অর্ণব সান্যাল

ডোনাল্ড ট্রাম্প। বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি।
ওপরের তিনটি নামই এখন সারা বিশ্বের সবচেয়ে আলোচিত নাম। প্রথম দুজনের নাম নিতে হচ্ছে একটি স্বাধীন দেশে আক্রমণের নির্দেশ দেওয়ার কারণে। তাদের কৃতকর্মের কারণেই আসছে তৃতীয় ব্যক্তির নাম। কারণ স্বাধীন দেশ ইরানে হামলা চালিয়ে প্রথম দুজন হত্যা করেছেন খামেনিকে।
এমন ঘটনাকে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা বলে অভিহিত করা হচ্ছে বিশ্বব্যাপী। বলা হচ্ছে, এর মধ্য দিয়ে বৈশ্বিক ব্যবস্থায় ‘যা খুশি তাই’ করার ট্রেন্ড চালু হচ্ছে। কিন্তু এই ‘যা খুশি তাই’ কি আগেও হতো না? হতো, তবে তা হয়তো বেশি হতো একটি নির্দিষ্ট দেশের গণ্ডির মধ্যে কেবল। আর ঠিক এ জায়গাতেই সমান্তরালে অবস্থান করে ট্রাম্প, নেতানিয়াহু কিংবা খামেনিও।
চলুন, এই তিন নেতার বিষয়েই আলাদা আলাদাভাবে একটু জানা যাক। সেসব তথ্য অবশ্যই অস্বস্তি জাগানিয়া। যেসব জানতে জানতে এক সময় একটি নির্দিষ্ট শ্রেণি বা গোষ্ঠীবদ্ধ মানুষের ছবি ফুটে ওঠে মানসপটে। তাতে ট্রাম্প, নেতানিয়াহু বা খামেনির মধ্যে আর পার্থক্য আঁকা যায় না। মনে হতে থাকে, সবই যেন এক!

ডোনাল্ড ট্রাম্প দিয়েই শুরু করা যাক। বর্তমান বিশ্ব ব্যবস্থাকে ছেলেখেলায় পরিণত করার মূল কারিগর আমেরিকার বর্তমান প্রেসিডেন্ট। এবার যা শুরু করেছেন, তাতে এটি স্পষ্ট যে, আগের মেয়াদে শুধু ‘রঙ’ দেখানোর চেষ্টা করেছিলেন ট্রাম্প। আর এখন দেখাচ্ছেন ‘রঙের ডিব্বা’! ট্রাম্পের বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ নেই? আমেরিকায় একনায়কতন্ত্র চালুর অভিযোগ আছে তার বিরুদ্ধে। আছে নারীবিরোধী নানা মন্তব্য করার অভিযোগ। নারীদের শুধুই পণ্য বোধ করানোর মতো অসংখ্য মন্তব্য করেছেন বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট। একইসঙ্গে তুমুল বর্ণবাদী আচরণও করে চলেছেন ট্রাম্প। আগের মেয়াদেও করেছেন, এখনও করছেন। সাদা চামড়াই তার কাছে শ্রেষ্ঠত্বের প্রতীক। এবং এই বিষয়টি তিনি বারবার সবাইকে মনে করিয়েও দেন।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে চারিত্রিক স্খলনের অভিযোগও বেশ পুরোনো। নতুন করে তা সামনে এনেছে এপস্টেইন ফাইলস। নিজের দেশেই নির্বাচনে হেরে মব উসকে ভাঙচুর চালানোর অভিযোগ আছে। যে কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ বিরল। ক্যাপিটল হিলে তাণ্ডব চালানোর মূল হোতাই ছিলেন ট্রাম্প। সেই হিসাবে অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলের কার্যক্রম চালানোর অভিযোগও ওঠে তার বিরুদ্ধে। ট্রাম্প ফ্যাসিস্ট কিনা, সেই বিতর্কও আছে ভালোমতোই। আর ওনার মুখ নিঃসৃত ‘বাণী’র বিষয়টি নিয়ে আলোচনা না করাই ভালো! ওসব লিখতে গেলে দিস্তা দিস্তা কাগজ ফুরোবে, কিন্তু অভিযোগ নয়।
