যুক্তরাষ্ট্রের সাথে জার্মানির দীর্ঘদিনের বিনা শর্ত বন্ধুত্বের যুগ শেষের দিকে বলে মন্তব্য করেছেন জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রাঙ্ক-ভাল্টার ফ্রিডরিশ মের্জ। ওয়াশিংটনের সাথে ট্রান্সঅ্যাটলান্টিক সম্পর্কের এই তিক্ততার জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনকেই সরাসরি দায়ী করেছেন তিনি।
এক সময় জার্মানির রাজনীতিতে অত্যন্ত মার্কিনপন্থী হিসেবে পরিচিত মের্জ, বার্লিনে নিজ দল ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্রেটিক ইউনিয়নের (সিডিইউ) এক নির্বাচনী প্রচারে স্পষ্ট জানান যে, আটলান্টিকের অপর পাড়ে রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি ও মিত্রতার মূল্যায়নে এমন এক পরিবর্তন আসছে যা আগে হয়তো অলৌকিক মনে হতো। তাই অদূর ভবিষ্যতে এই নিঃশর্ত বন্ধুত্বের সম্পর্কের দিন শেষ হতে চলেছে।
রুশ সংবাদমাধ্যম আরটির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, উভয় দেশের নেতৃত্বের মধ্যে সংঘাতের মূল কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে মধ্যপ্রাচ্য নীতি, জার্মান অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং বাণিজ্য সংকট। চলতি বছরের এপ্রিলে ইরান যুদ্ধে ওয়াশিংটনের ভূমিকা নিয়ে সমালোচনা করে মের্জ মন্তব্য করেছিলেন যে, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো স্পষ্ট কৌশল নেই এবং তারা ইরানের কাছে লজ্জিত হয়েছে।
এর জবাবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়ে মের্জকে নিজের ‘ভেঙে পড়া দেশ’ ঠিক করার পরামর্শ দেন। মে মাসে সম্পর্কের অবক্ষয় আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে যখন চ্যান্সেলর মের্জ যুক্তরাষ্ট্রকে আর ‘সুযোগের দেশ’ হিসেবে দেখতে অস্বীকৃতি জানান এবং সন্তানদের কাজ বা পড়াশোনার জন্য সেখানে না পাঠানোর পরামর্শ দেন।
এ ছাড়াও, জার্মানিতে মার্কিন অর্থায়নে ৫ মিলিয়ন ডলারের একটি প্রোগ্রাম চালুর মাধ্যমে সে দেশের রাজনীতি ও নির্বাচনে হস্তক্ষেপের চেষ্টার বিষয়ে ওয়াশিংটনকে সতর্ক করেন তিনি।
ডোনাল্ড ট্রাম্প ২০২৫ সালে পুনরায় হোয়াইট হাউসে আসার পর ইউরোপীয় বাণিজ্য অংশীদারদের ওপর নতুন করে শুল্ক আরোপ করেন এবং ইউরোপের অভিবাসন নীতির কঠোর সমালোচনা শুরু করেন। শুধু তাই নয়, ট্রাম্প ডেনমার্কের স্বশাসিত অঞ্চল গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণের পরিকল্পনা পুনরুজ্জীবিত করেন এবং মের্জ চ্যান্সেলর হিসেবে ‘বাজে কাজ’ করছেন বলে প্রকাশ্যে মন্তব্য করেন।
পাশাপাশি, ২০২৫ সালের মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে.ডি. ভ্যান্স ইউরোপের রাজনৈতিক ধারা বিশেষ করে জার্মানির অভিবাসনবিরোধী দল ‘অল্টারনেটিভ ফর জার্মানি’-কে মূলধারার রাজনীতি থেকে দূরে রাখার ‘ফায়ারওয়াল’ নীতির সমালোচনা করে বিতর্ক উসকে দেন।
এই দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের টানাপোড়েনের চরম প্রতিফলন ঘটে সামরিক ক্ষেত্রে, যখন মে মাসে পেন্টাগন জার্মানিতে অবস্থানরত তাদের ৩৬ হাজার সেনার মধ্য থেকে প্রায় ৫ হাজার সেনা প্রত্যাহারের ঘোষণা দেয়। অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সংকট সত্ত্বেও জার্মানি এখন নিজেদের নিরাপত্তা পুনর্গঠন ও ইউক্রেনকে সহায়তা চালিয়ে যাওয়ার নীতি গ্রহণ করেছে।
চ্যান্সেলর মের্জের মতে, নিজেদের সুরক্ষার জন্য জার্মানির এখন আরও বেশি স্বাধীন দায়িত্ব নেওয়ার সময় এসেছে।