চরচা ডেস্ক

শনিবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি ও বেশ কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নিহতের পর, তেহরান দ্রুততার সঙ্গেই পাল্টা জবাব দিয়েছে।
ইরান জানিয়েছে, তারা এই প্রতিশোধমূলক হামলা চালিয়েছে মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে ছড়িয়ে থাকা ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিগুলোতে। বিশেষ করে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের যেসব দেশে মার্কিন সেনারা অবস্থান করছে, সেসব দেশও ইরানের লক্ষ্যবস্তু ছিল।
আল জাজিজার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই পাল্টাপাল্টি হামলা আঞ্চলিক রাজনীতি ও বিশ্ববাজারের সামনে এখন একটি বড় প্রশ্ন তুলে ধরছে- এটি কি কেবল পাল্টাপাল্টি হামলার চক্রে সীমিত থাকবে, নাকি ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা, মিত্র বাহিনীর সক্রিয়তা মিলিয়ে শিপিং ও জ্বালানি অবকাঠামোকে চাপের মুখে ফেলে এক দীর্ঘ মেয়াদী যুদ্ধে রূপ নেবে?
এখন সবারই চোখ ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ভান্ডারের দিকে। যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের ক্ষয়ক্ষতি করার মতো তেহরানের সক্ষমতা কতটুকু আর তাদের কৌশলই বা কি, সেটি নিয়েই সবার এখন আগ্রহ।
কেন এবারের পরিস্থিতি ভিন্ন

২০২৫ সালের জুনে ইরানজুড়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চালানো সেই ১২ দিনের হামলার তুলনায় এবারের প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ আলাদা। আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির হত্যাকাণ্ড তেহরানের জন্য রীতিমতো ইসলামী প্রজাতন্ত্রের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই।
তেহরানের ভাষ্যমতে, প্রতিশোধ নিতে দেরি করা বা সংযত থাকা মানেই হলো নিজেদের দুর্বলতা প্রকাশ করা, যা প্রতিপক্ষকে আরও হামলার সুযোগ করে দেবে।
গতকাল রোববার ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, খামেনি ও অন্যান্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের হত্যার প্রতিশোধ নেওয়া ইরানের ‘দায়িত্ব’ এবং একই সঙ্গে ‘বৈধ অধিকার’।
কিন্তু ইরান ঠিক কীভাবে এই প্রতিশোধ নেবে?
ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কৌশল: অস্ত্রভাণ্ডার, সক্ষমতা ও রণকৌশল
ইরানের সামরিক শক্তি ও রণকৌশলের মূল ভিত্তি হলো তাদের ক্ষেপণাস্ত্র–ব্যবস্থা। প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, এটি মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে বড় এবং বৈচিত্র্যময় ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার, যার মধ্যে রয়েছে অসংখ্য ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র। আধুনিক বিমানবাহিনীর অনুপস্থিতিতে এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলোই তেহরানকে দূরপাল্লার আঘাত হানার সক্ষমতা যোগায়।
ইরানি কর্মকর্তাদের মতে, তাদের এই ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি মূলত একটি শক্তিশালী প্রতিরোধ ব্যবস্থা। কারণ দেশটির বিমানবাহিনী এখনো পুরনো আমলের যুদ্ধবিমানের ওপর নির্ভরশীল। তবে পশ্চিমা দেশগুলোর দাবি, ইরানের এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলো আঞ্চলিক অস্থিরতা বাড়িয়ে তুলছে এবং ভবিষ্যতে এসব পারমাণবিক অস্ত্র বহনেও ব্যবহৃত হতে পারে। তবে তেহরান এই অভিযোগ বরাবরই অস্বীকার করে আসছে।
ইরানের দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রগুলো সাধারণত দুই হাজার থেকে আড়াই হাজার কিলোমিটার পর্যন্ত পাড়ি দিতে সক্ষম। এর অর্থ হলো, এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ইসরায়েল এবং পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিশাল এলাকায় আঘাত হানতে পারে। তবে ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তার ঘনিষ্ঠজনদের দাবি সত্ত্বেও, এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর পক্ষে কোনোভাবেই যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছানো সম্ভব নয়।
