Advertisement Banner

তবে কি ইন্টেরিমের মতো জঙ্গিবাদ সমস্যাকে অস্বীকার করছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী?

তবে কি ইন্টেরিমের মতো জঙ্গিবাদ সমস্যাকে অস্বীকার করছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী?
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। ফাইল ছবি

জঙ্গিবাদ নিয়ে আজ মঙ্গলবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টার বক্তব্য যারা শুনেছেন, তাদের মাথায় নিশ্চয় আমাদের বিশ্লেষণের শিরোনামটি প্রশ্ন আকারে ঘুরপাক খাচ্ছে। যেকোনো একটি বিষয়ে একই সরকারের দুজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি যখন জঙ্গিবাদের মতো রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট বিষয়ে দুই ধরনের ধারণা পোষণ করে বক্তব্য রাখেন, তখন দ্বিধায় না পড়ে উপায় কী!

মঙ্গলবার রাজধানীর আলাদা দুটি অনুষ্ঠানে জঙ্গিবাদ নিয়ে কথা বলেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ। দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় জঙ্গি হামলার সাম্প্রতিক সতর্কতার পরিপ্রেক্ষিতে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ড. জাহেদ জঙ্গিবাদের ঝুঁকির কথা স্বীকার করলেও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী একাবারেই তা উড়িয়ে দেন।

সচিবালয়ে পিআইডির সম্মেলনকক্ষে সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রমের অগ্রগতি বিষয়ে আয়োজিত ব্রিফিংয়ে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমানকে সাংবাদিকরা জঙ্গিবাদ নিয়ে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, “বাংলাদেশে জঙ্গি আছে। দুটি এক্সট্রিম আছে। দুটি এক্সট্রিমের কথা বলি। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় জঙ্গি সমস্যাকে যে স্কেলে দেখানো হয়েছে, তা তারা ক্ষমতায় থাকার একটা ন্যারেটিভ হিসেবে ব্যবহার করেছে। তারা বলতে চেয়েছে বাংলাদেশে জঙ্গি আছে, জঙ্গিরা সব দখল করবে, আমি নির্বাচন করলাম কি না, তা দেখার দরকার নাই; আমাকে ক্ষমতায় রাখ। এটা এক্সেজারেটেড হয়েছিল ওই সরকারের আমলে। পরবর্তীতে ইন্টেরিম গভর্নমেন্টের আমলে এই আলাপ কেউ করার চেষ্টা করেছেন যে, দেশে জঙ্গি নেই। এটা আরেকটা এক্সট্রিম, এটাও ভুল কথা। বাংলাদেশে একটা পর্যায়ে জঙ্গিবাদ ছিল-আছে, সেটাকে আমরা কমব্যাট করতে চাই।”

জাহেদ উর রহমান বলেন, “এবার এই সতর্কতার মানে হচ্ছে–খানিকটা ঝুঁকি তৈরি করেছে; কারণ, দেড় বছর ইন্টেরিম সরকারের সময় আমরা খেয়াল করেছি, এই প্রবণতার মানুষদের সংগঠিত হওয়া বা পাবলিকলি আসা বা ওপেনলি আসার প্রবণতা তৈরি হয়েছিল। সেটার খানিকটা ইমপ্যাক্ট আমরা বলতে পারি। এই গভর্নমেন্ট এগুলো কমব্যাট করবে। এই ঝুঁকি এমন না যে, ভয় পেতে হবে। সেই পুরনো কথা–আমরা যদি একটা সংকটকে স্বীকার না করি, তাহলে তার চিকিৎসা হবে না। ইট ইজ দেয়ার এবং আমরা এটাকে একেবারে শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনার চেষ্টা করব।”

অন্যদিকে, রাজধানীর আগারগাঁওয়ে কোস্ট গার্ড সদর দপ্তরে ‘বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড’র ৩১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ও কোস্ট গার্ড দিবস-২০২৬ উদ্‌যাপনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদকেও একই বিষয়ে প্রশ্ন করেন সাংবাদিকরা।

প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান। ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া
প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান। ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া