তা এমন একজন রাষ্ট্রনায়ক, যিনি কিনা দেশের ভেতরেই তাণ্ডব চালিয়েছেন বহুবার, তিনি এবার সেই অস্থিরতা নিয়ে এসেছেন দেশের বাইরে। এক দেশের প্রেসিডেন্টকে অপহরণ করছেন, তো আরেক দেশের প্রেসিডেন্টকে বাড়িতে গিয়ে খুন করছেন। আর ট্যারিফ নিয়ে একধরণের সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ার, বা সেটিকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে বিভিন্ন সার্বভৌম রাষ্ট্রকে দাসানুদাস বানানোর চেষ্টা তো চলছেই। সব মিলিয়ে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে উগ্রবাদী, একনায়কতান্ত্রিক, ফ্যাসিস্ট, বর্ণবাদী, নারীবিরোধী, মানবতাবিরোধীসহ নানামাত্রিক ‘সচল’ অভিযোগ আছে।

বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু একই ঘরানার। নিজের দেশেই ক্ষমতা ধরে রাখার উদগ্র বাসনার জন্য তিনি কুখ্যাত। দুর্নাম আছে দমন, নিপীড়নের। সবচেয়ে বড় অভিযোগ গণহত্যা চালানোর। গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলের আধিপত্য বজায় রাখা ও বাড়ানোর জন্য ফিলিস্তিনিদের পাখির মতো গুলি করে ও বোমা মেরে হত্যার মূল কারিগর হিসেবে উচ্চারিত হয় বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নাম। ইরানে হামলার ক্ষেত্রেও মূল লাভ আসলে নেতানিয়াহুর বলেই রায় বিশ্লেষকদের। জাতিসংঘ, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল থেকে শুরু করে সব আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাই ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে চালানো গণহত্যা ও নানামাত্রিক নিপীড়নের পেছনের মানুষ হিসেবে নেতানিয়াহুর দিকেই আড়েঠারে অভিযোগের আঙুল তুলেছে।
হ্যাঁ, সরাসরি হয়তো সবাই কম বলেছে। কারণ পক্ষপাতিত্ব আসলে আছে সব জায়গাতেই। ভয়ও আছে। মাস্তানদের ভয় কে না পায়! তাই ঠিক যেভাবে আমেরিকার নিরাপত্তার কথা বলে ডোনাল্ড ট্রাম্প অন্য দেশে হামলা চালানোর কথা বলেন, তেমনি নেতানিয়াহুও ইহুদিদের রক্ষার ধুয়া তুলে নিরপরাধদের হত্যার ন্যায্যতা সৃষ্টি করেন এবং করছেন। যদি হিসাব করা যায়, তাহলে দেখা যাবে, যতবার ইসরায়েলের রাষ্ট্রক্ষমতায় বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সর্বময় কর্তা হয়েছেন, ঠিক ততোবার গাজা উপত্যকায় রক্তের বন্যা বয়ে গেছে। রক্ত অন্যান্য সময়েও ঝরেছে বটে। তবে মাত্রার বিচারে তা নেতানিয়াহুর আমলের মতো প্রচণ্ড কখনও হয়নি। কারণ নেতানিয়াহু ফিলিস্তিনিদের মানুষই মনে করেন না। তার কাছে ফিলিস্তিনিদের রক্ত নিজের ক্ষমতা ধরে রাখার ডিজেল। তাই আন্তর্জাতিক আইনের তোয়াক্কা না করে নির্বিচারে খুন করতেও বাধে না।