কম সক্ষমতার ক্ষেপণাস্ত্র: ‘প্রথম আঘাত’
ইরানের স্বল্প-পাল্লার ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর সক্ষমতা সাধারণত ১৫০ থেকে ৮০০ কিলোমিটার। এগুলো মূলত নিকটবর্তী সামরিক লক্ষ্যবস্তু এবং দ্রুতগতির আঞ্চলিক হামলার জন্য তৈরি করা হয়েছে।
এই বাহিনীর মূল স্তম্ভ হলো ফাত্তাহ সিরিজের বিভিন্ন সংস্করণ- জুলফিকার, কিয়াম-১ ও পুরনো মডেলের শাহাব-১ ও ২। সংকটের মুহূর্তে এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর স্বল্প পাল্লাই ইরানের জন্য বিশেষ সুবিধা হিসেবে কাজ করে। এগুলো একসঙ্গে ঝাঁকে ঝাঁকে নিক্ষেপ করা যায়, যা শত্রুপক্ষের সতর্ক হওয়ার সময় কমিয়ে দেয় এবং আগাম প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণ করা কঠিন করে তোলে।
২০২০ সালের জানুয়ারিতে এই একই কৌশল ব্যবহার করেছিল ইরান। জেনারেল কাসেম সোলেইমানিকে যুক্তরাষ্ট্র হত্যা করার পর ইরাকের আইন আল-আসাদ মার্কিন বিমান ঘাঁটিতে ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে তেহরান। সেই হামলায় অবকাঠামোগত ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির পাশাপাশি একশ’র বেশি মার্কিন সেনা মস্তিষ্কে গুরুতর আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছিলেন। এর মাধ্যমে ইরান প্রমাণ করেছিল যে, যুক্তরাষ্ট্রের মতো শক্তিশালী বিমানবাহিনী না থাকলেও তারা শত্রুপক্ষের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি করতে সক্ষম।
মাঝামাঝি সক্ষমতার ক্ষেপণাস্ত্র: আঞ্চলিক মানচিত্র পরিবর্তনের হাতিয়ার
যদি স্বল্প-পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ইরানের দ্রুত আঘাত হানার অস্ত্র হয়, তবে দেড় থেকে দুই হাজার কিলোমিটার পাল্লার মধ্যম পাল্লার ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রগুলোই মূলত ইরানকে পুরো অঞ্চলের সমীকরণে শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে এসেছে। শাহাব-৩, ইমাদ , কদর-১, খোররামশাহর এর বিভিন্ন সংস্করণ এবং সেজিল এই সিস্টেমগুলোই ইরানকে দূরবর্তী লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার সক্ষমতা দেয়। এর পাশাপাশি হালের খেইবার শেকান এবং হাজ কাসেমের মতো নতুন নকশাও এই তালিকায় যুক্ত হয়েছে।
এগুলোর মধ্যে সেজিল বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য কারণ এটি কঠিন জ্বালানি চালিত। তরল জ্বালানির ক্ষেপণাস্ত্রের তুলনায় এটি অনেক দ্রুত উৎক্ষেপণ করা যায়। ফলে ইরান যদি তাৎক্ষণিক কোনো হামলার আশঙ্কায় থাকে, তবে দ্রুত পাল্টা জবাব দিতে এবং নিজের টিকে থাকার সক্ষমতা জানান দিতে এটি একটি বড় তুরুপের তাস।
সামগ্রিকভাবে, এই মধ্যম পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ইসরায়েলসহ কাতার, বাহরাইন, কুয়েত, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতে অবস্থিত মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোকে সরাসরি ইরানের নিশানায় নিয়ে এসেছে। এর ফলে যেমন ইরানের লক্ষ্যবস্তুর তালিকা দীর্ঘ হয়েছে, তেমনি পুরো অঞ্চলটিই এক বিশাল ঝুঁকির মুখে পড়েছে।

ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন: এক নতুন আতংক
ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রগুলো সাধারণত ভূপৃষ্ঠের খুব কাছ দিয়ে নিচু হয়ে উড়ে চলে এবং ভূপ্রকৃতির আড়াল ব্যবহার করতে পারে। বিশেষ করে যখন আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে বিভ্রান্ত করতে এগুলো ড্রোন বা ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের ঝাঁকের সঙ্গে একত্রে নিক্ষেপ করা হয় তখন রাডারে এগুলো শনাক্ত করা বা ট্র্যাক করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে
গোয়েন্দা ও সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের কাছে স্থলভাগ এবং জাহাজে আঘাত হানার মতো শক্তিশালী ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের বিশাল ভাণ্ডার রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো সুমার , ইয়া-আলী, কুদসের বিভিন্ন সংস্করণ, হোভেইজেহ, পাভেহ ও রা’দ । বিশেষ করে ‘সুমার’ ক্ষেপণাস্ত্রটি আড়াই হাজার কিলোমিটার দূর পর্যন্ত আঘাত হানতে সক্ষম।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ড্রোনের উপদ্রব, যা এই সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে। ড্রোনগুলো ক্ষেপণাস্ত্রের চেয়ে ধীরগতির হলেও এগুলো তৈরি করা সস্তা এবং বিশাল সংখ্যায় এক সঙ্গে উৎক্ষেপণ করা সহজ। এই ওয়ান-ওয়ে আত্মঘাতী ড্রোনগুলো দফায় দফায় ব্যবহারের মাধ্যমে শত্রুপক্ষের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে দুর্বল করে ফেলা যায়। এর ফলে বিমানবন্দর, সমুদ্রবন্দর এবং জ্বালানি কেন্দ্রগুলোকে কয়েক মিনিটের বদলে টানা কয়েক ঘণ্টা ধরে চরম সতর্ক অবস্থায় থাকতে বাধ্য করা হয়। বিশ্লেষকদের মতে, সংঘাত যদি আরও দীর্ঘায়িত হয়, তবে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে অকেজো করার এই গণ-আক্রমণের কৌশলটি ইরান আরও বড় পরিসরে ব্যবহার করতে পারে।
ভূগর্ভস্থ ক্ষেপণাস্ত্র নগরী: প্রথম আঘাত সামলে টিকে থাকার কৌশল
ক্ষেপণাস্ত্রের সংখ্যা গুরুত্বপূর্ণ হলেও, দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের ক্ষেত্রে আসল প্রশ্ন হলো- প্রতিপক্ষের হামলার পর ইরান কতক্ষণ পাল্টা আঘাত অব্যাহত রাখতে পারবে। তেহরান গত কয়েক বছর ধরে তাদের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির একটি বড় অংশ সুরক্ষিত করতে মাটির নিচে টানেল, গোপন ঘাঁটি এবং সংরক্ষিত উৎক্ষেপণ কেন্দ্র তৈরি করেছে। এই নেটওয়ার্কের কারণে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার সক্ষমতা দ্রুত নষ্ট করা কঠিন। ফলে প্রতিপক্ষকে এটা মেনেই নিতে হচ্ছে যে, বড় ধরনের হামলার পরও ইরানের কিছু সক্ষমতা টিকে থাকবেই। সামরিক পরিকল্পনাকারীদের জন্য এই টিকে থাকার ক্ষমতা মানে হলো- ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র অবকাঠামোতে হামলা চালালে তা স্বল্পমেয়াদী যুদ্ধের বদলে দীর্ঘমেয়াদী রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে রূপ নিতে পারে।
হরমুজ প্রণালী: আনুষ্ঠানিক অবরোধ ছাড়াই বিপর্যয়
ইরানের প্রতিরোধের কৌশল কেবল স্থলভাগের লক্ষ্যবস্তুতে সীমাবদ্ধ নয়। পারস্য উপসাগর এবং হরমুজ প্রণালী ( এই চ্যানেল দিয়ে বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাসের একটি বিশাল অংশ পরিবাহিত হয়) তেহরানকে বিশ্ববাজার নাড়িয়ে দেওয়ার এক দ্রুত পথ করে দিয়েছে। ইরান তাদের জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র, সামুদ্রিক মাইন, ড্রোন এবং দ্রুতগামী অ্যাটাক ক্রাফট ব্যবহার করে নৌবাহিনী ও বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে। তারা তাদের ফাত্তাহ সিরিজের মতো হাইপারসনিক সিস্টেমও প্রদর্শন করেছে, যা অত্যন্ত উচ্চগতি এবং ম্যানুভারেবিলিটি সম্পন্ন বলে দাবি করা হয়, যদিও এর কার্যকারিতা নিয়ে বড় কোনো প্রমাণ নেই।
বিশ্ববাজারকে অস্থিতিশীল করতে কোনো আনুষ্ঠানিক অবরোধের প্রয়োজন নেই। ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) দেওয়া রেডিও সতর্কতা এবং যুদ্ধকালীন বীমার উচ্চ প্রিমিয়াম ইতিমধ্যেই জাহাজের চলাচল ও ভাড়া বাড়িয়ে দিয়েছে। আইআরজিসি জানিয়েছে, তারা ইতিমধ্যেই হরমুজ প্রণালীর কাছে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের সাথে যুক্ত তিনটি তেলবাহী ট্যাংকারে আঘাত হেনেছে। ডেনিশ কন্টেইনার শিপিং গ্রুপ মায়েরস্ক গত রবিবার জানিয়েছে, তারা হরমুজ প্রণালী দিয়ে তাদের সকল জাহাজ চলাচল স্থগিত করছে।
উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন বাহিনী: লক্ষ্যবস্তু যখন বেশি
ওয়াশিংটন এই অঞ্চলে তাদের নৌ ও বিমান শক্তি ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি করেছে, যাকে কর্মকর্তারা গত কয়েক বছরের মধ্যে ইরানের কাছে মার্কিন সমরশক্তির অন্যতম বৃহত্তম জমায়েত হিসেবে বর্ণনা করছেন। এটি আক্রমণ এবং আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষমতা বাড়ালেও, একই সাথে ইরানের সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুর তালিকাও দীর্ঘ করেছে। মার্কিন বাহিনী বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে এবং তারা ঘাঁটি, লজিস্টিক হাব ও কমান্ড সেন্টারের একটি নেটওয়ার্কের ওপর নির্ভরশীল, যার সবগুলোকে সবসময় সমানভাবে সুরক্ষা দেওয়া সম্ভব নয়। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, কয়েকটি স্থানে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেদ করতে পারলেই তা ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক হিসাবনিকাশ বদলে দিতে পারে এবং সংঘাত নিয়ন্ত্রণে রাখার খরচ বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে পারে।
তেহরানের বার্তা: কোনো সীমিত যুদ্ধ নয়
ইরানি কর্মকর্তারা দীর্ঘকাল ধরে সতর্ক করে আসছেন যে, ইরানি ভূখণ্ডে যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের যেকোনো আক্রমণকে একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের শুরু হিসেবে গণ্য করা হবে, কোনো সীমিত অপারেশন হিসেবে নয়। খামেনির হত্যাকাণ্ডের পর এই অবস্থান আরও কঠোর হয়েছে। আইআরজিসি আরও প্রতিশোধের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে এবং ইরান ইঙ্গিত দিয়েছে যে এটি কোনো একক নাটকীয় আঘাত নয়, বরং একটি দীর্ঘমেয়াদী প্রচারণা। যেমন- ইসরায়েলের দিকে ক্রমাগত ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ, একাধিক দেশে মার্কিন সংশ্লিষ্ট স্থাপনার কাছে হামলা এবং গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক রুটে সরাসরি ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি।
লেবাননের হিজবুল্লাহ এবং ইয়েমেনের হুথিদের মতো ইরান-ঘনিষ্ঠ গোষ্ঠীগুলোর মাধ্যমে এই সংঘাত আরও ছড়িয়ে পড়তে পারে। উভয় গোষ্ঠীই খামেনির হত্যাকাণ্ডের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে এবং তেহরানের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করে লড়াইয়ের ইঙ্গিত দিয়েছে।

শনিবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি ও বেশ কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নিহতের পর, তেহরান দ্রুততার সঙ্গেই পাল্টা জবাব দিয়েছে।
ইরান জানিয়েছে, তারা এই প্রতিশোধমূলক হামলা চালিয়েছে মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে ছড়িয়ে থাকা ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিগুলোতে। বিশেষ করে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের যেসব দেশে মার্কিন সেনারা অবস্থান করছে, সেসব দেশও ইরানের লক্ষ্যবস্তু ছিল।
আল জাজিজার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই পাল্টাপাল্টি হামলা আঞ্চলিক রাজনীতি ও বিশ্ববাজারের সামনে এখন একটি বড় প্রশ্ন তুলে ধরছে- এটি কি কেবল পাল্টাপাল্টি হামলার চক্রে সীমিত থাকবে, নাকি ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা, মিত্র বাহিনীর সক্রিয়তা মিলিয়ে শিপিং ও জ্বালানি অবকাঠামোকে চাপের মুখে ফেলে এক দীর্ঘ মেয়াদী যুদ্ধে রূপ নেবে?
