Advertisement Banner

ডিজিটাল শিক্ষা কমিয়ে কাগজের বইয়ে ফিরছে সুইডেনের স্কুলগুলো

ম্যাডি স্যাভেজ
ম্যাডি স্যাভেজ
ডিজিটাল শিক্ষা কমিয়ে কাগজের বইয়ে ফিরছে সুইডেনের স্কুলগুলো
ক্লাসরুমে ছাপানো বই, কাগজ এবং কলমের ওপর জোর দিচ্ছে সুইডেনের সরকার। ছবি: এআই

সুইডেনের শিক্ষা পদ্ধতি যে প্রায় পুরোটাই প্রযুক্তি নির্ভর তা তো আমরা জানি। কিন্তু বিধিবাম। এই নিয়ে রীতিমতো ভাঁজ পড়েছে সুইডিশ সরকারের কপালে। মনে করা হচ্ছে, এই কারণেই এই দেশে সাক্ষরতার হার কমে গেছে। আর এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় ক্লাসরুমে আবারও ছাপানো বই, কাগজ এবং কলমের ওপর জোর দিচ্ছে দেশটির সরকার। তবে এনালগ পদ্ধতিতে ফেরার এই সরকারি সিদ্ধান্ত নিয়ে এরই মধ্যে শুরু হয়েছে বিতর্ক। প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাবিদ এবং কম্পিউটার বিজ্ঞানীদের দাবি- এই পদক্ষেপ শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থান এবং সুইডেনের অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

স্টকহোমের নাক্কা এলাকার একটি উচ্চ বিদ্যালয়ের চিত্র এখন বেশ বদলে গেছে। শেষ বর্ষের শিক্ষার্থীরা তাদের ব্যাগ থেকে ল্যাপটপ বের করার পাশাপাশি এমন সব সরঞ্জাম বের করছে, যা কয়েক বছর আগেও খুব একটা দেখা যেত না।

১৮ বছর বয়সী শিক্ষার্থী সোফি বলেন, “এখন স্কুল থেকে ফেরার সময় প্রায়ই আমার ব্যাগে নতুন বই ও কাগজের স্তূপ থাকে।” তিনি জানান, তাদের একজন শিক্ষক এখন ক্লাসের সমস্ত টেক্সট বা পাঠ্যবস্তু প্রিন্ট করে বিলি করছেন। এমনকি গণিত ক্লাসেও ডিজিটাল লার্নিং প্ল্যাটফর্মের বদলে এখন কেবল পাঠ্যবই ব্যবহার করে পড়ানো হচ্ছে।

প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং উদীয়মান টেক স্টার্ট-আপের জন্য পরিচিত ইউরোপের অন্যতম আধুনিক দেশ সুইডেনের এই ‘ডিজিটাল-বিমুখ’ অবস্থান এখন এক বড় আলোচনার জন্ম দিয়েছে। অন্যসব দেশে যখন সবকিছুতেই অতি ডিজিটাল করার চেষ্টা চলছে, সেখানে সুইডেনে চলছে এনালগে ফেরার তোড়জোর। আলোচনা তাই হওয়ারই কথা।

সুইডেনের শ্রেণিকক্ষে ল্যাপটপের ব্যাপক ব্যবহার শুরু হয় শূন্য দশকের শেষের দিকে এবং এই শতকের প্রথম দশকের শুরুর ভাগে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সালের মধ্যেই মিউনিসিপ্যাল অনুদানভুক্ত হাই স্কুলগুলোর প্রায় ৮০ শতাংশ শিক্ষার্থীর হাতে ব্যক্তিগত ডিজিটাল ডিভাইস পৌঁছে যায়।

২০১৯ সালে প্রাক-প্রাথমিক স্তরেও ট্যাবলেট বা ট্যাবের ব্যবহার বাধ্যতামূলকভাবে পাঠ্যক্রমের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। তৎকালীন সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট নেতৃত্বাধীন সরকারের লক্ষ্য ছিল একদম ছোট শিশুদেরও ভবিষ্যতে একটি ক্রমবর্ধমান ডিজিটাল কর্মক্ষেত্র এবং ব্যক্তিগত জীবনেও প্রযুক্তি নির্ভর জন্য উপযুক্ত করে গড়ে তোলা।

