Advertisement Banner

ইকোনোমিস্টের বিশ্লেষণ

কিউবায় মার্কিন হামলা কি বড় ধরনের ভুল হবে

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
কিউবায় মার্কিন হামলা কি বড় ধরনের ভুল হবে
একটি শিশু কিউবার পতাকা হাতে। ছবি: রয়টার্স

আমেরিকার বিশেষ বাহিনী গত ৩ জানুয়ারি ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাস থেকে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে তুলে নিয়ে যাওয়ার মাত্র কয়েক ঘণ্টা পর আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছিলেন, এরপর কিউবার ‘পতন ঘটতে যাচ্ছে’। তখন থেকেই ট্রাম্প ভেনেজুয়েলার নতুন শাসকের ওপর চাপ সৃষ্টি করে আসছেন। নতুন শাসক তার পূর্বসূরির মতো নিজে অপহৃত হওয়া এড়ানোর জন্য কিউবায় সস্তা তেলের সরবরাহ বন্ধ করে দেন। কিউবা যখন বিদ্যুৎ বিভ্রাটে ভুগছে, তখন ট্রাম্প দেশটির শাসনগোষ্ঠীকে ‘খুব বেশি দেরি হওয়ার আগেই’ তার সঙ্গে একটি চুক্তিতে আসার আহ্বান জানাচ্ছেন।

ব্রিটিশ সাময়িকী ইকোনমিস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়, ট্রাম্প কিউবার পরিবর্তন চান, এদিক থেকে তিনি সঠিক। দেশটির কমিউনিস্ট শাসকরা অত্যন্ত নিষ্ঠুর। প্রায় সাত দশক ধরে তারা ভিন্নমতাবলম্বীদের বন্দী করে রেখেছেন এবং দেশের নাগরিকদের দরিদ্র করে তুলেছেন।

সাধারণ কিউবানরা খাবার বা ওষুধ কিনতেই হিমশিম খাচ্ছেন। অন্যদিকে, শাসনগোষ্ঠীর ঘনিষ্ঠ চাটুকাররা সরকারি নিয়ন্ত্রণে থাকা অর্থনীতিতে আধিপত্য বিস্তার করছে এবং বিলাসী জীবনযাপন করছে। কিউবা আমেরিকার নিরাপত্তার জন্যও একটি ছোট হুমকি। দেশটি আমেরিকার অঙ্গরাজ্য ফ্লোরিডা থেকে ২০০ কিলোমিটারেরও কম দূরত্বে রাশিয়া ও চীনকে ‘লিসেনিং পোস্ট’ (গোয়েন্দা তথ্য শোনার কেন্দ্র) পরিচালনার অনুমতি দিয়ে রেখেছে।

অন্ধকারে আলোচনা

জ্বালানি অবরোধ কিউবানদের জীবনকে আগের চেয়েও বেশি কষ্টকর করে তুলেছে। তবে দেশটির শাসনগোষ্ঠী এখন বিষয়টি আমলে নিয়ে আলোচনা করছে। এর মধ্যে কয়েকজন রাজনৈতিক বন্দীকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে এবং একগুচ্ছ অর্থনৈতিক সংস্কারের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এর আগে গত ১৬ মার্চ এই শাসকগোষ্ঠী জানায়, তারা বিদেশে বসবাসরত কিউবানদের কিউবায় সম্পূর্ণ নিজস্ব ব্যবসার মালিক হওয়ার অনুমতি দেবে। তবে ট্রাম্প এবং তার কিউবান-আমেরিকান পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এর চেয়েও অনেক বেশি কিছু চান। আর বেশি কিছু চাওয়াটা হলো কিউবার শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন।

আমেরিকা চাইছে কিউবায় সামরিক শক্তি প্রয়োগ করতে। কিউবার আকাশে নজরদারি ড্রোনগুলো সার্বক্ষণিক ঘুরপাক খাচ্ছে। গত ২০ মে আমেরিকার ১১টি বিমানবাহী রণতরীর অন্যতম ইউএসএস নিমিটজ ক্যারিবীয় অঞ্চলে এসে পৌঁছায়। একই দিনে আমেরিকার বিচার বিভাগ কিউবার নেতা রাউল কাস্ত্রোকে অভিযুক্ত করে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী রুবিও বলছেন, শান্তিপূর্ণ চুক্তির সম্ভাবনা ‘খুব একটা বেশি নয়’ এবং বর্তমান রাজনৈতিক ব্যবস্থা বহাল রেখে কিউবার সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। আমেরিকায় শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের জন্য শক্তি প্রয়োগ করবে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে রুবিও বলেন, “মিস্টার ট্রাম্প যা কিছু প্রয়োজন, তাই করবেন”।

এখানে উত্তেজনার প্রতিধ্বনি পাওয়া যাচ্ছে যা ট্রাম্পের ভেনেজুয়েলা অভিযানের আগে দেখা গিয়েছিল। যদিও ট্রাম্প অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসের সাথে দাবি করেন, সেই অভিযান একটি বড় সাফল্য ছিল। শক্তির হুমকি হয়তো আলোচনার টেবিলে তাকে অতিরিক্ত সুবিধা দিতে পারে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, একটি প্রকৃত সামরিক অভিযান অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হবে এবং পরিস্থিতি উন্নতির সম্ভাবনা খুবই কম।

শাসকগোষ্ঠীর শীর্ষ নেতৃত্বকে হঠাতে আমেরিকার একটি দ্রুত ও অবৈধ অনুপ্রবেশ সফল হতে পারে, কিন্তু তারপর কী হবে? কিউবা ভেনেজুয়েলা নয়। এখানকার একনায়কতন্ত্র অনেক বেশি সুপ্রতিষ্ঠিত এবং আদর্শিক। ডোনাল্ড ট্রাম্প হয়তো শীর্ষ কমিউনিস্টদের সরিয়ে আরও বাধ্যগত নেতাদের বসাতে পারেন, কিন্তু ভেনেজুয়েলার ওপর তার যে সামান্যতম নিয়ন্ত্রণ রয়েছে, কিউবার ক্ষেত্রে তার পুনরাবৃত্তি করাও কঠিন হবে।

বিশ্লেষকদের মতে, একটি পূর্ণ মাত্রার আক্রমণ আরও কম আকর্ষণীয় হবে। আমেরিকা হয়তো কিউবার সেনাবাহিনীকে গুঁড়িয়ে দিতে পারে, কিন্তু তারা কি একটি উন্নত কিউবা গড়ে তুলতে পারবে? অন্যান্য দেশে গেরিলা বিদ্রোহের মুখে জাতি-গঠনের ক্ষেত্রে আমেরিকার রেকর্ড বেশ দুর্বল। খুব কম কিউবানেরই স্বাধীনতার স্মৃতি মনে আছে। বিশ্লেষকদের মতে, শক্তির জোরে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার যেকোনো চেষ্টা হবে ধীরগতির, সংকটময় এবং সম্ভবত ব্যর্থতার সমাপ্তি।

শক্তি প্রয়োগ না করলে, তবে কী? আমেরিকা জ্বালানি অবরোধ দীর্ঘায়িত করতে পারে, যার ফলে আরও বেশি ক্ষুধা ও বিদ্যুৎ বিভ্রাট দেখা দেবে। এই আশায় যে ক্ষুব্ধ কিউবানরা তাদের শাসকদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবে। কিন্তু সেখানে কোনো সুসংগঠিত রাজনৈতিক বিরোধী দল নেই। এরইমৎধ্যে এত বিপুল সংখ্যক তরুণ দেশ ছেড়ে পালিয়েছে যে কিউবা এখন আমেরিকার অঞ্চলের সবচেয়ে বয়স্ক দেশে পরিণত হয়েছে। এ পর্যন্ত বেশিরভাগ প্রতিবাদ কেবল প্রকাশ্যে হাঁড়ি-পাতিল বাজানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে।

সরকার বিরোধী আন্দোলনে কিউবানরা। ছবি: রয়টার্স
সরকার বিরোধী আন্দোলনে কিউবানরা। ছবি: রয়টার্স

সেক্ষেত্রে সবচেয়ে কম খারাপ বিকল্পটিই বাকি থাকে। একটি ধারাবাহিক পরিবর্তনের জন্য চাপ দেওয়া। একটি সম্ভাব্য চুক্তির কিছু উপাদান ইতোমধ্যে প্রকাশ্যে এসেছে। আমেরিকা আরও তেল সরবরাহের অনুমতি দেবে এবং ক্যাথলিক চার্চ ও এনজিওগুলোর মাধ্যমে বণ্টনের জন্য ১০০ মিলিয়ন ডলারের মানবিক সহায়তা প্রদান করবে, যা কিউবান সেনাবাহিনীর দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যবসায়িক সাম্রাজ্যকে এড়িয়ে সরাসরি পৌঁছাবে।

এটি স্যাটেলাইটের মাধ্যমে প্রত্যেক কিউবানের জন্য বিনামূল্যে ইন্টারনেট সংযোগও প্রদান করবে। এটি রাজনৈতিক বিরোধী দল গড়ে ওঠার জন্য একটি পরিবেশ তৈরি করতে সাহায্য করতে পারে। এর বিনিময়ে শাসকগোষ্ঠীকে আরও বন্দিদের মুক্তি দিতে হবে, দমন-পীড়ন কমাতে হবে এবং কিউবাকে ব্যক্তিগত বিনিয়োগের জন্য উন্মুক্ত করতে হবে।

এমনকি কিউবার শাসকরা যদি এই ধরনের চুক্তিতে সম্মতও হন, তবুও বিশাল চ্যালেঞ্জ থেকে যাবে। বিশ্লেষকরা বলছেন, কিউবা ভেনেজুয়েলার চেয়ে অনেক বেশি দরিদ্র এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করার মতো কোনো বড় তেলের মজুত এখানে নেই। সেখানে আইনের শাসনও নেই। অনেক কিউবান-আমেরিকান বিনিয়োগ করতে চান, তবে তা কেবল তখনই যখন সম্পত্তি দখলকারী কমিউনিস্টরা বিদায় নেবে। তবুও, প্রকৃত অর্থনৈতিক সংস্কার একটি বড় পরিবর্তন আনতে পারে। আমেরিকানদের ভ্রমণের ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হলে পর্যটন দ্রুত বৃদ্ধি পেতে পারে। কৃষিজমি আরও উৎপাদনশীল কাজে ব্যবহার করা যেতে পারে। রাজনৈতিক পরিবর্তনের আগে সম্ভবত দেশটির অর্থনৈতিক উন্মুক্ত করতে হবে , যা দীর্ঘ সময় নিতে পারে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, ট্রাম্প প্রশাসন যদি জোরালো ও বিচক্ষণতার সাথে আলোচনা করে, তবে তারা কিউবানদের একটি বড় উপকার করতে পারে। আর যদি তারা সশস্ত্র শক্তির আশ্রয় নেয়, তবে তা পরিস্থিতিকে আরও অনেক খারাপ করে তুলতে পারে। এবার ট্রাম্প হয়তো ইরানের কাছ থেকে সেই শিক্ষাটি নিয়েছেন।

সম্পর্কিত