অস্ট্রেলিয়ায় পড়াশোনার জন্য আসা বিদেশি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তাদের সঙ্গী ও সন্তানদের আসার সুযোগ বন্ধ করা হবে। পাশাপাশি ‘ওয়ার্কিং হলিডে’ ভিসার নিয়মও কঠোর করা হবে। দেশটিতে উচ্চহারে অভিবাসন নিয়ে বিতর্ক বাড়ার মধ্যে আজ বৃহস্পতিবার এক জ্যেষ্ঠ মন্ত্রী এ কথা জানিয়েছেন।
বার্তা সংস্থা রয়টার্স এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে।
সরকারের এ পদক্ষেপের আগে সাম্প্রতিক জনমত জরিপে দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠা কট্টর ডানপন্থী ওয়ান নেশন পার্টি চলতি সপ্তাহে বলেছে, তিন বছরে অস্থায়ী অভিবাসীর সংখ্যা ৭ লাখ ৫০ হাজার কমানো হবে। এর মাধ্যমে অস্ট্রেলীয়দের ‘স্বস্তির সুযোগ’ দেওয়া হবে বলে দলটি জানিয়েছে।
তবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী টনি বার্ক ওয়ান নেশন পার্টির রাজনৈতিক চাপের কারণে এসব পরিবর্তন আনা হচ্ছে, এমন ধারণা নাকচ করে দিয়েছেন। নিজেদের নীতিকে ‘অস্ট্রেলিয়া ফার্স্ট’ হিসেবে বর্ণনা করা দলটির নীতির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতির তুলনা করা হয়ে থাকে।
সাংবাদিকদের বার্ক বলেন, “এটি সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য নেওয়া কোনো উদ্যোগ, এমন সন্দেহ করা যে একেবারেই ভুল, তা স্পষ্ট।”
সংস্কারগুলোর ফলে ২০২৮ সালের মধ্যে অস্ট্রেলিয়ায় বছরে নিট অভিবাসন কমে প্রায় ২ লাখ ২৫ হাজারে নেমে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে। মহামারির আগের সময়ের সঙ্গে যা মোটামুটি সামঞ্জস্যপূর্ণ। বর্তমানে এই সংখ্যা প্রায় ৩ লাখ। সাম্প্রতিক জনমত জরিপগুলোতে জীবনযাত্রার ব্যয় ও অভিবাসন ধারাবাহিকভাবে ভোটারদের প্রধান উদ্বেগের বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে।
বার্ক বলেন, ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার পরও যারা অস্ট্রেলিয়ায় অবস্থান করছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা আরও কঠোর করা হবে। এ জন্য আরও ১০০ জন কমপ্লায়েন্স কর্মকর্তা নিয়োগ করা হবে। পাশাপাশি মেলবোর্নের মহামারি-কালীন একটি কোয়ারেন্টিন স্থাপনাকে পুনর্ব্যবহার করে সেখানে অভিবাসন আটককেন্দ্র করার বিষয়টিও বিবেচনা করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, “আপনি যদি অস্থায়ীভাবে অস্ট্রেলিয়ায় আসতে চান, তাহলে অস্থায়ী ভিসার জন্য আবেদন করুন। স্থায়ীভাবে আসতে চাইলে স্থায়ী ভিসার জন্য আবেদন করুন। আর আপনার বৈধ ভিসা না থাকলে অস্ট্রেলিয়া ছেড়ে যাওয়া উচিত।”
ব্যাকপ্যাকারদের জন্য লটারির ব্যবস্থা
নতুন ব্যবস্থার আওতায় ‘ওয়ার্কিং হলিডে’ ভিসার মেয়াদ বাড়াতে আগ্রহী ব্যাকপ্যাকারদের জন্য লটারি বা বাছাই-ব্যবস্থা চালু করা হবে।