২০২২ সালে ক্ষমতায় আসা বর্তমান ডানপন্থী জোট সরকার এখন হাঁটছে ঠিক উল্টো পথে।

সুইডেনের শিক্ষামন্ত্রীর দল ‘লিবারেল পার্টি’র মুখপাত্র জোয়ার ফরসেল বলেন, “আমরা আসলে ক্লাসরুম থেকে স্ক্রিন বা ল্যাপটপ যতটা সম্ভব সরিয়ে ফেলতে চাইছি। বড়রা হয়তো কিছুটা ব্যবহার করতে পারে, কিন্তু ছোটদের জন্য স্কুলে স্ক্রিনের কোনো দরকার নেই বলেই আমরা মনে করি।”

সরকার এখন একটি চটকদার স্লোগান দিচ্ছে ‘স্ক্রিন ছেড়ে বই ধরি’ ( från skärm till pärm)।

তাদের যুক্তি হলো, ডিজিটাল ডিভাইস না থাকলে শিশুরা পড়ালেখায় বেশি মন দিতে পারে এবং তাদের হাতের লেখাও ভালো হয়, পড়ার আগ্রহও বাড়ে।

২০২৫ সাল থেকে সুইডেনের প্রাক-প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে ডিজিটাল টুল ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা তুলে দেওয়া হয়েছে। এমনকি দুই বছরের কম বয়সী শিশুদের হাতে এখন আর ট্যাবলেট বা ট্যাব দেওয়া হচ্ছে না।

চলতি বছরের শেষের দিকে স্কুলগুলোতে মোবাইল ফোন ব্যবহারের ওপর একটি পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হতে যাচ্ছে। এমনকি পড়াশোনার কাজেও শিক্ষার্থীরা আর মোবাইল ব্যবহার করতে পারবে না।

স্কুলগুলোতে পাঠ্যবই এবং শিক্ষক নির্দেশিকা কেনার জন্য সরকার ইতিমধ্যে ২১০ কোটি ক্রোনার (প্রায় ২০০ মিলিয়ন ডলার) অনুদান দিয়েছে। ২০২৮ সাল থেকে বই-নির্ভর পড়াশোনা বাধ্যতামূলক করতে একটি নতুন পাঠ্যক্রমও তৈরি করা হচ্ছে।

জোয়ার ফরসেল বলেন, “বাচ্চাদের সঠিক শিক্ষার জন্য আসল বই পড়া, কাগজে লেখা আর হাতে-কলমে অঙ্ক করা অনেক বেশি কার্যকর।”

২০২৩ সালে বিশেষজ্ঞ ও শিক্ষকদের সাথে আলোচনার পরেই শিক্ষানীতিতে এই বড় বদল আনা হয়। স্টকহোমের ক্যারোলিনস্কা ইনস্টিটিউটের নিউরোসায়েন্টিস্ট ড. সিসেলা নাটলি জানান, ক্লাসরুমে ল্যাপটপ বা ট্যাবের কারণে শিক্ষার্থীদের মনোযোগ নষ্ট হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, ডিজিটাল ডিভাইসে পড়াশোনা করলে তথ্য মনে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। এমনকি অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহারের ফলে ছোট শিশুদের মস্তিষ্কের স্বাভাবিক বিকাশও বাধাগ্রস্ত হতে পারে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা গেছে।

