস্তুর যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতেও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী এবং তার গোয়েন্দা ও সামরিক প্রধানরা অনায়াসে উপসাগরীয় অঞ্চলে যাতায়াত করতে সক্ষম।
অন্য দিকে, সংযুক্ত আরব আমিরাতের এই সফর অস্বীকার করার পেছনে বেশ কিছু গুরুতর অভ্যন্তরীণ ও আঞ্চলিক বাধ্যবাধকতা রয়েছে বলে আলী বাকির মনে করেন। প্রথমত, গাজার ভয়াবহ পরিস্থিতির পর মধ্যপ্রাচ্যের সাধারণ জনমনে যে তীব্র ইসরায়েল-বিরোধী ক্ষোভ তৈরি হয়েছে, সেই বাস্তবতায় নেতানিয়াহুর মতো একজন বিতর্কিত নেতাকে স্বাগত জানানোর কথা স্বীকার করা আবুধাবির জন্য চরম রাজনৈতিক ও সামাজিক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। যদিও সংযুক্ত আরব আমিরাত নিজেদের পরমতসহিষ্ণুতা এবং সহাবস্থানের কেন্দ্র হিসেবে প্রচার করে। কিন্তু যুদ্ধ পরিস্থিতিতে ইসরায়েলের সাথে এমন ঘনিষ্ঠ সামরিক ও গোয়েন্দা আঁতাত তাদের নিজস্ব জনগণের মধ্যেও অসন্তোষ তৈরি করতে পারত।
দ্বিতীয়ত, ২০২১ সালের উপসাগরীয় সংকটের অবসানের পর থেকে তুরস্ক এবং কাতারের মতো আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সাথে আমিরাত যে নতুন করে সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা চালাচ্ছিল, নেতানিয়াহুর এই একতরফা তথ্য ফাঁস সেই প্রচেষ্টাকে মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত করেছে। বিশেষ করে ইয়েমেন, সোমালিয়া, সুদান ও লিবিয়ার মতো সংঘাতে আরব আমিরাতকে যখন অনেকেই ইসরায়েলের প্রক্সি বা প্রতিনিধি হিসেবে সন্দেহ করছে, তখন এই গোপন সফরের খবর তাদের আঞ্চলিকভাবে আরও বেশি কোণঠাসা ও সমালোচিত করে তুলেছে।
আলী বাকির আরও উল্লেখ করেছেন যে, ইরানের সামরিক চাপও আবুধাবির এই অস্বীকারের অন্যতম প্রধান কারণ। যুদ্ধ চলাকালীন আমিরাতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, তাদের ভূখণ্ড লক্ষ্য করে ইরান প্রায় ৫৫০টি মিসাইল এবং ২২০০টি ড্রোন নিক্ষেপ করেছিল। এই অবস্থায় ইসরায়েলের সাথে তাদের গোয়েন্দা সহযোগিতার কথা প্রকাশ্যে স্বীকার করার অর্থ হলো ইরানের এই অভিযোগকে সত্য বলে মেনে নেওয়া যে উপসাগরীয় দেশগুলো ইসরায়েলের সহযোগী হিসেবে কাজ করছে। এটি তেহরানের কট্টরপন্থীদের আরও ক্ষুব্ধ করতে পারত, যার ফলে আমিরাতের ওপর নতুন করে এমন সব সামরিক হামলা আসতে পারত যা সামাল দেওয়ার সক্ষমতা তাদের নেই।
তদুপরি, আরব আমিরাতের মূল অর্থনৈতিক ভিত্তি দাঁড়িয়ে আছে আন্তর্জাতিক পুঁজি, বৈশ্বিক প্রতিভা এবং পর্যটনের ওপর একটি নিরাপদ ও স্থিতিশীল হাব বা কেন্দ্র হিসেবে। ইরানের সাথে যুদ্ধের মধ্যে ইসরায়েলের সাথে এমন প্রকাশ্য নিরাপত্তা অংশীদারিত্ব তাদের সেই অর্থনৈতিক ব্র্যান্ড বা ভাবমূর্তিকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে, যা বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আশঙ্কিত করে তুলবে। উপরন্তু, কূটনৈতিক রীতিনীতি লঙ্ঘন করে নেতানিয়াহুর এই আকস্মিক ও একতরফা প্রকাশকে আবুধাবির শাসকগোষ্ঠী তাদের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির সস্তা হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের একটি নোংরা চেষ্টা বলে মনে করেছে, যা তাদের আত্মসম্মানে আঘাত হেনেছে।

আলী বাকির এই ঘটনার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট টেনে দেখিয়েছেন যে, নেতানিয়াহুর পক্ষ থেকে এমন গোপন সফর ফাঁসের ঘটনা এটিই প্রথম নয়। এর আগে ২০২০ সালের শেষের দিকে তিনি সৌদি আরবের নেওম শহরে ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানের সাথে তার একটি গোপন বৈঠকের খবর একইভাবে ফাঁস করে দিয়েছিলেন। সে সময় রিয়াদ এই চালটি ধরে ফেলে এবং ইসরায়েলের সাথে স্বাভাবিকীকরণের প্রক্রিয়া থেকে নিজেদের পিছিয়ে নিয়ে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করে, যা আজও বহাল রয়েছে। নেতানিয়াহুর এই সাম্প্রতিক পদক্ষেপ হয়তো স্বাভাবিকীকরণের বিষয়ে সৌদি আরবের সেই অনড় অবস্থানকে আরও জোরালো করবে।
তবে সংযুক্ত আরব আমিরাতের ক্ষেত্রে এটি কতটা প্রভাব ফেলবে তা দেখার বিষয়, কারণ ইসরায়েলের সাথে আবুধাবির সম্পর্ক সৌদির তুলনায় অনেক বেশি গভীর এবং প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছে। তবুও আলী বাকিরের মতে, নেতানিয়াহুর এই ফাঁসের ফলে সংযুক্ত আরব আমিরাতের নীতিনির্ধারকদের মধ্যেও এখন এই প্রশ্নটি উঠতে শুরু করেছে যে, ইসরায়েলের সাথে এই সম্পর্কের জন্য তারা যে বিশাল রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা মূল্য দিচ্ছে তা আসলেই দীর্ঘমেয়াদে যুক্তিযুক্ত কি না, নাকি এটি তাদের নিজস্ব কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনকে খর্ব করে এমন এক সংঘাতে জড়িয়ে ফেলছে যার নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতে নেই।