Chaarcha Logo
Chaarcha logo
সর্বশেষবিশেষএক্সপ্লেইনারবিশ্লেষণভাবনাভিডিওশর্টসজীবনচরচাম্যাগাজিনপ্রবাস
২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
Chaarcha logo
সংক্ষেপেকানেক্টম্যাগাজিন

আমরা

আমাদের সম্পর্কেযোগাযোগবিধিনিষেধ ও শর্তাবলিগোপনীয়তার নীতি
Chaarcha logo
সর্বশেষবিশেষএক্সপ্লেইনারবিশ্লেষণভাবনাভিডিওশর্টসজীবনচরচাম্যাগাজিনপ্রবাস
২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
সর্বশেষবিশেষএক্সপ্লেইনারবিশ্লেষণভাবনাভিডিওশর্টসজীবনচরচাম্যাগাজিনপ্রবাস
Chaarcha logo
সর্বশেষএক্সপ্লেইনারবিশ্লেষণভাবনাভিডিওশর্টসজীবনচরচাম্যাগাজিনপ্রবাস
আমরা
  • আমাদের সম্পর্কে
  • যোগাযোগ
  • বিধিনিষেধ ও শর্তাবলি
  • গোপনীয়তার নীতি
এক্সপ্লেইনারবিশ্লেষণ

সম্পাদক: সোহরাব হাসান, প্রিন্টার্স বিল্ডিং (লেভেল–১৪), ৫ রাজউক অ্যাভিনিউ, মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা, ঢাকা–১০০০, বাংলাদেশ

|

স্বত্ব © চরচা

Chaarcha Logo
Advertisement
Advertisement
> প্রবাস

এক দেশের শরৎ, অন্য দেশের শীত

রহমান মৃধা

রহমান মৃধা

প্রকাশ : ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৭: ১৯
এক দেশের শরৎ, অন্য দেশের শীত
ছবি: লেখকের মাধ্যমে প্রাপ্ত

সুইডেনের শরৎ এখনো পুরোপুরি আসেনি। তবু প্রকৃতি তার আগমনের খবর দিতে শুরু করেছে। যেন দূর থেকে কেউ ধীরে ধীরে দরজায় কড়া নাড়ছে, কিন্তু ঘরে ঢোকার তাড়া নেই। গ্রীষ্ম এখনো চারপাশে তার শেষ আলোটুকু ধরে রেখেছে, অথচ বাতাসের ভেতর কোথাও যেন বদলের গন্ধ।

Advertisement
Advertisement
Advertisement

খুব ভোরে, যখন চারপাশের মানুষ তখনো ঘুমিয়ে, আমি ম্যালারেনের তীর দিয়ে হেঁটে আমার সুইডিশ কৃষিখেতে যাই। সকালের সেই পথটুকু আমার কাছে শুধু হাঁটার পথ নয়, ঋতুর সঙ্গে একান্ত আলাপের সময়।

ম্যালারেনের নীল পানির ওপর তখন হালকা ধোঁয়ার মতো কুয়াশা ভাসে। দূরের গাছগুলোকে মনে হয় কেউ সাদা স্বচ্ছ পর্দার আড়ালে দাঁড় করিয়ে রেখেছে। পানির ওপর আলো পড়ে, আবার মিলিয়ে যায়। বাতাসে থাকে ভেজা ঘাসের গন্ধ, মাটির গন্ধ, আর এমন এক নীরবতা, যারও যেন নিজস্ব ভাষা আছে।

কখনো দূরে কোনো পাখির ডাক ভেসে আসে। কোথাও ঘোড়ার শরীরে সকালের ঠান্ডা থেকে রক্ষার জন্য চাদর জড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। তারা মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকে, আর তাদের নিঃশ্বাস থেকে উষ্ণ বাষ্প উঠে আসে ঠান্ডা বাতাসে। সেই দৃশ্য দেখলে মনে হয়, প্রকৃতি যেন নিজেই তার সন্তানদের শরৎ আসার আগে একটু একটু করে প্রস্তুত করে দিচ্ছে।

Advertisement
Advertisement
Advertisement

তখন মনে পড়ে রবীন্দ্রনাথের সেই পঙ্‌ক্তি,

“শরৎ, তোমার অরুণ আলোর অঞ্জলি

ছড়িয়ে গেল ছাপিয়ে মোহন অঙ্গুলি।

শরৎ, তোমার শিশির-ধোওয়া কুন্তলে,

বনের-পথে-লুটিয়ে-পড়া অঞ্চলে

আজ প্রভাতের হৃদয় ওঠে চঞ্চলি।”

