ads

ঢাকা শহর বসবাসের কতটা অযোগ্য?

ঢাকা শহর বসবাসের কতটা অযোগ্য?
জনসংখ্যার দিক দিয়ে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর ঢাকা। ছবি: চরচা

যুক্তরাজ্যভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (ইআইইউ) প্রকাশিত বৈশ্বিক বাসযোগ্যতা সূচক ২০২৬-এ টানা দ্বিতীয় বছরের মতো বিশ্বের সবচেয়ে কম বসবাসযোগ্য শহরের তালিকায় তলানির দিকে স্থান পেয়েছে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা।

বিশ্বের মোট ১৭৩টি দেশের প্রধান শহরের ওপর করা এই জরিপে ঢাকার অবস্থান এবার ১৭১তম। ঢাকার নিচে রয়েছে কেবল যুদ্ধবিধ্বস্ত সিরিয়ার রাজধানী দামেস্ক এবং লিবিয়ার রাজধানী ত্রিপোলি।

বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের মানবসম্পদ বিভাগকে সহায়তা এবং প্রবাসী কর্মীদের সুযোগ-সুবিধা নির্ধারণে প্রতি বছর স্থিতিশীলতা, স্বাস্থ্যসেবা, সংস্কৃতি ও পরিবেশ, শিক্ষা এবং অবকাঠামো–এই পাঁচটি প্রধান মানদণ্ড বিবেচনা করে এই বৈশ্বিক সূচক প্রকাশ করে ইআইইউ।

ক্যাটাগরি ১: স্থায়িত্ব বা স্থিতিশীলতা (মোট স্কোরের ২৫%)

এই বিভাগে একটি শহরের সার্বিক নিরাপত্তা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি মূল্যায়ন করা হয়। এর মধ্যে থাকে–

  • ছোটখাটো অপরাধের প্রবণতা: পকেটমার বা ছিনতাইয়ের মতো সাধারণ অপরাধের হার
  • সহিংস অপরাধের প্রবণতা: খুন, ডাকাতি বা মারামারির মতো বড় অপরাধের হার
  • সন্ত্রাসী হামলার হুমকি: জঙ্গি বা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের আশঙ্কা
  • সামরিক সংঘাতের হুমকি: যুদ্ধ বা সেনা সংঘাতের ঝুঁকি
  • নাগরিক অশান্তি/সংঘাতের হুমকি: গণবিক্ষোভ, দাঙ্গা বা ভেতরের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা

ক্যাটাগরি ২: স্বাস্থ্যসেবা (মোট স্কোরের ২০%)

এই বিভাগে চিকিৎসা ব্যবস্থার মান এবং তা সাধারণ মানুষের কতটা নাগালের মধ্যে, তা দেখা হয়। এ ক্ষেত্রে যে বিষয়গুলোকে বিবেচনায় নেওয়া হয়–

  • বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবার সহজলভ্যতা: প্রাইভেট হাসপাতাল ও ক্লিনিকের সংখ্যা এবং সুযোগ-সুবিধা
  • বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবার মান: বেসরকারি চিকিৎসার গুণগত মান
  • সরকারি স্বাস্থ্যসেবার সহজলভ্যতা: সরকারি হাসপাতাল ও মেডিকেল সেন্টারের সংখ্যা এবং সুযোগ-সুবিধা
ছবি: চরচা
ছবি: চরচা
  • সরকারি স্বাস্থ্যসেবার মান: সরকারি চিকিৎসার গুণগত মান
  • সাধারণ ওষুধের সহজলভ্যতা: প্রেসক্রিপশন ছাড়া সাধারণ প্রয়োজনীয় ওষুধ সহজে পাওয়ার সুবিধা
  • সাধারণ স্বাস্থ্যসেবা সূচক: স্বাস্থ্য খাতের অন্যান্য সাধারণ তথ্যাদি (বিশ্বব্যাংকের ডেটা থেকে নেওয়া)

ক্যাটাগরি ৩: সংস্কৃতি ও পরিবেশ (মোট স্কোরের ২৫%)

এই বিভাগে শহরের আবহাওয়া, সামাজিক স্বাধীনতা এবং বিনোদনের সুযোগ মূল্যায়ন করা হয়। এ ক্ষেত্রে নিম্নোক্ত বিষয়গুলোকে বিবেচনা করা হয়–