এমনকি এসবের প্রতিবাদ যদি নিজের দেশেও হয়, তবুও দমন, নির্যাতনে চালাতে হাত কাঁপে না বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর। ভিন্নমত দমনে তিনি সিদ্ধহস্ত। অন্য জাতি নিয়ে তার কোনো ভাবনা নেই, সেসব দুনিয়া থেকে মুছে গেলেও না। তার বিরুদ্ধে নিজের দেশেই দুর্নীতির, অসততার অসংখ্য মামলাও হয়েছে। তাই বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুও উগ্রবাদী চিন্তার ধারক। তিনি বর্ণবাদী, যুদ্ধবাজ। গণহত্যা চালানো বা মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তার কাছে ডাল–ভাতের মতো নিরীহ বিষয়।

সবশেষে আসেন আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি। ওপরের দুজনের বিষয়ে পশ্চিমা মিডিয়া বেশ রেখে–ডেকে কথা বলে থাকে। কেউ কেউ অবশ্য খুল্লামখুল্লাও প্রশ্ন তোলে। তবে সেই সংখ্যাটি কম। বিপরীত দিক থেকে খামেনির ব্যাপারে পশ্চিমা মিডিয়া বরাবরই খড়্গহস্ত। কারণ ইরানের শাসনব্যবস্থা ঠিক পশ্চিমা ধারার নয়। পশ্চিমা বিশ্বের যে সামগ্রিক সাম্রাজ্যবাদী দৃষ্টিভঙ্গি আছে, সেটিরও প্রকাশ্য বিরোধিতা করেই ইরানে গড়ে উঠেছিল প্রথমে খোমেনির, পরে খামেনির শাসন।
প্রশ্ন হলো, নানান প্রপাগান্ডা, সংশয়, বিশ্লেষণ—সব সরিয়ে রেখে খামেনির শাসনের নিরপেক্ষ মূল্যায়ন কী হবে? শুধুই কি মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিরোধিতাই সেখানে মূল নির্ধারক হবে? ইসরায়েলের বিরোধিতাই কি একমাত্র মাপকাঠি হবে? নাকি মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের রাজনীতি, সামরিক নীতি, এমনকি ইরানের সাধারণ মানুষের প্রতি খোমেনি–খামেনি প্রশাসনের দৃষ্টিভঙ্গি অন্যতম প্রভাবক হবে?
মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী নীতির বিরোধিতা অবশ্যই করে গেছে খামেনির নেতৃত্বাধীন সরকারব্যবস্থা। ইসরায়েলের বিরোধিতাও করেছে জোর গলায়। এসবের শক্তিশালী সামরিক ভিতও আছে। এতে করে ইসরায়েল বা আমেরিকাকে অবশ্যই কিছুটা রয়েসয়ে কাজও করতে হয়েছে এতদিন। ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর থেকেই এই ভূমিকায় ছিল। এখনও আছে। আবার এই করতে গিয়ে আঞ্চলিক বিচ্ছিন্নতাবাদী বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীকেও প্রণোদনা দিয়ে গেছে খামেনির ইরান। ‘এক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স’ নামের এই প্রতিরোধ ব্যবস্থায় যেমন আঞ্চলিক যূথবদ্ধতা বা প্রতিবাদ প্রতিফলিত হয়, তেমনি এর বিপরীতে বিচ্ছিন্নতবাদী সহিংসতাও ফুটে ওঠে। সহিংসতার রূপ একটাই—এতে হিংস্রতা প্রকাশিত হয়, এতে মানুষের জান যায়। এখন কোন সহিংসতা কখন ন্যায্য হয়, কখন অন্যায্য—সেই কুতর্ক চাইলে অন্তহীন চালানো যায়। কিন্তু, কথা হলো, সব সহিংসতাতেই মানুষ মরে। এবং বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষই মরে।
