Advertisement Banner

আওয়ামী লীগ ‘নিষিদ্ধ’ থাকায় বিএনপির কী লাভ

আওয়ামী লীগ ‘নিষিদ্ধ’ থাকায় বিএনপির কী লাভ
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানে পতন হয় আওয়ামী লীগ সরকারের। দলটির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ভাঙচুর ও আগুন ধরিয়ে দেয় বিক্ষোভকারীরা। ছবি: চরচা

বর্তমান জাতীয় সংসদে যেই বিরল কয়েকটি বিষয়ে ক্ষমতাসীন বিএনপি ও বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী, এনসিপি মতৈক্যে পৌঁছেছে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ রাখা। এর মাধ্যমে তারা অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা অধ্যাদেশটি আইনে পরিণত করল। যদিও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা সম্পর্কিত অনেক অধ্যাদেশ তারা নির্বিচারে রহিত করে দিয়েছে। এক্ষেত্রে রাজনৈতিক লাভক্ষতির চেয়েও জরুরি প্রশ্ন হলো, এতে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা কতটা শক্তিশালী হবে? না প্রতিপক্ষকে অদৃশ্য করার মধ্য দিয়ে নিজের শক্তি বাড়ানোর পুরনো কৌশলই বিএনপি গ্রহণ করল?

ইতিহাসে রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করার মোক্ষম আইনি অস্ত্রটি ব্যবহারের বহু নজির আছে। পাকিস্তান আমলে দীর্ঘ সময় কমিউনিস্ট পার্টি নিষিদ্ধ ছিল। আবার ১৯৫৩ সালে কাদিয়ানি দাঙ্গাকে কেন্দ্র করে জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। স্বাধীনতার পর ধর্মের ভিত্তিতে দল করার অনুমতি ছিল না। তদুপরি একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা ও দখলদার পাকিস্তানি বাহিনীর সহায়ক ভূমিকা পালনের জন্য মুসলিম লীগ, জামায়াত, পিডিপি ও নেজামে ইসলামকে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত এসব দল নিষিদ্ধই ছিল।

পঁচাত্তরের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর জিয়াউর রহমানের শাসনামলে প্রথমে আইডিএলের নামে জামায়াত রাজনীতি করার সুযোগ পায়। ততদিনে ধর্মীয় দলগুলোর ওপর থেকেও নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়। একই সময়ে কমিউনিস্ট পার্টি ও খন্দকার মোশতাক আহমদের ডেমোক্রেটিক লীগকেও নিষিদ্ধ করা হয়েছিল নির্দিষ্ট সময়ের জন্য।

১৯৭৯ সালের নির্বাচনের পর জামায়াত নিজের নামে আবির্ভূত হওয়ার পর দলটিকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। বিএনপি ও আওয়ামী লীগ দুই দলই একে অপরকে ঠেকাতে জামায়াত ও জাতীয় পার্টিকে পক্ষে নিয়েছে। বিএনপিকে ঠেকাতে আওয়ামী লীগ অন্তত তিনটি নির্বাচনে জাতীয় পার্টিকে ডামি বিরোধী দল করছিল। বিগত নির্বাচনে আওয়ামী লীগ অংশগ্রহণের সুযোগ পেলে ভোটের হিসেব নিকেশ বদলে যেত এবং জামায়াত প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আবির্ভূত নাও হতে পারত।

আওয়ামী লীগ তার কৃতকর্মের ফল ভোগ করবে। অতীতে আরও অনেক দলের ভাগ্যে সেটি ঘটেছে। কিন্তু আওয়ামী লীগকে আইন করে নিষিদ্ধ করার পক্ষে কী যুক্তি থাকতে পারে? দলের যেসব নেতা হত্যা ও দমনপীড়নের সঙ্গে জড়িত ছিলেন, তাদের বিচার হোক। কিন্তু দল হিসেবে আওয়ামী লীগকে নেই করে দেওয়া হলে অন্য দলকেও একই পরিণতির জন্য প্রস্তুত থাকতে হতে পারে। কোনো দল রাজনীতি করতে পারবে কি না সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার মালিক জনগণ। তাদের হাতেই বিষয়টি ছেড়ে দেওয়া উচিত।

লেখক গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ লিখেছেন, বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের রাজনীতি নিষিদ্ধ আর জামায়াতে ইসলামী সংসদের প্রধান বিরোধী দল–এটা বাংলাদেশের রাজনীতির বড় প্যারাডক্স। সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শাহদীন মালিক চরচার সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, সরকার যদি আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করে, সেটা হবে পৃথিবীতে দ্বিতীয় উদাহরণ স্বাধীনতা যুদ্ধে জয়ী হওয়া দলটির এই ভাগ্য বরণ করা। এর আগে ঘানার স্বাধীনতা যুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী দলটিকে নিষিদ্ধ করেছিল দেশটির পরবর্তী শাসক।

অন্তর্বর্তী সরকার যখন আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করেছিল তখন দেশে স্বাভাবিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়া ছিল না। সদ্য বিদায়ী ক্ষমতাসীন দলটির বিরুদ্ধে প্রতিক্রয়াও ছিল প্রবল। সেই প্রতিক্রিয়া জনপরিসরে যে এখন নেই তার প্রমাণ বিগত নির্বাচনে সব দলই আওয়ামী লীগ সমর্থকদের ভোট পাওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছিল।

অন্তবর্তী সরকারের ভিত ছিল দুর্বল। তদুপরি অদৃশ্য আওয়ামী লীগের প্রতি তাদের ভয় ছিল, যদি তারা প্রকাশ্যে আসে নির্বাচনটি করা সম্ভব নাও হতে পারে। কিন্তু নির্বাচিত সরকারের সেই ভয় থাকার কথা নয়।

তারপরও আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ রাখার বিধানটি আইনে পরিণত করার পেছনে কি এক ঢিলে দুই পাখি মারার কৌশল কি না সেই প্রশ্নও উঠেছে। প্রথমত এর মাধ্যমে তারা বিরোধী পক্ষকে ‘সন্তুষ্ট’ করল। তাদের কাছে আওয়ামী লীগে রাজনীতি নিষিদ্ধ রাখাই প্রধান সংস্কার।

গত বুধবার জাতীয় সংসদে এ–সংক্রান্ত ‘সন্ত্রাসবিরোধী (সংশোধন) বিল’ পাস হয়। পাস হওয়া বিলে অধ্যাদেশের বিষয়বস্তুতে কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি। অধ্যাদেশের মাধ্যমে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে সংশোধনী এনে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ও তার নেতাদের বিচার কার্যসম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত দলটির যাবতীয় কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকার।

এর আগে, সন্ত্রাসবিরোধী আইনে কোনো সত্তার কার্যক্রম নিষিদ্ধের বিধান ছিল না। তখন বলা ছিল, কোনো ব্যক্তি বা সত্তা সন্ত্রাসী কাজের সঙ্গে জড়িত থাকলে সরকার প্রজ্ঞাপন দিয়ে ওই ব্যক্তিকে তফসিলে তালিকাভুক্ত করতে পারে বা সত্তাকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করতে পারবে। তবে অধ্যাদেশের মাধ্যমে সংশোধনী এনে সত্তার যাবতীয় কার্যক্রম নিষিদ্ধের বিধান যুক্ত করা হয়েছে।

বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ৯৮টি হুবহু এবং ১৫টি সংশোধিত আকারে সংসদে অনুমোদের সুপারিশ করেছিল জাতীয় সংসদের বিশেষ কমিটি। বাকি ২০টির মধ্যে ৪টি রহিত করা হয় এবং ১৬টি পরবর্তী সময়ে আরও শক্তিশালী করে নতুন বিল আনার সুপারিশ করা হয়।