  • আর্দ্রতা ও তাপমাত্রা: আবহাওয়া কতটা আরামদায়ক বা চরম ভাবাপন্ন
  • ভ্রমণকারীদের জন্য আবহাওয়ার অস্বস্তি: দেশের বাইরের মানুষের জন্য আবহাওয়া কতটা মানানসই
  • দুর্নীতির মাত্রা: প্রশাসনিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে দুর্নীতির পরিমাণ
  • সামাজিক বা ধর্মীয় বিধিনিষেধ: নাগরিক জীবনে সমাজ বা ধর্মের কড়াকড়ি বা বাধা
  • সেন্সরশিপের মাত্রা: গণমাধ্যম এবং সাধারণ মানুষের কথা বলার স্বাধীনতার ওপর নিয়ন্ত্রণ
  • খেলাধুলার সুযোগ: শহরের ভেতর খেলাধুলা করার ও দেখার সুবিধা
  • সাংস্কৃতিক সুযোগ-সুবিধা: থিয়েটার, সিনেমা, জাদুঘরসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ
  • খাবার ও পানীয়: রেস্তোরাঁ, ক্যাফে এবং বিভিন্ন ধরনের খাবার পাওয়ার সুবিধা
  • নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও সেবা: প্রতিদিনের দরকারি জিনিসপত্র ও সেবা সহজে পাওয়ার নিশ্চয়তা

ক্যাটাগরি ৪: শিক্ষা (মোট স্কোরের ১০%)

এই বিভাগে পড়াশোনার সুযোগ ও মান বিবেচনা করা হয়–

  • বেসরকারি শিক্ষার সহজলভ্যতা: প্রাইভেট স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা
  • বেসরকারি শিক্ষার মান: প্রাইভেট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর পড়াশোনার মান
  • সরকারি শিক্ষার সূচক: সরকারি স্কুল-কলেজের অবস্থা ও মান (বিশ্বব্যাংকের ডেটা থেকে নেওয়া)
  • ক্যাটাগরি ৫: অবকাঠামো (মোট স্কোরের ২০%)
  • এই বিভাগে শহরের রাস্তাঘাট, যোগাযোগ এবং নাগরিক সুযোগ-সুবিধার মান দেখা হয়।
  • সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার মান: রাস্তাঘাটের অবস্থা এবং হাইওয়ে নেটওয়ার্ক
  • গণপরিবহন ব্যবস্থার মান: বাস, ট্রেন, মেট্রো ইত্যাদি পাবলিক ট্রান্সপোর্টের সুবিধা
  • আন্তর্জাতিক যোগাযোগের মান: বিমানবন্দর বা বন্দর দিয়ে অন্যান্য দেশের সাথে যোগাযোগের সুবিধা
  • মানসম্মত আবাসনের সহজলভ্যতা: থাকার জন্য ভালো ও নিরাপদ বাড়ি বা ফ্ল্যাট পাওয়ার সুবিধা
  • বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহের মান: নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাস পাওয়ার সুবিধা
  • পানি সরবরাহের মান: বিশুদ্ধ ও পর্যাপ্ত পানি পাওয়ার সুবিধা
  • টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থার মান: ইন্টারনেট, মোবাইল নেটওয়ার্ক এবং ফোন লাইনের সুবিধা

চলতি বছরের সূচকে ১০০ নম্বরের মধ্যে ঢাকার সার্বিক স্কোর এসেছে মাত্র ৪২। বিভিন্ন ক্যাটাগরির মধ্যে ঢাকা সবচেয়ে খারাপ করেছে অবকাঠামো খাতে, যেখানে স্কোর মাত্র ২৭।

এ ছাড়া সংস্কৃতি ও পরিবেশ ক্যাটাগরিতে ৪১, স্বাস্থ্যসেবায় ৪২, স্থিতিশীলতায় ৪৫ এবং শিক্ষা খাতে ঢাকা সর্বোচ্চ ৬৭ স্কোর করেছে।

সাধারণত তীব্র যানজট, উচ্চ জনঘনত্ব এবং অপরাধপ্রবণতার মতো নাগরিক সংকটের কারণেই এই বড় শহরগুলোর বাসযোগ্যতার সূচক এত নিচে নেমে যায়।

ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত

এবারের তালিকায় ঢাকার সাথে তলানিতে থাকা অন্য শহরগুলোর মধ্যে রয়েছে তেহরান, করাচি, হারারে, কিয়েভ, পোর্ট মোর্সবি, লাগোস ও আলজিয়ার্স।