শরৎকে বুঝতে হলে হয়তো ক্যালেন্ডারের তারিখ দেখার দরকার হয় না। প্রকৃতি নিজেই জানিয়ে দেয়, কখন তার রঙ বদলাতে শুরু করেছে।

সুইডেনের শরৎ আসে খুব ধীরে। প্রথমে কোনো একটি গাছের একটি-দুটি পাতা হলুদ হয়। তারপর আরেকটি। তারপর হঠাৎ এক সকালে মনে হয়, গতকালের পরিচিত সবুজ পৃথিবীর ওপর কেউ যেন সোনালি রঙের প্রথম আঁচড়টি টেনে দিয়েছে।

এরপর শুরু হয় রঙের উৎসব।

সবুজের ভেতর হলুদ, হলুদের ভেতর কমলা, কমলার পাশে লাল, কোথাও তামাটে বাদামি। বার্চ গাছের পাতায় হালকা হলুদ আলো, ম্যাপলের পাতায় আগুনের মতো লাল, কোথাও গাঢ় কমলা। দূরের বন যেন ধীরে ধীরে একটি বিশাল ক্যানভাসে পরিণত হয়।

প্রকৃতি তখন নিজেই শিল্পী।

তার হাতে নেই কোনো তুলি, নেই কোনো রঙের বাক্স, নেই কোনো ক্যানভাস। অথচ সে এমন ছবি আঁকে, যা কোনো চিত্রশিল্পী যত যত্নেই আঁকুন না কেন, পুরোপুরি নকল করতে পারবেন না।

তবু মানুষ থেমে যায়।

কেউ ক্যামেরা বের করে। কেউ মোবাইল ফোনে ছবি তোলে। কেউ নীরবে দাঁড়িয়ে থাকে। আবার কোনো চিত্রশিল্পী হয়তো তার ক্যানভাস খুলে বসে যায়, কারণ এই ঋতুতে প্রকৃতির সামনে দাঁড়ালে শিল্পীর ভেতরেও কিছু একটা জেগে ওঠে।

শরৎ মানুষকে শুধু আনন্দ দেয় না। তার মধ্যে এক ধরনের কোমল বিষণ্নতাও ছড়িয়ে দেয়।

গ্রীষ্মের দীর্ঘ দিনগুলো শেষ হয়ে আসে। সন্ধ্যা একটু একটু করে আগে নামে। সূর্য তার উষ্ণতা কমিয়ে দেয়। আলো নরম হয়। রাত দীর্ঘ হয়। মানুষ বুঝতে পারে, যে দিনগুলোকে এত স্বাভাবিক মনে হয়েছিল, সেগুলো আসলে ফিরে আসবে না।

অভিবাসন কমার পর কীভাবে ভোটার টানবে সুইডেনের ডেমোক্র্যাটরা?sweden

সম্ভবত এ কারণেই শরৎ মানুষের মনকে একটু বেশি নরম করে। কিন্তু এই নরম হয়ে যাওয়া সবার জন্য সমান সুখের নয়। কারও কাছে শরতের নীরবতা শান্তির, কারও কাছে তা একাকিত্বের। দিনের আলো কমে আসা, দীর্ঘ রাত, প্রকৃতির নিস্তব্ধতা এবং নিজের ভেতরে ফিরে যাওয়া অনেক মানুষের মনে বিষণ্নতা বাড়িয়ে দিতে পারে। কেউ কেউ গভীর হতাশায় ডুবে যায়; মানসিক সংকট কখনো কখনো এমন চরম পরিণতিও ডেকে আনতে পারে, যেখানে মানুষ নিজের জীবনকেও আর অর্থপূর্ণ মনে করতে পারে না।

তাই শরতের সৌন্দর্যের পাশে তার অন্ধকারটুকুকেও অস্বীকার করা যায় না। প্রকৃতি যেমন রঙ বদলায়, মানুষের মনও তেমনি বদলায়। এই সময়ে একে অন্যের পাশে থাকা, কথা বলা, একাকী মানুষটির দরজায় কড়া নাড়া, কখনো কখনো একটি জীবনকে ধরে রাখতে পারে।