এক সাংবাদিকের প্রশ্ন ছিল, দেশে জঙ্গির উত্থান হয়েছে এবং বিমানবন্দরগুলোতে নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে–এ বিষয়টি আপনারা কীভাবে দেখছেন? জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “আমি আপনাদের প্রশ্নগুলো বুঝতে পেরেছি। কিন্তু আমি ওই শব্দকে রিকগনাইজ করি না। আমাদের দেশে এ রকম কোনো তৎপরতা নেই। কিছু এক্সট্রিমিস্ট গ্রুপ থাকে, পৃথিবীর সব দেশেই এ রকম অ্যাকটিভ থাকে, রেডিক্যাল কিছু গ্রুপ থাকে, ফান্ডামেন্টাল কিছু পলিটিক্যাল পার্টি থাকে। এগুলো আমরা ইউজড টু। কিন্তু সে বিষয়ে আপনি যে শব্দ উচ্চারণ করলেন, আমাদের দেশের কালচারে এখন আর তা নাই। আগে সে শব্দটা উচ্চারিত হতো ফ্যাসিবাদী আমলের সময়, তারা নিজস্ব রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের জন্য এগুলোকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করত। বর্তমান বাংলাদেশে এগুলোর এগজিস্ট্যান্স নেই।”

এখানে লক্ষ্যণীয়, ড. জাহেদ মনে করেন আওয়ামী লীগের সময় জঙ্গিবাদ সমস্যাটিকে অতিরিঞ্জিত করে উপস্থাপন করা হয়েছিল, যেন এটিকে ব্যবহার করে ক্ষমতা থাকা যায়। আবার সদ্য সাবেক অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় এই গুরুতর সমস্যাটিকে আমলে নেওয়া হয়নি; বরং এই সংকটকে একরকম অস্বীকার করা হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবতা হলো–দেশে জঙ্গি আছে।

অপরদিকে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ জানান, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকার জঙ্গিবাদকে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে। কিন্তু দেশে যে জঙ্গিবাদের উত্থান হয়েছে, তিনি তা মানতে নারাজ। সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে তিনি স্পষ্ট বলেন, “আমি আপনাদের প্রশ্নগুলো বুঝতে পেরেছি। কিন্তু আমি ওই শব্দকে রিকগনাইজ করি না। আমাদের দেশে এ রকম কোনো তৎপরতা নেই।”

তার মানে দেশে জঙ্গিবাদের উত্থান হচ্ছে বলে পুলিশের যে সতর্কতা জারি হয়েছে, সেই ‘জঙ্গিবাদের উত্থানকে’ তিনি রিকগনাইজ করেন না এবং তার দৃষ্টিতে বাংলাদেশে জঙ্গিদের ‘কোনো তৎপরতা’ নেই।

এখন প্রশ্ন আসে কার বক্তব্য সঠিক বলে ধরে নেবে জনসাধারণ? কারণ, দুজনই বিএনপি সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। একজন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, অপরজন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা। রাষ্ট্রের নিরাপত্তা রক্ষা যাদের দায়িত্ব, সেই আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সবগুলো সংস্থার নিয়ন্ত্রণ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে। আর এই মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হলেন সালাহউদ্দিন আহমেদ। তাই দেশে জঙ্গি আছে কি নেই, তা সবচেয়ে ভালো জানার কথা তারই।

জাতীয় সংসদ।
জাতীয় সংসদ।

আবার সম্প্রতি পুলিশ সদর দপ্তরের কনফিডেনশিয়াল শাখা থেকে পুলিশের বিভিন্ন ইউনিট ও জেলা পুলিশ সুপারদের পাঠানো এক চিঠিতে জানানো হয়, গ্রেপ্তারকৃত দুই উগ্রবাদী সদস্য ইশতিয়াক আহম্মেদ ওরফে সামী ওরফে আবু বক্কর ওরফে আবু মোহাম্মদের সঙ্গে চাকরিচ্যুত দুই সেনাসদস্যের নিয়মিত যোগাযোগের তথ্য মিলেছে।

চিঠিতে সতর্ক করে বলা হয়, তারা জাতীয় সংসদ, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর স্থাপনা, উপাসনালয়, শাহবাগসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে হামলার পরিকল্পনা করতে পারে। এমনকি অস্ত্রাগার লক্ষ্য করেও হামলার আশঙ্কা রয়েছে বলে ওই চিঠিতে বলা হয়।

