Chaarcha Logo
Chaarcha logo
সর্বশেষবিশেষএক্সপ্লেইনারবিশ্লেষণভাবনাভিডিওশর্টসজীবনচরচাম্যাগাজিনপ্রবাস
১০ অক্টোবর, ২০২৬
১০ অক্টোবর, ২০২৬
Chaarcha logo
সংক্ষেপেকানেক্টম্যাগাজিন

আমরা

আমাদের সম্পর্কেযোগাযোগবিধিনিষেধ ও শর্তাবলিগোপনীয়তার নীতি
Chaarcha logo
সর্বশেষবিশেষএক্সপ্লেইনারবিশ্লেষণভাবনাভিডিওশর্টসজীবনচরচাম্যাগাজিনপ্রবাস
১০ অক্টোবর, ২০২৬
১০ অক্টোবর, ২০২৬
সর্বশেষবিশেষএক্সপ্লেইনারবিশ্লেষণভাবনাভিডিওশর্টসজীবনচরচাম্যাগাজিনপ্রবাস
Chaarcha logo
সর্বশেষএক্সপ্লেইনারবিশ্লেষণভাবনাভিডিওশর্টসজীবনচরচাম্যাগাজিনপ্রবাস
আমরা
  • আমাদের সম্পর্কে
  • যোগাযোগ
  • বিধিনিষেধ ও শর্তাবলি
  • গোপনীয়তার নীতি
এক্সপ্লেইনারবিশ্লেষণ

সম্পাদক: সোহরাব হাসান, প্রিন্টার্স বিল্ডিং (লেভেল–১৪), ৫ রাজউক অ্যাভিনিউ, মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা, ঢাকা–১০০০, বাংলাদেশ

|

স্বত্ব © চরচা

Chaarcha Logo
Advertisement
Advertisement
> প্রবাস
প্রথম পর্ব

চার দশকেও যে দেশকে পুরো দেখা হয়নি

রহমান মৃধা

রহমান মৃধা

প্রকাশ : ০৫ অক্টোবর ২০২৬, ১৬: ৫৭
চার দশকেও যে দেশকে পুরো দেখা হয়নি
প্রতীকী ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

আমার জীবনের একটি দীর্ঘ অধ্যায়ের শুরু হয়েছিল ১৯৮৫ সালের ১৯ মে। সেদিন আমি সুইডেনে এসেছিলাম পড়াশোনার জন্য। তখন জানতাম না, এই দেশই একদিন আমার জীবনের এত বড় অংশ হয়ে উঠবে। পড়াশোনা শেষ করেছি, কর্মজীবনে প্রবেশ করেছি, নানা দায়িত্ব পালন করেছি, পরিবার গড়েছি, মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করেছি। চার দশকেরও বেশি সময় ধরে এই সমাজের ভেতর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে সুইডেনকে অনেকভাবে দেখেছি।

Advertisement

তবু আজও একটি কথা বলতে হয়, আমি পুরো সুইডেন দেখিনি।

একজন পর্যটক হয়তো কয়েক সপ্তাহে সুইডেনের বিখ্যাত কিছু জায়গা দেখে ফিরে যেতে পারেন। কিন্তু একটি দেশকে দেখা আর একটি দেশকে বোঝা এক বিষয় নয়। একটি দেশকে বুঝতে হলে তার মানুষ, ইতিহাস, প্রকৃতি, কাজ, পরিবার, শিক্ষা, রাষ্ট্র, অর্থনীতি, সংস্কৃতি এবং প্রতিদিনের জীবনকে একসঙ্গে দেখতে হয়।

আর সুইডেনকে বুঝতে হলে স্টকহোমের বাইরে যেতে হয়।

Advertisement
Advertisement
Advertisement

দক্ষিণ থেকে উত্তরে সুইডেনের বিস্তার প্রায় ১ হাজার ৫০০ কিলোমিটার। দেশটির ভূগোলও বৈচিত্র্যময়। দক্ষিণে কৃষিজমি, মধ্যাঞ্চলে বন ও হ্রদ, পূর্বে বাল্টিক সাগরের দীর্ঘ উপকূল ও দ্বীপপুঞ্জ, আর উত্তরে বিস্তীর্ণ বন, পাহাড় ও আর্কটিক অঞ্চলের কাছাকাছি প্রকৃতি।