সুইডেন সরকার আশা করছে, এই পুরোনো শিক্ষাপদ্ধতিতে ফিরে আসার ফলে আন্তর্জাতিক শিক্ষার মানদণ্ড প্রোগ্রাম ফর ইন্টারন্যাশনাল স্টুডেন্ট অ্যাসেসমেন্ট (পিআইএসএ) র‍্যাঙ্কিংয়ে তাদের অবস্থানের উন্নতি হবে। বিশ্বের উন্নত ও উচ্চ-আয়ের দেশগুলোর একটি আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সংগঠন অর্গানাইজেশন ফর ইকোনমিক কো-অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (ওইসিডি) পরিচালিত এই র‍্যাঙ্কিংয়ের মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে দেশগুলোর শিক্ষার মান যাচাই করা হয়। এক সময় শিক্ষার শীর্ষে থাকলেও, ২০১২ সালে সুইডেনের পারফরম্যান্স নাটকীয়ভাবে পড়তির দিকে। মাঝে কিছুটা উন্নতি হলেও, ২০২২ সালে গণিত ও অন্যান্য দক্ষতায় তারা আবারও বড় ধরনের পিছিয়ে পড়ে।

যদিও গড়পড়তা হিসেবে সুইডেন এখনো ওইসিডি দেশগুলোর তুলনায় কিছুটা এগিয়ে, কিন্তু ২০২২ সালের পড়ার ও লেখার দক্ষতায় তারা ব্রিটেন, যুক্তরাষ্ট্র, ডেনমার্ক ও ফিনল্যান্ডের চেয়ে খারাপ ফল করেছে। দেখা গেছে, দেশটিতে ১৫ থেকে ১৬ বছর বয়সী শিক্ষার্থীদের প্রায় এক-চতুর্থাংশই (২৪%) সাধারণ পড়ার বা বোঝার সক্ষমতা অর্জন করতে পারেনি।

জোয়ার ফরসেল বলেন, “আমরা দেখছি যেসব শিশু সবসময় ল্যাপটপ বা ট্যাবে পড়াশোনা করেছে, তারা আন্তর্জাতিক পরীক্ষায় পিছিয়ে পড়ছে।”

তবে এ বছরের শুরুতে ওইসিডির একটি রিপোর্টে বলা হয়েছে, ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে শিক্ষার্থীরা আসলে উপকৃতই হয়েছে। কিন্তু রিপোর্টে একটি সমস্যার কথা জানানো হয় ক্লাসরুমে ডিজিটাল ডিভাইসের কারণে শিক্ষার্থীদের মন বারবার পড়াশোনা থেকে সরে যায়। বিশেষ করে অঙ্ক ক্লাসে খুব বেশি কম্পিউটার বা ট্যাব ব্যবহার করলে পরীক্ষার ফল খারাপ হতে দেখা গেছে।

ওইসিডির শিক্ষা পরিচালক আন্দ্রেয়াস স্লাইখার মনে করেন, কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা বা লক্ষ্য ছাড়াই ক্লাসরুমে অতিরিক্ত প্রযুক্তি ঢুকিয়ে দেওয়ার কারণে এমনটা হয়েছে।

এদিকে, সরকারের এই বইমুখী নীতি নিয়ে ব্যবসায়ীদের মধ্যে বিতর্ক শুরু হয়েছে। সুইডিশ এডটেক ইন্ডাস্ট্রির পক্ষ থেকে সতর্ক করা হয়েছে যে, কেবল বই-খাতায় ফিরে গেলে শিক্ষার্থীরা ভবিষ্যতের চাকরির বাজারের জন্য তৈরি হতে পারবে না।

সংস্থাটির প্রধান জানি জেপেসেন বলেন, “আজকাল যেকোনো কাজের জন্যই ডিজিটাল জ্ঞান থাকা জরুরি।” তিনি আরও জানান, ভবিষ্যতে প্রায় ৯০ শতাংশ চাকরির জন্য কম্পিউটার বা প্রযুক্তি ব্যবহারের দক্ষতা লাগবে।

জেপেসেন সুইডেনের উদ্যোক্তা তৈরি এবং উদ্ভাবনের ওপর এর প্রভাব নিয়ে বেশ চিন্তিত। বর্তমানে জনসংখ্যার অনুপাতে সুইডেন হলো ইউরোপের সবচেয়ে বড় টেক ইউনিকর্ন (যেসব স্টার্ট-আপের বাজারমূল্য ১০০ কোটি ডলারের বেশি) তৈরির কারখানা।