এখন সবারই চোখ ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ভান্ডারের দিকে। যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের ক্ষয়ক্ষতি করার মতো তেহরানের সক্ষমতা কতটুকু আর তাদের কৌশলই বা কি, সেটি নিয়েই সবার এখন আগ্রহ।
কেন এবারের পরিস্থিতি ভিন্ন

২০২৫ সালের জুনে ইরানজুড়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চালানো সেই ১২ দিনের হামলার তুলনায় এবারের প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ আলাদা। আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির হত্যাকাণ্ড তেহরানের জন্য রীতিমতো ইসলামী প্রজাতন্ত্রের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই।
তেহরানের ভাষ্যমতে, প্রতিশোধ নিতে দেরি করা বা সংযত থাকা মানেই হলো নিজেদের দুর্বলতা প্রকাশ করা, যা প্রতিপক্ষকে আরও হামলার সুযোগ করে দেবে।
গতকাল রোববার ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, খামেনি ও অন্যান্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের হত্যার প্রতিশোধ নেওয়া ইরানের ‘দায়িত্ব’ এবং একই সঙ্গে ‘বৈধ অধিকার’।
কিন্তু ইরান ঠিক কীভাবে এই প্রতিশোধ নেবে?
ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কৌশল: অস্ত্রভাণ্ডার, সক্ষমতা ও রণকৌশল
ইরানের সামরিক শক্তি ও রণকৌশলের মূল ভিত্তি হলো তাদের ক্ষেপণাস্ত্র–ব্যবস্থা। প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, এটি মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে বড় এবং বৈচিত্র্যময় ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার, যার মধ্যে রয়েছে অসংখ্য ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র। আধুনিক বিমানবাহিনীর অনুপস্থিতিতে এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলোই তেহরানকে দূরপাল্লার আঘাত হানার সক্ষমতা যোগায়।
ইরানি কর্মকর্তাদের মতে, তাদের এই ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি মূলত একটি শক্তিশালী প্রতিরোধ ব্যবস্থা। কারণ দেশটির বিমানবাহিনী এখনো পুরনো আমলের যুদ্ধবিমানের ওপর নির্ভরশীল। তবে পশ্চিমা দেশগুলোর দাবি, ইরানের এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলো আঞ্চলিক অস্থিরতা বাড়িয়ে তুলছে এবং ভবিষ্যতে এসব পারমাণবিক অস্ত্র বহনেও ব্যবহৃত হতে পারে। তবে তেহরান এই অভিযোগ বরাবরই অস্বীকার করে আসছে।
ইরানের দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রগুলো সাধারণত দুই হাজার থেকে আড়াই হাজার কিলোমিটার পর্যন্ত পাড়ি দিতে সক্ষম। এর অর্থ হলো, এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ইসরায়েল এবং পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিশাল এলাকায় আঘাত হানতে পারে। তবে ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তার ঘনিষ্ঠজনদের দাবি সত্ত্বেও, এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর পক্ষে কোনোভাবেই যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছানো সম্ভব নয়।
কম সক্ষমতার ক্ষেপণাস্ত্র: ‘প্রথম আঘাত’
ইরানের স্বল্প-পাল্লার ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর সক্ষমতা সাধারণত ১৫০ থেকে ৮০০ কিলোমিটার। এগুলো মূলত নিকটবর্তী সামরিক লক্ষ্যবস্তু এবং দ্রুতগতির আঞ্চলিক হামলার জন্য তৈরি করা হয়েছে।
