চরচা ডেস্ক

ডিসেম্বরের শেষ থেকেই ইরান উত্তাল। চলছে সরকারবিরোধী আন্দোলন। দৃশ্যপটে আবার হাজির রেজা শাহ পাহলভী। ইরান কি শেষতক পুরনো শাহ জমানায় ফিরবে? খামেনির কী হবে? শাহ ও খোমেনির নামই–বা কেন পাশাপাশি উচ্চারিত হচ্ছে?
বলা হচ্ছে বিদেশে বসে ক্ষমতাচ্যুত শাসক রেজা শাহ পাহলভী ইরানে এই আন্দোলনে মদদ দিচ্ছে। অনেকের ধারণা, এবার হয়তো পতন হবে ইরানের ধর্মতান্ত্রিক শাসকগোষ্ঠীর। আবার ভিন্ন ধারণাও আছে। তবে এমন এক পরিস্থিতি কিন্তু ইরানে আগেও ঘটেছিল।
১৯৭৯ সালের ১ ফেব্রুয়ারি। তেহরান বিমানবন্দরে একটি বিশেষ বিমান ল্যান্ড করল। সিঁড়ি দিয়ে নেমে এলেন সাদা দাড়ি আর কালো পাগড়ির এক বৃদ্ধ। নাম তার–আয়াতুল্লাহ খামেনি। ১৫ বছরের দীর্ঘ নির্বাসন শেষে তার এই ঘরে ফেরা ছিল একটি দেশের মানচিত্র এবং ইতিহাস বদলে দেওয়ার চূড়ান্ত মুহূর্ত। অথচ এর মাত্র দুই সপ্তাহ আগেই প্রবল পরাক্রমশালী শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভি দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছিলেন।
ঘটনার শুরুটা আরও পেছনে। ১৯৪১ সালে ব্রিটিশ আর সোভিয়েত মদদে ক্ষমতায় বসেন মোহাম্মদ রেজা পাহলভি। তিনি ছিলেন ঘোরতর পশ্চিমাঘেঁষা। ১৯৬৩ সালে তিনি শুরু করেন তার উচ্চাভিলাষী ‘শ্বেত বিপ্লব’। লক্ষ্য ছিল আধুনিকায়ন–ভূমি সংস্কার থেকে শুরু করে নারীর সমঅধিকার।
কিন্তু মুদ্রার উল্টো পিঠও ছিল। এই আধুনিকায়নের নামে তিনি ইরানের হাজার বছরের ইসলামি সংস্কৃতি আর ধর্মীয় নেতাদের প্রভাব কমিয়ে দিতে চাইলেন। আর ঠিক এই জায়গাতেই দেয়াল হয়ে দাঁড়ালেন আয়াতুল্লাহ খামেনি। তিনি স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করলেন, “এ আধুনিকায়ন নয়, এ হলো পশ্চিমাদের গোলামি।” ফলাফল? ১৯৬৪ সালে তাকে দেশ থেকে বহিষ্কার করা হলো।
বিদেশে থাকলেও খামেনির প্রভাব এক চুলও কমেনি। ইরাক আর ফ্রান্সে বসে তিনি তার জ্বালাময়ী ভাষণ ক্যাসেটে রেকর্ড করে চোরা পথে ইরানে পাঠাতেন। সেই কণ্ঠস্বর দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ল সাধারণ মানুষের ঘরে ঘরে। সত্তরের দশকে শাহ যখন আড়াই হাজার বছরের পারস্য রাজতন্ত্রের উৎসবে কোটি কোটি টাকা ওড়াচ্ছিলেন, তখন সাধারণ মানুষ দারিদ্র্য আর দমন-পীড়নে অতিষ্ঠ। ১৯৭৮ সালে রাজপথ উত্তাল হয়ে উঠল। মধ্যবিত্ত থেকে শুরু করে কট্টরপন্থী ছাত্র–সবাই এক সুরে স্লোগান দিল: ‘শাহের পতন চাই।’ ঠিক আজ যেমন শোনা যাচ্ছে–‘খামেনির পতন চাই।’
খামেনির প্রত্যাবর্তনের পর ইরান রাতারাতি বদলে গেল। রাজতন্ত্রের জায়গায় প্রতিষ্ঠিত হলো ইসলামি প্রজাতন্ত্র। কিন্তু উত্তেজনা তখনো তুঙ্গে।
১৯৭৯ সালের ৪ নভেম্বর একদল উত্তেজিত ছাত্র তেহরানের মার্কিন দূতাবাস দখল করে নেয়। ৫২ জন মার্কিন কর্মীকে জিম্মি করা হয় দীর্ঘ ৪৪৪ দিন! এই একটি ঘটনা আমেরিকার সাথে ইরানের সম্পর্কের সমীকরণ চিরতরে বদলে দিল।
খামেনির শাসনকাল সহজ ছিল না। ১৯৮০ সালে সাদ্দাম হোসেনের ইরাক ইরান আক্রমণ করলে শুরু হয় ধ্বংসাত্মক এক যুদ্ধ, যা চলেছিল টানা ৮ বছর। দেশের ভেতরেও ছিল কঠোর শাসন। পশ্চিমা সংস্কৃতি নিষিদ্ধ হলো, হিজাব বাধ্যতামূলক হলো।
১০ বছর শাসনের পর ১৯৮৯ সালে যখন খোমেনি মারা যান, তখন তেহরানের রাস্তায় ২০ লক্ষ মানুষের ঢল নেমেছিল।
আজকের ইরান যে ধর্মীয় শাসনের ছাঁচে গড়া, তার রূপকার ছিলেন এই খামেনিই। বিপ্লব যেমন একটি দেশের মুক্তি নিয়ে আসে, তেমনি সাথে নিয়ে আসে রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম আর গভীর রাজনৈতিক জটিলতা। খামেনির সেই প্রত্যাবর্তনের পর ৪৭ বছর পেরিয়েছে। বিশ্ব এখন অপেক্ষায় শাহ প্রত্যাবর্তন করে কি না, তা দেখতে। তেমনটি হলে এবারের বদলও কতটা ইরানিদের হবে, আর কতটা অন্যের চাওয়ার হবে–সে প্রশ্ন থেকে যাবে।

ডিসেম্বরের শেষ থেকেই ইরান উত্তাল। চলছে সরকারবিরোধী আন্দোলন। দৃশ্যপটে আবার হাজির রেজা শাহ পাহলভী। ইরান কি শেষতক পুরনো শাহ জমানায় ফিরবে? খামেনির কী হবে? শাহ ও খোমেনির নামই–বা কেন পাশাপাশি উচ্চারিত হচ্ছে?
বলা হচ্ছে বিদেশে বসে ক্ষমতাচ্যুত শাসক রেজা শাহ পাহলভী ইরানে এই আন্দোলনে মদদ দিচ্ছে। অনেকের ধারণা, এবার হয়তো পতন হবে ইরানের ধর্মতান্ত্রিক শাসকগোষ্ঠীর। আবার ভিন্ন ধারণাও আছে। তবে এমন এক পরিস্থিতি কিন্তু ইরানে আগেও ঘটেছিল।
১৯৭৯ সালের ১ ফেব্রুয়ারি। তেহরান বিমানবন্দরে একটি বিশেষ বিমান ল্যান্ড করল। সিঁড়ি দিয়ে নেমে এলেন সাদা দাড়ি আর কালো পাগড়ির এক বৃদ্ধ। নাম তার–আয়াতুল্লাহ খামেনি। ১৫ বছরের দীর্ঘ নির্বাসন শেষে তার এই ঘরে ফেরা ছিল একটি দেশের মানচিত্র এবং ইতিহাস বদলে দেওয়ার চূড়ান্ত মুহূর্ত। অথচ এর মাত্র দুই সপ্তাহ আগেই প্রবল পরাক্রমশালী শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভি দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছিলেন।
ঘটনার শুরুটা আরও পেছনে। ১৯৪১ সালে ব্রিটিশ আর সোভিয়েত মদদে ক্ষমতায় বসেন মোহাম্মদ রেজা পাহলভি। তিনি ছিলেন ঘোরতর পশ্চিমাঘেঁষা। ১৯৬৩ সালে তিনি শুরু করেন তার উচ্চাভিলাষী ‘শ্বেত বিপ্লব’। লক্ষ্য ছিল আধুনিকায়ন–ভূমি সংস্কার থেকে শুরু করে নারীর সমঅধিকার।