এর পরিপ্রেক্ষিতে সিআইডি, এসবি, এটিইউ, সিটিটিসিসহ দেশের সব পুলিশ সুপারকে নিরাপত্তা জোরদার, নজরদারি বাড়ানো এবং সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। এর পর আবার দেশের সকল বিমানবন্দরে বাড়তি নিরাপত্তার ব্যবস্থা করে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। জঙ্গি তৎপরতা যদি দেশে না থাকে, তবে এমন চিঠি চালাচালি করে নিরাপত্তা জোরদার কেন? আগেই বলা হয়েছে, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সবগুলো সংস্থার নিয়ন্ত্রণ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে। ফলে প্রশ্ন আসে, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে এড়িয়ে কি তবে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর দপ্তরে দপ্তরে এই চিঠি চালাচালি হয়েছে? প্রশ্নটি অবান্তর কারণ, তেমন সুযোগ নেই। তর্কের খাতিরে এমন প্রেক্ষাপটকে আমলে নিলে পাল্টা প্রশ্ন আসে–স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাহলে কী করছে? পুলিশ সদর দপ্তর কি তাহলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে এড়িয়ে এত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে চিঠি চালাচালি করছে? আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর কি তবে মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণ নেই? প্রশ্ন অনেক। জঙ্গিবাদের উত্থানকে অস্বীকার করা কিংবা এত গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় নিরাপত্তা ইস্যুকে গুরুত্বহীনভাবে তুলে ধরার কারণ ব্যাখ্যা করতে পারবেন কেবলমাত্র মন্ত্রী নিজেই।

অন্তর্বর্তী সরকারের শপথ। ফাইল ছবি
অন্তর্বর্তী সরকারের শপথ। ফাইল ছবি

অন্যদিকে ড. জাহেদ উর রহমান হলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের তথ্য উপদেষ্টা। দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে তিনি সরকারি সব গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন। তাকে যেহেতু নিয়মিত সরকারের সিদ্ধান্ত এবং সমসাময়িক বিষয়ে কথা বলতে হয়, তাই এও মোটামুটি নিশ্চিত যে, সরকারের সকল কর্মকাণ্ড কাছ থেকে দেখার ও জানার সুযোগ পান তিনি। সেই সঙ্গে তিনি প্রেস কনফারেন্সে ঠিক কতটুকু বলবেন, তাও নিশ্চয় তার দপ্তর থেকে নির্ধারণ করে দেওয়া আছে।

ড. জাহেদের প্রথম পরিচয় তিনি রাজনৈতিক বিশ্লেষক। প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার আগে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সরকারের নিয়মিত সমালোচনা করতেন তিনি। এরই ধারাবাহিকতায় আগেও জঙ্গিবাদ নিয়ে দেশের বাস্তব চিত্র নানা সময়ে তার আলোচনায় জায়গা পেয়েছে। তাই মঙ্গলবার সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে জঙ্গিবাদ নিয়ে কোনো ভুল বা মনগড়া তথ্য প্রকাশের সুযোগ তার ক্ষেত্রেও নেই।

ড. জাহেদ স্পষ্টভাবেই বলেছেন, দেশে জঙ্গি আছে এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় এসে উগ্রবাদীরা প্রকাশ্যে আসার সুযোগ পেয়েছে। আর সেসময় সরকারের নির্মোহ ভূমিকা এবং জঙ্গিবাদ সমস্যাটিকে অস্বীকারের মধ্য দিয়ে এটিকে গুরুতর করে তুলেছে। ড. জাহিদ সাংবাদিকদের বলেন, “আমরা যদি একটা সংকটকে স্বীকার না করি, তাহলে তার চিকিৎসা হবে না। ইট ইজ দেয়ার এবং আমরা এটাকে একেবারে শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনার চেষ্টা করব।” অর্থাৎ, প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টার ভাবনা হলো–জঙ্গিবাদের মতো গুরুতর সমস্যাকে অ্যাড্রেস করে তা নিয়ন্ত্রণের সর্বোচ্চ ব্যবস্থা নেওয়াটাই জরুরি, বাস্তবতাকে অস্বীকার করলে এই সংকট তীব্র হবে।

এখন বড় প্রশ্ন হলো–স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এমন গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকেও জাতীয় নিরাপত্তা ইস্যুতে এতটা দায়সারা বক্তব্য দেন কীভাবে? এটা কি শুধুই কৌশল নাকি ড. জাহেদের বক্তব্য অনুযায়ী স্বরাষ্টমন্ত্রীও ইন্টেরিম সরকারের মতো দিব্বি অস্বীকার করে গেলেন দেশ ও দশের নিরাপত্তার ইস্যুটি?

সম্পর্কিত