শরৎ আমাদের তাই শুধু প্রকৃতিকে দেখতে শেখায় না, মানুষকেও দেখতে শেখায়।

শরতের আরেকটি গভীর সৌন্দর্য আছে তার ঝরে পড়ার মধ্যে।

ছবি: লেখকের মাধ্যমে প্রাপ্ত
ছবি: লেখকের মাধ্যমে প্রাপ্ত

একটি পাতা যখন গাছ ছেড়ে মাটিতে পড়ে, আমরা তাকে শেষ বলে দেখি। কিন্তু প্রকৃতির কাছে সেটি শেষ নয়। সেটি ফিরে যাওয়া। মাটিতে মিশে যাওয়া। আগামী দিনের নতুন জীবনের অংশ হয়ে যাওয়া।

তখন মনে পড়ে, “ঝরা পাতা গো, আমি তোমারি দলে।”

পাতাটি ঝরে যায়, কিন্তু তার গল্প শেষ হয় না। তার শরীর মাটির সঙ্গে মিশে যায়, আর সেই মাটির বুক থেকেই কোনো একদিন জন্ম নেয় নতুন সবুজ। প্রকৃতির কাছে মৃত্যু কখনো সম্পূর্ণ বিলীন হয়ে যাওয়া নয়, বরং এক রূপ থেকে আরেক রূপে ফিরে যাওয়া।

মানুষের জীবনও কি খুব আলাদা?

আমরা ধরে রাখতে চাই। মানুষকে, সময়কে, যৌবনকে, সাফল্যকে, সম্পর্ককে। অথচ প্রকৃতি প্রতিদিন শেখায়, কিছু কিছু জিনিস ছেড়ে দিতে হয়। ঝরে পড়া মানেই হারিয়ে যাওয়া নয়।

সম্ভবত জীবনের সবচেয়ে কঠিন শিল্পই হলো কখন কোথায় ধরে রাখতে হবে আর কখন ছেড়ে দিতে হবে, তা বুঝতে পারা।

আর তখন শরৎ শুধু প্রকৃতির ঋতু থাকে না, মানুষের সম্পর্কেরও এক অদৃশ্য ঋতু হয়ে ওঠে।

কখনো প্রেম ধীরে ধীরে ভালোবাসায় পরিণত হয়। সেই ভালোবাসা একদিন দাম্পত্যের ঘর তৈরি করে। আবার কখনো দাম্পত্যের শুরু হয় এমন এক সময়ে, যখন দুজন মানুষই বুঝতে পারে না সামনে কত দীর্ঘ পথ। কেউ সেই পথ হাত ধরে পেরিয়ে যায়, কেউ মাঝপথে হারিয়ে ফেলে একে অন্যকে। কখনো সম্পর্কের পাতা সবুজ থাকে, কখনো হলুদ হয়ে আসে, কখনো নিঃশব্দে ঝরে পড়ে।

তবু প্রতিটি সম্পর্কেরই কিছু পাতা থেকে যায় মানুষের ভেতরে।

কারও হাসি, কারও স্পর্শ, কোনো এক ভোরের কথা, কোনো অসমাপ্ত বাক্য, কোনো বিদায়, কিংবা কোনো মানুষকে শেষবার দেখার মুহূর্ত। মানুষ চলে যায়, সম্পর্কের রূপ বদলে যায়, কিন্তু স্মৃতি অনেক সময় মাটির নিচে থাকা শিকড়ের মতো থেকে যায়।

এই কারণেই শরৎ আমাকে জীবনের কথা মনে করিয়ে দেয়।

সুইডেনে স্কুলে তলোয়ার নিয়ে এক তরুণের হামলা, নিহত ১, আহত ২attacks a school in Sweden–AP–unb

মনে হয়, ঋতু বদলাচ্ছে শুধু প্রকৃতিতে নয়, মানুষের মধ্যেও। গ্রীষ্ম আমাদের বাইরে নিয়ে যায়, শরৎ আমাদের ভেতরে ফিরিয়ে আনে। আর সেই ফিরে আসার পথে আমরা হয়তো নিজেদেরই নতুন করে চিনতে শুরু করি।

দূরদেশ থেকে আসা পরিযায়ী বুনো হাঁসেরা তখন তাদের যাত্রার প্রস্তুতি নেয়। যে পাখিরা কোনো এক সময় উত্তরের আলো, জল আর গ্রীষ্মের দীর্ঘ দিনকে আপন করে নিয়েছিল, তারা এবার দক্ষিণের উষ্ণতার দিকে ফিরে যাবে।

আকাশের অনেক ওপরে কখনো তাদের সারি দেখা যায়। তারা ডানা মেলে উড়ে যায় একে অন্যের পেছনে, যেন আকাশের বুকের ওপর কেউ একটি চলমান রেখা এঁকে দিয়েছে।

তারা জানে কখন যেতে হবে। মানুষ অনেক সময় জানে না। পাখিরা ঋতুর ভাষা বোঝে। মানুষ বোঝে স্মৃতির ভাষা।

তাই শরৎ এলে মানুষের ভেতরেও যেন একটি অদৃশ্য পরিযান শুরু হয়। মন ফিরে যায় শৈশবে, পুরোনো বাড়িতে, নদীর ধারে, হারিয়ে যাওয়া মানুষদের কাছে, কোনো এক ভোরের কাছে, কোনো এক অসমাপ্ত কথার কাছে।

ম্যালারেনের ওপর কুয়াশা তখন আরও ঘন হয়। আমার পথের পাশে ঘোড়াগুলো দাঁড়িয়ে থাকে। খেতের ওপর শিশির জমে। দূরের বন রঙ বদলাতে থাকে। কোথাও একটি পাতা নিঃশব্দে মাটিতে পড়ে। আমি হাঁটতে থাকি। আমার সুইডিশ কৃষিখেতের দিকে।

ছবি: লেখকের মাধ্যমে প্রাপ্ত
ছবি: লেখকের মাধ্যমে প্রাপ্ত

মনে হয়, ঋতু বদলাচ্ছে শুধু প্রকৃতিতে নয়, মানুষের মধ্যেও। গ্রীষ্ম আমাদের বাইরে নিয়ে যায়, শরৎ আমাদের ভেতরে ফিরিয়ে আনে। আর সেই ফিরে আসার পথেই হঠাৎ আমার নিজের আরেকটি পৃথিবী চোখের সামনে ভেসে ওঠে।

বাংলাদেশের শীত।

ম্যালারেনের ওপর ভেসে থাকা এই কুয়াশা আমাকে ফিরিয়ে নিয়ে যায় সেই বহু দূরের পল্লীগ্রামে, যেখানে কেটেছে আমার শৈশব ও কৈশোরের কত সকাল। তখনো শীত মানেই ছিল কুয়াশায় ঢাকা পথ, শিশিরে ভেজা ঘাস, ভোরের নরম আলো আর খেজুর গাছের বুক থেকে রাতভর ঝরে পড়া মিষ্টি রস। ভোর হওয়ার আগেই গাছিরা হাঁড়ি নামিয়ে আনত। মাটির হাঁড়িতে জমে থাকা সেই টলটলে রসের স্বাদে যেন শীতের সকাল নিজেই মিশে থাকত।

কুয়াশার ভেতর দিয়ে দূরের কোনো বাড়ি থেকে ধোঁয়া উঠত। উঠোনে আগুন পোহানোর আয়োজন। কোথাও মুরগির ডাক, কোথাও গরুর ঘণ্টা, কোথাও অচেনা কোনো পাখির ডাক। শিশিরে ভেজা ধানের গন্ধ, ভোরের ঠান্ডা বাতাস আর মাটির সোঁদা গন্ধ মিলে শীতের সেই গ্রামকে আমার কাছে আজও একটি জীবন্ত ছবির মতো করে রেখেছে।

সেই ছবির মধ্যে প্রকৃতির সঙ্গে আমার এক ধরনের নীরব প্রেম ছিল। নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা, কুয়াশার ভেতর দিয়ে হেঁটে যাওয়া, শীতের সকালে রোদ উঠলে খোলা মাঠে ছুটে বেড়ানো, গাছের পাতায় জমে থাকা শিশির আঙুল দিয়ে ছুঁয়ে দেখা, এসবের মধ্যে তখন কোনো দর্শন ছিল না, ছিল শুধু জীবন। আজ এত বছর পর বুঝি, সেই সরল আনন্দগুলোই ছিল জীবনের সবচেয়ে গভীর সম্পদ।

সুইডেনের শরৎ আমাকে তাই শুধু বর্তমানের দিকে তাকাতে শেখায় না, মাঝে মাঝে বহু দূরের অতীতের দরজাও খুলে দেয়।

ডিজিটাল শিক্ষা কমিয়ে কাগজের বইয়ে ফিরছে সুইডেনের স্কুলগুলোimage 3

এক দেশের কুয়াশার ভেতর অন্য দেশের কুয়াশা দেখা যায়। এক দেশের ভোরে আরেক দেশের ভোর ফিরে আসে। একটি ঋতু কখনো কখনো অন্য একটি ঋতুর স্মৃতি হয়ে ওঠে। আর প্রকৃতি তখন তার সবচেয়ে বড় ছবিটি আঁকতে থাকে। একটি পাতা দিয়ে। একটি কুয়াশার রেখা দিয়ে। একটি পাখির উড়ে যাওয়া দিয়ে। একটি ঘোড়ার নিঃশ্বাস দিয়ে। আর ম্যালারেনের নীল জলের ওপর ভোরের আলো দিয়ে।

