চরচা ডেস্ক

১৮১৭ সালে ওয়েলসের সমাজ সংস্কারক রবার্ট ওয়েন একটি স্লোগান তুলেছিলেন—“আট ঘণ্টা শ্রম, আট ঘণ্টা বিনোদন, আট ঘণ্টা বিশ্রাম।” উদ্দেশ্য ছিল শ্রমিকদের জন্য একটি সুষম ও মানবিক কর্মসপ্তাহ তৈরি করা। সেই থেকে মানুষের মনে একটি ধারণা স্থায়ী আসন গেড়ে বসেছে: রাতে অন্তত আট ঘণ্টা ঘুমানো স্বাস্থ্যের জন্য সবচেয়ে উপকারী। চিকিৎসক থেকে শুরু করে পুষ্টিবিদ- সবাই দৈনিক আট ঘণ্টা ঘুমের পরামর্শ দেন। কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞান কি এই দাবিকে পুরোপুরি সমর্থন করে?
দীর্ঘদিন ধরেই অপর্যাপ্ত ঘুমকে একটি বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। মাত্র এক রাতের অনিদ্রা পরের দিন আমাদের মনোযোগ ও কার্যক্ষমতা কমিয়ে দেয়, মেজাজ খিটখিটে করে এবং মানসিক চাপ বাড়ায়। দীর্ঘমেয়াদে ঘুমের এই ঘাটতি মানসিক অবক্ষয়, বিষণ্ণতা, এমনকি অকাল মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়িয়ে তোলে। তবে সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, মুদ্রার অপর পিঠও সমান উদ্বেগজনক; অর্থাৎ প্রয়োজনের চেয়ে অতিরিক্ত ঘুমানোও শরীরের জন্য সমান ক্ষতিকর হতে পারে।
বিজ্ঞানীদের মতে, স্বাস্থ্য ও ঘুমের মেয়াদের মধ্যে আসলে একটি ‘U’ আকৃতির সম্পর্ক রয়েছে। এর অর্থ হলো, এই গ্রাফের দুই প্রান্ত—অর্থাৎ খুব কম ঘুম কিংবা খুব বেশি ঘুম, উভয়ই শরীরের জন্য ক্ষতিকর। সুস্বাস্থ্যের চাবিকাঠি লুকিয়ে রয়েছে এর ঠিক মাঝখানের একটি আদর্শ সীমার মধ্যে।
এই আদর্শ সময়টুকু ঠিক কত ঘণ্টা, তা জানতে ২০১৫ সালে দুটি বড় মাপের বিশ্লেষণধর্মী গবেষণা চালানো হয়। প্রথম গবেষণাটি প্রকাশিত হয় ‘স্লিপ হেলথ’ সাময়িকীতে, যেখানে বিগত এক দশকের ৫৭৫টি গবেষণার তথ্য পর্যালোচনা করা হয়। সেখানে দেখা যায়, ১৮ থেকে ৬৪ বছর বয়সীদের জন্য প্রতি রাতে ৭ থেকে ৯ ঘণ্টা ঘুম প্রয়োজন হলেও, ৬৫ ঊর্ধ্ব প্রবীণদের জন্য তা কমে দাঁড়ায় ৭ থেকে ৮ ঘণ্টায়।
দ্বিতীয় গবেষণাটি প্রকাশিত হয় ‘স্লিপ’ সাময়িকীতে। ৩১১টি গবেষণার ওপর ভিত্তি করে তারা সিদ্ধান্তে পৌঁছায় যে, দৈনিক প্রায় ৭ ঘণ্টার ঘুমই মানবদেহের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত লক্ষ্য।
পরবর্তী সময়ে বিজ্ঞান সাময়িকী ‘নেচার’-এ প্রকাশিত একটি গবেষণায় এই হিসাবটিকে আরও নিখুঁত ও বৈজ্ঞানিক রূপ দেওয়া হয়। গবেষকেরা মানুষের প্রতিটি আলাদা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের ওপর ঘুমের প্রভাব পরীক্ষা করতে বায়োলজিক্যাল ক্লক বা জৈবিক ঘড়ির ধারণাটি ব্যবহার করেন। এই প্রযুক্তি মূলত একজন মানুষের প্রকৃত বয়সের তুলনায় তার অভ্যন্তরীণ অঙ্গগুলোর কার্যক্ষমতা কতটা তরুণ বা বুড়ো হয়ে পড়েছে, তা পরিমাপ করে।
কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটির কম্পিউটেশনাল নিউরোসায়েন্টিস্ট এবং এই গবেষণার প্রধান গবেষক ডা. জুনহাও ওয়েন বিষয়টিকে সহজ করে ব্যাখ্যা করেছেন। যেমন—মস্তিষ্কের জটিলতায় ভুগছেন এমন একজন মানুষের ‘মস্তিষ্কের বয়স’ তার প্রকৃত বয়সের চেয়ে বেশি হতে পারে। আবার নিয়মিত ব্যায়াম করা একজন অ্যাথলেটের পেশি তার আসল বয়সের তুলনায় অনেক বেশি তরুণ ও সতেজ থাকতে পারে।
ডা. ওয়েন এবং তার দল ‘ইউকে বায়োব্যাংক’ থেকে প্রায় ৫ লাখ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের বিশাল তথ্য ভাণ্ডার বিশ্লেষণ করেন। তারা মানুষের মস্তিষ্ক, ফুসফুস, লিভার ও ত্বকসহ ৯টি প্রধান শারীরিক তন্ত্রের ওপর ঘুমের প্রভাব পর্যবেক্ষণ করে সেই একই ‘U’ আকৃতির প্যাটার্ন খুঁজে পান। তবে এবার আদর্শ ঘুমের সময়টা আরও সুনির্দিষ্টভাবে বেরিয়ে আসে। গবেষণার ফলাফল অনুযায়ী, নারীদের জন্য সবচেয়ে আদর্শ ঘুমের সময় ৬.৫ থেকে ৭.৮ ঘণ্টা এবং পুরুষদের জন্য তা ৬.৪ থেকে ৭.৭ ঘণ্টা।
তবে এই সংখ্যা দেখে যারা রাতের পর রাত বিছানায় ছটফট করছেন, তাদের আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। প্রথমত, জনসংখ্যা-ভিত্তিক এই সামষ্টিক গবেষণার গড় ফলাফল প্রতিটি মানুষের ব্যক্তিগত জীবনে হুবহু খাটবে না। দ্বিতীয়ত, কম ঘুম ও শারীরিক বার্ধক্যের মধ্যে কার্যকারণ সম্পর্কটা বেশ জটিল। কম ঘুমানোর কারণে কি অঙ্গগুলো দ্রুত বুড়িয়ে যাচ্ছে, নাকি শরীরের ভেতরের অন্য কোনো রোগের কারণে একইসাথে বার্ধক্য ও অনিদ্রা ভর করছে—তা এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়।
এ বিষয়ে ইউনিভার্সিটি অব অ্যারিজোনার মনোরোগ বিশেষজ্ঞ মাইকেল গ্র্যান্ডনার বলেন, “ঘুমের সময়কাল কেবল একটি সংখ্যা মাত্র। এর বাইরেও ঘুমের গুণগত মান, নিরবচ্ছিন্নতা সমান গুরুত্বপূর্ণ।” তার সরল পরামর্শ হলো—যদি আপনার ঘুমের স্থায়িত্ব খুব বেশি অস্বাভাবিক না হয়, তবে নির্দিষ্ট কোনো সংখ্যার পেছনে ছুটে অযথা দুশ্চিন্তা বাড়াবেন না।
ঘুমের সবচেয়ে বড় পরিহাস হলো, এটি নিয়ে যত বেশি চিন্তা করবেন, ঘুম তত দূরে পালাবে। ২০২৫ সালে ‘আমেরিকান একাডেমি অব স্লিপ মেডিসিন’-এর একটি জরিপে দেখা গেছে, ৭৬ শতাংশ মানুষ রাতে ঘুমাতে পারেন না কেবল ‘ঘুম হচ্ছে না’—এই দুশ্চিন্তায় ভোগার কারণে।
তাই ঘড়ির কাটার দিকে না তাকিয়ে ডা. ওয়েনের দেওয়া পরামর্শটি মেনে চলাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে: নিজের শরীরের ভাষা বুঝুন। রাতে ৬ থেকে ৮ ঘণ্টার একটি লক্ষ্য রাখুন ঠিকই, তবে বিছানায় গিয়ে ঘড়ির কাঁটার হিসাব মেলাতে ছটফট না করে, ততটুকুই ঘুমান যাতে সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর নিজেকে সতেজ, প্রাণবন্ত ও চনমনে মনে হয়।
তথ্যসূত্র: দ্য ইকোনমিস্ট

১৮১৭ সালে ওয়েলসের সমাজ সংস্কারক রবার্ট ওয়েন একটি স্লোগান তুলেছিলেন—“আট ঘণ্টা শ্রম, আট ঘণ্টা বিনোদন, আট ঘণ্টা বিশ্রাম।” উদ্দেশ্য ছিল শ্রমিকদের জন্য একটি সুষম ও মানবিক কর্মসপ্তাহ তৈরি করা। সেই থেকে মানুষের মনে একটি ধারণা স্থায়ী আসন গেড়ে বসেছে: রাতে অন্তত আট ঘণ্টা ঘুমানো স্বাস্থ্যের জন্য সবচেয়ে উপকারী। চিকিৎসক থেকে শুরু করে পুষ্টিবিদ- সবাই দৈনিক আট ঘণ্টা ঘুমের পরামর্শ দেন। কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞান কি এই দাবিকে পুরোপুরি সমর্থন করে?
দীর্ঘদিন ধরেই অপর্যাপ্ত ঘুমকে একটি বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। মাত্র এক রাতের অনিদ্রা পরের দিন আমাদের মনোযোগ ও কার্যক্ষমতা কমিয়ে দেয়, মেজাজ খিটখিটে করে এবং মানসিক চাপ বাড়ায়। দীর্ঘমেয়াদে ঘুমের এই ঘাটতি মানসিক অবক্ষয়, বিষণ্ণতা, এমনকি অকাল মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়িয়ে তোলে। তবে সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, মুদ্রার অপর পিঠও সমান উদ্বেগজনক; অর্থাৎ প্রয়োজনের চেয়ে অতিরিক্ত ঘুমানোও শরীরের জন্য সমান ক্ষতিকর হতে পারে।
বিজ্ঞানীদের মতে, স্বাস্থ্য ও ঘুমের মেয়াদের মধ্যে আসলে একটি ‘U’ আকৃতির সম্পর্ক রয়েছে। এর অর্থ হলো, এই গ্রাফের দুই প্রান্ত—অর্থাৎ খুব কম ঘুম কিংবা খুব বেশি ঘুম, উভয়ই শরীরের জন্য ক্ষতিকর। সুস্বাস্থ্যের চাবিকাঠি লুকিয়ে রয়েছে এর ঠিক মাঝখানের একটি আদর্শ সীমার মধ্যে।
এই আদর্শ সময়টুকু ঠিক কত ঘণ্টা, তা জানতে ২০১৫ সালে দুটি বড় মাপের বিশ্লেষণধর্মী গবেষণা চালানো হয়। প্রথম গবেষণাটি প্রকাশিত হয় ‘স্লিপ হেলথ’ সাময়িকীতে, যেখানে বিগত এক দশকের ৫৭৫টি গবেষণার তথ্য পর্যালোচনা করা হয়। সেখানে দেখা যায়, ১৮ থেকে ৬৪ বছর বয়সীদের জন্য প্রতি রাতে ৭ থেকে ৯ ঘণ্টা ঘুম প্রয়োজন হলেও, ৬৫ ঊর্ধ্ব প্রবীণদের জন্য তা কমে দাঁড়ায় ৭ থেকে ৮ ঘণ্টায়।
দ্বিতীয় গবেষণাটি প্রকাশিত হয় ‘স্লিপ’ সাময়িকীতে। ৩১১টি গবেষণার ওপর ভিত্তি করে তারা সিদ্ধান্তে পৌঁছায় যে, দৈনিক প্রায় ৭ ঘণ্টার ঘুমই মানবদেহের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত লক্ষ্য।
পরবর্তী সময়ে বিজ্ঞান সাময়িকী ‘নেচার’-এ প্রকাশিত একটি গবেষণায় এই হিসাবটিকে আরও নিখুঁত ও বৈজ্ঞানিক রূপ দেওয়া হয়। গবেষকেরা মানুষের প্রতিটি আলাদা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের ওপর ঘুমের প্রভাব পরীক্ষা করতে বায়োলজিক্যাল ক্লক বা জৈবিক ঘড়ির ধারণাটি ব্যবহার করেন। এই প্রযুক্তি মূলত একজন মানুষের প্রকৃত বয়সের তুলনায় তার অভ্যন্তরীণ অঙ্গগুলোর কার্যক্ষমতা কতটা তরুণ বা বুড়ো হয়ে পড়েছে, তা পরিমাপ করে।
কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটির কম্পিউটেশনাল নিউরোসায়েন্টিস্ট এবং এই গবেষণার প্রধান গবেষক ডা. জুনহাও ওয়েন বিষয়টিকে সহজ করে ব্যাখ্যা করেছেন। যেমন—মস্তিষ্কের জটিলতায় ভুগছেন এমন একজন মানুষের ‘মস্তিষ্কের বয়স’ তার প্রকৃত বয়সের চেয়ে বেশি হতে পারে। আবার নিয়মিত ব্যায়াম করা একজন অ্যাথলেটের পেশি তার আসল বয়সের তুলনায় অনেক বেশি তরুণ ও সতেজ থাকতে পারে।
