আপনি কি জানেন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে কয়বার গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে?
দুনিয়ার বিভিন্ন দেশের মতো বাংলাদেশের সংবিধানেও গণভোট নামের একটি ব্যবস্থার বিধান আছে। এখনো পর্যন্ত বাংলাদেশে তিনবার গণভোট হয়েছে। যার সর্বশেষটি অনুষ্ঠিত হয়েছে ৩৪ বছর আগে।
১৭৭৮ সালে সুইজারল্যান্ডে গণভোট প্রথম চালু হয়। ইংরেজিতে একে বলা হয় রেফারেন্ডাম। সাধারণত, দেশের প্রশাসনিক ও সাংবিধানিক কোনো বিষয়ে জনগণের মতামত নেওয়ার নামই গণভোট। ভোটার তালিকায় যাঁদের নাম আছে, তাঁরাই এই গণভোটে নিজেদের মতামত দিতে পারেন। গণভোট পদ্ধতিতে ব্যালটে প্রশাসনিক ও সাংবিধানিক বিষয়ে একটি প্রশ্ন রাখায় হয়, ভোটাররা সেটার পক্ষে না বিপক্ষে, সেটি ‘হ্যাঁ’ ও ‘না’ ঘরে সিল মেরে জানিয়ে দেন। সুইজারল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, ইতালিসহ দুনিয়ার কয়েকটি দেশে সংবিধান সংশোধনের জন্য গণভোট বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
বাংলাদেশের সংবিধানের প্রস্তাবনা ও অনুচ্ছেদ ৮, ৪৮, ৫৬, ৫৮, ৮০, ৯২ক বা ১৪২ সংশোধন বা পরিবর্তনের প্রশ্নে গণভোট অনুষ্ঠানের বিধান আছে। যদিও ২০১১ সালে আওয়ামী লীগ সরকার সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী পাস করে বাংলাদেশ থেকে গণভোট প্রথা বাতিল করে দিয়েছিল। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যূত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর উচ্চ আদালত গণভোট পদ্ধতি আবারও ফিরিয়ে আনার পক্ষে রায় দিয়েছে।
বাংলাদেশে যে তিনটি গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে তার প্রথম দুটি ছিল প্রশাসনিক গণভোট, সর্বশেষটি ছিল সাংবিধানিক গণভোট।

১৯৭৭ সালের ৩০ মে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশের প্রথম গণভোটটি ছিল সামরিক শাসক মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানের শাসনের প্রতি জনগণের সমর্থন আদায় করার উদ্দেশ্যে। ভোটারদের কাছে ব্যালটে প্রশ্ন ছিল—‘আপনি কি রাষ্ট্রপতি মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানের (বীরউত্তম) প্রতি এবং তাঁর গৃহীত নীতি ও কার্যক্রমের ওপর আস্থাশীল?’
সেই গণভোটে মোট ৮৮.১ ভাগ ভোটার নিজেদের মতামত দিয়েছিলেন বলে কাগজপত্রে পাওয়া যায়। ৯৮.৯ শতাংশ ভোটারই রাষ্ট্রপতি জিয়ার শাসনের প্রতি নিজেদের সমর্থনের কথা জানান।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে নিহত হন। তাঁর নিহতের পরপরই সামরিক শাসন জারি হয় দেশে। রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নেন তাঁরই দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সহযোগী খন্দকার মোশতাক আহমেদ। তিনি তিন মাস দেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিলেন। এরপর দেশে পাল্টাপাল্টি সামরিক অভ্যূত্থানের ঘটনা ঘটে। রক্তক্ষয়ী ওই সময়ে কারাগারে হত্যা করা হয় চারজন জাতীয় নেতাকে। খন্দকার মোশতাকের বিরুদ্ধে অভ্যূত্থানে নিহত হন ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ, কর্নেল এটিএম হায়দার ও লেফটেন্যান্ট কর্নেল নাজমুল হুদা। এই অভ্যূত্থানে বন্দী হয়েছিলেন সে সময়ের উপ-সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান। পরে খালেদ মোশাররফের অভ্যূত্থানের বিরুদ্ধে পাল্টা অভ্যূত্থানটি সিপাহী-জনতার অভ্যূত্থান হিসেবে পরিচিত। এবং সেই অভ্যূত্থানের মাধ্যমে সাধারণ সৈনিকেরা জিয়াকে মুক্তি করে তাঁকে দেশের শাসন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করে।