এই বাহিনীর মূল স্তম্ভ হলো ফাত্তাহ সিরিজের বিভিন্ন সংস্করণ- জুলফিকার, কিয়াম-১ ও পুরনো মডেলের শাহাব-১ ও ২। সংকটের মুহূর্তে এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর স্বল্প পাল্লাই ইরানের জন্য বিশেষ সুবিধা হিসেবে কাজ করে। এগুলো একসঙ্গে ঝাঁকে ঝাঁকে নিক্ষেপ করা যায়, যা শত্রুপক্ষের সতর্ক হওয়ার সময় কমিয়ে দেয় এবং আগাম প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণ করা কঠিন করে তোলে।
২০২০ সালের জানুয়ারিতে এই একই কৌশল ব্যবহার করেছিল ইরান। জেনারেল কাসেম সোলেইমানিকে যুক্তরাষ্ট্র হত্যা করার পর ইরাকের আইন আল-আসাদ মার্কিন বিমান ঘাঁটিতে ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে তেহরান। সেই হামলায় অবকাঠামোগত ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির পাশাপাশি একশ’র বেশি মার্কিন সেনা মস্তিষ্কে গুরুতর আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছিলেন। এর মাধ্যমে ইরান প্রমাণ করেছিল যে, যুক্তরাষ্ট্রের মতো শক্তিশালী বিমানবাহিনী না থাকলেও তারা শত্রুপক্ষের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি করতে সক্ষম।
মাঝামাঝি সক্ষমতার ক্ষেপণাস্ত্র: আঞ্চলিক মানচিত্র পরিবর্তনের হাতিয়ার
যদি স্বল্প-পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ইরানের দ্রুত আঘাত হানার অস্ত্র হয়, তবে দেড় থেকে দুই হাজার কিলোমিটার পাল্লার মধ্যম পাল্লার ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রগুলোই মূলত ইরানকে পুরো অঞ্চলের সমীকরণে শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে এসেছে। শাহাব-৩, ইমাদ , কদর-১, খোররামশাহর এর বিভিন্ন সংস্করণ এবং সেজিল এই সিস্টেমগুলোই ইরানকে দূরবর্তী লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার সক্ষমতা দেয়। এর পাশাপাশি হালের খেইবার শেকান এবং হাজ কাসেমের মতো নতুন নকশাও এই তালিকায় যুক্ত হয়েছে।
এগুলোর মধ্যে সেজিল বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য কারণ এটি কঠিন জ্বালানি চালিত। তরল জ্বালানির ক্ষেপণাস্ত্রের তুলনায় এটি অনেক দ্রুত উৎক্ষেপণ করা যায়। ফলে ইরান যদি তাৎক্ষণিক কোনো হামলার আশঙ্কায় থাকে, তবে দ্রুত পাল্টা জবাব দিতে এবং নিজের টিকে থাকার সক্ষমতা জানান দিতে এটি একটি বড় তুরুপের তাস।
সামগ্রিকভাবে, এই মধ্যম পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ইসরায়েলসহ কাতার, বাহরাইন, কুয়েত, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতে অবস্থিত মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোকে সরাসরি ইরানের নিশানায় নিয়ে এসেছে। এর ফলে যেমন ইরানের লক্ষ্যবস্তুর তালিকা দীর্ঘ হয়েছে, তেমনি পুরো অঞ্চলটিই এক বিশাল ঝুঁকির মুখে পড়েছে।

ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন: এক নতুন আতংক
ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রগুলো সাধারণত ভূপৃষ্ঠের খুব কাছ দিয়ে নিচু হয়ে উড়ে চলে এবং ভূপ্রকৃতির আড়াল ব্যবহার করতে পারে। বিশেষ করে যখন আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে বিভ্রান্ত করতে এগুলো ড্রোন বা ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের ঝাঁকের সঙ্গে একত্রে নিক্ষেপ করা হয় তখন রাডারে এগুলো শনাক্ত করা বা ট্র্যাক করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে
গোয়েন্দা ও সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের কাছে স্থলভাগ এবং জাহাজে আঘাত হানার মতো শক্তিশালী ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের বিশাল ভাণ্ডার রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো সুমার , ইয়া-আলী, কুদসের বিভিন্ন সংস্করণ, হোভেইজেহ, পাভেহ ও রা’দ । বিশেষ করে ‘সুমার’ ক্ষেপণাস্ত্রটি আড়াই হাজার কিলোমিটার দূর পর্যন্ত আঘাত হানতে সক্ষম।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ড্রোনের উপদ্রব, যা এই সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে। ড্রোনগুলো ক্ষেপণাস্ত্রের চেয়ে ধীরগতির হলেও এগুলো তৈরি করা সস্তা এবং বিশাল সংখ্যায় এক সঙ্গে উৎক্ষেপণ করা সহজ। এই ওয়ান-ওয়ে আত্মঘাতী ড্রোনগুলো দফায় দফায় ব্যবহারের মাধ্যমে শত্রুপক্ষের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে দুর্বল করে ফেলা যায়। এর ফলে বিমানবন্দর, সমুদ্রবন্দর এবং জ্বালানি কেন্দ্রগুলোকে কয়েক মিনিটের বদলে টানা কয়েক ঘণ্টা ধরে চরম সতর্ক অবস্থায় থাকতে বাধ্য করা হয়। বিশ্লেষকদের মতে, সংঘাত যদি আরও দীর্ঘায়িত হয়, তবে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে অকেজো করার এই গণ-আক্রমণের কৌশলটি ইরান আরও বড় পরিসরে ব্যবহার করতে পারে।
ভূগর্ভস্থ ক্ষেপণাস্ত্র নগরী: প্রথম আঘাত সামলে টিকে থাকার কৌশল
ক্ষেপণাস্ত্রের সংখ্যা গুরুত্বপূর্ণ হলেও, দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের ক্ষেত্রে আসল প্রশ্ন হলো- প্রতিপক্ষের হামলার পর ইরান কতক্ষণ পাল্টা আঘাত অব্যাহত রাখতে পারবে। তেহরান গত কয়েক বছর ধরে তাদের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির একটি বড় অংশ সুরক্ষিত করতে মাটির নিচে টানেল, গোপন ঘাঁটি এবং সংরক্ষিত উৎক্ষেপণ কেন্দ্র তৈরি করেছে। এই নেটওয়ার্কের কারণে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার সক্ষমতা দ্রুত নষ্ট করা কঠিন। ফলে প্রতিপক্ষকে এটা মেনেই নিতে হচ্ছে যে, বড় ধরনের হামলার পরও ইরানের কিছু সক্ষমতা টিকে থাকবেই। সামরিক পরিকল্পনাকারীদের জন্য এই টিকে থাকার ক্ষমতা মানে হলো- ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র অবকাঠামোতে হামলা চালালে তা স্বল্পমেয়াদী যুদ্ধের বদলে দীর্ঘমেয়াদী রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে রূপ নিতে পারে।
হরমুজ প্রণালী: আনুষ্ঠানিক অবরোধ ছাড়াই বিপর্যয়
ইরানের প্রতিরোধের কৌশল কেবল স্থলভাগের লক্ষ্যবস্তুতে সীমাবদ্ধ নয়। পারস্য উপসাগর এবং হরমুজ প্রণালী ( এই চ্যানেল দিয়ে বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাসের একটি বিশাল অংশ পরিবাহিত হয়) তেহরানকে বিশ্ববাজার নাড়িয়ে দেওয়ার এক দ্রুত পথ করে দিয়েছে। ইরান তাদের জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র, সামুদ্রিক মাইন, ড্রোন এবং দ্রুতগামী অ্যাটাক ক্রাফট ব্যবহার করে নৌবাহিনী ও বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে। তারা তাদের ফাত্তাহ সিরিজের মতো হাইপারসনিক সিস্টেমও প্রদর্শন করেছে, যা অত্যন্ত উচ্চগতি এবং ম্যানুভারেবিলিটি সম্পন্ন বলে দাবি করা হয়, যদিও এর কার্যকারিতা নিয়ে বড় কোনো প্রমাণ নেই।