কিন্তু মুদ্রার উল্টো পিঠও ছিল। এই আধুনিকায়নের নামে তিনি ইরানের হাজার বছরের ইসলামি সংস্কৃতি আর ধর্মীয় নেতাদের প্রভাব কমিয়ে দিতে চাইলেন। আর ঠিক এই জায়গাতেই দেয়াল হয়ে দাঁড়ালেন আয়াতুল্লাহ খামেনি। তিনি স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করলেন, “এ আধুনিকায়ন নয়, এ হলো পশ্চিমাদের গোলামি।” ফলাফল? ১৯৬৪ সালে তাকে দেশ থেকে বহিষ্কার করা হলো।
বিদেশে থাকলেও খামেনির প্রভাব এক চুলও কমেনি। ইরাক আর ফ্রান্সে বসে তিনি তার জ্বালাময়ী ভাষণ ক্যাসেটে রেকর্ড করে চোরা পথে ইরানে পাঠাতেন। সেই কণ্ঠস্বর দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ল সাধারণ মানুষের ঘরে ঘরে। সত্তরের দশকে শাহ যখন আড়াই হাজার বছরের পারস্য রাজতন্ত্রের উৎসবে কোটি কোটি টাকা ওড়াচ্ছিলেন, তখন সাধারণ মানুষ দারিদ্র্য আর দমন-পীড়নে অতিষ্ঠ। ১৯৭৮ সালে রাজপথ উত্তাল হয়ে উঠল। মধ্যবিত্ত থেকে শুরু করে কট্টরপন্থী ছাত্র–সবাই এক সুরে স্লোগান দিল: ‘শাহের পতন চাই।’ ঠিক আজ যেমন শোনা যাচ্ছে–‘খামেনির পতন চাই।’
খামেনির প্রত্যাবর্তনের পর ইরান রাতারাতি বদলে গেল। রাজতন্ত্রের জায়গায় প্রতিষ্ঠিত হলো ইসলামি প্রজাতন্ত্র। কিন্তু উত্তেজনা তখনো তুঙ্গে।
১৯৭৯ সালের ৪ নভেম্বর একদল উত্তেজিত ছাত্র তেহরানের মার্কিন দূতাবাস দখল করে নেয়। ৫২ জন মার্কিন কর্মীকে জিম্মি করা হয় দীর্ঘ ৪৪৪ দিন! এই একটি ঘটনা আমেরিকার সাথে ইরানের সম্পর্কের সমীকরণ চিরতরে বদলে দিল।
খামেনির শাসনকাল সহজ ছিল না। ১৯৮০ সালে সাদ্দাম হোসেনের ইরাক ইরান আক্রমণ করলে শুরু হয় ধ্বংসাত্মক এক যুদ্ধ, যা চলেছিল টানা ৮ বছর। দেশের ভেতরেও ছিল কঠোর শাসন। পশ্চিমা সংস্কৃতি নিষিদ্ধ হলো, হিজাব বাধ্যতামূলক হলো।
১০ বছর শাসনের পর ১৯৮৯ সালে যখন খোমেনি মারা যান, তখন তেহরানের রাস্তায় ২০ লক্ষ মানুষের ঢল নেমেছিল।
আজকের ইরান যে ধর্মীয় শাসনের ছাঁচে গড়া, তার রূপকার ছিলেন এই খামেনিই। বিপ্লব যেমন একটি দেশের মুক্তি নিয়ে আসে, তেমনি সাথে নিয়ে আসে রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম আর গভীর রাজনৈতিক জটিলতা। খামেনির সেই প্রত্যাবর্তনের পর ৪৭ বছর পেরিয়েছে। বিশ্ব এখন অপেক্ষায় শাহ প্রত্যাবর্তন করে কি না, তা দেখতে। তেমনটি হলে এবারের বদলও কতটা ইরানিদের হবে, আর কতটা অন্যের চাওয়ার হবে–সে প্রশ্ন থেকে যাবে।