অন্যদিকে, বৈশ্বিক এই সূচকের শীর্ষস্থানগুলো ধরে রেখেছে কোপেনহেগেন, ভিয়েনা, মেলবোর্ন, সিডনি ও জুরিখ।

এর মধ্যে ডেনমার্কের রাজধানী কোপেনহেগেন স্থিতিশীলতা, শিক্ষা ও অবকাঠামো–এই তিন বিভাগেই ১০০-তে ১০০ স্কোর অর্জন করে শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে।

ঢাকার গত কয়েক বছরের সূচক বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, শহরের বাসযোগ্যতার ধারাবাহিক কোনো টেকসই উন্নতি হয়নি, বরং দিন দিন এর অবনমন ঘটেছে।

২০২১ সালে ১৪০টি শহরের মধ্যে ঢাকার অবস্থান ছিল ১৩৭তম, যেখানে করোনা মহামারির কারণে স্বাস্থ্যসেবার স্কোর নেমেছিল মাত্র ১৬.৭-এ।

২০২২ সালে মহামারি-পরবর্তী পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলে ১৭২টি শহরের মধ্যে ঢাকা ১৬৬তম অবস্থানে আসে।

২০২৩ সালেও শিক্ষা খাতে ভালো করার পরও অবকাঠামোগত দুর্বলতার কারণে ঢাকার অবস্থান ১৬৬তমই থেকে যায়। এরপর ২০২৪ সালে শিক্ষা খাতের স্কোর কমে যাওয়ায় ঢাকার অবস্থান আরও পিছিয়ে ১৬৮তম হয়।

সবশেষ ২০২৫ সালে দেশের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে শহরের ‘স্থিতিশীলতা’ স্কোর বড় ধাক্কা খেয়ে ৪৫-এ নামে, যা ঢাকাকে বিশ্বের তৃতীয় অবাসযোগ্য শহর হিসেবে ১৭১তম অবস্থানে নামিয়ে দেয়।

চলতি ২০২৬ সালেও আগের সেই ৪২ স্কোরেই আটকে থাকায় পরিস্থিতির কোনো দৃশ্যমান পরিবর্তন হয়নি।

এ প্রসঙ্গে স্থপতি ইকবাল হাবিব চরচাকে বলেন, “ঢাকা শহর এখনও দুবাই বা আবুধাবির মতো খালি জমির শহর নয়; তবে এর পূর্ব অংশটি এখন ধীরে ধীরে নতুন করে দৃশ্যমান হচ্ছে। অন্যদিকে মধ্য, পশ্চিম, উত্তর ও দক্ষিণ–ঢাকার প্রায় পুরোটা অংশই এখন জনাকীর্ণ ও ঘিঞ্জি।”

ইকবাল হাবিব বলেন, “এই অবস্থায় ঢাকাকে সত্যি সত্যি বাসযোগ্য করে তুলতে হলে মূলত দুটি বড় পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।

প্রথমত, এই অত্যন্ত ঘনবসতিপূর্ণ শহরটিকে নতুন করে পুনর্গঠন বা ‘রিকন্সট্রাকশন’ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, ঢাকার ওপর থেকে চাপ কমাতে এর দ্রুত বিকেন্দ্রিকরণ করা প্রয়োজন।

সেই সাথে ঢাকার চারপাশের প্রান্তিক শহরগুলোকে দ্রুতগতির ও সহজ যোগাযোগ নেটওয়ার্কের (শর্ট কানেকশন) মাধ্যমে যুক্ত করতে হবে।”

এই নগর পরিকল্পনাবিদের মতে, এই দুটি মূল কাজের পাশাপাশি, ঢাকার অভ্যন্তরীণ যাতায়াত ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ গণমুখী করতে হবে।

একই সাথে শহরের হারিয়ে যাওয়া ‘গ্রিন ও ব্লু নেটওয়ার্ক’; অর্থাৎ গাছপালা-পার্ক এবং খাল-জলাশয়গুলোকে একটি সমন্বিত মহাপরিকল্পনার আওতায় এনে দ্রুত উদ্ধার করতে হবে। তবেই ঢাকাকে একটি আধুনিক ও বাসযোগ্য নগরী হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব।

সম্পর্কিত