আবার ইরানের জনগণেরও সব অংশ যে ইসলামী বিপ্লব ও এর পর গৃহীত সব পরিবর্তনের সাথে একমত ছিলেন, তা নয়। অভিযোগ আছে, ইসলামী বিপ্লবের পর আগের রাজতন্ত্রের বিলোপের পর আদতে সাধারণের নিমিত্তে কোনো শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়নি। যদিও বিপ্লবের সময় দাবি করা হয়েছিল তেমনটাই। কিন্তু বিপ্লবের পর সেই কথা কেউ রাখেনি। ফলে ধীরে ধীরে একটি একনায়কতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থাই আবার প্রতিষ্ঠা করা হয়, যার কেন্দ্রে ছিলেন খামেনি এবং ধর্মীয় বিধির নির্দিষ্ট ব্যাখ্যা। অর্থাৎ, ওই ইরান একটি নির্দিষ্ট পক্ষের হয়ে উঠেছিল, সবার হয়নি। তবে শুধু নির্দিষ্ট পক্ষের হয়েই ক্ষান্ত থাকেনি খামেনির ইরান, বরং অন্য পক্ষভুক্তদের নিজেদের দলভুক্ত হতে জোর করেছে। সবাইকে ‘একইরকম’ বানানোর এমন প্রকল্প ফ্যাসিজমের ক্ল্যাসিক বৈশিষ্ট্য। আবার যারা ‘একরকম’ হতে চায়নি, তাদের বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দেশান্তরী হতে হয়েছে। সেই দেশান্তরী ইরানিদের আমরা দেখতে পাই খামেনির মৃত্যুতে বিভিন্ন দেশে উল্লাসরত অবস্থায়। কেউ ভেঙে পড়ে কান্নায়, আবার কাউকে পাওয়া গেছে অভিশাপের বন্যায়!
শুধু সাম্প্রতিক সময়ে ইরানে যে বিক্ষোভ হয়ে গেল, তাতেই খামেনি সরকার প্রায় ৩০ হাজার বিক্ষোভকারীকে হত্যা করেছে বলে অভিযোগ আছে। হ্যাঁ, এই সংখ্যার কম–বেশি হতেই পারে। তবে তাতে ‘হাজার হাজার’ শীর্ষক বিশেষণমূলক মাত্রা থেকে রেহাই মেলে না। কথা হলো, এসব তথ্যের বিষয়ে দশকের পর দশক ধরেই ইরান সরকার উদার নয়। বরং এসব ঢেকে রাখতেই ভালোবাসে। এর সাথে আবার আছে মাশা আমিনীর মতো নারীবিরোধী এবং ক্ষেত্রবিশেষে নারীর প্রতি নিপীড়নকারী নানা নীতি ও ঘটনার উদাহরণ। আছে ‘নীতি পুলিশ’–এর অযাচিত হস্তক্ষেপের বিভিন্ন ঘটনা। এসবে শুধু মানুষের সাধারণ অধিকারের বিরোধিতা ও সেসব লঙ্ঘনের উদাহরণই মেলে, অন্য কিছু না।
এসব হিসাব মাথায় নিলে আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির বিরুদ্ধেও তাই ‘ফ্যাসিবাদী’, ‘উগ্রবাদী’, ‘বর্ণবাদী’, ‘একনায়কতান্ত্রিক’, ‘নারীবিরোধী’ কিংবা ‘মানবতাবিরোধী’ নামের বিশেষণগুলো উঠে যায় জোরেশোরে। সেসবের বিরোধিতা করে যুক্তি দেওয়াও কঠিন। অবশ্য আবেগের বশে ভেসে গিয়ে দায়মুক্তি দেওয়া বা একচোখা দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করলে, সেটি ভিন্ন বিষয়।
সুতরাং, পৃথিবীতে যেমন বিশুদ্ধ চাকুরি নেই, ঠিক তেমনি কেবলই ন্যায়ের পক্ষের কাউকে খুঁজে পাওয়া কঠিন। বরং যে যার ‘যুক্তি’ দাঁড় করিয়ে, চালায় সেই একবগ্গা নীতিই। এতে একসময়ের মনে হওয়া ‘ভালো’ ঢুকে যায় এমন ‘খারাপ’ দুনিয়ায়, যা এড়ানোই হয়তো ছিল উদ্দেশ্য। দিনশেষে দেখা যায়, আজকের কথিত মজলুম হয়ে উঠছে আগামীর জালিম। আর যে জালিম হিসেবেই গর্ববোধ করে সর্বদা, তার আর কী অসুবিধা!