জনপ্রিয় মিউজিক স্ট্রিমিং অ্যাপ স্পটিফাই এবং আইনি পেশার জন্য তৈরি এআই প্ল্যাটফর্ম লেগোরার মতো বড় বড় প্রতিষ্ঠানগুলো এই তালিকার অন্তর্ভুক্ত। জেপেসেন সতর্ক করে বলেন, “সুইডেনে যদি পর্যাপ্ত আইটি বা প্রযুক্তিগত দক্ষতা সম্পন্ন কর্মী না পাওয়া যায়, তবে এই ধরণের কোম্পানিগুলো অন্য দেশে চলে যাবে।”

এআইয়ের ক্রমবর্ধমান ব্যবহার নিয়েও নতুন বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। সুইডেন সরকার চাইছে মাধ্যমিক পর্যায়ের স্কুলগুলোতে এআই-এর সুযোগ ও ঝুঁকি নিয়ে পাঠদান শুরু করতে। তবে অনেক সমালোচকের মতে, এই শিক্ষা আরও ছোটবেলা থেকেই শুরু করা উচিত।

সুইডেনের লিঙ্কোপিং ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক লিনিয়া স্টেনলিডেন সতর্ক করে বলেন, এই পদক্ষেপ না নিলে একটি ডিজিটাল বৈষম্য তৈরি হতে পারে। বিত্তবান পরিবারের সন্তানরা তাদের বাবা-মায়ের সহায়তায় এআই ব্যবহারে দক্ষ হয়ে উঠবে, যা পিছিয়ে পড়া পরিবারের সন্তানদের তুলনায় তাদের বাড়তি সুবিধা দেবে।

তবে সুইডিশ পার্লামেন্টে জোয়ার ফরসেল তার অবস্থানে অনড়। তিনি মনে করেন, মৌলিক শিক্ষাগুলো ভালোভাবে রপ্ত করার আগে শিশুদের এআই শেখানো উচিত নয়। তার মতে, সরকারি এই সনাতন পদ্ধতি বৈষম্য বাড়াবে না, বরং সঠিক শিক্ষার মাধ্যমে সবাইকে সমান সুযোগ দেবে।

অন্যদিকে, সুইডিশ এডটেক ইন্ডাস্ট্রির প্রধান জানি জেপেসেন একে একটি সস্তা বা লোক দেখানো সিদ্ধান্ত বলে অভিহিত করেছেন। তার মতে, এনালগ বনাম ডিজিটাল বিতর্কের দিকে সরকারের এই মাত্রাতিরিক্ত মনোযোগ শিক্ষার মান পড়ে যাওয়ার অন্যান্য মূল কারণগুলো থেকে মানুষের দৃষ্টি সরিয়ে দিচ্ছে।

সুইডেনের শিক্ষা দপ্তরের গত মার্চের এক রিপোর্টে বলা হয়েছে, শিক্ষা সরঞ্জামের অভাব এবং শিক্ষকদের দক্ষতার ঘাটতিও ফলাফলের ওপর প্রভাব ফেলছে।

নাক্কা এলাকার শেষ বর্ষের শিক্ষার্থীদের মধ্যেও এই নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন মত পাওয়া গেছে। ১৮ বছর বয়সী অ্যালেক্সিওস বলেন, “ইন্টারনেট এখন ছোটদের ওপর জেঁকে বসেছে। আমি দেখেছি ওরা খুব সহজেই পড়া থেকে মন হারিয়ে ফেলে।” অ্যালেক্সিওস চায় না তার ছোট ভাইবোনেরা ক্লাসে তাদের মতো ল্যাপটপ বা ট্যাবে ডুবে থাকুক।

তবে ১৯ বছর বয়সী জেসমিন মনে করেন, ছোটবেলা থেকেই কম্পিউটার শেখা উচিত। তিনি বলেন, “আমাদের কম্পিউটারের ওপরই বেশি জোর দেওয়া উচিত। কারণ সত্যি বলতে, পুরো পৃথিবীই এখন কম্পিউটারে চলছে।”

*লেখাটি বিবিসিতে প্রকাশিত নিবন্ধ থেকে অনূদিত*

সম্পর্কিত