Advertisement Banner

মাল্টিভিটামিন: প্রয়োজন নাকি অপ্রয়োজন?

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
মাল্টিভিটামিন: প্রয়োজন নাকি অপ্রয়োজন?
প্রতীকী ছবি: ফ্রিস্টক ডট ওআরজি

দীর্ঘদিন ধরেই একটি ধারণা প্রচলিত রয়েছে যে, মাল্টিভিটামিন খাওয়া মানে ‘দামী প্রস্রাব তৈরি করা’ ছাড়া আর কিছু নয়। অনেক চিকিৎসকই রোগীদের এই কথাই বলে থাকেন। ২০১৩ সালে অন্যালস অব ইন্টারনাল মেডিসিন-এ প্রকাশিত একটি সম্পাদকীয় তো সরাসরি মানুষকে ভিটামিন সাপ্লিমেন্ট খাওয়া বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, বিষয়টি এতটা সরল নয়। বরং কিছু ক্ষেত্রে মাল্টিভিটামিনের উপকারিতা থাকতে পারে– বিশেষ করে নির্দিষ্ট কিছু জনগোষ্ঠীর জন্য।

মাল্টিভিটামিনের সম্ভাব্য উপকারিতা নিয়ে গবেষণার ইতিহাস নতুন নয়। ২০০১ সালে একটি বড় গবেষণায় দেখা যায়, বয়সজনিত চোখের রোগ, বিশেষ করে ম্যাকুলার ডিজেনারেশন–প্রতিরোধে কিছু ভিটামিন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এই গবেষণায় সাড়ে তিন হাজারের বেশি মানুষের ওপর পরীক্ষা চালানো হয় এবং তাদেরকে ভিটামিন সি, ই, জিঙ্ক ও বিটা-ক্যারোটিন দেওয়া হয়। ফলাফল ছিল উল্লেখযোগ্য–এই সাপ্লিমেন্ট গ্রহণকারীদের মধ্যে উন্নত পর্যায়ের রোগে অগ্রসর হওয়ার ঝুঁকি প্রায় ২৫ শতাংশ কমে যায়। যদিও পরে বিটা-ক্যারোটিন বাদ দিতে হয়, কারণ এটি ধূমপায়ীদের মধ্যে ফুসফুসের ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে বলে প্রমাণিত হয়।

এরপরের বছরগুলোতে আরও কিছু গবেষণা মাল্টিভিটামিনের সম্ভাব্য উপকারিতার দিকে ইঙ্গিত করেছে। বিশেষ করে কসমস ট্রায়াল নামে পরিচিত একটি বড় গবেষণায় ২১ হাজারের বেশি বয়স্ক আমেরিকানের ওপর পরীক্ষা চালানো হয়। ২০১৫ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত পরিচালিত এই গবেষণায় দেখা যায়, যারা নিয়মিত মাল্টিভিটামিন গ্রহণ করেছেন, তাদের স্মৃতিশক্তি ও জ্ঞানের সামান্য উন্নতি হয়েছে। এমনকি দুই থেকে তিন বছর নিয়মিত ভিটামিন গ্রহণের ফলে তাদের মস্তিষ্কের কার্যকারিতা এমন পর্যায়ে ছিল, যেন তাদের বয়স দুই বছর কম।

এই ফলাফল নিঃসন্দেহে আগ্রহ জাগায়, কিন্তু এটি কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়। অনেক বিশেষজ্ঞই মনে করেন, এই উপকারিতা খুবই সীমিত এবং সব মানুষের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। তবে একটি বিষয় পরিষ্কার–বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শরীরের পুষ্টি শোষণের ক্ষমতা কমে যায়। উদাহরণস্বরূপ, ভিটামিন বি১২ শোষণের ক্ষমতা কমে যায়, আর সূর্যালোক থেকে ভিটামিন ডি তৈরির দক্ষতাও হ্রাস পায়। ফলে বয়স্কদের ক্ষেত্রে মাল্টিভিটামিন কিছু ঘাটতি পূরণে সহায়ক হতে পারে।

তবে প্রশ্ন থেকে যায়– এই ভিটামিনগুলো কীভাবে কাজ করে? এর সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা এখনো বিজ্ঞানীদের কাছে পরিষ্কার নয়। একটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হলো, অনেক মানুষের শরীরে এমন কিছু ‘সাবক্লিনিক্যাল’ ঘাটতি থাকে, যা বাহ্যিকভাবে বোঝা যায় না, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে শরীরের ওপর প্রভাব ফেলে। মাল্টিভিটামিন এই লুকানো ঘাটতিগুলো পূরণ করতে পারে। বিশেষ করে ভিটামিন বি-এর ঘাটতি শরীরে অক্সিডেটিভ স্ট্রেস ও প্রদাহ বাড়াতে পারে, যা বার্ধক্যজনিত নানা সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত।

কসমস গবেষণার আরও একটি আকর্ষণীয় দিক হলো– মাল্টিভিটামিন হয়তো বার্ধক্যের গতি সামান্য কমাতে পারে। গবেষণার একটি অংশে দেখা গেছে, নিয়মিত মাল্টিভিটামিন গ্রহণ ডিএনএ মিথাইলেশন প্রক্রিয়াকে ধীর করতে পারে, যা জৈবিক বয়স নির্ধারণের একটি সূচক হিসেবে ব্যবহৃত হয়। যদিও এই প্রভাব খুবই ছোট–মাত্র কয়েক মাসের সমান– তবুও এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দেয়। তবে এটি এখনো পরিষ্কার নয়, এই পরিবর্তন আসলেই আয়ু বৃদ্ধি বা রোগ কমানোর সঙ্গে সম্পর্কিত কি না।

বয়স্কদের বাইরে, কিছু নির্দিষ্ট শিশুদের ক্ষেত্রেও মাল্টিভিটামিন উপকারী হতে পারে। যেসব শিশুদের খাদ্যাভ্যাস সীমিত, অথবা যাদের আবেগ নিয়ন্ত্রণে সমস্যা রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শে সাপ্লিমেন্ট দেওয়া যেতে পারে। তবে এটি অবশ্যই চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে হওয়া উচিত, কারণ অতিরিক্ত ভিটামিন গ্রহণও ক্ষতিকর হতে পারে।

অন্যদিকে, তরুণ ও সুস্থ প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য মাল্টিভিটামিনের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে তেমন শক্ত প্রমাণ নেই। যারা সুষম খাদ্য গ্রহণ করেন, তাদের জন্য আলাদা করে ভিটামিন সাপ্লিমেন্ট নেওয়ার প্রয়োজন সাধারণত হয় না। তবে এখানে দুটি বিষয় বিবেচনা করা জরুরি। প্রথমত, প্রত্যেক মানুষের শরীর আলাদা–জেনেটিক বৈশিষ্ট্য, খাদ্যাভ্যাস এবং পুষ্টি শোষণের ক্ষমতা ভিন্ন। দ্বিতীয়ত, প্রতিদিনের ভিটামিনের যে মাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, তা মূলত রোগ প্রতিরোধের জন্য– সর্বোচ্চ মানসিক বা শারীরিক সক্ষমতা অর্জনের জন্য নয়। ফলে, কেউ যদি আরও ভালো স্বাস্থ্য বা মস্তিষ্কের কার্যকারিতা চান, তাহলে অতিরিক্ত সাপ্লিমেন্টের ভূমিকা থাকতে পারে–যদিও এর প্রমাণ এখনো সীমিত।

সবশেষে বলা যায়, মাল্টিভিটামিন কোনো জাদুকরী সমাধান নয়। এটি সুষম খাদ্যের বিকল্পও নয়। বরং এটি একটি সহায়ক উপাদান, যা নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে উপকার করতে পারে। তাই অন্ধভাবে সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ না করে, নিজের শারীরিক অবস্থা, বয়স এবং খাদ্যাভ্যাস বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়াই সবচেয়ে যুক্তিসঙ্গত পথ।

এই বিতর্কের মূল বার্তা একটাই– স্বাস্থ্য একটি ব্যক্তিগত বিষয় এবং এর সমাধানও ব্যক্তিভেদে ভিন্ন হতে পারে। মাল্টিভিটামিন সেই সমাধানের একটি অংশ হতে পারে, কিন্তু পুরোটা নয়।

সূত্র: দ্য ইকোনমিস্ট

সম্পর্কিত