আমি কিছুক্ষণ থেমে থাকি। চারপাশে তাকাই। মনে হয়, পৃথিবী যত দূরেই যাই, মানুষের ভেতরের প্রকৃতিটা তত দূরে যায় না। সুইডেনের কুয়াশা আমাকে বাংলাদেশের কুয়াশায় ফিরিয়ে নিয়ে যায়, ম্যালারেনের জল মনে করিয়ে দেয় আমার শৈশবের নদী, আর শরতের ঝরা পাতা মনে করিয়ে দেয় জীবনের কত কিছুই আমরা একদিন ছেড়ে এসেছি।

হয়তো এটাই প্রকৃতির সবচেয়ে বড় ক্ষমতা। সে আমাদের বর্তমানের মধ্যে দাঁড় করিয়ে অতীতের দরজা খুলে দিতে পারে।

আর সেই দরজা দিয়ে কখনো ফিরে আসে একটি মুখ, কখনো একটি গন্ধ, কখনো একটি গান, কখনো কোনো প্রিয় বিকেল, আবার কখনো এমন কোনো স্মৃতি, যার কথা আমরা বহু বছর ভুলে ছিলাম।

তখন মনে হয়, ঋতু বদলায়, মানুষ বদলায়, সম্পর্ক বদলায়, দেশ বদলায়, এমনকি আমাদের নিজের শরীর ও জীবনও বদলে যায়। কিন্তু কিছু অনুভূতি থেকে যায়। প্রেম কখনো ভালোবাসায় পরিণত হয়, ভালোবাসা কখনো দাম্পত্যের ঘর বাঁধে, আবার কোনো কোনো সম্পর্ক অসময়ে ভেঙেও যায়। কেউ আমাদের জীবনে থেকে যায়, কেউ দূরে চলে যায়, কেউ স্মৃতিতে পরিণত হয়। তবু মানুষের হৃদয়ে কিছু সম্পর্কের পাতা সহজে ঝরে না।

সম্ভবত জীবনও একটি দীর্ঘ ঋতুচক্র। কখনো বসন্ত আসে, কখনো গ্রীষ্ম, কখনো শরৎ। কোনো কোনো সময় শীতও নামে। কিন্তু কোনো ঋতুই চিরস্থায়ী নয়।

দূর আকাশে তখন একঝাঁক বুনো হাঁস উড়ে যায়। তারা জানে, কখন কোথায় যেতে হবে। মানুষ অনেক সময় তা জানে না।

ছবি: লেখকের মাধ্যমে প্রাপ্ত
ছবি: লেখকের মাধ্যমে প্রাপ্ত

তবু মানুষও একদিন নিজের ভেতরের কোনো অদৃশ্য ডাকে পথ বদলায়, দেশ বদলায়, সম্পর্ক বদলায়, জীবন বদলায়। আর পেছনে রেখে যায় কিছু পদচিহ্ন, কিছু মানুষ, কিছু ভালোবাসা এবং অসংখ্য স্মৃতি।

আমি আবার হাঁটতে শুরু করি। আমার সুইডিশ কৃষিখেতের দিকে। পেছনে ম্যালারেনের নীল জল, সামনে শরতের অপেক্ষায় থাকা মাঠ। বাতাসে কুয়াশা, গাছের পাতায় রঙ বদলের আভাস, দূরে ঘোড়ার নিঃশ্বাস, আর আকাশে পরিযায়ী পাখিদের দীর্ঘ যাত্রা।

হঠাৎ মনে হয়, শরৎ আসলে কোনো নির্দিষ্ট দিনে আসে না। সে আসে একটি গন্ধ হয়ে। একটি কুয়াশা হয়ে। একটি ঝরা পাতা হয়ে। কোনো পুরোনো স্মৃতি হয়ে। কখনো বাংলাদেশের শীতের ভোর হয়ে। কখনো সুইডেনের ম্যালারেনের নীল জলের ওপর ভাসতে থাকা কুয়াশা হয়ে।