জিয়া প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হয়েছিলেন, রাষ্ট্রপতি হয়েছিলেন বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম। পরে স্বাস্থ্যগত কারণ দেখিয়ে আবু সাদাত সায়েম রাষ্ট্রপতির পদ ছেড়ে দিলে জিয়াউর রহমান একাধারে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক ও দেশের রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করতে থাকেন। জিয়ার সামরিক শাসনের শুরুর দিকটা ছিল অস্থির এক সময়। সেনাবাহিনীতে এই সময় বেশ কিছু ছোট-বড় অভ্যূত্থান সংঘটিত হয়। এরই প্রেক্ষিতে জিয়ার রাজনৈতিক উত্তরণে দেশের মানুষের সমর্থন আদায় জরুরি হয়ে পড়েছিল। ’৭৭ সালের গণভোটে জনগণের সমর্থন পাওয়ার পর জিয়া রাষ্ট্রক্ষমতা ও দেশের প্রশাসনের ওপর নিজের পূর্ণ কর্তৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন। রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে জিয়ার উত্থানে ১৯৭৭ সালের গণভোট ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।
রাষ্ট্রপতি জিয়া সামরিক শাসন থেকে বেসামরিক শাসন চালু করেন। বিএনপি গঠন করে নিজেকে রাজনীতিবিদ রাষ্ট্রপতি হিসেবে নিজের উত্তরণ ঘটান জিয়া। ১৯৭৮ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জয়লাভ করে তিনি নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি হিসেবে দেশ চালানো শুরু করেন। ১৯৭৯ সালে দেশে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। জিয়ার দল বিএনপি ২০৭ আসন নিয়ে সেই নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে।
যে গণভোটে জিয়া নিজের ভিত শক্ত করেছিলেন, সেটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৭৭ সালের ৩০ মে। তার ঠিক ৪ বছর পর, ১৯৮১ সালের ৩০ মে একদল বিপথগামী সেনা সদস্যের হাতে চট্টগ্রামে নিহত হন জিয়া। তাঁর মৃত্যুর পর উপরাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবদুস সাত্তার অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হয়ে সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখেন। ’৮১’র নভেম্বরে দেশে অনুষ্ঠিত রাষ্ট্রপতি নির্বাচনেও বিচারপতি সাত্তার জয়ী হন। তবে তাঁর সরকারের বিরুদ্ধে অযোগ্যতা ও অকার্যকারিতার অভিযোগ তুলে নির্বাচনের চার মাসের মাথায় দেশে সামরিক শাসন জারি করেন সে সময়ের সেনাবাহিনী প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। তিনিও শুরুতে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হিসেবেই দায়িত্ব নেন। রাষ্ট্রপতি হন বিচারপতি আহসানউদ্দিন চৌধুরী। কিছু দিন পর বিচারপতি আহসানউদ্দিন স্বাস্থ্যগত কারণ দেখিয়ে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব তুলে দেন প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক জেনারেল এরশাদের হাতে। জিয়ার মতোই এরশাদ একাধারে রাষ্ট্রপতি ও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হন।

এরশাদ তাঁর সামরিক শাসনের প্রথম তিন বছর রাজনৈতিক বিরোধিতার সম্মুখীন হয়েছিলেন। তাঁর সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতার বিক্ষোভ, আন্দোলন হয়েছে। গণতন্ত্র ও নির্বাচনের দাবীতে সোচ্চার ছিল দেশের রাজনৈতিক দলগুলোও। ১৯৮৫ সালের ২১ মার্চ জিয়ার পথ অনুসরণ করে এরশাদও নিজের রাজনৈতিক উত্তরণ ও জনসমর্থন আদায়ের জন্য গণভোটের আয়োজন করেন।
সেই গণভোটে, প্রথম গণভোটের মতোই প্রশ্ন রাখা হয়েছিল ভোটারদের সামনে। ১৯৮৫ গণভোটে ব্যালটে যে প্রশ্ন ছিল, তার অংশ ছিল দুটি। প্রথম অংশটি ছিল এমন—‘আপনি কি রাষ্ট্রপতি লেফটেন্যান্ট জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের প্রতি ও তাঁর গৃহীত নীতির প্রতি আস্থাশীল?’
দ্বিতীয় অংশে ছিল—‘আপনি কি চান রাষ্ট্রপতি এরশাদ জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে একটি নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের পূর্ব পর্যন্ত প্রশাসন পরিচালনা করবেন?’
