রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়ায় সাবেক শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী ও দুই সন্তান হত্যাকাণ্ডে গ্রেপ্তার মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাসই হত্যাকারী বলে দাবি করেছেন রংপুর মহানগর পুলিশ কমিশনার (আরএমপি) মোহাম্মদ আব্দুল মাবুদ। আজ বৃহস্পতিবার মামলার তদন্তের অগ্রগতি জানাতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এই দাবি করেন পুলিশ কমিশনার।
তবে সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ কমিশনারের বক্তব্য শেষ হওয়ার পর সাংবাদিকরা বিভিন্ন প্রশ্ন করেন। একপর্যায়ে সাংবাদিকরা প্রশ্ন করেন, ২০২৪ সালে আবু সাঈদ হত্যার পর তার ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন কয়েকবার পরিবর্তনের অভিযোগ পাওয়া যায়, এখানেও তেমন কিছু ঘটছে কীনা? এ প্রশ্নের পর কোনো জবাব না দিয়ে সংবাদ সম্মেলন ত্যাগ করেন কমিশনার।
আদালতে মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থের জবানবন্দির বরাত দিয়ে পুলিশ কমিশনার জানান, চারজনের মধ্যে গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী ও মেয়েকে বাড়ির ছাদেই হত্যা করা হয়। পরে গণপতির মরদেহ টিন দিয়ে ঢেকে রাখা হয়। আর তার স্ত্রী ও মেয়ের মরদেহ ছাদের সিঁড়ির গেটের আড়ালে রাখা হয়, যাতে পাশের বাড়ির ছাদ থেকে সহজে দেখা না যায়।
পুলিশ কমিশনারের ভাষ্য, বৃহস্পতিবার রাত ১২টার পর সিদ্ধার্থ দাস ইয়াবা নিয়ে মুগ্ধ দাসকে সঙ্গে করে সীমান্তের বাসায় যান। সেখানে তারা তিনটি ইয়াবা সেবন করেন। রাত ৩টার দিকে আরও ইয়াবা সেবনের ইচ্ছা হলে কামাল কাছনার ইয়াবা কারবারি শান্তর সঙ্গে যোগাযোগ করেন তারা। পরে আরও চারটি ইয়াবা নেন। ইয়াবা কেনার জন্য সিদ্ধার্থ নিজের মোবাইল ফোনটি বন্ধক রাখেন। ইয়াবা নেওয়ার পর সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ আবার সীমান্তের বাসায় যান। রাত ৩টার পর সেখান থেকে বের হলে রাস্তায় কুকুর দেখতে পান তারা। তখন প্রাচীর টপকে পাশের দেবুদের বাড়িতে ঢোকেন। এরপর দেবুদের বাড়ির ছাদ হয়ে গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে ওঠেন।
পুলিশ কমিশনার বলেন, গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদটি চারদিকে হাফ-ওয়াল দিয়ে ঘেরা ছিল। ফলে বাইরে থেকে সহজে ছাদ দেখা যেত না। তারা সেখানে পানির ট্যাংকের আড়ালে বসে আবার ইয়াবা সেবন করতে থাকেন।
সিদ্ধার্থের জবানবন্দির বরাত দিয়ে পুলিশ কমিশনার বলেন, ইয়াবা সেবনের একপর্যায়ে তারা খেয়াল করেননি কখন ভোর হয়ে গেছে। ওই রাতে তারা মোট আটটি ইয়াবা সেবন করেন। এর আগে একসঙ্গে সর্বোচ্চ দুটি ইয়াবা সেবন করলেও সেদিন রাতে তারা এর চেয়ে অনেক বেশি ইয়াবা সেবন করেন বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করেছেন সিদ্ধার্থ।
পুলিশের দাবি, সকালে গণপতি চক্রবর্তী ছাদে হাঁটতে এসে তাদের দেখে ফেলেন। এ সময় তিনি দুজনকে ধমক দিয়ে বলেন, ‘‘তোরা এত সকালে এখানে কী করিস?’’
পুলিশ কমিশনার জানান, নিজেদের ‘‘মান-সম্মান’’ বাঁচাতে মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ গণপতিকে গলায় থাকা গামছা পেঁচিয়ে শ্বাসরোধে হত্যা করেন। পরে তার মরদেহ ছাদের এক পাশে টিন দিয়ে ঢেকে রাখা হয়। এরপর গণপতির স্ত্রী ও মেয়ে শব্দ শুনে ছাদে এলে তারা চিৎকার শুরু করেন। তখন মুগ্ধ গামছা দিয়ে গণপতির স্ত্রীর গলা চেপে ধরেন। আর সিদ্ধার্থ এক হাতে তার মেয়ের গলা এবং অন্য হাতে মুখ চেপে ধরেন।
জবানবন্দির বরাত কমিশনার জানিয়েছেন, গণপতির স্ত্রীকে হত্যার পর একই গামছা দিয়ে দুজন মিলে মেয়েটির গলায় পেঁচিয়ে শ্বাসরোধের চেষ্টা করেন। এতে তার মৃত্যু না হলে পাশেই কবুতরের খাবার রাখার বাক্স থেকে রশি এনে গলায় পেঁচানো হয়। পরে দুই দিক থেকে টান দিয়ে তাকে হত্যা করা হয়।
পুলিশ কমিশনার বলেন, এরপর তারা বাড়ির ভেতরে ঢুকে দেখতে পান গণপতির ছেলে প্রীয়ম চক্রবর্তী ঘুম থেকে উঠেছেন। সিদ্ধার্থকে দেখে প্রীয়ম বলেন, ‘‘সিদ্ধার্থ দাদা, তুমি এখানে কেন?’’ কমিশনারের দাবি, এ সময় তার গলায় কাপড় পেঁচিয়ে তাকেও হত্যা করা হয়।
হত্যাকাণ্ডে গ্রেপ্তার সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাসের ডোপ টেস্ট ও ডিএনএ নমুনা পরীক্ষার প্রক্রিয়া চলছে বলে জানিয়েছেন পুলিশ কমিশনার। আদালতের অনুমতি নিয়ে নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষার প্রয়োজনীয় কার্যক্রম সম্পন্ন করা হচ্ছে।