সামরিক শাসক হয়েও জিয়া কেন এত জনপ্রিয়

চরচা প্রতিবেদক
চরচা প্রতিবেদক
সামরিক শাসক হয়েও জিয়া কেন এত জনপ্রিয়
জিয়াউর রহমান। ছবি: সংগৃহীত

জিয়াউর রহমান ছিলেন একজন সামরিক শাসক। কঠোর প্রশাসক। এক ক্রান্তিকালে তিনি রাষ্ট্রের শাসনভার গ্রহণ করেছিলেন। কঠোর হাতে দেশ চালিয়েছেন। কিন্তু একজন সামরিক শাসক কিংবা কঠোর প্রশাসক হয়েও তিনি জনপ্রিয়। কীভাবে একজন সামরিক শাসক হয়ে উঠলেন জনপ্রিয় রাষ্ট্রনায়ক? কীভাবে তিনি হয়ে উঠলেন বাংলাদেশের রাজনীতির কাল্ট চরিত্র?

জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের এক গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। ১৯৭১ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে চাকরিরত একজন মেজর হয়েও তিনি তার বাঙালি জাতিসত্ত্বার স্বপক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন। অষ্টম ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্ট নিয়ে তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে দেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে যোগ দিয়েছিলেন। ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তান বাহিনী যখন বাঙালিদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল তীব্র আক্রোশে, দেশে যখন গণহত্যা চলছে, দিগভ্রান্ত জাতিকে পথ দেখাতে যখন ব্যর্থ রাজনীতিকেরা, তখনই জিয়াউর রহমান নিজ কণ্ঠে ঘোষণা করেছিলেন দেশের স্বাধীনতা। সেই ঘোষণা পাকিস্তানিদের নৃশংসতার মুখে অসহায় জাতির মনে জাগিয়েছিল আশা। সেদিন থেকেই জিয়া বাংলাদেশের মানুষের মনে জায়গা করে নিয়েছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি ‘জেড ফোর্স’ নামের একটি পদাতিক ব্রিগেডের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সেক্টর কমান্ডার। মোটকথা বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে জিয়াউর রহমানের ছিল অবিস্মরণীয় ভূমিকা।

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকার মধ্য দিয়েই জিয়াউর রহমানের কাল্ট হয়ে ওঠা শুরু। স্বাধীনতার পর তিনি হলেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর উপপ্রধান। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান সপারিবারে নৃশংসভাবে নিহত হন সেনাবাহিনীর একাংশের হাতে। জিয়াউর রহমান এরপর সেনাবাহিনী প্রধান হন। তবে মুজিব–হত্যার পর সেনাবাহিনীতে অস্থিরতা দেখা দেয়। চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়ে পুরোপুরি। পঁচাত্তরের নভেম্বরে পাল্টা অভ্যুত্থান ঘটলে জিয়াউর রহমানকে বন্দী করা হয়। কিন্তু সেনাবাহিনীর যে ক্ষুদ্র অংশটি জিয়াকে বন্দী করে নিজেদের ক্ষমতায়িত করতে চেয়েছিল, তাদের হিসাবে ছিল বড় ভুল। সেনাবাহিনীর সাধারণ সৈনিকদের কাছে বিপুল জনপ্রিয় জিয়া মুক্ত হতে বেশি সময় নেননি। সাধারণ সৈনিকেরাই তাকে মুক্ত করে। এরপর রক্তক্ষয়ী সিপাহী–জনতার বিপ্লবের মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের অগ্রসৈনিক জিয়ার কাঁধে তুলে দেওয়া হয় দেশের নেতৃত্ব। তিনি হন দেশের উপপ্রধান সামরিক আইন প্রশাসক।

জিয়ার রাষ্ট্রনায়ক হয়ে ওঠার কাল এটিই। ইতিহাসের বরপুত্র হয়েই তিনি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পান। ইতিহাসের গতিপথই তার ভাগ্য নির্ধারণ করে দিয়েছিল। তিনি যখন রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব হাতে পান, দেশের পরিস্থিতি তখন অস্থির। একটা গৃহযুদ্ধের শঙ্কার মধ্যে রাষ্ট্রের দায়িত্ব যখন কারও কাঁধে চাপে, কাজটা তখন মোটেও সহজ নয়। কিন্তু সেই কঠিন দায়িত্বটাই জিয়া সামলেছিলেন কঠোর হাতে।

রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিব হত্যার পর দেশে ভয়াবহ নেতৃত্বের সংকট দেখা দিয়েছিল। শেখ মুজিবের ব্যক্তিত্ব ছিল বিশাল। তিনি ছিলেন এক ক্ষমতাবান দেশনেতা। দেশের স্বাধীনতার স্থপতিই। তার আঙুলের ইশারাতেই দেশের মানুষ মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। জিয়া নিজেও মুক্তিযুদ্ধ করেছিলেন মুজিবের নেতৃত্ব মেনেই। এমনকি চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে তিনি যে স্বাধীনতার ঘোষণাটি দিয়েছিলেন, সেটি ছিল শেখ মুজিবের পক্ষেই। এই শেখ মুজিবের মৃত্যুর পর দেশের নেতৃত্বের সংকট মিটেছিল জিয়ার মাধ্যমেই। জিয়াই হয়ে ওঠেন বাংলাদেশের রাষ্ট্রনেতা। তার হাতেই দেশের মানুষ সঁপে দিয়েছিল নিজেদের ভাগ্য।