সব ধরনের ভিজিটর ভিসায় ‘নো ফারদার স্টে’ শর্ত যুক্ত করা হবে। এর ফলে ভিসাধারীরা অস্ট্রেলিয়ায় অবস্থান করে পার্টনার ভিসার মতো অন্য কোনো ভিসার জন্য আবেদন করে সেখানেই থাকার সুযোগ পাবেন না।
আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীরা কেবল তখনই তাদের স্টুডেন্ট ভিসা নবায়ন করতে পারবেন, যখন তারা উচ্চতর যোগ্যতা অর্জনের দিকে এগোবেন।
তবে প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জের কিছু দেশ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কিছু দেশের শিক্ষার্থীরা তাদের সঙ্গী ও সন্তানদের সঙ্গে আনতে পারবেন। অধিকাংশ স্টুডেন্ট ভিসার ক্ষেত্রে অবশ্য দ্বিতীয় আবেদনকারী হিসেবে সঙ্গী বা সন্তানকে যুক্ত করার সুযোগ থাকবে না।
বর্তমানে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের স্বামী, স্ত্রী বা সঙ্গীরা অস্ট্রেলিয়ায় কাজ করতে পারেন। তবে তারা কত ঘণ্টা কাজ করতে পারবেন, তা শিক্ষার্থীর পড়াশোনার কোর্সের ওপর নির্ভর করে।
২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত এক বছরে আন্তর্জাতিক শিক্ষা খাত অস্ট্রেলিয়ার অর্থনীতিতে ৫ হাজার ৩৬০ কোটি অস্ট্রেলীয় ডলার (৩ হাজার ৮০০ কোটি আমেরিকান ডলার) অবদান রেখেছে। এটি দেশটির চতুর্থ বৃহত্তম রপ্তানি খাত। তা সত্ত্বেও অভিবাসন কমানোর প্রচেষ্টায় কেন্দ্র-বামপন্থী লেবার সরকারের অন্যতম প্রধান নজরের বিষয় হয়ে উঠেছে বিদেশি শিক্ষার্থীরা।
গত চার বছরে স্টুডেন্ট ভিসার আবেদন ফি প্রায় ৩০০ শতাংশ বেড়ে ২ হাজার ৫০০ অস্ট্রেলীয় ডলারে দাঁড়িয়েছে। একই সময়ে ইংরেজি ভাষার দক্ষতার শর্ত এবং স্নাতকোত্তর ভিসার আবেদনকারীদের ন্যূনতম সঞ্চয়ের সীমাও কঠোর করা হয়েছে।
প্রস্তাবিত নীতিগত পরিবর্তন নিয়ে অস্ট্রেলিয়ান ব্রডকাস্টিং করপোরেশনকে (এবিসি) দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইউনিভার্সিটিজ অস্ট্রেলিয়ার প্রধান নির্বাহী লুক শিহি বলেন, “দেশের একটি বড় জাতীয় সম্পদ আন্তর্জাতিক শিক্ষা। এ নিয়ে যে আস্থা তৈরি হয়েছিল, তার ওপর ধীরে ধীরে আঘাত আসছে।”
প্রায় দুই বছর কোভিড-১৯ মহামারির কারণে সীমান্ত বন্ধ থাকার পর ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে অস্ট্রেলিয়া সীমান্ত খুলে দিলে দেশটিতে অভিবাসন দ্রুত বেড়ে যায়। এ বৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি ছিল আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী, ব্যাকপ্যাকার ও অস্থায়ী কর্মীরা।
তবে গত দুই বছরে এই সংখ্যা কমেছে। ২০২৫ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত এক বছরে অস্ট্রেলিয়ায় নিট বিদেশি অভিবাসন ছিল ৩ লাখ ৬ হাজার। এর অর্ধেকেরও বেশি ছিলেন আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী। ২০২৩ সালে এই সংখ্যা সর্বোচ্চ ৫ লাখ ১৮ হাজারে পৌঁছেছিল।