এসসিবির ২০১৩ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সুইডেনে ২ লাখ ৬৭ হাজার ৫৭০টি দ্বীপ ছিল। এর মধ্যে ৩৮ শতাংশ ছিল সমুদ্রের দ্বীপ। একই পরিসংখ্যানে ৯৮৪টি দ্বীপে স্থায়ী জনবসতি এবং ৮ হাজার ৯৩টি দ্বীপে কোনো না কোনো ভবন থাকার তথ্য পাওয়া যায়। গটল্যান্ড দেশের সবচেয়ে বড় দ্বীপ, এরপর ওল্যান্ড।

স্টকহোম নিজেই যেন এই ভূগোলের একটি প্রতীক। হ্রদ, সমুদ্র, দ্বীপ ও সেতুর মধ্যে গড়ে ওঠা এই শহর একই সঙ্গে আধুনিক নগর ও প্রকৃতির কাছাকাছি একটি শহর।

আর সুইডেনে প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের একটি বিশেষ দিক হলো allemansrätten, অর্থাৎ প্রকৃতিতে চলাফেরা ও উপভোগের বিস্তৃত অধিকার। তবে এই অধিকার দায়িত্বের সঙ্গেও যুক্ত। প্রকৃতির কাছে যাওয়ার অধিকার মানে প্রকৃতিকে নষ্ট করার অধিকার নয়।

সুইডেনের ইতিহাসের আগে থেকেই যে মানুষগুলো

সুইডেনের উত্তরাঞ্চলের দিকে তাকালে দেশের আরেকটি ইতিহাস সামনে আসে। সামি জনগোষ্ঠী এই ভূখণ্ডের প্রাচীন আদিবাসী জনগোষ্ঠী। আধুনিক রাষ্ট্রের সীমানা তৈরি হওয়ার বহু আগে থেকেই তাদের জীবন এই উত্তরাঞ্চলের ভূমি, প্রকৃতি, ভাষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত।

সামি ভাষার পাঁচটি প্রধান ভাষারূপ রয়েছে—দক্ষিণ, উমে, পিতে, লুলে ও উত্তর সামি। সামিদের নিজস্ব নির্বাচিত প্রতিষ্ঠান সামি সংসদ

(Sametinget) রয়েছে, যা একই সঙ্গে একটি নির্বাচিত সংস্থা ও সরকারি কর্তৃপক্ষ। এতে ৩১ জন সদস্য থাকে এবং নির্বাচন হয় চার বছর পরপর।

সামি জনগোষ্ঠীর ইতিহাসের সঙ্গে সুইডিশ রাষ্ট্রের সম্পর্ক সবসময় সহজ ছিল না। ভূমি, ভাষা, সংস্কৃতি ও অধিকার নিয়ে অতীতের নীতির প্রভাব আজও আলোচনার বিষয়। ফলে উত্তরের সুইডেনকে শুধু বন, পাহাড় ও খনিজ সম্পদের ভূখণ্ড হিসেবে দেখলে একটি গুরুত্বপূর্ণ মানবিক ইতিহাস বাদ পড়ে যায়।

বন, লোহা আর শিল্পায়নের পথ

সুইডেনের আধুনিক অর্থনৈতিক ইতিহাস তার ভূগোলের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। বন, লৌহ আকরিক, জলবিদ্যুৎ ও অন্য প্রাকৃতিক সম্পদ শিল্পায়নের ভিত্তি তৈরি করেছে। সেই শিল্পায়নের সঙ্গে গড়ে উঠেছে বড় বড় সুইডিশ প্রতিষ্ঠান, উৎপাদনশিল্প এবং রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতি।

ব্যক্তিগত স্বাধীনতায় সুইডেন-ডেনমার্কের স্তরে বাংলাদেশbangladesh

ভলভো, এরিকশন, এসকেএফ, স্যান্ডভিক, অ্যাটলাস কোপকো, ইলেকট্রোলাক্স, আইকেইএ, অ্যাস্ট্রাজেনেকা, এইচ&এম ও স্পটিফাই-এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলো বিভিন্ন সময়ে সুইডেনের শিল্প ও উদ্ভাবনের পরিচয়কে বিশ্বে পৌঁছে দিয়েছে।

কিন্তু শুধু প্রাকৃতিক সম্পদ দিয়ে একটি ছোট জনসংখ্যার দেশ দীর্ঘমেয়াদে শক্তিশালী অর্থনীতি তৈরি করতে পারে না।

এর পেছনে প্রয়োজন শিক্ষা, দক্ষতা, প্রযুক্তি, গবেষণা, অবকাঠামো, শ্রমবাজার, প্রতিষ্ঠান এবং পারস্পরিক আস্থা।

সুইডেনের শ্রমবাজারের ইতিহাসেও একটি বিষয় লক্ষণীয়। কর্মী ও ব্যবস্থাপনার সম্পর্ককে শুধু মালিক বনাম শ্রমিকের দ্বন্দ্ব হিসেবে না দেখে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান খোঁজার একটি দীর্ঘ ঐতিহ্য তৈরি হয়েছে। এর সঙ্গে শ্রমিক সংগঠন, নিয়োগকর্তা এবং রাষ্ট্রের মধ্যে সমঝোতার সংস্কৃতিও যুক্ত হয়েছে।

আমার নিজের কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা এই বিষয়টিকে অন্যভাবে বুঝতে সাহায্য করেছে।

ফার্মাসিউটিক্যাল শিল্পে বহু বছর কাজ করতে গিয়ে দেখেছি, একটি ওষুধ তৈরি হওয়া মানে শুধু কারখানায় একটি পণ্য উৎপাদন করা নয়। কাঁচামাল, উৎপাদন, মাননিয়ন্ত্রণ, নথিপত্র, পরিচ্ছন্নতা, নিরাপত্তা, সংরক্ষণ, পরিবহন, নিয়ন্ত্রক সংস্থার মানদণ্ড এবং শেষ পর্যন্ত রোগীর কাছে পৌঁছানো পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াটিই গুরুত্বপূর্ণ।

একটি ছোট ভুলও সেখানে ছোট থাকে না। কারণ শেষ পর্যন্ত তার সঙ্গে একজন মানুষের জীবন জড়িয়ে থাকতে পারে, রাষ্ট্রও অনেকটা তেমন।

কল্যাণরাষ্ট্রের ভিত

সুইডেনের উন্নয়নের গল্প শুধু শিল্পের গল্প নয়। এর সঙ্গে সমান্তরালে গড়ে উঠেছে কল্যাণরাষ্ট্রের ধারণা।

শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক নিরাপত্তা, শিশু ও পরিবার সহায়তা, বেকারত্ব ও বার্ধক্যের সময়ে সুরক্ষা, প্রবীণদের সেবা, প্রতিবন্ধী মানুষের সহায়তা, এসবের পেছনে রয়েছে একটি সামাজিক চুক্তি।

রাষ্ট্র নাগরিককে কিছু সেবা দেবে, আর নাগরিক কর ও দায়িত্বের মাধ্যমে সেই ব্যবস্থাকে বহন করতে অংশ নেবে।

এই ব্যবস্থার শক্তি তখনই বোঝা যায়, যখন মানুষ জীবনের কোনো কঠিন সময়ে পড়ে। চাকরি হারানো, অসুস্থতা, বার্ধক্য কিংবা সন্তানের প্রয়োজনের সময়ে রাষ্ট্র কতটা পাশে দাঁড়াতে পারে, সেখানেই কল্যাণরাষ্ট্রের বাস্তব অর্থ প্রকাশ পায়।

কিন্তু এই ব্যবস্থারও সীমা আছে।

জনসংখ্যার বয়স বাড়ছে। স্বাস্থ্য ও সামাজিক সেবার প্রয়োজন বাড়ছে। দক্ষ কর্মীর প্রয়োজনও বাড়ছে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় সেবার অর্থায়নের প্রশ্নও রয়েছে।

তাই ভবিষ্যতের সুইডেনের সামনে একটি বড় প্রশ্ন থাকবে; কীভাবে এমন একটি কল্যাণব্যবস্থা বজায় রাখা যায়, যা আজকের মানুষের পাশাপাশি আগামী প্রজন্মের কাছেও টেকসই থাকে?

স্কুলের শ্রেণিকক্ষেই ভবিষ্যৎ

সুইডেনের শিক্ষা ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো, শিক্ষা শুধু পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়ার জন্য নয়। স্কুলে জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, সামাজিক দায়িত্ব এবং ভবিষ্যৎ জীবনের প্রস্তুতিকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়।

প্রাথমিক ও নিম্ন মাধ্যমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক। এরপর উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন একাডেমিক ও বৃত্তিমূলক পথে যেতে পারে। যারা প্রয়োজনীয় যোগ্যতা অর্জন করতে পারেনি, তাদের জন্যও বিকল্প শিক্ষাপথ রয়েছে।

প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য Komvux এবং অভিবাসীদের জন্য এসএফআই-এর মতো ব্যবস্থাও রয়েছে।

এখানে একটি বিষয় আমার কাছে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। একজন মানুষের শিক্ষা শুধু ২০ বছর বয়সে শেষ হয়ে যায় না।

আমি নিজেও বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনার পর কর্মজীবনের মধ্যে এক্সিকিউটিভ এমবিএ করেছি। কর্মজীবনে ঢোকার পর আবার শেখার প্রয়োজন কতটা, তা নিজের অভিজ্ঞতা থেকেই বুঝেছি।

আজ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অটোমেশন এবং সবুজ শিল্পের মতো পরিবর্তন যখন কাজের ধরন বদলে দিচ্ছে, তখন লাইফলং লার্নিং বা জীবনব্যাপী শিক্ষার গুরুত্ব আরও বাড়ছে।

অভিবাসন কমার পর কীভাবে ভোটার টানবে সুইডেনের ডেমোক্র্যাটরা?sweden

তবে শিক্ষায় সমান সুযোগ আর সমান ফল এক বিষয় নয়।

একটি শিশুর পরিবারের অর্থনৈতিক অবস্থা, বাবা-মায়ের শিক্ষা, ভাষা, বাসস্থান, সামাজিক পরিবেশ এবং ঘরে পড়াশোনার সুযোগ তার ভবিষ্যৎকে প্রভাবিত করতে পারে।

তাই একটি ভালো শিক্ষা ব্যবস্থা শুধু স্কুলের ভেতরের শিক্ষাকে নয়, শিশুটির চারপাশের সমাজকেও দেখতে বাধ্য।

ভাষা থেকে কাজ, কাজ থেকে সমাজ

অভিবাসনের প্রশ্নে ভাষা একটি গুরুত্বপূর্ণ দরজা। কিন্তু ভাষা শেখানোই পুরো সমাধান নয়।

একজন মানুষ ভাষা শিখবেন, কিন্তু যদি সেই ভাষা ব্যবহার করার সুযোগ না পান, মানুষের সঙ্গে মেশার সুযোগ না পান, কাজের জায়গায় প্রবেশ করতে না পারেন, তাহলে শেখা ভাষা তার জীবনে কতটা কার্যকর হবে?

আমার নিজের অভিজ্ঞতায় মনে হয়েছে, কাজ শুধু অর্থ উপার্জনের পথ নয়। কাজ একজন মানুষকে সমাজের সঙ্গে যুক্ত করে।

কর্মক্ষেত্রে সহকর্মী পাওয়া যায়, নিয়ম শেখা যায়, দায়িত্ব নেওয়া যায়, নিজের যোগ্যতা প্রকাশের সুযোগ পাওয়া যায়। ধীরে ধীরে সমাজের সঙ্গে একটি সম্পর্ক তৈরি হয়।

সামাজিক সংহতির ক্ষেত্রেও তাই ভাষা, শিক্ষা, কাজ, পরিবার ও স্থানীয় সমাজকে একসঙ্গে দেখতে হয়।

২০২৬ সালে এসসিবির একটি সরকারি দায়িত্বের অধীনে প্রকাশিত বিশ্লেষণে গণতান্ত্রিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক একীভবনের বিভিন্ন দিক নিয়ে ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের জীবনযাত্রার তথ্য এবং ২০২৬ সালের সামাজিক সংহতির জরিপ বিশ্লেষণ করা হয়েছে। অর্থাৎ integration এখনো সুইডিশ সমাজের একটি চলমান নীতিগত ও সামাজিক প্রশ্ন।

যখন নিরাপত্তার প্রশ্ন সামনে আসে

সুইডেনের পরিবর্তনের কথা বলতে গেলে অপরাধ ও নিরাপত্তার প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া যাবে না।

বিশেষ করে সংঘবদ্ধ অপরাধ, গ্যাং সহিংসতা এবং আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার গত কয়েক বছরে সমাজে বড় উদ্বেগ তৈরি করেছে।

তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য করা দরকার।

অভিবাসন এবং অপরাধ এক বিষয় নয়।

বিভিন্ন দেশ ও পটভূমি থেকে আসা মানুষের বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠই সাধারণ জীবনযাপন করেন, কাজ করেন, পড়াশোনা করেন এবং পরিবার গড়ে তোলেন। অপরাধী গোষ্ঠীর কর্মকাণ্ডকে একটি সম্পূর্ণ জনগোষ্ঠীর পরিচয়ের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা বাস্তবতাকে সরল করে ফেলে।

একই সঙ্গে অপরাধের বাস্তবতাকেও ছোট করে দেখার সুযোগ নেই।

Brå (এটি সুইডেনের জাস্টিস ডিপার্টমেন্ট বা আইন মন্ত্রণালয়ের অধীন একটি সরকারি সংস্থা)–এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সুইডেনে ৮৪টি নিশ্চিত প্রাণঘাতী সহিংসতার ঘটনা ছিল, যা ২০২৪ সালের তুলনায় ৮টি কম এবং ২০১৬ থেকে ২০২৫ সময়ের দশ বছরের গড়েরও নিচে।

অর্থাৎ বাস্তবতাটি একই সঙ্গে দুই দিকেই দেখতে হবে।

নিরাপত্তার সমস্যা বাস্তব। কিন্তু তার সমাধান খুঁজতে গিয়ে একটি সম্পূর্ণ জনগোষ্ঠীকে সমস্যার সঙ্গে এক করে দেখা যাবে না।

শিক্ষা, কর্মসংস্থান, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, মাদক, অপরাধী নেটওয়ার্ক, পারিবারিক পরিবেশ এবং স্থানীয় পরিস্থিতি, সবকিছুকে বিবেচনায় নিয়েই একটি জটিল সমস্যাকে বোঝার চেষ্টা করতে হবে।

স্বাস্থ্য: যখন মানুষ সবচেয়ে দুর্বল

একটি কল্যাণরাষ্ট্রের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা হয় মানুষ যখন অসুস্থ হয়ে পড়ে।

সুইডেনে স্বাস্থ্যসেবা মূলত অঞ্চলভিত্তিকভাবে পরিচালিত। পৌরসভাগুলোরও প্রবীণ ও কিছু সামাজিক সেবায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

সুইডেনের সাধারণ নির্বাচনে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত প্রার্থীদের সরব উপস্থিতি Symbolic image of voting Reuters

আমার নিজের পেশাগত অভিজ্ঞতা থেকে স্বাস্থ্যব্যবস্থার আরেকটি দিকও আমি দেখেছি। একজন রোগী যখন ওষুধ হাতে পান, তখন তিনি সাধারণত দেখতে পান শেষ ধাপটি। কিন্তু তার পেছনে থাকে কাঁচামাল, উৎপাদন, মাননিয়ন্ত্রণ, নথিপত্র, সংরক্ষণ, পরিবহন, সরবরাহব্যবস্থা এবং কঠোর নিয়ন্ত্রক মানদণ্ডের একটি দীর্ঘ শৃঙ্খল।

একটি নিরাপদ ওষুধের পেছনে শুধু একটি কোম্পানি নয়, একটি সম্পূর্ণ ব্যবস্থা কাজ করে।

তবু কোনো স্বাস্থ্যব্যবস্থাই সমস্যামুক্ত নয়। কোথাও অপেক্ষার সময়, কোথাও জনবল, কোথাও অর্থনৈতিক চাপ, কোথাও আঞ্চলিক পার্থক্য, আবার কোথাও দ্রুত সেবার প্রয়োজন, সবই বাস্তবতা।