লেখক: বার্তা সম্পাদক, চরচা

ডোনাল্ড ট্রাম্প। বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি।
ওপরের তিনটি নামই এখন সারা বিশ্বের সবচেয়ে আলোচিত নাম। প্রথম দুজনের নাম নিতে হচ্ছে একটি স্বাধীন দেশে আক্রমণের নির্দেশ দেওয়ার কারণে। তাদের কৃতকর্মের কারণেই আসছে তৃতীয় ব্যক্তির নাম। কারণ স্বাধীন দেশ ইরানে হামলা চালিয়ে প্রথম দুজন হত্যা করেছেন খামেনিকে।
এমন ঘটনাকে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা বলে অভিহিত করা হচ্ছে বিশ্বব্যাপী। বলা হচ্ছে, এর মধ্য দিয়ে বৈশ্বিক ব্যবস্থায় ‘যা খুশি তাই’ করার ট্রেন্ড চালু হচ্ছে। কিন্তু এই ‘যা খুশি তাই’ কি আগেও হতো না? হতো, তবে তা হয়তো বেশি হতো একটি নির্দিষ্ট দেশের গণ্ডির মধ্যে কেবল। আর ঠিক এ জায়গাতেই সমান্তরালে অবস্থান করে ট্রাম্প, নেতানিয়াহু কিংবা খামেনিও।
চলুন, এই তিন নেতার বিষয়েই আলাদা আলাদাভাবে একটু জানা যাক। সেসব তথ্য অবশ্যই অস্বস্তি জাগানিয়া। যেসব জানতে জানতে এক সময় একটি নির্দিষ্ট শ্রেণি বা গোষ্ঠীবদ্ধ মানুষের ছবি ফুটে ওঠে মানসপটে। তাতে ট্রাম্প, নেতানিয়াহু বা খামেনির মধ্যে আর পার্থক্য আঁকা যায় না। মনে হতে থাকে, সবই যেন এক!

ডোনাল্ড ট্রাম্প দিয়েই শুরু করা যাক। বর্তমান বিশ্ব ব্যবস্থাকে ছেলেখেলায় পরিণত করার মূল কারিগর আমেরিকার বর্তমান প্রেসিডেন্ট। এবার যা শুরু করেছেন, তাতে এটি স্পষ্ট যে, আগের মেয়াদে শুধু ‘রঙ’ দেখানোর চেষ্টা করেছিলেন ট্রাম্প। আর এখন দেখাচ্ছেন ‘রঙের ডিব্বা’! ট্রাম্পের বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ নেই? আমেরিকায় একনায়কতন্ত্র চালুর অভিযোগ আছে তার বিরুদ্ধে। আছে নারীবিরোধী নানা মন্তব্য করার অভিযোগ। নারীদের শুধুই পণ্য বোধ করানোর মতো অসংখ্য মন্তব্য করেছেন বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট। একইসঙ্গে তুমুল বর্ণবাদী আচরণও করে চলেছেন ট্রাম্প। আগের মেয়াদেও করেছেন, এখনও করছেন। সাদা চামড়াই তার কাছে শ্রেষ্ঠত্বের প্রতীক। এবং এই বিষয়টি তিনি বারবার সবাইকে মনে করিয়েও দেন।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে চারিত্রিক স্খলনের অভিযোগও বেশ পুরোনো। নতুন করে তা সামনে এনেছে এপস্টেইন ফাইলস। নিজের দেশেই নির্বাচনে হেরে মব উসকে ভাঙচুর চালানোর অভিযোগ আছে। যে কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ বিরল। ক্যাপিটল হিলে তাণ্ডব চালানোর মূল হোতাই ছিলেন ট্রাম্প। সেই হিসাবে অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলের কার্যক্রম চালানোর অভিযোগও ওঠে তার বিরুদ্ধে। ট্রাম্প ফ্যাসিস্ট কিনা, সেই বিতর্কও আছে ভালোমতোই। আর ওনার মুখ নিঃসৃত ‘বাণী’র বিষয়টি নিয়ে আলোচনা না করাই ভালো! ওসব লিখতে গেলে দিস্তা দিস্তা কাগজ ফুরোবে, কিন্তু অভিযোগ নয়।
