বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণ। আর এই পার্বণ তালিকায় সবচেয়ে অসাম্প্রদায়িক ও প্রাণের উৎসব হলো পয়লা বৈশাখ। নববর্ষের এই দিনটি কেবল ক্যালেন্ডারের পাতা ওল্টানোর দিন নয়; বরং এটি বাঙালির জাতিসত্তা, সংস্কৃতি ও পারস্পরিক সৌহার্দ্য উদ্যাপনের এক মহালগ্ন। বৈশাখের এই উৎসব এক সময় ঘরদোর পরিষ্কার করা আর হালখাতার মিষ্টির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। সময়ের বিবর্তনে এর সাথে যুক্ত হয়েছে নতুন এক অনুষঙ্গ–বৈশাখের উপহার। উপহারের আদান-প্রদান এখন উৎসবের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা বাঙালি হৃদয়ের উষ্ণতা আর ভালোবাসাকেই প্রকাশ করে।
পয়লা বৈশাখ উদ্যাপনের ইতিকথা
বাংলাদেশে পয়লা বৈশাখ উদ্যাপনের শেকড় অনেক গভীরে প্রোথিত। এর ইতিহাস মূলত মোগল সম্রাট আকবরের আমল থেকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়। খাজনা আদায়ে সুবিধার দিকে তাকিয়েই আকবর ফসলি সনের সূচনা করেন। সম্রাটের নির্দেশে রাজজ্যোতিষী ফতেহউল্লাহ সিরাজির তত্ত্বাবধানে সৌর ও চন্দ্রবর্ষের সমন্বয়ে তৈরি হয় ‘ফসলি সন’, যা কালক্রমে ‘বঙ্গাব্দ’ হিসেবে পরিচিতি পায়। বাংলাদেশের জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়ার তথ্য বলছে, ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দে ১০ বা ১১ মার্চ প্রবর্তিত এই সন মূলত খাজনা আদায়ের সুবিধার্থে করা হয়।
এ ক্ষেত্রে কেউ নওরোজের প্রভাবের কথা বলেন, কেউ-বা বলেন শকাব্দের কথা, যা রাজা শশাঙ্কের প্রবর্তিত বর্ষপঞ্জি। এ নিয়ে গবেষকদের মধ্যেই রয়েছে বিস্তর তর্ক। সে যাক। কালক্রমে এই বঙ্গাব্দের প্রথম দিনটিতে উৎসবের আমেজ যোগ হয়। প্রজাদের খাজনা পরিশোধ, আর জমিদারদের তরফে মিষ্টি দিয়ে আপ্যায়ন–এই প্রথাই ছিল বাঙালি ঐতিহ্যের ‘হালখাতা’র সূচনালগ্ন। এ উপলক্ষে তখন মেলা বসত। হতো নানা অনুষ্ঠান।
বিংশ শতাব্দীতে এসে পয়লা বৈশাখ অর্থনৈতিক লেনদেনের গণ্ডি পেরিয়ে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনে রূপ নেয়। ইতিহাসবিদ মুনতাসীর মামুন জানান, বিভিন্ন সময়ে বাংলা নববর্ষ উদ্যাপন বাঙালির প্রতিবাদের ভাষা হয়েও উঠেছে। বিশেষ করে ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর আইয়ুব খানের আমলে ১৯৬৭ সালে ছায়ানটের রমনার বটমূলে বর্ষবরণ অনুষ্ঠান শুরুর পর থেকে এটি বাঙালির আত্মপরিচয়ের প্রতীক হয়ে ওঠে।