জিয়াউর রহমান। ছবি: সংগৃহীত
জিয়াউর রহমান। ছবি: সংগৃহীত

দেশে স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে একজন সামরিক শাসকের ওপর মানুষ নির্ভর করেছিল। তার ওপর তারা আস্থা রেখেছিল অস্থির পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে, দেশের সংকটগুলোর সমাধানে। জিয়া তার শাসনামলে সেই কাজটি করেছিলেন দারুণ সফলতার সঙ্গে। তিনি যেখানে কঠোর হওয়ার, হয়েছেন। কঠোর হওয়ার কারণে তাকে সমালোচিত হতে হয়েছে। হতে হয়েছে বিতর্কিত। কিন্তু তিনি দেশের জন্য যেটি সঠিক মনে করেছেন, সেটিই করেছেন। তার সময়ে সামরিক বাহিনীতে একাধিক বিদ্রোহ ও অভ্যুত্থান হয়েছে। সেনাবাহিনীকে শৃঙ্খলার পথে ফিরিয়ে আনার জন্য তিনি কঠোরতম ভূমিকায় ছিলেন। অনেক সময় সেই কঠোরতা কারও কারও মতে নিষ্ঠুরতার পর্যায়েই পৌঁছেছিল। জিয়াকে কঠোর প্রশাসক সবাই বলেন, কেউ কেউ বলেন ‘নিষ্ঠুর শাসক’, কিন্তু তবুও তিনি জনপ্রিয়। কারণ, তিনি শেষ পর্যন্ত দেশের মানুষকে খুশি করতে পেরেছিলেন অনেক ক্ষেত্রেই।

জিয়ার জনপ্রিয়তার কারণ বিশ্লেষণ করলে একটা বিষয় খুব পরিষ্কার হয়ে সামনে আসে। স্বাধীনতা–পরবর্তী সময়ে দেশে যে অস্থিরতা ছিল, যে অস্থিরতা হয়তো নানা কারণে শেখ মুজিবও সামাল দিতে পারেননি, জিয়া ক্ষমতায় এসে দেশকে এক ধরনের স্থিতিশীলতা উপহার দিয়েছিলেন। সামরিক আইনের কারণেই হোক, কিংবা তার সরকারের নীতি–নির্ধারণী সক্ষমতার কারণেই হোক, দেশে এক ধরনের স্থিতিশীলতা এসেছিল। জিয়ার জনপ্রিয়তার বড় কারণ এটিই।

জিয়ার শাসনামলের সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার হলো, একজন সামরিক শাসক হয়েও জিয়া দেশের গণতন্ত্র উত্তরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। শেখ মুজিব সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনী জারি করে একদলীয় শাসন কায়েম করেছিলেন। তিনি বাকশাল শাসন বেশিদিন জারি রাখতে পারেননি। এরপরই তিনি নিহত হন ও তার দলেরই অন্যতম শীর্ষ নেতা খন্দকার মোশতাক শাসনভার গ্রহণ করেন। শাসনের ধরন যেটিই হোক, সাংবিধানিকভাবে একদলীয় শাসন ছিলই। অনেকেই বলেন সামরিক শাসক জিয়া একদলীয় শাসন ব্যবস্থা খুব সহজেই পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করতে পারতেন, নিজের স্বার্থেই। কিন্তু অদ্ভুতভাবে তিনি সেটা না করে বহুদলীয় ব্যবস্থার দিকেই দেশকে নিয়ে গেছেন। পরিশুদ্ধ গণতন্ত্র হয়তো তিনি দেননি, কিন্তু দেশ একদলীয় পদ্ধতি থেকে বহুদলীয় রাজনীতির পথে যে জিয়ার হাত ধরেই হেঁটেছিল, সেটা তার শত্রুও স্বীকার করবেন।

জিয়ার শাসনামল একটা অসমাপ্ত ছোটগল্পের মতো। তিনি যখন পূর্ণ কর্তৃত্ব নিয়ে দেশ শাসনে মনোযোগী, সামরিক শাসন তুলে দিয়ে দেশকে বহুদলীয় ব্যবস্থার দিকে নিয়ে গেছেন, নিজে রাজনীতিতে এসেছেন, রাজনৈতিক দল গঠন করেছেন, সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে একটা পার্লামেন্ট প্রতিষ্ঠা করেছেন, ঠিক তখনই এক ব্যর্থ সেনা অভ্যূত্থানে জিয়া নিহত হন চট্টগ্রামে, ১৯৮১ সালের ৩০ মে। হতবাক জাতি একজন সামরিক শাসককে মৃত্যুর পর যে মর্যাদা দিয়েছিল, সেটি অবিস্মরণীয়। জিয়া মূলত কাল্ট হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন নিহত হওয়ার পরই। তার জনপ্রিয়তাও মানুষ অনুভব করেছে তার মৃত্যুর পরই। জিয়া ছিলেন ব্যক্তিগত সততার দৃষ্টান্ত। উপমহাদেশীয় রাজনীতিতে একজন রাষ্ট্রনায়কের সততা, তার সাধারণ জীবনযাপন মানুষ আবেগের সঙ্গেই গ্রহণ করে, জিয়ার ক্ষেত্রেও তেমনটিই হয়েছিল।

জিয়া কতটা জনপ্রিয় ছিলেন, তার প্রমাণ সামরিক শাসকের প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলটির সাধারণ মানুষের রাজনৈতিক দল হয়ে ওঠা। যদিও সেটি হয়েছে, তার মৃত্যুর পর, জিয়ার স্ত্রী খালেদা জিয়ার হাত ধরেই। জিয়ার রাজনৈতিক পরম্পরার ধারক–বাহক হয়ে খালেদা জিয়া সেই পরম্পরাকেই এগিয়ে নিয়ে গেছেন পরবর্তী চার দশকেরও বেশি সময় ধরে।

সামরিক শাসকের একটা দেশের রাজনীতির কাল্টে পরিণত হওয়ার ঘটনা দুনিয়ায় খুব বেশি নেই।

সম্পর্কিত