তা এমন একজন রাষ্ট্রনায়ক, যিনি কিনা দেশের ভেতরেই তাণ্ডব চালিয়েছেন বহুবার, তিনি এবার সেই অস্থিরতা নিয়ে এসেছেন দেশের বাইরে। এক দেশের প্রেসিডেন্টকে অপহরণ করছেন, তো আরেক দেশের প্রেসিডেন্টকে বাড়িতে গিয়ে খুন করছেন। আর ট্যারিফ নিয়ে একধরণের সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ার, বা সেটিকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে বিভিন্ন সার্বভৌম রাষ্ট্রকে দাসানুদাস বানানোর চেষ্টা তো চলছেই। সব মিলিয়ে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে উগ্রবাদী, একনায়কতান্ত্রিক, ফ্যাসিস্ট, বর্ণবাদী, নারীবিরোধী, মানবতাবিরোধীসহ নানামাত্রিক ‘সচল’ অভিযোগ আছে।

বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু একই ঘরানার। নিজের দেশেই ক্ষমতা ধরে রাখার উদগ্র বাসনার জন্য তিনি কুখ্যাত। দুর্নাম আছে দমন, নিপীড়নের। সবচেয়ে বড় অভিযোগ গণহত্যা চালানোর। গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলের আধিপত্য বজায় রাখা ও বাড়ানোর জন্য ফিলিস্তিনিদের পাখির মতো গুলি করে ও বোমা মেরে হত্যার মূল কারিগর হিসেবে উচ্চারিত হয় বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নাম। ইরানে হামলার ক্ষেত্রেও মূল লাভ আসলে নেতানিয়াহুর বলেই রায় বিশ্লেষকদের। জাতিসংঘ, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল থেকে শুরু করে সব আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাই ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে চালানো গণহত্যা ও নানামাত্রিক নিপীড়নের পেছনের মানুষ হিসেবে নেতানিয়াহুর দিকেই আড়েঠারে অভিযোগের আঙুল তুলেছে।
হ্যাঁ, সরাসরি হয়তো সবাই কম বলেছে। কারণ পক্ষপাতিত্ব আসলে আছে সব জায়গাতেই। ভয়ও আছে। মাস্তানদের ভয় কে না পায়! তাই ঠিক যেভাবে আমেরিকার নিরাপত্তার কথা বলে ডোনাল্ড ট্রাম্প অন্য দেশে হামলা চালানোর কথা বলেন, তেমনি নেতানিয়াহুও ইহুদিদের রক্ষার ধুয়া তুলে নিরপরাধদের হত্যার ন্যায্যতা সৃষ্টি করেন এবং করছেন। যদি হিসাব করা যায়, তাহলে দেখা যাবে, যতবার ইসরায়েলের রাষ্ট্রক্ষমতায় বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সর্বময় কর্তা হয়েছেন, ঠিক ততোবার গাজা উপত্যকায় রক্তের বন্যা বয়ে গেছে। রক্ত অন্যান্য সময়েও ঝরেছে বটে। তবে মাত্রার বিচারে তা নেতানিয়াহুর আমলের মতো প্রচণ্ড কখনও হয়নি। কারণ নেতানিয়াহু ফিলিস্তিনিদের মানুষই মনে করেন না। তার কাছে ফিলিস্তিনিদের রক্ত নিজের ক্ষমতা ধরে রাখার ডিজেল। তাই আন্তর্জাতিক আইনের তোয়াক্কা না করে নির্বিচারে খুন করতেও বাধে না।
এমনকি এসবের প্রতিবাদ যদি নিজের দেশেও হয়, তবুও দমন, নির্যাতনে চালাতে হাত কাঁপে না বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর। ভিন্নমত দমনে তিনি সিদ্ধহস্ত। অন্য জাতি নিয়ে তার কোনো ভাবনা নেই, সেসব দুনিয়া থেকে মুছে গেলেও না। তার বিরুদ্ধে নিজের দেশেই দুর্নীতির, অসততার অসংখ্য মামলাও হয়েছে। তাই বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুও উগ্রবাদী চিন্তার ধারক। তিনি বর্ণবাদী, যুদ্ধবাজ। গণহত্যা চালানো বা মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তার কাছে ডাল–ভাতের মতো নিরীহ বিষয়।

সবশেষে আসেন আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি। ওপরের দুজনের বিষয়ে পশ্চিমা মিডিয়া বেশ রেখে–ডেকে কথা বলে থাকে। কেউ কেউ অবশ্য খুল্লামখুল্লাও প্রশ্ন তোলে। তবে সেই সংখ্যাটি কম। বিপরীত দিক থেকে খামেনির ব্যাপারে পশ্চিমা মিডিয়া বরাবরই খড়্গহস্ত। কারণ ইরানের শাসনব্যবস্থা ঠিক পশ্চিমা ধারার নয়। পশ্চিমা বিশ্বের যে সামগ্রিক সাম্রাজ্যবাদী দৃষ্টিভঙ্গি আছে, সেটিরও প্রকাশ্য বিরোধিতা করেই ইরানে গড়ে উঠেছিল প্রথমে খোমেনির, পরে খামেনির শাসন।
প্রশ্ন হলো, নানান প্রপাগান্ডা, সংশয়, বিশ্লেষণ—সব সরিয়ে রেখে খামেনির শাসনের নিরপেক্ষ মূল্যায়ন কী হবে? শুধুই কি মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিরোধিতাই সেখানে মূল নির্ধারক হবে? ইসরায়েলের বিরোধিতাই কি একমাত্র মাপকাঠি হবে? নাকি মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের রাজনীতি, সামরিক নীতি, এমনকি ইরানের সাধারণ মানুষের প্রতি খোমেনি–খামেনি প্রশাসনের দৃষ্টিভঙ্গি অন্যতম প্রভাবক হবে?
মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী নীতির বিরোধিতা অবশ্যই করে গেছে খামেনির নেতৃত্বাধীন সরকারব্যবস্থা। ইসরায়েলের বিরোধিতাও করেছে জোর গলায়। এসবের শক্তিশালী সামরিক ভিতও আছে। এতে করে ইসরায়েল বা আমেরিকাকে অবশ্যই কিছুটা রয়েসয়ে কাজও করতে হয়েছে এতদিন। ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর থেকেই এই ভূমিকায় ছিল। এখনও আছে। আবার এই করতে গিয়ে আঞ্চলিক বিচ্ছিন্নতাবাদী বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীকেও প্রণোদনা দিয়ে গেছে খামেনির ইরান। ‘এক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স’ নামের এই প্রতিরোধ ব্যবস্থায় যেমন আঞ্চলিক যূথবদ্ধতা বা প্রতিবাদ প্রতিফলিত হয়, তেমনি এর বিপরীতে বিচ্ছিন্নতবাদী সহিংসতাও ফুটে ওঠে। সহিংসতার রূপ একটাই—এতে হিংস্রতা প্রকাশিত হয়, এতে মানুষের জান যায়। এখন কোন সহিংসতা কখন ন্যায্য হয়, কখন অন্যায্য—সেই কুতর্ক চাইলে অন্তহীন চালানো যায়। কিন্তু, কথা হলো, সব সহিংসতাতেই মানুষ মরে। এবং বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষই মরে।