একটি উন্নত স্বাস্থ্যব্যবস্থার মান তাই শুধু প্রযুক্তি বা হাসপাতালের সংখ্যা দিয়ে বিচার করা যায় না। মানুষ যখন সবচেয়ে দুর্বল অবস্থায় থাকে, তখন সে কতটা সম্মান, নিরাপত্তা ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পায়, সেটিই আসল প্রশ্ন।

পরিবার বদলেছে

সুইডেনের সামাজিক পরিবর্তনের আরেকটি বড় অধ্যায় পরিবার।

আজ পরিবার বলতে শুধু প্রচলিত বিবাহিত দম্পতি ও সন্তানকে বোঝানো যায় না। একক অভিভাবক পরিবার, বিবাহিত ও অবিবাহিত দম্পতি, পুনর্গঠিত পরিবার এবং সমলিঙ্গের পরিবারসহ বিভিন্ন ধরনের পারিবারিক কাঠামো এখানে বিদ্যমান।

ব্যক্তিস্বাধীনতার গুরুত্ব সুইডিশ সমাজে প্রবল। মানুষ নিজের জীবন, শিক্ষা, পেশা, সম্পর্ক ও পারিবারিক সিদ্ধান্তে বড় ধরনের স্বাধীনতা ভোগ করে।

কিন্তু স্বাধীনতার সঙ্গে দায়িত্বও থাকে।

নারী ও পুরুষের সমান অংশগ্রহণ, পিতামাতার ছুটি, কর্মজীবন ও পারিবারিক জীবনের ভারসাম্য, এসব পরিবর্তন পরিবারকে নতুনভাবে গড়ে তুলেছে।

তবু আইনগত সমতা আর বাস্তব সমতা সবসময় এক নয়। ঘরের অদৃশ্য কাজ, সন্তান ও প্রবীণদের যত্ন, পেশাগত নেতৃত্ব এবং আয়ের পার্থক্য নিয়ে প্রশ্ন এখনো রয়েছে।

আর ব্যক্তিস্বাধীনতার আরেকটি দিকও আছে।

একজন মানুষ স্বাধীন হতে পারেন, কিন্তু একা হয়ে যেতে পারেন।

রাষ্ট্র শিক্ষা দিতে পারে, চিকিৎসা দিতে পারে, সামাজিক নিরাপত্তা দিতে পারে। কিন্তু বন্ধুত্ব, ভালোবাসা ও গভীর মানবিক সম্পর্ক রাষ্ট্র তৈরি করতে পারে না।

রাষ্ট্রকে প্রশ্ন করার অধিকার

সুইডেনকে বুঝতে হলে রাষ্ট্র কী দেয় তা যেমন দেখতে হয়, রাষ্ট্র কীভাবে কাজ করে সেটিও দেখতে হয়।

সুইডেনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো সরকারি নথিতে জনসাধারণের প্রবেশাধিকারের নীতি। ফ্রিডম অব দ্য প্রেস অ্যাক্ট-এর অধীনে সরকারি নথি সাধারণভাবে জনগণের জন্য উন্মুক্ত, যদিও জাতীয় নিরাপত্তা, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, অপরাধ প্রতিরোধসহ নির্দিষ্ট কারণে তথ্য গোপন রাখা যায়।

এই ঐতিহ্যের শিকড় আরও পুরোনো। ১৭৬৬ সালে সুইডেন আইন করে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠা করেছিল এবং দেশটি এ ক্ষেত্রে বিশ্বের প্রথম রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত।

কিন্তু স্বচ্ছতা থাকলেই কি দুর্নীতি থাকবে না?

অবশ্যই নয়।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের ২০২৫ সালের করাপশন পাসেপশনস ইনডেক্সে সুইডেন ১০০-এর মধ্যে ৮০ পয়েন্ট পেয়েছে এবং ১৮২টি দেশ ও অঞ্চলের মধ্যে ষষ্ঠ অবস্থানে ছিল। তবে এটি সরকারি খাতে দুর্নীতির প্রত্যক্ষ ঘটনার সংখ্যা নয়; সূচকটি মূলত সরকারি খাতে দুর্নীতির ধারণা বা পারসেপশন পরিমাপ করে।

তাই কোনো সূচকে ভালো অবস্থান মানেই অনিয়ম নেই, এমন বলা যায় না।

একটি সুস্থ রাষ্ট্রের পরীক্ষা বরং অন্য জায়গায়; অনিয়মের অভিযোগ উঠলে মানুষ প্রশ্ন করতে পারে কি না, সাংবাদিক অনুসন্ধান করতে পারে কি না, সরকারি নথি পাওয়া যায় কি না এবং প্রতিষ্ঠানগুলো সেই প্রশ্নের জবাব দিতে বাধ্য কি না।(আগামী পর্বে সমাপ্য)

লেখক: গবেষক ও সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন

ই-মেইল: [email protected]

বিষয়: সমাজপ্রকৃতিদেশমানুষসুইডেনঅর্থনীতি
Advertisement
সর্বশেষ
  • ১

    রাজনৈতিক প্রোপাগাণ্ডা ও বিদ্যায়তনিক পরাধীনতার শিকার তাসনীম সিরাজ

  • ২

    ব্রাজিলের নির্বাচন ও লাতিন আমেরিকায় মার্কিন আধিপত্য

  • ৩

    সরকারি কর্মী: বেতন বৃদ্ধি যৌক্তিক ও সময়োচিত

  • ৪

    ১৯৫৪ সালের পূর্ব পাকিস্তান আইনসভায় নির্বাচিত অমুসলিম ছিলেন ৭২ জন, এখন বাংলাদেশে ৪

  • ৫

    ব্যাংক খাত পুনর্গঠনে বছরে ৬০ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন: গভর্নর

সম্পর্কিত
  • রেমিট্যান্স বন্ধের হুমকি দেশবিরোধী: রুহুল কবির রিজভী

    রেমিট্যান্স বন্ধের হুমকি দেশবিরোধী: রুহুল কবির রিজভী

    শুক্রবার বিকেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি মিলনায়তনে ‘জিয়া স্মৃতি পাঠাগার’ আয়োজিত অনুষ্ঠানে রুহুল কবির রিজভী এসব কথা বলেন।

  • মালয়েশিয়ায় বিদেশি কর্মী কোটা জালিয়াতির অভিযোগে ১১ বাংলাদেশিসহ আটক ২০

    মালয়েশিয়ায় বিদেশি কর্মী কোটা জালিয়াতির অভিযোগে ১১ বাংলাদেশিসহ আটক ২০

    দাতুক জাকারিয়া বলেন, অনুসন্ধানে দেখা গেছে, দেশে আনা বিদেশি কর্মীরা কোটার জন্য আবেদন করা কোম্পানিগুলোর হয়ে কাজ করত না। এর বদলে তারা স্বাধীনভাবে অন্য কোম্পানিতে কাজ করত।

  • যুক্তরাষ্ট্রে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের কর্মসূচিতে ৭০ হাজার ডলার ফি আরোপের প্রস্তাব

    যুক্তরাষ্ট্রে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের কর্মসূচিতে ৭০ হাজার ডলার ফি আরোপের প্রস্তাব

    ওপিটি হলো শিক্ষার্থীদের অধ্যয়নের বিষয়সংশ্লিষ্ট কাজে সাময়িকভাবে যুক্তরাষ্ট্রে কাজ করার অনুমতি দেওয়ার একটি ব্যবস্থা।

  • বিমানবন্দরে প্রবাসী কর্মীদের হয়রানি বন্ধে নজরদারির সুপারিশ

    বিমানবন্দরে প্রবাসী কর্মীদের হয়রানি বন্ধে নজরদারির সুপারিশ

    মন্ত্রণালয়ের সব কর্মকর্তা যাতে দায়িত্ব পালনে সতর্ক থাকেন এবং সামগ্রিক কার্যক্রমে কোনো ধরনের অনিয়ম, দুর্নীতি বা বিচ্যুতি না ঘটে, সে বিষয়ে কমিটি তাগিদ দেয়।