১৯৮১ সালের ৩০ মে এক সামরিক অভ্যুত্থান চেষ্টায় চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে নিহত হয়েছিলেন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। রাষ্ট্রপতি হত্যা তদন্তে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবদুস সাত্তার গঠন করেছিলেন একটি উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত কমিটি। কিন্তু সেই কমিটির প্রতিবেদন গত ৪৫ বছরেও প্রকাশিত হয়নি। সম্প্রতি সেই অপ্রকাশিত তদন্ত প্রতিবেদনটি ইংরেজি দৈনিক দ্য ডেইলি স্টারের হাতে এসেছে। আজ বুধবার সে বিষয়ে ডেইলি স্টার একটি বিশদ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।
ডেইলি স্টারের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে তদন্তের বিভিন্ন দিক। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রাথমিকভাবে কমিশনের দায়িত্ব ছিল হত্যাকাণ্ডের পেছনে কোনো গভীর ষড়যন্ত্র ছিল কি না এবং এর সাথে জড়িতদের উদ্দেশ্য ও পরিকল্পনা উন্মোচন করা। তবে সেই তদন্তের উল্লেখযোগ্য এবং বিতর্কিত দিকও তুলে ধরেছে ডেইলি স্টার। সেটি হচ্ছে, কার্যপরিধির পরিবর্তন।
তদন্ত চলাকালে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একটি বিশেষ প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে ষড়যন্ত্র সংক্রান্ত অংশটি তদন্তের পরিধি থেকে বাদ দিয়েছিল। ফলে কমিশনের কাজ শুধু রাষ্ট্রপতির নিরাপত্তায় নিয়োজিত সংস্থাগুলোর ব্যর্থতা এবং প্রশাসনের কর্মকর্তাদের ভূমিকা মূল্যায়নের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছিল।
তৎকালীন সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদসহ ৬২ জন সাক্ষীর জবানবন্দি গ্রহণ শেষে কমিশন দেখতে পায় যে, রাষ্ট্রপতির নিরাপত্তাব্যবস্থা অত্যন্ত দুর্বল ও শিথিল ছিল।
সার্কিট হাউসে পর্যাপ্ত অস্ত্রসজ্জা থাকা সত্ত্বেও হামলাকারীদের বিরুদ্ধে কার্যত কোনো প্রতিরোধ গড়ে তোলা হয়নি।
চট্টগ্রাম সার্কিট হাউস। ফাইল ছবি
কমিশনের প্রতিবেদনে হামলাকারীদের এই সাফল্যকে জুলিয়াস সিজারের বিখ্যাত উক্তি “ভিনি, ভিডি, ভিসি” (এলাম, দেখলাম, জয় করলাম) সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে।
চট্টগ্রামের তৎকালীন জেলা প্রশাসক জিয়াউদ্দিন এম চৌধুরীর এ বিষয়ে ডেইলি স্টারকে জানিয়েছেন, “অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও এই প্রতিবেদনটি কখনোই আনুষ্ঠানিকভাবে জনসমক্ষে আনা হয়নি বা আলোর মুখ দেখেনি।”
রাষ্ট্রপতি জিয়া নিহত হওয়ার এক সপ্তাহের মাথায় তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি তদন্তে কমিশনটি গঠন করেন। সাবেক প্রধান বিচারপতি রুহুল ইসলামের নেতৃত্বাধীন কমিশনের সদস্য ছিলেন বিচারপতি আবু তাহের মোহাম্মদ আফজাল (যিনি পরে প্রধান বিচারপতি হন)। এ ছাড়াও ছিলেন খুলনার জেলা ও দায়রা জজ সৈয়দ সিরাজউদ্দিন আহমেদ।
তদন্ত প্রতিবেদনে ১৯৮১ সালের ৩০ মে ভোরে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের অবস্থানকালে তার সহকারীদের ভূমিকা। সে সময় চট্টগ্রামস্থ সেনাবাহিনীর ২৪ পদাতিক ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল আবুল মনজুরের ভূমিকা পর্যালোচনা করা হয়েছে। তবে জেনারেল মনজুরকে কী কারণে আটক করার পরও জিয়াহত্যার ২ দিনের মাথায় হত্যা করা হয়েছিল, সে বিষয়ে তদন্তের দায়িত্ব এই কমিশনের ছিল না।
৪৫ বছর পর দ্য ডেইলি স্টারের হাতে আসা এই প্রতিবেদন বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম এক অন্ধকার অধ্যায়ের দিকে নতুন করে প্রশ্নের আঙুল তুলছে।