বাংলাদেশে রিটেইল ব্যাংকিং ব্যবসা থেকে সরে যাওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে ব্রিটিশ বহুজাতিক ব্যাংক স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড। গ্রাহকদের পাঠানো এক চিঠিতে ব্যাংকটি জানিয়েছে, তাদের ওয়েলথ অ্যান্ড রিটেইল ব্যাংকিং (ডব্লিউআরবি) ব্যবসা বিক্রির সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে এ প্রক্রিয়ায় এখনই গ্রাহকদের সেবা বা ব্যাংকের কার্যক্রমে কোনো প্রভাব পড়বে না।
স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড বাংলাদেশ জানিয়েছে, সম্ভাব্য বিক্রয়প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে ১৮ থেকে ২৪ মাস সময় লাগতে পারে এবং এর জন্য নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন প্রয়োজন হবে। বাংলাদেশে ব্যাংকটির করপোরেট ও ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকিং ব্যবসায় আরও বেশি মনোযোগ দেওয়ার অংশ হিসেবেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড বাংলাদেশের ওয়েলথ অ্যান্ড রিটেইল ব্যাংকিংয়ের প্রধান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক লুৎফুল হাবিব গ্রাহকদের পাঠানো চিঠিতে বলেছেন, “বৈশ্বিক কৌশলের অংশ হিসেবে বাংলাদেশে ওয়েলথ অ্যান্ড রিটেইল ব্যাংকিং ব্যবসা বিক্রির বিভিন্ন বিকল্প খতিয়ে দেখছে ব্যাংকটি। এই ঘোষণার ফলে তাৎক্ষণিকভাবে গ্রাহকদের ওপর কোনো প্রভাব পড়বে না। সম্ভাব্য বিক্রয়প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত ব্যাংকের রিটেইল ব্যাংকিং কার্যক্রম স্বাভাবিকভাবেই চলবে।
গ্রাহকদের আমানত ও বিনিয়োগ নিরাপদ রয়েছে বলেও আশ্বস্ত করেছে ব্যাংকটি। পাশাপাশি স্বাভাবিক নিয়মে ব্যাংকিং লেনদেন চালিয়ে যেতে পারবেন গ্রাহকেরা। স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড জানিয়েছে, “সম্ভাব্য লেনদেনটি সম্পন্ন হতে অন্তত ১৮ থেকে ২৪ মাস সময় লাগতে পারে। পুরো প্রক্রিয়াটিই নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতার ওপর নির্ভর করবে।”
রিটেইল ব্যবসা বিক্রির উদ্যোগ নিলেও বাংলাদেশ থেকে পুরোপুরি সরে যাচ্ছে না স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড। বরং ব্যাংকটি করপোরেট অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকিং বা সিআইবি ব্যবসাকে আরও শক্তিশালী করার পরিকল্পনা করছে।
ব্যাংকটির প্রধান এনামুল হক বলেন, “বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, আন্তসীমান্ত মূলধন প্রবাহ এবং অবকাঠামো অর্থায়নের মতো খাতে ব্যাংকটির বৈশ্বিক নেটওয়ার্ক ও সক্ষমতা সবচেয়ে বেশি কাজে লাগানো সম্ভব। তাই এসব ব্যবসায় কৌশলগতভাবে আরও বেশি মনোযোগ দিতে চায় স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড। বাংলাদেশে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের উপস্থিতি অব্যাহত থাকবে এবং করপোরেট ও ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকিং ব্যবসার মাধ্যমে গ্রাহকদের সেবা দেওয়া হবে। বাংলাদেশে ১২০ বছরেরও বেশি সময় ধরে কার্যক্রম পরিচালনা করছে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড।”
স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের রিটেইল ব্যাংকিং ব্যবসা বিক্রির বিষয়টি অবশ্য নতুন নয়। গত কয়েক সপ্তাহ ধরেই ব্যাংক খাতে এ নিয়ে আলোচনা চলছিল। সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে খবর আসে, ব্যাংকটি তাদের রিটেইল ব্যাংকিং ব্যবসা বিক্রির জন্য সম্ভাব্য ক্রেতাদের সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু করেছে।
সে সময় ব্র্যাক ব্যাংক ও সিটি ব্যাংকের কর্মকর্তারা স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের সঙ্গে প্রাথমিক আলোচনার কথা নিশ্চিত করেছিলেন। পরবর্তী সময়ে পূবালী ব্যাংক ও মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকও ব্যবসাটি নেওয়ার বিষয়ে আগ্রহ দেখিয়ে আলোচনা শুরু করে। ব্যাংক খাতের সংশ্লিষ্টদের বরাতে এর আগে আরও জানা যায়, সম্ভাব্য বিক্রয়প্রক্রিয়ায় ব্যবসার মূল্যায়ন, অডিট, গ্রাহক ও আমানত, ঋণ পোর্টফোলিও, কর্মী এবং অন্যান্য অবকাঠামো বিবেচনায় আসতে পারে। তবে তখন পর্যন্ত কোনো চূড়ান্ত চুক্তি হয়নি।
স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের রিটেইল ব্যবসা দেশের অন্যান্য ব্যাংকের কাছে আকর্ষণীয় হওয়ার অন্যতম কারণ এর গ্রাহকভিত্তি। বিশেষ করে উচ্চ আয়ের ও অগ্রাধিকারভিত্তিক গ্রাহক, বহুজাতিক ও বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের বেতন হিসাব এবং দীর্ঘদিনের খুচরা গ্রাহকদের নিয়ে এ ব্যবসার একটি শক্তিশালী ভিত্তি রয়েছে। ২০২৫ সালের শেষে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের রিটেইল ও সিএমএসএমই ঋণ পোর্টফোলিও ছিল প্রায় ৮ হাজার ৪৭৯ কোটি টাকা। একই সময়ে রিটেইল আমানতের পরিমাণ ছিল প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকা।
তবে এই ব্যবসা শেষ পর্যন্ত কোন ব্যাংকের কাছে যাবে, কিংবা আদৌ কোনো নির্দিষ্ট ব্যাংকের কাছে বিক্রি হবে কি না, তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। সম্ভাব্য লেনদেনের জন্য মূল্যায়ন, যাচাই-বাছাই এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদনসহ বিভিন্ন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে।