পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যা নিরসনে সম্প্রতি তিনটি কমিটি গঠনের প্রজ্ঞাপন জারি করেছে সরকার। এর মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীদের দীর্ঘদিনের ‘সমস্যা জিইয়ে রেখে অধিকতর সামরিকায়নের মাধ্যমে পাহাড়ীদের দমন পীড়নের পথ উন্মুক্ত’ করার প্রচেষ্টার প্রতিবাদ জানিয়ে বিবৃতিতে দিয়েছেন ৫২ জন নাগরিক।
আজ সোমবার যৌথ বিবৃতিতে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক আনু মোহাম্মদ, সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী জেড আই খান পান্নাসহ ৫২ জন নাগরিক স্বাক্ষর করেছেন।
বিবৃতিতে বলা হয়, পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীদের ন্যায়সঙ্গত অধিকার সুরক্ষার দাবির বিষয় তোয়াক্কা না করে সেখানে সামরিকায়নের মাধ্যমে দমন পীড়নের পথ বেছে নিয়ে, সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে দাবিয়ে রাখার চেষ্টা করা হয়েছিল বহুদিন ধরে। ষাটের দশকে কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের মাধ্যমে পাহাড়ের প্রায় এক লাখ জনগোষ্ঠীকে উদ্বাস্তু করা হয়েছে। পরবর্তীতে সেনা ক্যাম্প স্থাপন ও সম্প্রসারণ ওই এলাকার আদিবাসীদের জীবনযাত্রা ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হয়েছে। যার ফলে আমরা দীর্ঘ দুই যুগেরও অধিক সময় সশস্ত্র সংঘাত দেখেছি। সেই সংঘাতে সামরিক বেসামরিক বহু মানুষ হতাহত হয়েছেন। বিভিন্ন সরকারের সাথে ধারাবাহিক ২৬ বার বৈঠকের মাধ্যমে ১৯৯৭ সালে একটি চুক্তিতে উপনীত হয়। ২৯ বছর পার হলেও চুক্তির মৌলিক ধারাগুলো বাস্তবায়িত না হওয়ায় শান্তি প্রতিষ্ঠা ও আদিবাসীদের অধিকারের বিষয়ে আদতে কোনো সুরাহা হয়নি।
আরও বলা হয়, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে জোরালো দাবি ছিল- পার্বত্য চুক্তি অনুযায়ী পাহাড় থেকে সেনা শাসন প্রত্যাহার করা। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে পাহাড়ীরা অন্তত দুবার সাম্প্রদায়িক হামলায় সাতজন আদিবাসী প্রাণ হারান। নির্বাচনী ইশতেহারে বিএনপি প্রস্তাবিত ‘রেইনবো নেশন’ আকুণ্ঠ সমর্থন জানিয়ে জাতীয় নির্বাচনে পাহাড়ীরা তিন জেলা থেকেই বিএনপির প্রার্থীকে নির্বাচিত করেছেন।
কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব এককভাবে সেই এলাকার কোন প্রতিনিধির উপর ন্যস্ত হবার কথা থাকলেও তা হয়নি। চুক্তিকে বৃদ্ধাঙ্গুলী দেখিয়ে মন্ত্রণালয়ে একজন অ-পাহাড়ী প্রতিমন্ত্রী নিযুক্তিতে পাহাড়ের জনসাধারণ আপত্তি জানালেও তা আমলেই নেওয়া হয়নি।
বিবৃতিতে বলা হয়, প্রধানমন্ত্রীকে সভাপতি করে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক জাতীয় কমিটি, স্বরাষ্ট্র সচিবকে সভাপতি করে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক নির্বাহী কমিটি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন ও পরিবীক্ষণ কমিটির চেয়ারম্যানকে সভাপতি করে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক পরামর্শক কমিটি গঠন করা হয়। উপরোক্ত দুটি কমিটিকে সচিবালয় সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় জনবল ও অবকাঠামোগত সুবিধা দেবে প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তর (ডিজিএফআই)। এটি একটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও কর্তৃত্বপরায়ণ পদক্ষেপ।
পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তিতে উপনীত হতে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার (১৯৯১-১৯৯৫) পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সাথে ১৩ বার আনুষ্ঠানিক বৈঠক করেছিল। যা পরবর্তীতে একটি আনুষ্ঠানিক চুক্তির রূপ লাভ করে। কিন্তু সরকারের একটি বিশেষ মহল পার্বত্য বিষয়টিকে সেই প্রেক্ষাপটে বিবেচনায় না নিয়ে আশির দশকের ন্যায় পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যাকে নিরাপত্তার চশমা দিয়ে দেখার চেষ্টা করছে। এতে উদ্ভুত পরিস্থিতিতে পার্বত্য চট্টগ্রামে সামরিকায়ন জোরদারে আমরা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ ও অশান্তিকে উস্কে দেবার অশুভ ছায়া লক্ষ্য করছি।
বিবৃতিতে, পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যাকে রাজনৈতিক উপায়ে সমাধানে সরকারকে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সকল বৈধ প্রতিনিধির সাথে পুনরায় আলোচনা করে কমিটিগুলো গোয়েন্দা নিয়ন্ত্রণমুক্ত ভাবে পুনর্গঠনসহ পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের কার্যকরী পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।