হয়তো এটাই প্রকৃতির সবচেয়ে বড় ক্ষমতা। সে আমাদের বর্তমানের মধ্যে দাঁড় করিয়ে অতীতের দরজা খুলে দিতে পারে।

এক দেশের শরৎ কখনো কখনো অন্য দেশের শীত হয়ে ফিরে আসে। একটি ঋতু অন্য একটি ঋতুর স্মৃতি হয়ে ওঠে। একটি দেশের কুয়াশা অন্য দেশের ভোরকে জাগিয়ে তোলে।

শরৎ এখনো আসেনি। তবু সে এসে গেছে। আমার চারপাশে নয় শুধু, আমার ভেতরেও।

লেখক: গবেষক ও সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন। বর্তমানে সুইডেনপ্রবাসী

ইমেইল: [email protected]

বিষয়: গ্রীষ্মশরৎশীতশীতকালসুইডেন
সর্বশেষ
  • ১

    খুমেকে ইন্টার্ন চিকিৎসকদের কর্মবিরতি প্রত্যাহার

  • ২

    দাড়ি নিয়ে যুবদল নেতা নয়নের স্লোগান, নিন্দা জানিয়ে ক্ষমা চাইতে বলল জামায়াত

  • ৩

    বিদেশি বিনিয়োগকারীরা মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে কেন?

  • ৪

    পারমাণবিক কর্মসূচিতে কোনো ছাড় দেবে না ইরান

  • ৫

    বরিশালে প্রাথমিকে নিয়োগপত্র পাননি ৭২ প্রার্থী, কারণ জানেন না কেউ

সম্পর্কিত
  • মালয়েশিয়ার হালাল বাণিজ্য মেলায় বাংলাদেশি খাদ্যপণ্যে বিদেশি ব্যবসায়ীদের আগ্রহ

    মালয়েশিয়ার হালাল বাণিজ্য মেলায় বাংলাদেশি খাদ্যপণ্যে বিদেশি ব্যবসায়ীদের আগ্রহ

    মেলায় বাংলাদেশি খাদ্যপণ্যে আগ্রহ দেখিয়েছেন বিভিন্ন দেশের ব্যবসায়ীরা।

  • খলিলুর রহমান কি পারবেন বিভক্ত বিশ্বকে একই টেবিলে রাখতে?

    খলিলুর রহমান কি পারবেন বিভক্ত বিশ্বকে একই টেবিলে রাখতে?

    শেষ পর্যন্ত খলিলুর রহমানের সাফল্য তিনি কত শক্তিধর নেতার পাশে দাঁড়ালেন তা দিয়ে মাপা হবে না। বরং দেখা হবে, তিনি কত দক্ষতার সঙ্গে পরস্পরবিরোধী শক্তিগুলোর মাঝখানে দাঁড়িয়ে থেকেও নিজেকে নিরপেক্ষ রাখতে পারলেন।

  • সৌদি ফ্যাশন অ্যান্ড টেক্স এক্সপো নিয়ে জেদ্দায় বাংলাদেশ কনস্যুলেটের সংবাদ সম্মেলন

    সৌদি ফ্যাশন অ্যান্ড টেক্স এক্সপো নিয়ে জেদ্দায় বাংলাদেশ কনস্যুলেটের সংবাদ সম্মেলন

    মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম বৃহৎ অর্থনীতির দেশ সৌদি আরবে বাংলাদেশি পণ্যের বাজার সম্প্রসারণের লক্ষ্যে আজ বৃহস্পতিবার থেকে জেদ্দায় শুরু হচ্ছে চতুর্থ ‘সৌদি ফ্যাশন অ্যান্ড টেক্স এক্সপো ২০২৬। চার দিনব্যাপী (২৪ থেকে ২৭ সেপ্টেম্বর) এই এক্সপো জেদ্দা ইন্টারন্যাশনাল এক্সিবিশন অ্যান্ড কনভেনশন সেন্টারে আয়োজন

  • বাংলাদেশি আইটি পেশাজীবীদের জন্য মালয়েশিয়ায় বড় কর্মসংস্থানের সুযোগ

    বাংলাদেশি আইটি পেশাজীবীদের জন্য মালয়েশিয়ায় বড় কর্মসংস্থানের সুযোগ

    মালয়েশিয়ার উপ-অর্থমন্ত্রী বলেন, “বাংলাদেশের বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠীকে প্রয়োজনীয় কারিগরি ও পেশাগত প্রশিক্ষণ দেওয়া গেলে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে তাদের জন্য উল্লেখযোগ্য কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে।”