আবার ইরানের জনগণেরও সব অংশ যে ইসলামী বিপ্লব ও এর পর গৃহীত সব পরিবর্তনের সাথে একমত ছিলেন, তা নয়। অভিযোগ আছে, ইসলামী বিপ্লবের পর আগের রাজতন্ত্রের বিলোপের পর আদতে সাধারণের নিমিত্তে কোনো শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়নি। যদিও বিপ্লবের সময় দাবি করা হয়েছিল তেমনটাই। কিন্তু বিপ্লবের পর সেই কথা কেউ রাখেনি। ফলে ধীরে ধীরে একটি একনায়কতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থাই আবার প্রতিষ্ঠা করা হয়, যার কেন্দ্রে ছিলেন খামেনি এবং ধর্মীয় বিধির নির্দিষ্ট ব্যাখ্যা। অর্থাৎ, ওই ইরান একটি নির্দিষ্ট পক্ষের হয়ে উঠেছিল, সবার হয়নি। তবে শুধু নির্দিষ্ট পক্ষের হয়েই ক্ষান্ত থাকেনি খামেনির ইরান, বরং অন্য পক্ষভুক্তদের নিজেদের দলভুক্ত হতে জোর করেছে। সবাইকে ‘একইরকম’ বানানোর এমন প্রকল্প ফ্যাসিজমের ক্ল্যাসিক বৈশিষ্ট্য। আবার যারা ‘একরকম’ হতে চায়নি, তাদের বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দেশান্তরী হতে হয়েছে। সেই দেশান্তরী ইরানিদের আমরা দেখতে পাই খামেনির মৃত্যুতে বিভিন্ন দেশে উল্লাসরত অবস্থায়। কেউ ভেঙে পড়ে কান্নায়, আবার কাউকে পাওয়া গেছে অভিশাপের বন্যায়!
শুধু সাম্প্রতিক সময়ে ইরানে যে বিক্ষোভ হয়ে গেল, তাতেই খামেনি সরকার প্রায় ৩০ হাজার বিক্ষোভকারীকে হত্যা করেছে বলে অভিযোগ আছে। হ্যাঁ, এই সংখ্যার কম–বেশি হতেই পারে। তবে তাতে ‘হাজার হাজার’ শীর্ষক বিশেষণমূলক মাত্রা থেকে রেহাই মেলে না। কথা হলো, এসব তথ্যের বিষয়ে দশকের পর দশক ধরেই ইরান সরকার উদার নয়। বরং এসব ঢেকে রাখতেই ভালোবাসে। এর সাথে আবার আছে মাশা আমিনীর মতো নারীবিরোধী এবং ক্ষেত্রবিশেষে নারীর প্রতি নিপীড়নকারী নানা নীতি ও ঘটনার উদাহরণ। আছে ‘নীতি পুলিশ’–এর অযাচিত হস্তক্ষেপের বিভিন্ন ঘটনা। এসবে শুধু মানুষের সাধারণ অধিকারের বিরোধিতা ও সেসব লঙ্ঘনের উদাহরণই মেলে, অন্য কিছু না।
এসব হিসাব মাথায় নিলে আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির বিরুদ্ধেও তাই ‘ফ্যাসিবাদী’, ‘উগ্রবাদী’, ‘বর্ণবাদী’, ‘একনায়কতান্ত্রিক’, ‘নারীবিরোধী’ কিংবা ‘মানবতাবিরোধী’ নামের বিশেষণগুলো উঠে যায় জোরেশোরে। সেসবের বিরোধিতা করে যুক্তি দেওয়াও কঠিন। অবশ্য আবেগের বশে ভেসে গিয়ে দায়মুক্তি দেওয়া বা একচোখা দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করলে, সেটি ভিন্ন বিষয়।
সুতরাং, পৃথিবীতে যেমন বিশুদ্ধ চাকুরি নেই, ঠিক তেমনি কেবলই ন্যায়ের পক্ষের কাউকে খুঁজে পাওয়া কঠিন। বরং যে যার ‘যুক্তি’ দাঁড় করিয়ে, চালায় সেই একবগ্গা নীতিই। এতে একসময়ের মনে হওয়া ‘ভালো’ ঢুকে যায় এমন ‘খারাপ’ দুনিয়ায়, যা এড়ানোই হয়তো ছিল উদ্দেশ্য। দিনশেষে দেখা যায়, আজকের কথিত মজলুম হয়ে উঠছে আগামীর জালিম। আর যে জালিম হিসেবেই গর্ববোধ করে সর্বদা, তার আর কী অসুবিধা!
লেখক: বার্তা সম্পাদক, চরচা