২০২৫ সালের ১১ মে সন্ত্রাসবিরোধী আইন সংশোধনে জারি করা অধ্যাদেশ গেজেট আকারে প্রকাশ করে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার। তখন সংসদ কার্যকর না থাকায় আইনটি অধিকতর সংশোধন করে আশু ব্যবস্থা নিতে সংবিধানের ৯৩ (১) অনুচ্ছেদে দেওয়া ক্ষমতাবলে রাষ্ট্রপতি অধ্যাদেশ জারি করেন। পরে তা গেজেট আকারে প্রকাশ করা হয়। যার ধারাবাহিকতায় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ অধিবেশনে গত বুধবার (৮ এপ্রিল) দুপুরে জাতীয় সংসদে এ সংক্রান্ত ‘সন্ত্রাসবিরোধী (সংশোধন) বিল’ পাস হয়। কিন্তু, পাস হওয়া বিলে অধ্যাদেশের বিষয়বস্তুতে কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি।

এখানে অন্তর্বর্তী সরকার ও বিএনপি সরকার উভয়ই চালাকির আশ্রয় নিয়েছে। এর আগে যত রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে সেখানে সংগঠনকেই নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এখানে দল নয় কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়েছে। প্রশ্ন হলো, একটি রাজনৈতিক দলের সত্তা ও কার্যক্রমের মধ্যে ফারাক কী। রাজনৈতিক দলের প্রধান কাজ হলো সভাসমাবেশের মাধ্যমে জনমত তৈরি করা, দলীয় নীতি ও আদর্শ জনগণের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া।

কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় সেই কাজটি আওয়ামী লীগ করতে পারবে না। তাহলে করবে কি? এর মাধ্যমে দলটির ওপর জনগণের যে ক্ষোভ ছিল সেটা প্রশমিত হবে। বরং তাদের সহানুভূতি পাবে আওয়ামী লীগ।

ক্ষমতায় থাকতে আওয়ামী লীগ বিএনপির ওপর দমনপীড়ন চালিয়েছে। হাজার হাজার নেতা-কর্মীকে গায়েবি মামলায় জেলে পাঠিয়েছে। কিন্তু তারা দল নিষিদ্ধ করেনি। বিএনপি সরকার তার জবাব দিল অন্তর্বর্তী সরকারের ঘাড়ে বন্দুক রেখে।

কিন্তু অন্তর্বর্ন্তী সরকার যখন সন্ত্রাসদমন আইনে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করেছিল, তখন বিএনপি নেতাদের কণ্ঠে ভিন্ন কথা শোনা গেছে। তারা বলেছিলেন, আইন করে কোনো দলকে নিষিদ্ধ করাকে বিএনপি সমর্থন করে না। ভোটের মাধ্যমেই জনগণ রায় দিক কোনো দল রাজনীতিতে থাকবে কি থাকবে না। কিন্তু বাস্তবতা হলো আওয়ামী লীগকে প্রকাশ্য রাখার ঝুঁকি যেমন অন্তর্বর্তী সরকার নেয়নি, বিএনপি সরকারও নিতে চায় না।

কিন্তু সরকারের এই সিদ্ধান্ত আখেরে কি দেশের গণতন্ত্রের ভিত শক্তিশালী করবে? বিএনপি যদি তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে উচিত শিক্ষা দিতে অন্তর্বর্তী সরকারের অন্যায় অধ্যাদেশকে আইনে পরিণত করে থাকে, ভবিষ্যতে তাদেরও একই পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত থাকতে হতে পারে। রাজনীতির মাঠে আওয়ামী লীগ প্রতিপক্ষ থাকলে খেলাটা সমানে সমান হবে। আর জামায়াতে ইসলামী বা অন্য কোনো দল থাকলে তাকেও আরও ডানপন্থার দিকে ঝুঁকতে হবে।

লেখক: সম্পাদক, চরচা।

সম্পর্কিত