আশির দশকের শেষের দিকে স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ভাষা ছিল বর্ষবরণের আনুষ্ঠানিকতা। ১৯৮৯ সালে পয়লা বৈশাখের অনুষ্ঠানে যোগ হয় আনন্দ শোভাযাত্রা, পরে যার নাম হয় মঙ্গল শোভাযাত্রা। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলার এই ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ নামেই আয়োজনটি ইউনেসকোর বিশ্ব ঐতিহ্যের মর্যাদা পায়।
বৈশাখের উপহার: আদি থেকে বর্তমান
পয়লা বৈশাখের উপহারের সংস্কৃতি একদিনে গড়ে ওঠেনি। এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘ এক সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিবর্তন। গ্রামবাংলার আড়ত থেকে শহরের শপিং মল–এই যাত্রায় উপহারের ধরন বদলেছে ঠিকই, কিন্তু এর ভেতরের ‘বাঙালিয়ানা’ আবেগটি রয়ে গেছে আগের মতোই।
প্রাচীনকাল থেকেই কৃষিভিত্তিক এই জনপদে বছরের প্রথম দিনটি ছিল হিসাব মেলানোর দিন। চৈত্র মাসের শেষ দিন পর্যন্ত সব দেনা-পাওনা চুকিয়ে বৈশাখের প্রথম সকালে নতুন খাতায় নাম লেখানো হতো। এই ‘হালখাতা’ অনুষ্ঠানটি কেবল একটি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ছিল না, ছিল এক বিরাট সামাজিক মিলনমেলা।
তখন উপহার বলতে এখনকার মতো দামী জিনিসের চল ছিল না। ক্রেতা যখন পুরনো দেনা শোধ করে দোকানে আসত, তখন দোকানি তাকে আপ্যায়ন করত ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি দিয়ে। এক প্যাকেট জিলাপি, কদমা, বাতাসা বা রসগোল্লা ছিল সেই সময়ের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত উপহার।
একটা সময় মেলা থেকে কেনা এমন খেলনাই ছিল ছোটদের অন্যতম প্রিয় উপহার। ছবি: চরচাএই মিষ্টির প্যাকেটটি ছিল ক্রেতা-বিক্রেতার মধ্যকার অটুট বিশ্বাসের প্রতীক। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যেত, ছোট ছোট শিশুরা তাদের বাবার হাত ধরে দোকানে যেত শুধু সেই মিষ্টির প্যাকেটের আশায়। উপহার হিসেবে এই মিষ্টিই ছিল তৎকালীন সমাজের সৌহার্দ্য বিনিময়ের মাধ্যম।
গত শতকের শেষ দশক এবং এই শতকের একদম শুরুতে বৈশাখী উপহারে যুক্ত হয় নতুন পোশাক। আগে যেখানে ঈদ বা পূজায় নতুন পোশাক কেনা হতো, সেখানে পয়লা বৈশাখ নিজের সংস্কৃতিকে উদ্যাপনের এক নতুন উপলক্ষ হয়ে দাঁড়ায়।
বৈশাখী সাজে লাল-সাদা রঙের প্রাধান্য শুরু হয়েছিল মূলত শুভ্রতা ও নতুনত্বের প্রতীক হিসেবে। শাড়ির লাল পাড় আর সাদা জমিন কিংবা সাদা পাঞ্জাবিতে লাল কাজ–এটি যেন বাঙালির এক অলিখিত ‘ড্রেস কোড’ হয়ে যায়। এই সময়েই বাবা-মায়েরা সন্তানদের জন্য বৈশাখী পোশাক কেনা শুরু করে এবং আত্মীয়-স্বজনদের মাঝে কাপড় উপহার দেওয়ার রেওয়াজ তৈরি হয়।
একবিংশ শতাব্দীর শুরুর দুই দশকে বাংলাদেশের গণমাধ্যম এবং বিশ্বায়নের প্রভাবে বৈশাখী উপহারের ধরন আমূল বদলে যায়। এটি আর কেবল মিষ্টি বা কাপড়ে সীমাবদ্ধ থাকে না।
অবশ্য আগের শতকের নব্বইয়ের দশক থেকে আড়ং, কে-ক্র্যাফট বা অঞ্জনস-এর মতো দেশি বুটিক হাউজগুলো বৈশাখকে কেন্দ্র করে বিশেষ কালেকশন আনা শুরু করে। ফলে উপহারের তালিকায় পোশাকের পাশাপাশি যুক্ত হয় হাতে তৈরি মাটির গয়না, নকশী চাদর এবং ঘর সাজানোর শৌখিন জিনিসপত্র।
টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর বিশেষ অনুষ্ঠান এবং খবরের কাগজের বিশেষ ক্রোড়পত্র বৈশাখী কেনাকাটাকে একটি উৎসবে পরিণত করে। এখন উপহার হিসেবে করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের কর্মীদের ‘বৈশাখী বোনাস’ বা গিফট হ্যাম্পার দেয়। এই উপহার দেওয়ার রীতিই মূলত পয়লা বৈশাখকে বিশেষত নগরবাসীদের প্রতিটি ঘরে পৌঁছে দিয়েছে।
এখনকার বৈশাখে উপহারের বৈচিত্র্য
পয়লা বৈশাখের উপহার এখন বেশ বৈচিত্র্যময়। উপহারের মাধ্যমে মানুষ তার রুচি ও আভিজাত্য প্রকাশ করতে চায়। এখন বৈশাখে যেসব উপহারের চল সবচেয়ে বেশি দেখা যায়–
পোশাক
এখনো বৈশাখের সেরা উপহার হিসেবে বিবেচিত হয় পোশাক। লাল-সাদা ঐতিহ্য বজায় থাকলেও এখন মানুষ নীল, বাসন্তী বা মাটির রংকেও বেছে নিচ্ছে। মেয়েদের জন্য তাঁত, জামদানি, সূতি শাড়ি আর ছেলেদের জন্য বিভিন্ন দেশি ব্র্যান্ডের ব্লক ও এমব্রয়ডারির পাঞ্জাবি, ফতুয়া, কাতুয়া, হাওয়াই শার্ট উপহার দেওয়ার ধুম পড়ে যায়। পরিবারের বয়স্ক সদস্যদের জন্যও আলাদা করে পোশাক কেনা হয়। বিভিন্ন ফ্যাশন ব্র্যান্ড, বুটিক হাউজ এমনকি সাধারণ কাপড়ের দোকানে ছোট্ট শিশুদের জন্যও বৈশাখী পোশাক আনা হয়।
গয়না ও ঘর সাজানোর সরঞ্জাম
বৈশাখের সাজে গয়না এক অনন্য মাত্রা যোগ করে। বিশেষ করে মাটির গয়না। এ ছাড়া এখন তামা, পিতল, কাঠ, কাপড়ের গয়নার আবেদন অনেক। উপহার হিসেবে এখন অনেকে হাতে তৈরি মাটির মালা, দুল, কাঠের চুড়ি বা শোলার কাজ করা গয়না দিচ্ছেন। স্বনামধন্য ফ্যাশন ব্র্যান্ড, বুটিক হাউজ ছাড়াও এখন অনেক ছোট-বড় অনলাইন ফ্যাশন ব্র্যান্ড বৈশাখ উপলক্ষে এগুলো নিয়ে আসছে।
ঘর সাজানোর জন্য এমন আইটেম এখন বেশ জনপ্রিয়। ছবি: যাত্রা'র ফেসবুক পেজ থেকেএ ছাড়া ঘর সাজানোর জন্য নকশিকাঁথা, শতরঞ্জি, মাটির সরাচিত্র, সখের হাঁড়ি, টেপাপুতুল, বাবুই পাখির বাসা, হাতের কাজের ওয়ালম্যাট ইত্যাদি উপহার হিসেবে বেশ জনপ্রিয়। এই ধরনের উপহার বাঙালি শেকড়ের কথা মনে করিয়ে দেয়।
স্যুভেনির