বিশ্ববাজারকে অস্থিতিশীল করতে কোনো আনুষ্ঠানিক অবরোধের প্রয়োজন নেই। ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) দেওয়া রেডিও সতর্কতা এবং যুদ্ধকালীন বীমার উচ্চ প্রিমিয়াম ইতিমধ্যেই জাহাজের চলাচল ও ভাড়া বাড়িয়ে দিয়েছে। আইআরজিসি জানিয়েছে, তারা ইতিমধ্যেই হরমুজ প্রণালীর কাছে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের সাথে যুক্ত তিনটি তেলবাহী ট্যাংকারে আঘাত হেনেছে। ডেনিশ কন্টেইনার শিপিং গ্রুপ মায়েরস্ক গত রবিবার জানিয়েছে, তারা হরমুজ প্রণালী দিয়ে তাদের সকল জাহাজ চলাচল স্থগিত করছে।
উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন বাহিনী: লক্ষ্যবস্তু যখন বেশি
ওয়াশিংটন এই অঞ্চলে তাদের নৌ ও বিমান শক্তি ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি করেছে, যাকে কর্মকর্তারা গত কয়েক বছরের মধ্যে ইরানের কাছে মার্কিন সমরশক্তির অন্যতম বৃহত্তম জমায়েত হিসেবে বর্ণনা করছেন। এটি আক্রমণ এবং আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষমতা বাড়ালেও, একই সাথে ইরানের সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুর তালিকাও দীর্ঘ করেছে। মার্কিন বাহিনী বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে এবং তারা ঘাঁটি, লজিস্টিক হাব ও কমান্ড সেন্টারের একটি নেটওয়ার্কের ওপর নির্ভরশীল, যার সবগুলোকে সবসময় সমানভাবে সুরক্ষা দেওয়া সম্ভব নয়। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, কয়েকটি স্থানে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেদ করতে পারলেই তা ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক হিসাবনিকাশ বদলে দিতে পারে এবং সংঘাত নিয়ন্ত্রণে রাখার খরচ বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে পারে।
তেহরানের বার্তা: কোনো সীমিত যুদ্ধ নয়
ইরানি কর্মকর্তারা দীর্ঘকাল ধরে সতর্ক করে আসছেন যে, ইরানি ভূখণ্ডে যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের যেকোনো আক্রমণকে একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের শুরু হিসেবে গণ্য করা হবে, কোনো সীমিত অপারেশন হিসেবে নয়। খামেনির হত্যাকাণ্ডের পর এই অবস্থান আরও কঠোর হয়েছে। আইআরজিসি আরও প্রতিশোধের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে এবং ইরান ইঙ্গিত দিয়েছে যে এটি কোনো একক নাটকীয় আঘাত নয়, বরং একটি দীর্ঘমেয়াদী প্রচারণা। যেমন- ইসরায়েলের দিকে ক্রমাগত ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ, একাধিক দেশে মার্কিন সংশ্লিষ্ট স্থাপনার কাছে হামলা এবং গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক রুটে সরাসরি ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি।
লেবাননের হিজবুল্লাহ এবং ইয়েমেনের হুথিদের মতো ইরান-ঘনিষ্ঠ গোষ্ঠীগুলোর মাধ্যমে এই সংঘাত আরও ছড়িয়ে পড়তে পারে। উভয় গোষ্ঠীই খামেনির হত্যাকাণ্ডের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে এবং তেহরানের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করে লড়াইয়ের ইঙ্গিত দিয়েছে।