ডা. ওয়েন এবং তার দল ‘ইউকে বায়োব্যাংক’ থেকে প্রায় ৫ লাখ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের বিশাল তথ্য ভাণ্ডার বিশ্লেষণ করেন। তারা মানুষের মস্তিষ্ক, ফুসফুস, লিভার ও ত্বকসহ ৯টি প্রধান শারীরিক তন্ত্রের ওপর ঘুমের প্রভাব পর্যবেক্ষণ করে সেই একই ‘U’ আকৃতির প্যাটার্ন খুঁজে পান। তবে এবার আদর্শ ঘুমের সময়টা আরও সুনির্দিষ্টভাবে বেরিয়ে আসে। গবেষণার ফলাফল অনুযায়ী, নারীদের জন্য সবচেয়ে আদর্শ ঘুমের সময় ৬.৫ থেকে ৭.৮ ঘণ্টা এবং পুরুষদের জন্য তা ৬.৪ থেকে ৭.৭ ঘণ্টা।
তবে এই সংখ্যা দেখে যারা রাতের পর রাত বিছানায় ছটফট করছেন, তাদের আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। প্রথমত, জনসংখ্যা-ভিত্তিক এই সামষ্টিক গবেষণার গড় ফলাফল প্রতিটি মানুষের ব্যক্তিগত জীবনে হুবহু খাটবে না। দ্বিতীয়ত, কম ঘুম ও শারীরিক বার্ধক্যের মধ্যে কার্যকারণ সম্পর্কটা বেশ জটিল। কম ঘুমানোর কারণে কি অঙ্গগুলো দ্রুত বুড়িয়ে যাচ্ছে, নাকি শরীরের ভেতরের অন্য কোনো রোগের কারণে একইসাথে বার্ধক্য ও অনিদ্রা ভর করছে—তা এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়।
এ বিষয়ে ইউনিভার্সিটি অব অ্যারিজোনার মনোরোগ বিশেষজ্ঞ মাইকেল গ্র্যান্ডনার বলেন, “ঘুমের সময়কাল কেবল একটি সংখ্যা মাত্র। এর বাইরেও ঘুমের গুণগত মান, নিরবচ্ছিন্নতা সমান গুরুত্বপূর্ণ।” তার সরল পরামর্শ হলো—যদি আপনার ঘুমের স্থায়িত্ব খুব বেশি অস্বাভাবিক না হয়, তবে নির্দিষ্ট কোনো সংখ্যার পেছনে ছুটে অযথা দুশ্চিন্তা বাড়াবেন না।
ঘুমের সবচেয়ে বড় পরিহাস হলো, এটি নিয়ে যত বেশি চিন্তা করবেন, ঘুম তত দূরে পালাবে। ২০২৫ সালে ‘আমেরিকান একাডেমি অব স্লিপ মেডিসিন’-এর একটি জরিপে দেখা গেছে, ৭৬ শতাংশ মানুষ রাতে ঘুমাতে পারেন না কেবল ‘ঘুম হচ্ছে না’—এই দুশ্চিন্তায় ভোগার কারণে।
তাই ঘড়ির কাটার দিকে না তাকিয়ে ডা. ওয়েনের দেওয়া পরামর্শটি মেনে চলাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে: নিজের শরীরের ভাষা বুঝুন। রাতে ৬ থেকে ৮ ঘণ্টার একটি লক্ষ্য রাখুন ঠিকই, তবে বিছানায় গিয়ে ঘড়ির কাঁটার হিসাব মেলাতে ছটফট না করে, ততটুকুই ঘুমান যাতে সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর নিজেকে সতেজ, প্রাণবন্ত ও চনমনে মনে হয়।
তথ্যসূত্র: দ্য ইকোনমিস্ট