বৈশাখের উপহার হিসেবে লোকজ ও শহুরে ঐতিহ্যের মিশেলে তৈরি স্যুভেনির এখন আগ্রহের কেন্দ্রে। ঘর সাজাতে মেটালে রিকশা, বেবি টেক্সি, নানা রঙের পোস্টবক্স, পাল তোলা নৌকা বা বজরার মতো শোপিসগুলো যেমন নান্দনিক, তেমনি উপহার হিসেবেও বেশ আভিজাত্যপূর্ণ। পাশাপাশি যোগ হয়েছে দেশি মোটিফের ফ্রিজ ম্যাগনেট। এ ছাড়া মাটির তৈরি মুখোশ বা গ্রামীণ মোটিফের রঙিন পোস্টারগুলো অন্দরসজ্জায় বাঙালি সংস্কৃতির এক চিরন্তন আবহ তৈরি করে। আড়ং, যাত্রা, জয়িতা, ডাক্কা স্যুভেনির ইত্যাদির মতো ব্র্যান্ডগুলোতে এসব বৈচিত্র্যময় ও সৃজনশীল স্যুভেনিরের বিশাল সংগ্রহ পাওয়া যায়।
বই
কয়েক বছর ধরে পয়লা বৈশাখে বই উপহার দেওয়ার এক চমৎকার সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। বিশেষ করে বইপ্রেমীদের মধ্যে। যেহেতু বৈশাখ আমাদের ভাষার সাথে যুক্ত, তাই প্রিয়জনকে বাংলা সাহিত্যের ক্ল্যাসিক বা নতুন কোনো জনপ্রিয় লেখকের বই উপহার দেওয়ার চল বাড়ছে। ছোটদের জন্য ছড়ার বই বা কিশোর সাহিত্যের বই এখন বৈশাখের উপহারের অংশ হয়ে উঠছে।
উপহার হিসেবে গাছ অনেকেরই পছন্দ। ছবি: অরনীর ফেসবুক পেজ থেকেদেশি খাবারের ঝুড়ি বা ‘হ্যাম্পার’
আধুনিক যুগে উপহার হিসেবে ‘গিফট হ্যাম্পার’ খুব জনপ্রিয়। বৈশাখী হ্যাম্পারে থাকে মুড়ি-মুড়কি, বাতাসা, কদমা, খই, নাড়ু আর নানা পদের পিঠা। সাথে হয়তো থাকে এক ডজন কাঁচের চুড়ি বা একটি গামছা। বড় বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো এখন তাদের কর্মীদের এই ধরনের দেশি পণ্যের হ্যাম্পার উপহার দেয়।
গাছ
উপহার হিসেবে গাছ অনেকেরই পছন্দ। টবে লাগানো ইনডোর প্ল্যান্ট, বনসাই বা ছোট ক্যাকটাস, সাকুলেন্ট, অর্কিড উপহার দিয়ে অনেকে প্রিয়জনের আঙিনা সবুজ করার বার্তা দেন। এটি যেমন টেকসই, তেমনি অর্থবহ।
উপহারে সৌহার্দ্যের টান
এক সময় যা ছিল কেবল ব্যবসায়িক খাতিরে মিষ্টিমুখ, আজ তা পরিণত হয়েছে হাজার কোটি টাকার এক বিশাল উৎসবে। তবে উপহারের উপাদানে পরিবর্তন এলেও মূল সুরটি একই রয়ে গেছে। আর তা হলো–একে অপরের সাথে আনন্দ ভাগ করে নেওয়া এবং নতুন বছরকে পরম মমতায় বরণ করে নেওয়া।
উপহার দেওয়া কেবল একটি বস্তু আদান-প্রদান নয়, এটি সামাজিক বন্ধনকে দৃঢ় করে। যান্ত্রিক এই ব্যস্ত জীবনে আমরা যখন একে অপরের সাথে দেখা করার সুযোগ পাই না, তখন একটি ছোট্ট বৈশাখী উপহার এই বার্তা দেয় যে–“আমি তোমার কথা মনে রেখেছি।”
বাংলাদেশে বর্তমানে বৈশাখী উপহারের বাজার অনেক বড়। আমাদের দেশি বুটিক হাউজ এবং হস্তশিল্পের কারিগররা সারাবছর অপেক্ষা করেন এই একটি দিনের জন্য। ফলে আমরা যখন দেশি পণ্য উপহার হিসেবে কিনি, তখন সেটি আমাদের অর্থনীতির চাকাকে সচল রাখতে সাহায্য করে। কুমার পাড়ার সেই শিল্পী, যার মাটির সরা আপনি উপহার দিলেন, তার ঘরেও নববর্ষের আনন্দ পৌঁছে যায় আপনার উসিলায়।