সেই গণভোটে ৭২.২ শতাংশ ভোটার উপস্থিতি ছিল বলে সরকারি হিসেবে জানা যায়। হাজির হওয়া ভোটারের ৯৪.৫ শতাংশই এরশাদের পক্ষে নিজেদের সমর্থন জানান। এই গণভোটের এক বছর পর, ১৯৮৬ সালে এরশাদ সংসদ নির্বাচন দেন। সেই নির্বাচনে তাঁর প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দল জাতীয় পার্টি ১৫১ আসন নিয়ে সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে আবির্ভূত হয়।
১৯৯০ সালে এক গণঅভ্যূত্থানে ক্ষমতাচ্যূত হন রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। তবে তাঁর ক্ষমতা হস্তান্তর ছিল সংবিধান মেনেই। সংবিধান অনুযায়ী তিনি উপরাষ্ট্রপতির হাতে ক্ষমতা তুলে দেন। তবে তিনি যে উপরাষ্ট্রপতির হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন তিনি তাঁর নির্বাচিত উপরাষ্ট্রপতি ছিলেন না। অভ্যূত্থানের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক দলগুলো সে সময়ের প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমেদকে উপরাষ্ট্রপতির পদে মনোনীত করে। এরশাদ পদত্যাগের আগে বিচারপতি সাহাবুদ্দীনকে উপরাষ্ট্রপতি করেন এবং তাঁর হাতেই ক্ষমতা হস্তান্তর করেন।

এরশাদের পতনের পর দেশে নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি রাষ্ট্রক্ষমতায় আসে। খালেদা জিয়া হন প্রধানমন্ত্রী। তবে দেশে তখনো সাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকার ব্যবস্থা জারি ছিল। তবে রাজনৈতিক দলগুলোর দাবী ছিল সংসদীয় গণতন্ত্র। ১৯৯১ সালের জুলাই মাসে সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনী সর্বসম্মতিক্রমে পাস হয় জাতীয় সংসদে। সেই সংশোধনীর মধ্য দিয়ে সংসদীয় ব্যবস্থায় ফেরে দেশ। এর আগে একাদশ সংশোধনী পাস হয়, যে সংশোধনীর মাধ্যমে সাহাবুদ্দীন আহমেদের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন শেষে প্রধান বিচারপতির পদে ফেরাকে বৈধতা দেওয়া হয়। দ্বাদশ সংশোধনীতে রাষ্ট্রপতি সম্মতি দেবেন কিনা, সে প্রশ্নে অনুষ্ঠিত হয় দেশের ইতিহাসের তৃতীয় ও এখনো পর্যন্ত সর্বশেষ গণভোট।
১৯৯১ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত সেই গণভোটে ভোটারদের সামনে প্রশ্ন ছিল—‘রাষ্ট্রপতি কি সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনী বিলে সম্মতি দেবেন?’ যে সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্র রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকার ব্যবস্থা থেকে সংসদীয় পদ্ধতির সরকার ব্যবস্থায় ফেরে। একই সঙ্গে সেই সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্রপতিকে সাংবিধানিক প্রধান ও প্রধানমন্ত্রীকে নির্বাহী প্রধান হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে রাষ্ট্রপতি পদটিকে অনেকটাই আলংকারিক পদে পরিণত করা হয়। দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে উপরাষ্ট্রপতি ও উপপ্রধানমন্ত্রী পদ দুটি বাতিল করা হয়।
বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত তিনটি গণভোটের একটি বৈশিষ্ট্য হলো, তিনটিতেই সরকার বা প্রশাসন যেটা চেয়েছে, সেটির পক্ষেই ভোটারদের সম্মতি পাওয়া গেছে। এ কারণে, কোনো কোনো সমালোচকের মতে, বাংলাদেশের ইতিহাসের তিনটি গণভোটই বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। ভোটার উপস্থিতির সঠিক হার নিয়েও আছে বিতর্ক। এসব বিতর্ক থাকলেও ২০১১ সালে পঞ্চদশ সংশোধনী পাস করে বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত এই ব্যবস্থা বাতিল করা নিয়েও আছে তীব্র সমালোচনা। আদালতের রায়ে আবারও গণভোট ব্যবস্থা যেহেতু ফিরেছে, তাই ভবিষ্যতে বাংলাদেশে যেকোনো প্রশাসনিক ও সাংবিধানিক প্রশ্নে গণভোট আয়োজনের সম্ভাবনাকে আর উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই।